somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গদ্যচর্চা- এক

১৪ ই ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ৯:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গদ্যচর্চা- এক/ শেখ জলিল

১.
বাসার পাশে আমগাছের ডালে একটানা কর্কষ ডাক ডেকেই চলছে কাকটা। আরিফ সাহেবের ইচ্ছে করছে গুলি করে মারা যেতো যদি কাকটাকে। কিন্তু লাইসেন্স করা বন্দুক তো নেই ঘরে। অতএব সে উপায়ও নেই। অনেক সময় যখন মন ভালো থাকে তখন এ ঢাকা শহরে দুপুরে কাকের ডাক-ই কোকিলের ডাকের মতো মধুর শোনায় তার কাছে। কিন্তু আজ তার মন ভীষণ খারাপ। চোখ বুঁজে বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছে আরিফ সাহেব। আজ তিন মাস হলো চাকরি নেই তার।

এরকম অবস্থা তার জীবনে বহুবার এসেছে। প্রতিবারই কঠিন সংগ্রামে ধৈর্য সহকারে সামলিয়েছে সেসব। কিন্তু এবার তার ধৈর্যের বাঁধ যেন ভেঙে যাচ্ছে। বারবার খেই হারাচ্ছে সমস্যা উত্তোরণের ভাবনা থেকে। কীভাবে কোন পথে এগুবে সে? কোনোকিছুতেই মিলছে না সমাধানের পথ। শীতের এ অলস দুপুরে খাবার পর একটা পাতলা কাঁথা গায়ে ভাবছে আরিফ সাহেব। রাত লম্বা বলে শীতের দিনে দুপুরে ঘুম আসছে না তার। আর যখন ঘুম আসে না চোখে তখন দুনিয়ার ভাবনা এসে ভিড় করে মনে।

হয়তো ভাবলো সে আজই লেগে যাবে একটা কাজে। কিন্তু সে কাজের ফল দেবে কতোটুকু? যখন ফলাফল আয়-উপার্জনের সাথে জড়িত, সংসার চালানোর দায় যখন কাঁধের উপর- তখন যেনতেন কাজ তো আর সমাধান নয়। সঠিক সময়ে চাই সঠিক কাজ। যে কাজে সময় অপচয় বেশি অথচ উপার্জন কম- এরকম কাজ করার বয়স তার নেই। বয়স চল্লিশ ছাড়িয়েছে তার দু'বছর আগে।

আরিফ সাহেবের বাবা মারা গেছেন আট বছর আগে। ঘরে স্ত্রী, এক ছেলে, দুই মেয়েসহ তার ছোট্ট সংসার। মা বেঁচে থাকাকালীন সাথে থাকতেন তিনি। তিনিও মারা গেছেন গেলো বছর। তবু ঢাকা শহরের এ ছোট্ট বাসার ভাড়া বিদ্যুত, পানি, গ্যাস, পেপার, টেলিফোন ও ডিস লাইনের বিলসহ দশ হাজার টাকার উপরে পড়ে যায় প্রতিমাসে। খাওয়া-দাওয়ার খরচ আর কতোই বা কামানো যায়? তার উপর ছেলেমেয়ের পড়াশুনা, যাতায়াত, কাপড়চোপড়, উৎসব খরচ তো আছেই।

২.
আরিফ সাহেবের মনে পড়ছে প্রথম বেকার জীবনের কথা। সবেমাত্র বিয়ে করেছে সে। জেলা শহর থেকে উঠে এসেছে শ্বশুড়বাড়িতে। একে তো নতুন বউয়ের নানান চাহিদা তার উপর বেকার জীবন। বউ তার কাছে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাবার তাড়া দেয়। কারো বাসায় গেলে কী আর খালি হাতে যাওয়া যায়? মাঝে মাঝে বউ যখন শপিং-এ যাবার বায়না ধরে আরিফ সাহেবের তখন মরে যেতে ইচ্ছে করে। গোণা টাকায় আর ক'দিন চলে? নিজের যা গচ্ছিত ছিলো অল্প ক'দিনেই শেষ যায় তা। এরপর শুরু হলো আসল অত্যাচার। বউয়ের খোটা শুনতে হয় প্রতিদিন- কামাইয়ের মুরদ নেই, তবে বিয়ে করলা ক্যান?

আরিফ সাহেব হন্ন হয়ে চাকরি খোঁজে। সরকারি কী বেসরকারি একটা চাকরি তার চাই-ই। সেবার বিসিএস পরীক্ষায় ভাইভা পর্যন্ত গিয়েও চাকরি হলো না তার। শালার দুর্ভাগ্য একেই বলে! এরপর আরিফ সাহেব পণ করলো- জীবনে আর সরকারি চাকরি করবে না সে। পত্রিকায় বেসরকারি চাকরির বিজ্ঞাপন খুঁজে খুঁজে প্রায় প্রতিদিনই একটা করে দরখাস্ত পাঠাতে থাকে সে। অবশেষে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়। একটি বেসরকারি সংস্থায় ঢাকার বাইরে চাকরি হয় তার। কিন্তু বউ সাথে যেতে রাজি হয় না সেখানে। এতো অল্প বেতন আর মফস্বল জীবন তার পছন্দ না। বাধ্য হয়ে আরিফ সাহেব চাকরি নিয়ে একাই চলে যায় উপজেলা শহরে। কথা দিয়ে যায়- ছ'মাস পর শিক্ষানবীসকাল শেষে যখন বেতন বাড়বে তখন এসে বউ নিয়ে যাবে সে।

আর এটাই কাল হলো আরিফ সাহেবের জীবনে। বউ তার একা ঢাকার বাসায় থাকে। কোনো ছেলেমেয়ে হয়নি তাদের। সাথে যদিও শ্বাশুড়ি, সম্বন্ধী ও তার বউ থাকে, তাতে কী? আধুনিক ঢাকা শহরে স্বামীছাড়া স্ত্রীদের ক্ষেত্রে যা ঘটে তাই। এতো দূরে থেকে আরিফ সাহেব অবশ্য কিছুই জানতে পারে না। দু'মাসে একবার ঢাকায় বউয়ের কাছে এসে কী আর বুঝবে সে? আরিফ সাহেব রাতদিন চেষ্টা করে চাকরিটা পাকাপোক্ত করার আর অফিসের মন জোগাতে। এদিকে ঢাকায় নিজের বউ যে তার অন্যের মন জোগাতে প্রতিদিনই বাইরে যায় শ্বশুড়বাড়ির কেউ খেয়াল করে না তা।

অবশ্য চাকরিক্ষেত্রে আরিফ সাহেবের ভাগ্য খুলে যায় একদিন। কিন্তু নিয়তির কী নির্মম পরিহাস! পদোন্নতি আর বদলী নিয়ে যখন সে ঢাকায় আসে বউ আর তার নিজের থাকে না। হঠাৎ খবর আসে- বউ তার পালিয়ে গেছে অন্যের হাত ধরে। এরপরের দিনগুলো আরিফ সাহেবের বেশ কষ্টে যায়। বছরখানেক একা থাকার পর আবার বিয়ে করে সে। কিন্তু যে ফাটা কপাল তা তেমিন থাকে, জোড়া লাগে না। চাকরিতে এরকম ভাঙাগড়া চলছে তো চলছেই। এই দশ বছরে পাঁচবার চাকরি বদল করতে হয়েছে তাকে। একেই কী বলে বেসরকারি চাকরিজীবন? ....(চলবে)

১৪.১২.২০০৭


সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ১১:১০
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×