somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দুঃখ দিনের গান - শেষ পর্ব।

২৮ শে জুলাই, ২০০৯ দুপুর ২:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


দুঃখ দিনের গান-১
বনি আর আমি যখন পালিয়ে বিয়ে করি, তখন আমাদের আর কতই বয়স?
আমরা দুজন সবে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শেষ করে বসে আছি।
পালিয়ে না গিয়ে আসলে আমাদের কোন উপায় ছিল না। কারণ আমাদের ভালোবাসাকে স্বীকৃতি দেবার মত তখন কেউ ছিল না।
তাছাড়া বনি আর আমাদের সামাজিক অবস্থান এক ছিল না। বনিদের ছিল স্বচ্ছল পরিবার। বনি ছিল একমাত্র মেয়ে। প্রচন্ড সুন্দরী। অতটুকু মফঃস্বল শহরে, ওকে এক নামে সবাই চিনতো। ওদের সামাজিক প্রতিপত্তিও ছিল বিস্তর।
আর আমি? ছোট বেলায় হারিয়েছি মা'কে। বাবা আরেকটা বিয়ে করে আলাদা থাকেন। থাকি বড় বোনের আশ্রয়ে। যদিও বড় বোন যথেষ্ট আদর করেন।
অন্যদিকে চেহারায় আমার বনির মধ্যে ছিল আকাশ-পাতাল তফাৎ।
আমাকে সৃষ্টিকর্তা তৈরীই করেছেন কালো মাটি দিয়ে, আর রেখেছেন চির অন্ধকারে। এই জীবনে শুধু অন্ধকারেই পথচলা আমার।
চেহারায় শ্রী বলতে কিছুই নেই। তবুও বনি আমার প্রচন্ড প্রেমে পড়েছিল।
আসলে এখন বুঝতে পারি, যতটা ও আমায় ভালো বেসেছিল- তার চেয়ে ও মুগ্ধ পাঠক ছিল আমার লেখার। আমি নাকি খুব ভালো লিখতে পারি।আমাকে বনি বলতো, "হ্যামিলনের বাঁশীওয়ালা।"আমার কবিতায় বনির মত নরম মেয়েরা দুর্বল না হয়ে পারেনা।
ইশ্বর আমাকে দিয়েছিলেন, প্রচন্ড ভালোবাসার ক্ষমতা। যার অধিকাংশই আমি ব্যায় করেছিলাম, বনির পেছনে।
বিয়ে করে যখন বড় আপার বাসায় উঠলাম, সে রাতটা ছিল বড় ঝড়-জলের রাত। তারিখটা ছিল ১৪ শ্রাবণ। সে রাতে আমি বনিকে আমার নয়, মহাদেব সাহার কাছ থেকে ধার করে শুনিয়েছিলাম--
"তুমি শুদ্ধ করো আমার জীবন, আমি প্রতিটি ভোরের মতো
আবার নতুন হয়ে উঠি,
হই সূর্যোদয়
আমার জীবন তুমি পরিশুদ্ধ করো, আমি প্রস্ফুটিত হই ।"

মেয়েটা সারারাত আমার বুকের মধ্যে নুড়িসুড়ি মেরে শুয়েছিল। আমি ওর গায়ের গন্ধ, চুলের গন্ধ শুঁকে পার করেছি শ্রাবণের সেই আনন্দময় রাত।
আমরা দুজন কাছাকাছি এসেছিলাম, পরদিন। সমস্তটা দিন ওর হাত ধরে ছিলাম। কোথাও যাইনি। কিছু করিনি। শুধু আমি আর বনি, একটা ঘরে। আমাদের স্বপ্নে ঘরে।
১৬ ই শ্রাবণ বনির মা অনেক কষ্ট করে ঠিকানা খুঁজে এলেন, আমরা তখন গোছগাছ করছি--দূরে কোথাও পালিয়ে যাব।

প্রথমে বনি কিছুতেই মা'র সাথে দেখা করবে না। আমিউ ওকে পাঠালাম, কথা বলে আস--ভয় কি? আমি জোর করে ওর হাত থেকে আমার হাতটা সরিয়ে নেই। মা- মেয়েতে কি কথা হয়েছিল, জানি না।
শুধু এইটুকু জানি, এর কিছুক্ষণ পর; মেহের বানু আমার কাছে এলেন, "হাত জোর করে বল্লেন, বাবা তোমরা তো বিয়ে করেই ফেলেছ। আমার তো আর করার কিছু নেই-- তবে আমার একটাই মেয়ে। আমার একটা মান-সম্মান আছে। তাই একটা সামাজিক অনুষ্ঠানটা করে-মেয়েকে তোমার হাতে তুলে দিতে চাই। কয়েকটা দিন তুমি অপেক্ষা করতে পারবে না? তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিও না বাবা।"
মা মারা গেছেন অনেকদিন-- আরেকজন মা হাতজোর করছেন, কেন যেন সেটাকে কিছুতেই ফেরাতে পারিনি। বনি, মা'র সাথে যাবে না বলে অনেক কেঁদেছিল। আমি ওকে বুঝিয়ে পাঠাই। সবার সামনে আমি বনিকে স্পর্শ করতে পারিনি কিন্তু সেদিন ওর চোখের জল ছুঁয়েছিলাম।
চোখের জল মুছিয়ে আমি আমার নববধুকে তার মা'র সঙ্গে পাঠিয়ে দেই, একটা সুন্দর দিন দেখবো বলে।
সেই বনির সঙ্গে আমার শেষ দেখা। এরপর অনেক চেষ্টা করেছি, বনিকে শুধু একনজর দেখবার জন্য। বনির মা-বাবা, পুলিশকে ইনফর্ম করে রেখেছিল, ঐ এলাকায় আমাকে দেখা মাত্র যেন এ্যারেষ্ট করা হয়।
কতবার পুলিশের তাড়া খেয়ে দৌড়েছি। মার খেয়েছি, একদিন জেলেও ছিলাম। সেই পুলিশেরা আজও আমার পিছু ছাড়েনি। আমি স্বপ্নে, দুঃস্বপ্নে বাঁচার জন্য দৌড়ে বেড়াই।
শুনেছি, বনি নাকি প্রথম প্রথম কাঁদতো-- তারপর একদিন রাস্তায় ওর সঙ্গে আমার দেখা হল। বনি আমাকে চিনতে পারেনি। বনি তাকায়নি আমার দিকে।
বনির ১১৭ টা চিঠি আছে আমার কাছে। প্রতিটা চিঠিতে কত আবেগ, কত প্রেম, সেগুলোকে উপেক্ষা করে, আমাকে উপেক্ষা করে বনি চলে যায় অনাগত ভবিষ্যতকে সুন্দর করতে।
পেছনে পরে থাকি আমি সেই কালো ছেলে--"মুঠো মুঠো কবিতা বুকের ভেতর জমিয়ে।" আমার ক্ষত বিক্ষত হৃদয় জুড়ে থাকে শুধু ঘৃণা।
তারপর যা হয়, পা বাড়াই আরেক অন্ধাকার জগতে, প্রথমে নেশা-- তারপর রাজনীতি। অস্ত্রবাজি, নীতির অবক্ষয়, সব কিছুই আমার চরিত্রের সাথে নোটিশ বোর্ডের মত ঝুলতে থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই কালো দিনগুলো থেকে আমাকে মুক্ত করে যুথি। শর্ত একটাই, যৌথ জীবনের প্রতিশ্রুতি।
যুথি আমার ক্ষতের মলম হয়ে এলও,একটা দিনের জন্যও আমি বনিকে ভুলতে পারিনি। সেটা কি আমার দোষ? চাইলেই জীবন থেকে মুছে ফেলা যায়, প্রথম প্রেমের স্মৃতি? সেই ১১৭ টা চিঠি? কদম গন্ধ মেশানো তুমুল ভালোবাসা?
না, আমি আসলে ঠিক কাউকেই ধরে রাখার উপযুক্ত না। আজকাল এটুকু বুঝতে পারি, আবেগ দিয়ে হৃদয় দোলানো যায়। কবিতা লিখে, কবিতা পড়ে মোহ তৈরী করা যায়--- কিন্তু ভালোবাসার গহীন জল সেঁচে মুক্তো আনা যায় না।
হয়তো আমি ঠিক পুরুষ না। শক্তি প্রয়োগে ঘৃণা ছিল বলেই কি, আমার জীবনে ভালোবাসারা দেশান্তরী? আমি ঠিক বুঝতে পারি না।
আজকেও ১৬ শ্রাবণ, যুথি চলে গেল একটু আগে। আর ফিরবে কিনা আমার জানা নেই।
এ জীবনে আমারই তো আর ফিরতে ইচ্ছা করে না, যুথিকে ফেরাবো কি? ঘরের আলো গুলো নিভিয়ে, জানালা খুলে দেই। বাইরে বৃষ্টি ধোওয়া আকাশ আর জোৎস্না জলে মাখামাখি। খোলা জানালায়--বুক ভরে তুলে নেই মুক্ত বাতাস।
তারপর চাঁদের আলোতে আমি বনির ১১৭ টা চিঠি পোড়াই।
আমার ব্যাক্তিগত বাক্সে লুকিয়ে রাখা চিঠির পাশে শুয়ে থাকা, ক্ষুদে অস্ত্রটাকে তুলে নেই আলগোছে। বড় যত্নে এতদিন যুথির চোখ এড়িয়ে ওটাকে রেখেছিলাম।
খুব ঠান্ডা মাথায় অস্ত্রটাকে পর পর দুবার নিশানা করি নিজের দিকে।
একবার শুধু ঘুমাতে চাই, আরামের ঘুম।
আমি পড়ে থাকি আমার বোধর বাইরে।
বোধহীন শূণ্যতায় এবার বনি কিম্বা যুথির কথা বলি না, আমি জীবনানন্দকে স্মরণ করি, বিড়বিড় করে বলি---
"ধানসিড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়েছিলাম--পউষের রাতে--
কোনদিন আর জাগবো না জেনে
কোনদিন জাগবো না আমি --কোনোদিন জাগবো না আর--"


আজ ১৬ শ্রাবণ, এবার আমি পালাবোই।

সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জুলাই, ২০০৯ দুপুর ২:৪৭
৪২টি মন্তব্য ৩৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×