রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছি, হঠাত অচেনা একজন তরুনের সালামে কিছুটা চমকে উঠি। আমতা আমতা করে বলেই ফেললাম আপনাকে ঠিক চিনতে পারলাম না।
“স্যার, আমি বদরুল, ঐ যে আপনি যেখানে অফিস করতেন সেই ফ্লোরে ক্লিনারের কাজ করতাম”
এবার আমি চিনতে পারি। মনে পড়ে, ২০০৭ সালের কথা, আমি নতুন ওই ফ্লোরে বসা শুরু করেছি। একটি ছোট ছেলে (চেহারা দেখে আনুমান, বড় জোর বয়স হবে ১৫-১৬ বছর)আমাদের জন্য বাথ রুম/ফ্লোর পরিস্কার করছে। মনে মনে ভাবতাম যে কোম্পানী এত সিএসআর করে বেড়াচ্ছে, শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে এত বড় কথা বলে তারাই আবার থার্ড পার্টির মাধ্যমে নিজেদের কাজে শিশুদের নিয়োগ করছে।
ছেলেটি কয়েক বার এসেছে আমার কাছে, “স্যার এডমিনে বলে আমাকে ক্লিনার থেকে পিওনের চাকরি নিয়ে দেন”..কর্পোরেটের বেড়াজাল টপকে তার আবদার কিম্বা ক্যারিরার উন্নতির এই আকাঙ্ক্ষা টুকু পূরন করতে পারিনি। তেমনি পারিনি সিএসআর ডিপার্টমেন্টে একটা মেইল করতে এই বলে যে কোম্পানীর সিএসআর এর আওতায় এদের জন্য কিছু করতে যেন এরা তাদের কাজের পাশাপাশি লিখাপড়াটা চালিয়ে নিতে পারে এবং ভবিষ্যতে যেন ভাল কোন কাজের সুযোগ পেতে পারে (এটা ভেবেছি অনেক বার কিন্তু করা হয় নি)। কারণ আমিও তথাকথিত স্বার্থপর কর্পোরেট দাস...যারা নিজেরটুকু পনের আনা হলেই চরম বিরক্ত এবং হতাশ হই কিন্তু আমাদের পাশেই অসংখ্য বঞ্চিতদের কথা ভাবি না, ভাবি ওরা তো পিওন/ক্লিনার, ওরা অশিক্ষিত-ছোটলোক ওদের আবার পাওয়া – না পাওয়া কি? এই অফিসে যে ওরা ঢুকতে পারে সেটিই ওদের সৌভাগ্য!
তারপর একসময় ঐ ফ্লোর আমাকে ছাড়তে হয়েছিল, অফিসের নিয়মে আমাকে বসতে হল অন্যত্র। বিগত প্রায় তিন বছর আর দেখা নাই, স্বীকার করতে দ্বিধা নাই যে আমি প্রায় তাকে ভুলেই গেছিলাম।
আবার ফিরে আসি বর্তমানে, বলি হ্যা চিনতে পেরেছি ভাই, তা তুমি এখন কি কর?
“স্যার আমি একটা কোম্পানী দিয়েছি” - বলে তার একটা কার্ড বের করে দেয় আমাকে।
এবার আমি সত্যি অবাক হই। ভাল করে লক্ষ্য করি, ছেলেটির মুখে সেই অসহায় আর্তি নেই, বরং আত্মবিশ্বাসে টগবগে এক তরুন। পেশাদার সেলসম্যানের মত আমাকে নিজে থেকেই বলে যায়...
“স্যার আমি একটা ক্লিনিং কোম্পানী দিয়েছি, বাসা-অফিসের সোফা-কার্পেট-ফ্লোর-বাথরুম পরিস্কার করতে পারি। একবার কাজ করলে স্যার দেখবেন কত ভাল আমাদের কাজ। স্যার, আমার দিকে দেখবেন, কিছু কাজ যদি যোগাড় করে দেন”
আমি বলি ভাই আমি যেখানে কাজ করি সেখানে তো তোমাকে এ ধরনের কাজ পাইয়ে দেবার সুযোগ নেই। তাতেও হতাশ হয় না সামান্য ক্লিনার থেকে উদ্যোক্তা বনে যাওয়া বদরুল, বলে
“স্যার, আপনার অফিসে না হয়, অন্য জায়গায় দেখেন, আপনার বন্ধুদের বলে দিলেই হবে। স্যার ওখানে পিওনের পদ চেয়েছিলাম, কিছু হল না, কাজও স্যার কিছু শিখতে পারছিলাম না-শুধু হারপিক দিয়ে বাথরুম পরিস্কার করা ছাড়া। পরে স্যার অন্য কোম্পানি তে জয়েন করে আরো বিভিন্ন রকম কাজ শিখেছি। মেশিন কিনেছি। একটি কোম্পানিতে দুজন লোক দিয়েছি। আরেকটি কোম্পনীতে স্যার কোটেশন জমা দিয়েছি”
বেশ গর্বিত ভাবে নিজের সাফল্য বলে যায় সে।
“স্যার, আমার জন্য একটু দোয়া করবেন”
যত শুনি তত মুগ্ধ হই। অন্তর থেকেই তার জন্য শুভকামনা বের হয়ে আসে।
বদরুল শাহজাদপুর কেন্দ্রিক অফিস নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। কারো বাসা-অফিসে প্রফেসনাল ক্লিনিং এর প্রয়োজন হলে তাকে ট্রাঈ করতে পারেন।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০১০ সকাল ১০:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



