somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কবিতা লেখার জ্বালা

০৮ ই জানুয়ারি, ২০০৮ সকাল ৮:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কবিতা লেখার জ্বালা অনেক। কবির ঘরে জ্বালা, বাইরে জ্বালা, অন্তরেও জ্বালা লেগে থাকে সবসময়। এ জ্বালার যেন শেষ নেই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত! একবার শব্দপরী যাকে ছুঁয়ে যায়, কবিতার ঘূণপোকা তার শরীরের বাসা বাঁধে, কুরে কুরে খায় তাকে। সমাজ, সংসার, রাষ্ট্র কারও কাছে কবিরা সঠিক মূল্যায়ণ পেয়েছে বলে শুনিনি কোনোকালে। উপর্যুপুরি নানান তিক্ত কথা, অপমান সইতে হয় কবিদের সমাজ, সংসারের কাছ থেকে। মা-বাবার কাছে একজন ছেলে বা মেয়ের কবিতা লেখা মানে বখে যাওয়া বা নষ্ট হয়ে যাওয়া- সে ছেলে বা মেয়েটি যেন আর মানুষ হবার নয়। আসলে সমাজের কাছে কাছে কবি আর মানুষ যেন দু'টি ভিন্ন প্রজাতি হয়ে যাচ্ছে আজকাল!

কবিতা লেখার শুরু থেকে শুনে আসছি- বাংলাদেশে কবি ও কাকের সংখ্যা নাকি সমান। একজন কবি মানেই গাঁজাখোর, বেশ্যালয়ে গমনকারী বলে আখ্যায়িত করতে শুনেছি অনেক শিক্ষিত লোক বা অধুনা প্রকাশকদেরও। এই যদি হয় কবিদের বর্তমান সামাজিক অবস্থান তখন কবিতা লেখায় নিরুৎসাহিত পারেন অনেকেই। সেক্ষেত্রে গদ্যলেখকদের হয়তো মর্যাদা বাড়বে আরও, তবে সুকোমল হৃদয়বৃত্তির চর্চা, দ্রোহ, প্রেম, ভালোবাসা আমাদের সমাজ থেকে কতোটুকু উবে যাবে সুশীল পাঠকগণ বুঝবেন আশা করি।

বলছিলাম কবি ও কবিতা লেখার কথা। কবির বিরুদ্ধে এই যে বিষোদ্গার- সেখানে কবি সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে কতোটুকু প্রয়োজনীয় একটু পিছন ফিরে দেখি। বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে বিশ্বকবির গান, বিদ্রোহী কবির কবিতা বা মুকুন্দ-দ্বিজেন্দ্রগীতি কতোটুকু উন্মাদনা তুলেছিলো তা নতুন করে কাউকে বলে দেবার প্রয়োজন নেই। আমাদের ভাষা আন্দোলনে, স্বাধীনতাযুদ্ধে উপরোক্ত কবিদের গান-কবিতা ছাড়াও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে সিকান্দার আবু জাফর, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহসহ অনেক কবির কবিতা ও গান। সবচেয়ে বড়ো গর্বের বিষয় হলো বাংলা সহিত্যে একমাত্র নোবেল বিজয়ী কিন্তু একজন কবিই। সাতচল্লিশ, বায়ান্ন, একাত্তর, নব্বই সব আন্দোলনের সাংস্কৃতিক অবদান কিন্তু প্রথমে কবিদেরই প্রাপ্য।

এবার আসি কবিতা লেখার অবদানকে খাটো করার প্রয়াস নিয়ে যে কথাগুলো বলা হয় তার দিকে। অনেক শিক্ষিত লোককে বলতে দেখেছি- আধুনিক কবিতা মানে একটি গল্প বা প্রবন্ধের দুই দিকে ছেঁটে দিলেই হলো। ব্যস, হয়ে গেলো একটি গদ্যকবিতা। আগের যুগেও কবির ভাবনাকে তুচ্ছ করতে দেখেছি- আষাঢ় মাস/গরু খায় ঘাস- এরকম লইন আওরিয়ে। আসলে কবিতা লেখা কী এতোই সোজা? একজন কবিকে অনেক পথ পাড়ি দিতে হয়। তাঁকে প্রাত্যহিক জীবন থেকে নিতে হয় তার মূল আস্বাদনটুকু। তবেই না একজন কবির কবিতা হয়ে ওঠে কাব্যময়- স্থান প্রায় সমাজ ও মানুষের অন্তরে।

আজকালকার তথাকথিত অধুনা গদ্যলেখক যারা কবিদের দিকে নাক ছিটকান তারা একটু খেয়াল করলেই দেখবেন- রবীন্দ্র যুগ থেকে বর্তমান পর্যন্ত কোনো ভালো নামকরা কবির গদ্যরচনা অপাংক্তেয় হয়েছে কি? বরং গদ্যরচনায় সবাই মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। রবীন্দ্র-নজরুলের গল্প, উপন্যাস, নাটক আমদের কাছে অমৃতস্বরূপ। আধুনিককালে এপার বাংলার কবি আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, আবুল মান্নান সৈয়দ-এর গদ্য বা ওপার বাংলার কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের গদ্য অনেক অনেক সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী।

হাল আমলে বাংলাদেশে কবিদের বইয়ের বিক্রির সংখ্যা নিতান্ত নগণ্য। কবি শামসুর রাহমানের বইয়ের কাটতি যে বেশি ছিলো তাও নয়। তাঁর মৃত্যুর পর কবিতাসমগ্র বিক্রির হার কিছুটা বাড়লেও উপন্যাসের মতোন অমন আহামরি নয়। জীবিত কবিদের মধ্যে আল মাহমুদ, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ-এর বই বিক্রির কথা কিছুটা শোনা যায়। অন্যান্যদের বিক্রির হার খুবই নগণ্য। এমতাবস্থায় নুতন কবিরা গাঁটের পয়সা খরচ করে বই বের করলেও মূলধন কখনো উঠে আসে না। আর প্রকাশকরা এ সুযোগটা নিয়ে অনেক তরুণ কবির সাথে প্রতারণাও করে। যদিওবা কারও কারও বই বিক্রি কিছু হয়, তখন প্রাপ্য সম্মানীটুকুও ঐ কবির কপালে জোটে না।

এমতাবস্থায় ভাবছি, কবিতা লেখা ছেড়ে দেবো। লিখবো না আর কবিতা কিংবা গান! হালের গদ্যলেখকদের এতো কদর আর কবিদের প্রতি অবহেলা মনটা বিষিয়ে তুলছে। ঘরে জমে আছে বেশ ক'টি কবিতার বইয়ের পাণ্ডুলিপি। প্রকাশ করা যাচ্ছে না কোনোভাবেই। অথচ দেদারছে প্রকাশ হচ্ছে গদ্য নামের চটিবই- যা কিনা ফুটপাতের দোকানে শোভা পাচ্ছে শেষ পর্যন্ত।

প্রকাশকদের সাফ কথা- কবিতার বইয়ের বিক্রি নেই। (অ)উপন্যাস নামের অখাদ্য বইও পাঠকরা নাকি গিলে থাকেন নিয়মিত। কথা ঠিক- পদ্যের চেয়ে গদ্য সাহিত্যের নতুন মাধ্যম। মানুষ নতুনের দিকে ঝুঁকবেই। তবে তা শিল্পসাহিত্যের বিচারে কতোটুকু পাঠযোগ্য তারও তো বিচার করা চাই। আধুনিক যুগে বাংলাদেশে অলৌকিক বিষয়, কল্পকাহিনী, কুসংস্কার, ঝাড়ফুঁক, জ্বীনপরী, তাবিজকবজ, পর্ণো নিয়ে লিখে নামকরা কথাসহিত্যিকগণ প্রচুর টাকা কামাচ্ছেন, করছেন বাড়িগাড়ি। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবিদেরও দিনাতিপাত কঠিন হয়ে যাচ্ছে আজকাল। এই অবস্থার দায় কী একমাত্র কবিদেরই? প্রকাশক, সমালোচক, পাঠকদের কী একটুও দায়বদ্ধতা নেই?

০৭.০১.২০০৮
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে আগস্ট, ২০০৮ রাত ১০:৫৬
৪টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×