ভাবছি, এবার গদ্যে হাত দেবো। কতো স্মৃতি, কতো কথা জমে আছে বুকের ভিতর! কিছুই বলা হচ্ছে না গদ্যে। যখনই কোনো কিছু লিখতে গেছি কথার মালায়- এসেছে কবিতার অজস্র লাইন, কখনো বা পদ্যের শ্লোক। কেউ বুঝেছে, কেউ বোঝেনি আমার কবিতা-পদ্যকে। গদ্যের সরল বর্ণনায় পাঠক টানে। আমি তেমন গদ্য লিখিনি বলে পাঠকও টানতে পারিনি। গদ্যের ব্যাপারে এ আমার চির অপারগতা।
মাঝখানে উপন্যাসের খসড়া হিসেবে তিন খণ্ড লিখে ইস্তফা দিয়েছিলাম। সচল করা হয়নি আর সেটাকে। নিজের জীবনভিত্তিক আত্মকথন শুরু করেছিলাম। আমার কম্পু বিট্রে করলো। হারিয়ে ফেললাম সেটাও। হায়রে, একেই বলে গদ্যভাগ্য! সচরাচর যার হয় না গদ্যলক্ষ্মীর দেখা, ভাগ্যও তার সাথে পরিহাস করে। সারাক্ষণ হাঁসফাঁস করি কী করে লিখবো গদ্য? আর তখন পদ্য এসে ধরা দেয় কলমের ডগায়। এটাই হচ্ছে আমার লেখালিখির দিনকাল।
কিছুদিন আগে কথা হলো আমার এক খালাতো বোনের সাথে। সত্যিকারের খালাতো বোন না হলেও তারও ঊর্ধে সম্পর্ক বলবো। অনেক বছর পর ঢাকা মেডিকেলে রোগী দেখতে গিয়ে সাক্ষাৎ হলো। শুনলাম তাদের পরিবারের মর্মান্তিক কাহিনী। লোমহর্ষক সে কাহিনী শুনে আমার মাথায় সবসময় গদ্য বা উপন্যাস এসে ভিড় করছে। লিখতে পারছে না কিছুতেই। বোধ হয় ঐ পরিবারের সাথে বেশি ক্লোজ ছিলাম বলেই লেখা হচ্ছে না তাদের মা-বাবা হারানোর মর্মান্তিক কাহিনী। কিন্তু এবার পণ করেছি লিখতে হবেই আমাকে- তা যে করেই হোক।
২০০৬ সালের মে মাস। প্রথম ঘটনার সংবাদ এলো আমার কাছে। গ্রামের বাড়ি থেকে আমার ভাতিজা ফোন করলো একদিন। ভাতিজা বললো- কাকা, ডা. নূরুল ইসলাম মারা গেছেন। হঠাৎ স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। কারণ তিনি ছিলেন আমার শ্রদ্ধাভাজন, একেবারে পিতৃস্থানীয়। ক'দিন পরে সংবাদ পাওয়ায় দেখতে যাওয়া হয়নি সে সময়। সারারাত ঘুমাতে পারলাম না সেদিন। সচরাচর যা হয়, লিখে ফেললাম কবিতা। ২৪.০৫.২০০৬ তারিখে লিখলাম-
আপনি গেলেন চলে
আপনি গেলেন চলে ডাক দিয়ে আমার ভিতর
অন্তরাত্মা কেঁদে মরে দু'টি চোখ শোকের পাথর।
এই যে চলে যাওয়া- এতো সেই যাওয়া শেষের
অনন্ত অসীমে ডাকে ঐ তারা সুনীল আকাশের!
আর ফিরে আসবেন না জানি তবুও আজ বলি
এটা কী সময়ে যাওয়া না অসময়ের প্রাণ বলী?
পিছনে রইলো পড়ে ধন সব অগাধ সংসার
স্মৃতিকথা ধুঁকেধুঁকে মরে, কাঁদে দুঃখেরা অপার।
সেই যে আপনি শেষ টেলিফোনে বললেন কী যে
এখনো জীবন্ত স্বর দুই কানেতে সশব্দে বাজে-
আপনার আত্মজীবনীটা লেখা ছিলো প্রায় শেষ
লিখেছেন কী তাতে বাড়ন্ত স্বপনের অবশেষ?
জানি শেষ হয়নি সব চেয়েছিলেন আপনি যা
মরণ সরিয়ে গেছে আশাহত জীবনের বোঝা!
ডা. নূরুল ইসলাম সাহেবের মৃত্যটা ছিলো অস্বাভাবিক। একদিন স্ত্রীর সাথে ঝগড়াঝাটি, কথা কাটাকাটি হচ্ছিলো খুব। পালিত ভাগিনা এসে ঘরে তালাবদ্ধ করলো তাঁকে। আবদ্ধ ঘরে গরমের মধ্যে এক পর্যায়ে দ্বিতীয়বারের মতো স্ট্রোক করলেন তিনি। আর জ্ঞান ফেরেনি তাঁর। এরপরের ঘটনা আরও মর্মান্তিক। তাঁর স্ত্রী শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে আছেন। গ্রামের বাড়িতে স্বামীর স্মৃতি নিয়ে একলা একা পড়ে থাকেন। খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো করেন না, কারো সাথে তেমন কথাও বলেন না। ঠিক করলেন- চল্লিশ দিন পর দোয়া-দরুদ পড়াবেন, ফকির-মিসকিন খাওয়াবেন। অনুষ্ঠানের ঠিক ক'দিন আগে খবর এলো- থাকার ঘরে কে বা কাহারা তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করে গেছে! বাড়ির চাকর, কাজের মেয়েরা পলাতক!!
২৮.০১.২০০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

