গদ্যচর্চা- দুই/ শেখ জলিল
৩.
আরিফ সাহেবের ভাবনায় এবার আসে দেশ ও জাতি। আজ শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস। স্বাধীনতার ছত্রিশ বছর পেরিয়ে গেছে। তবু বাঙালি জাতি জাগেনি, গড়তে পারেনি আজো দেশটাকে। একাত্তরে যে বুদ্ধিজীবিরা পথ দেখিয়েছিলো স্বাধীনতার- তারা আজ চিরনিদ্রায় শায়িত। রাজাকার, আলবদরেরা হত্যা করেছে বুদ্ধিজীবিদের। আর স্বাধীন দেশে জাতির পিতাকে হত্যা করেছে এদেশের মানুষ। সারাবিশ্বেই যুদ্ধাপরাধীদের জন্য রয়েছে বিচারের আইন। বঙ্গবন্ধুর আমলে বাংলাদেশেও হয়েছিলো আইন তৈরি। বিচার করতে বাঁধা কোথায়? এইতো শালার বাঙালি জাতি। কী নির্মম সেলুকাস!
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ছত্রিশ বছরে জুটমিল, কটনমিল, কলকারখানা বন্ধ হয়েছে। বাড়ছে লোকসংখ্যা, বাড়ছে বেকারসংখ্যা তবু বাড়েনি কর্মসংস্থান। যুবক-যুবতী, ছাত্র-ছাত্রীরা আজ হতাশায় ভুগছে, বিপথে যাচ্ছে। কোনোদিকেই যেন খেয়াল নেই সরকারের। যখনই যে ক্ষমতায় এসেছে তাদের আখের গুছিয়েই ক্ষান্ত হয়েছে সবাই। ক্ষমতার বাইরে থাকলেই জাতির পিতা হত্যার বিচার চাই, বুদ্ধিজীবি হত্যার বিচার চাই। অথচ ক্ষমতার যাবার জন্য যুদ্ধাপরাধীদের সাথেই তারা মেলাচ্ছে হাত। ভাগ্যিস! বুদ্ধিজীবিরা আজ বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে তাঁরা এদেশের দলগুলোর অবস্থা দেখে নিজেরাই লজ্জায় মরে যেতেন।
এইতো এদেশের অবস্থা। যেখানে নতুন কর্মসংস্থান নেই সেখানে একটা চাকরি পাওয়া যে কতো কষ্টের তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে আরিফ সাহেব। নতুন কর্মসংস্থানের ঘোষণা দিয়ে গড়ে উঠেছে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী, বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, এনজিও, মোবাইল ফোন অপারেটর, ব্যাংক, বীমা নামক নানান প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সেখানেও বিদেশী ডিগ্রিধারী বা সাদা চামড়াদের দৌরাত্মই বেশি। মাল্টিন্যাশনাল হাসপাতালগুলোতে বিদেশী ডাক্তার, নার্স এমন কী ওয়ার্ড বয়, আয়া পর্যন্তও পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে আগত। হায়রে স্বদেশ! হায়রে বাংলাদেশের বেকার যুবা!
আরিফ সাহেবের ভাবনায় কিছুই মেলে না। মানুষ কেন যে এতো লোভী হয়! বাঙালির রক্তের মধ্যেই যেন মিশে আছে কম সময়ে বড়লোক হবার নেশা। তা নাহলে এতো ছোট্ট দেশ দুর্নীতিতে শীর্ষস্থান দখল করে কেমনে? রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সরকারী চাকুরে, এনজিও প্রধান, ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার সবাই আজ দুর্নীতির দায়ে বিচারাধীন। যে বেসরকারি চাকরি নিয়ে আরিফ সাহেব কাটালো এতোটা বছর সেখানেও দেখেছে সে দুর্নীতি। মনে পড়ে তার- যে ক'টি প্রতিষ্ঠানে সে চাকরি নিয়েছে সেখানকার শীর্ষস্থানীয় সবাই কমবেশি দুর্নীতির সাথে জড়িত। আর তাইতো তাকে ছাড়তে হয়েছে চাকরি। চাকরিজীবনের বিগত প্রতিষ্ঠানগুলো হয় বন্ধ হয়েছে নয়তো ফান্ডের অভাবে থুবড়ে পড়েছে। এই হলো তার চাকরিজীবনের ইতিহাস!
৪.
ভাবনায় ছেদ পড়ে আরিফ সাহেবের। কাকটা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। গলার স্বর তার আরও উচ্চে উঠেছে। এদিকে গিন্নী তার পাশে এসে মেজাজ গরমে শুরু করলো সকালের কৈফিয়তগুলো।
'ঘরে চাল নেই, আজ সাতদিন হলো বাজারে যাও না তুমি। কী দিয়ে যে কী রাঁধি, একবার ভেবেছো কি? এমন হলে ছেলেমেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যাবো আমি।'
আরিফ সাহেব বউয়ের কথায় কোনো উত্তর দেয় না। মনে মনে বলে, 'কিছুদিনের জন্য চলে গেলেই তো ভালো। একদিকে পকেট খালি তার উপর চাকরি নেই। ধারকর্জে আর কতোদিন!' আরিফ সাহেব সিদ্ধান্ত নেয়- এক আত্মীয়ের কাছ থেকে উপহার পাওয়া বিদেশি দামী ঘড়িটা একদিন চুপ করে বেঁচে দেবে সে। কিছুটা হলেও এমাসের খরচের সংস্থান হবে। তারপর বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলে উদাস মনে দাঁড়ায় সে। পাশের দোকান থেকে আজ রাতের রান্নার জন্য বাকি আনতে যেতে হবে তাকে।
১৫.১২.২০০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

