দৃশ্য- এক:
স্কয়ার হাসপাতালের গলি ধরে কলাবাগান থেকে রাসেল স্কোয়ারের দিকে যাচ্ছি। ভরদুপুর বেলা। রাস্তায় লোকজন একটু কম। হাসপাতালের পাশের গলিতে চারটে কুকরছানা। নির্জীব পড়ে আছে একটি। বোধ হয় মরে গেছে! অদূরে ডাস্টবিনে খাদ্য খুঁজছে দু'টি। অপরটি নড়াচড়াহীন বাচ্চাটাকে জীব দিয়ে চাটছে আর কুঁইকুঁই শব্দ করছে।
অনেকক্ষণ বাচ্চা চারটি দেখলাম। কী সুন্দর ফুটফুটে বাচ্চাগুলো। আহা, কে করলো এ কাজ! বোধ হয় জ্বালাতন সহ্য করতে না পেরে কোনো মনুষ্যজীবের এই কাজ। ঘরের নিশ্চিত আশ্রয় থেকে ছুড়ে ফেলেছে রাস্তায়। বাচ্চা চারটি কী মায়ের থেকে আলাদা হয়ে গেছে? ভাবছি আর হাঁটছি।
হাঁটতে হাঁটতে রাসেল স্কয়ারের কাছাকাছি চলে এসেছি। হঠাৎ নজরে এলো একটি মাদী কুকুর। বুকে তার পুষ্ট মাই দুধের ভারে ঝুলে আছে। সম্প্রতি বাচ্চা প্রসব করার লক্ষণ। কুকুরটি রাস্তা ধরে হাঁটছে আর গন্ধ শুঁকছে। মনে পড়লো- স্কয়ার হাসপাতালের পাশের গলির কুকরছানাগুলোর কথা। আমার মন খুশিতে ভরে উঠলো। যাক, বাচ্চাগুলো তাহলে তাদের মাকে ফিরে পাবে! এ গল্পে মনুষ্যজীব আমরা এটাকে একটা সাধারণ ঘটনা বলতে পারি।
দৃশ্য- দুই:
সন্ধ্যায় ফেরার সময় বশির উদ্দিন রোডের টং দোকানে চা খাই। প্রায় প্রতিদিনই আড্ডা মারি মজুমদার সাহেবের সাথে। সেদিন ফিরছি অফিস থেকে সন্ধ্যার একটু আগে। টং দোকানে আলোচনা। এ বাড়ির এক বউ পালিয়েছে। ঘটনা কী জিজ্ঞেস করলাম মজুমদার সাহেবকে। তিনি বললেন- চলেন নিজ চোখে দেখে আসি। ঐ পরিবার আবার মজুমদার সাহেবের সাথে পরিচিত।
বাসায় ঢুকতেই মাহফুজ নামে এক ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। উনি পালিয়ে যাওয়া গৃহবধূর ভাই। আমাদেরকে দেখে বসতে দিলেন। আমি কুশল বিনিময় করি। বোধ হয়, মজুমদার সাহেবের দোকানে বেশ কয়েকবার কথা হয়েছে ভদ্রলোকের সাথে। একতলা এ বাড়িটি তাদের নিজস্ব। একটু পরে আমাদেরকে নিয়ে গেলেন ভেতরে।
আড়াই মাসের একটি ফুটফুটে মেয়ে। আর পাঁচ বছরের একটি ছেলে। সে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য! তাদের বাবা মেয়েটিকে ফিডারে দুধ খাওয়াতে চেষ্টা করছেন। মেয়েটি ক্রমাগত কান্না করে যাচ্ছে। না খাচ্ছে দুধ, না থামাচ্ছে কান্না। ভদ্রলোক বোধ হয় অভ্যস্ত নন। বাচ্চা সামলাতে পারছেন না। পাশে ছেলেটির চোখ ছলোছলো। তার পিঠে একটু আদর করতেই ও কান্না জুড়ে দিলো। বললো- আম্মু কোথায় যেন পালিয়ে গেছে, আম্মু আর আসবে না!
এ দৃশ্য বেশিক্ষণ দেখা যায় না। গুমোট, অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। আমরা বের হয়ে এলাম। মজুমদার সাহেবের কাছে আসল ঘটনা শুনলাম। ভদ্রলোক শ্বশুড়বাড়িতে ভাড়া থাকেন। পাশে থাকেন তার সম্বন্ধী মাহফুজ সাহেব। আজ পাঁচদিন হলো ভদ্রমহিলা পালিয়েছে স্বামীর ভাগিনার সাথে। খোঁজাখুজি করে কোথাও তাদের পাওয়া যাচ্ছে না। দেশ ছেড়ে যাবার সম্ভাবনাও নাকি আছে। টং দোকানে চা খাই আর মজুমদার সাহেবের কাছে গল্পটা শুনি। আমার চোখে ভাসে ফুটফুটে মেয়ে বাচ্চাটার মুখচ্ছবি। মনুষ্য সমাজে আমরা এটাকে দুর্ঘটনা বলতে পারি!
ফলোআপ:
পরদিন রাস্তায় কুকুরছানাগুলোকে আর দেখা যায়নি। হয়তো তাদের মা কুকুর নিরাপদ কোনো জায়গায় তাদেরকে নিয়ে গেছে। অথবা সিটি কর্পোরেশেনের লোকজন একটা বিহিত করেছে। এদিকে বশির উদ্দিন রোডের সেই মহিলা আর ফেরেনি। ভদ্রলোকের ভাগিনাকেই বিয়ে করেছে। ফুটফুটে ছোটো মেয়েটিকে তার চাচী পালতে নিয়ে গেছে। আর ছেলেটি এখনও আছে ভদ্রলোকের সাথে।
মন্তব্য:
কুকুরের ইজ্জত নেই, বাসস্থান নেই। তাদের বাচ্চা তাই রাস্তায় ফেলে দেয় মানুষ। সন্তানহারায় কুকুর মা পাগলপারা হয়ে যায়। হন্নে হয়ে খুঁজে বেড়ায়। তবে মানুষের ইজ্জত আছে, বাসস্থান আছে । তারাও বাচ্চা ফেলে যায় কখনো কখনো সখনো। কিন্তু মানুষ কুকুরের মতো পাগল হয় না। কেউ কেউ আবার খোঁজও নেয় না কোনোদিন!
১৫.০৩.২০০৮
©Sheikh Jalil

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



