somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ব্লগারদের বই নিয়ে ব্লগব্লগর- ১

২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ বিকাল ৫:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এবারের বইমেলায় বেশ ক'জন ব্লগারুর বই বেরিয়েছে। অন্তর্জাল পাঠকদের জন্য এটা নিঃসন্দেহে সুখবর। নেটে লেখালেখি, সরাসরি পাঠকদের সাথে শেয়ার করে মন্তব্য পাওয়া, ভাবের আদান-প্রদান এবং বই আকারে শেষে বইমেলায় প্রকাশ- এটা ব্যাপক পরিবর্তনের ঈঙ্গিত দিচ্ছে আজকাল। প্রকাশনা জগতে লেখক-পাঠকদের এই যে পরিবর্তনের হাওয়া একবিংশ শতাব্দীতে অনিবার্য হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে।

১৬ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে বইমেলায় গিয়েছিলাম। কিনেছিলাম নামকরা ব্লগার আলী মাহমেদ-এর 'খোদেজা', আরিফ জেবতিক-এর 'তাকে ডেকেছিল ধূলিমাখা চাঁদ' এবং অমিত আহমেদ-এর 'গন্দম'। বই কিনে বাসায় এসেই এক নাগাড়ে পড়ে গেলাম সব ক'টি বই। পড়তে পড়তে বেশ আশার হাওয়া দিচ্ছিলো প্রাণে। যাক, বই কিনে তাহলে ঠকিনি। তিনজন লেখকই আমার মতো পাঠককে অন্তত ধরে রাখতে পেরেছেন- যার নাকি গদ্য পড়া হয় না তেমন!

লেখক আলী মাহমেদ সামহোয়্যারইনব্লগে 'শুভ' নামে ব্লগিং করতেন। তখন থেকেই আমি তাঁর ভক্ত। এই লেখকের মোট ১১টি বই এখন বাজারে। বেশিরভাগ বই-ই বেরিয়েছে জাগৃতি প্রকাশনী থেকে। ব্রাহ্মনবাড়িয়ার মফস্বলে বসে আধুনিক ব্লগজগতে নিয়মিত লেখেন তিনি। গতবারও তাঁর লেখার 'শুভ'র ব্লগিং' নামের বইখানা পড়েছিলাম আমি। দারুণ গদ্যের হাত তাঁর। এবারের উপন্যাস 'খোদেজা' একজন সাত বছরের ধর্ষিত শিশু ও তার মৃত্য নিয়ে। কীভাবে নরপশুরা পালাক্রমে ধর্ষণ করে শিশুটিকে, মুখে বালি গুঁজে দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে তার লোমহর্ষক কাহিনী। বইটিতে আরও আছে চাকরি নিয়ে এক দম্পতির সংগ্রামী জীবনের কথা। পড়তে পড়তে বেশ মনোকষ্ট এসে যাচ্ছিলো নিশি ও জাবীর দম্পতির প্রতি এবং ধর্ষক পাষন্ডদের হাতে খোদেজার অকাল মৃত্যু বেশ ঘৃণা জাগাচ্ছিলো মনে। আর পাঠকদের এই মনোভাব লেখক আলী মাহমেদ জাগাতে পেরেছেন খুব সুচারুভাবেই। উপন্যাসের পরতে পরতে লোকজ বচন, ছড়া এবং আঞ্চলিক ভাষা তুলে আনার মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন লেখক। ভাষার বিন্যাস, কাহিনীও বেশ ভালো। তবে উপন্যাস রচনায় বেশ তাড়াহুড়ো মনে হয়েছে কাহিনীর পরিনতিতে। বিশেষ করে কেমন করে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ ধর্ষন ও হত্যা মামলাটির তদন্তের ভার পেলো- তা লেখক আড়াল করেছেন। খোদেজার ভাই সোহাগের পরিনতির চিত্র আরও বড় করে লেখা যেতো। লেখা যেতো সাংবাদিক অয়নের রিপোর্টিং দিকটা আরও শক্তিশালী করে। পাঁচ ফর্মার বইয়ের সাথে আরও এক ফর্মা যোগ করলে উপন্যাসের পরিনতি আরও পরিপক্ক হতো বলেই আমার বিশ্বাস। তবু সোঁদা মাটির গন্ধভরা এই উপন্যাসটি সুপাঠ্য এবং সংগ্রহে রাখার মতো। বই পড়ে লেখক আলী মাহমেদ-এর মতো পাঠককেও বলতে ইচ্ছে করবে- খোদেজা, ঘুমাক তোমার সঙ্গে পশুটাও, তাইলে আমরা বেঁচে যাই।

আরিফ জেবতিক সুলেখক। সচলায়তন এবং সামহোয়্যারইনব্লগে লেখেন। আড্ডাবাজ এই লেখক এক সময় ছাত্র রাজনীতি করতেন। সাংবাদিকতার পেশাতেও ছিলেন বেশ কিছুদিন। তাঁর লেখা 'তাকে ডেকেছিল ধূলিমাখা চাঁদ' পড়ে আমার কখনো মনে হয়নি এটাই লেখকের প্রথম উপন্যাস। নামীদামী লেখকের মতো প্রথম অধ্যায়ের সূচনা আমাকে বিস্মিত করেছে। একটানে পড়ে গেলাম শেষ পর্যন্ত। কী সুন্দর গল্প, কাহিনীবিন্যাস, চরিত্রসৃষ্টি! কিন্তু একটা অতৃপ্তি থেকেই গেলো। আর এটাই বুঝি আরিফ জেবতিক-এর সহজাত প্রবণতা! পাঠককে এভাবে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখা? তবুও বলবো- আমার মতো পাঠকের উপর অবিচার করেছেন তিনি। মাঝে মাঝে প্রশ্ন জেগেছে- লেখক উপন্যাসের গল্পে কাকে ফোকাস করতে যাচ্ছেন বেশি আনিস না দীপুকে? আনিস যদি প্রধান চরিত্র হয় তবে জয়িতার সাথে তার সম্পর্ককে আরও সাবলীল বা ঘনিষ্ঠ করলেন না কেন? আর যদি দীপুই কেন্দ্রীয় চরিত্র হয় তবে দীপুর ব্যাপারে সেঁজুতির ভাবনা, অনুভবটা আরও গভীর দেখানো যেতো! কেনই বা লেখক সেঁজুতির কাছে দীপুর লেখা এতো সুন্দর একটি কবিতার লাইন অজানা রাখলেন! উপন্যাসের শেষদিকে এসে এতো তাড়াহুড়া কেন করলেন লেখক। বিশেষ করে দীপুর মৃত্যর বিষয়টি। আনিস তাকে দেখতে গেলেন না, দীপুর শরীরে আঘাতের কথাটিও গেলেন চেপে। হ্যাঁ, রাজনৈতিক উপন্যাসে অনেক কিছুই এড়াতে চান নতুন লেখকেরা। তবে যেহেতু স্বীকার করেই নেয়া হয়েছে- ঘটনার পরম্পরা বাস্তব ইতিহাস নয়, এটি উপন্যাসই। সবেশেষ আরিফ জেবতিককে বলবো- আপনাকে দিয়ে হবে। বাংলা সাহিত্যে রাজনৈতিক উপন্যাস খুব একটা নেই- একমাত্র সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পূর্ব-পশ্চিম ছাড়া। এ লাইনে লিখলে আপনি আরও ভালো করবেন বলেই আমার বিশ্বাস।

এরপরের লেখক কানাডা প্রবাসী অমিত আহমেদ। তারুণ্যের উচ্ছাসে ভরা সুদর্শন লেখক। লিখেছেনও বেশ আধুনিক জীবনের যন্ত্রণার কাহিনী। তাঁর উপন্যাসের নাম 'গন্দম'- নিষিদ্ধ সময়ের টান, যাপিত জীবন। বিশেষ করে গুলশান, বনানী ও ধানমন্ডির উচ্চবিত্ত শ্রেনীর প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের জীবন, তাদের চাকরি, আড্ডা, জীবনযাপনের খুঁটিনাটি বেশ সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন। বলতে হয়- লেখকের দেখার চোখ আছে, যা অনেক দামী লেখকেরও নেই। যেভাবে তিনি গড়েছেন রাজীব-তৃণা- ঋতু-দীপক, সজীব-ইশিতা, রানা-নিপূণ-তমাল-নওরীন চরিত্রগুলো ভাবতে অবাক লাগে এটাই যে তার প্রথম উপন্যাস! মোদ্দাকথা একটা পরিপূর্ণ উপন্যাসের সবকিছুই আছে 'গন্দম' বইটিতে। কাহিনীর বিন্যাস ও ডায়লগগুলোও দারুণ। তবে রাজীব-ঋতুর প্রেমটা আরও বাস্তবসম্মতভাবে উপস্থাপন করা যেতো। যার জন্য রাজীব চরিত্রটির প্রতি মেয়েঘেঁষা, ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ানোর অপবাদটা এসেই যায়। মনে প্রশ্ন জাগে- এতা অল্প সময়েই এতো গভীর প্রেম? যার জন্য রাজীব প্লেনে ওঠার আগেও প্রতিশ্রুতি দেয়- সে ঋতুর কাছে ফিরে আসবেই! সে কী প্রেম না অন্য কিছু? সবশেষে তরুণ লেখক যেভাবে 'গন্দম' উপন্যাসে কোলকাতার ক্রিকেট, নন্দীগ্রাম, বাংলাদেশের এনজিও, ড. ইউনুস ও নোবেল বিষয়ক কথা এনেছেন তাতে বোর লাগেনি কখনো। আর মূলকাহিনীও বেশ পরিণতির দিকেই নিয়ে যেতে পেরেছেন। এখানেই অমিত আহদমদ-এর সার্থকতা।

খবর পেলাম বইগুলোর বিক্রি ভালো। বই তিনটির বহুল প্রচার কামনা করছি। সুস্বাস্থ্য কামনা করছি তিনজন লেখকের। সাথে সাথে প্রকাশনা সংস্থা জাগৃতিকে বলবো আপনাদের তিনটি বইয়েই প্রচুর টাইপো। এদিকে একটু খেয়াল না দিলে এই ভাষা আন্দোলনের মাসে বাংলা ভাষাকে খুব দীন মনে হয়!
২৩.০২.২০০৮
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ সকাল ৯:১৫
১০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×