আমার প্রিয় পোস্ট

একপাশে জাতীয় পার্টি অন্যপাশে মহাজোট!

১৯ শে জানুয়ারি, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:৫৩

শেয়ারঃ
0 4 0


হাতি-ঘোড়া না থাকলে কি আর রাজা হওয়া যায়। রূপকথার রাজা আর দাবার কোর্টের রাজা যার কথাই বলুন, সবারই রয়েছে হাতি-ঘোড়া। হয়তো সেই ভাবনা থেকেই জাতীয় পার্টির চেয়ারপার্সন হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ গত ৬ জানুয়ারি জাপার ২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকি উপল্েয আয়োজিত মহাসমাবেশে নিয়ে এসেছিলেন জাপার নানা রকম রঙ-বেরঙের ব্যানারে আবৃত হাতি-ঘোড়া। কিন্তু হাতি-ঘোড়া দিয়ে কি আর লাঙ্গল চলে! লাঙ্গল চালাবার জন্য যেই নিরীহ জীবটিকে সব সময় প্রয়োজন, সেই জীবটিকে হাতি-ঘোড়ার পাশাপাশি এরশাদকে অভিনন্দন জানাতে দেখলে বোধহয় ব্যাপারটা আরো আকর্ষনীয় হতো।

পল্টনের ময়দানে জাপার মহাসমাবেশের মঞ্চটাও নিমার্ণ করা হয়েছিল মহাপরিসরেই। মঞ্চের পেছনে এক বিশাল ব্যানার। ব্যানারের দু’পাশে এরশাদ সাহেব আয়েসি ভঙ্গিতে চেয়ারে বসে আছেন এমন দুটি ছবি। মাঝখানে এরশাদের তুলনামূলক বড় আকৃতির হাস্যোজ্বল মুখের ছবি।
সেই ছবির ডান পাশে ‘একটি সুদৃশ্য বন্ধ জানালার পাশে শান্তির প্রতীক পায়রা উড়ছে’-এমন একটি লোগো। লোগো দেখে মনে হচ্ছিল, পায়রা জানালা দিয়ে ঢুকতে পারছে না বলেই বাইরে উড়ে বেড়াচ্ছে। এই লোগোর পায়রার সাথে এরশাদ সাহেবের কেমন যেন একটা মিল রয়েছে।
তিনিও অনেকদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতির বিভিন্ন জানালার আশপাশ দিয়ে পায়রা সেজে উড়ে বেড়াচ্ছেন কিন্তু ভেতরে ঢুকতে পারছেন না।

সেদিন জাপার মহাসমাবেশের পাশাপাশি মহাজোট সরকারের এক বছর পূর্তি উপল্েয জাতীয় স্টেডিয়ামের সামনে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আরেকটি সমাবেশ আয়োজন করা হয়েছিল।
একই দিনে মহাজোটের এবং জাপার আলাদাভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজনের বিষয়টি কেমন যেন হয়ে যাচ্ছিল। পরে জাপার মহাসমাবেশে মহাজোটের পে শেখ ফজলুল করিম এসে বক্তব্য প্রদান করায় কেমন কেমন বিষয়টি খানিকটা হালকা হয়ে যায়। তবে মানুষের ঢল বা ঢেউ কোনটারই কমতি হয়নি এরশাদের মহাসমাবেশে। ককশিট আর হালকা কাঠের তৈরি লাঙ্গল হাতে জনতা এসেছিল মহাসমারোহে। মানুষ আর প্লাস্টিকের চেয়ার দিয়ে পল্টনের ময়দান ছেয়ে গিয়েছিল। ঘুরে ঘুরে সব দেখছিলাম।

এমন সময় সমাবেশের বাহিরে স্টেডিয়াম মাকের্টের কাছাকাছি ফুটপাতের এক জায়গায় দেখি ছোটখাট আরেকটি মহাসমাবেশ। বিষয়টা কি দেখার জন্য সামনে এগিয়ে গেলাম। কাছে গিয়ে দেখি দশ টাকা মূল্যে তুমুল ভঙ্গিতে এরশাদের পোস্টার বিক্রি চলছে। বড় পোস্টারও আছে। সেগুলোর মূল্য বিশ টাকা। এক রেট! তার সাথে সাথে সেফটিপিন যুক্ত জাতীয় পার্টির প্লাস্টিক ট্যাগও বিক্রি হচ্ছে।

পোস্টারে এরশাদ সাহেবের বিভিন্ন ভঙ্গিমা রয়েছে। কখনো এরশাদ সাহেব চিন্তিত ভঙ্গিতে চেয়ারে বসে আছেন। আবার দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছেন। এরকম দেখলে নিজের ছবিরও পোস্টার ছাপিয়ে ফেলতে ইচ্ছা হতে পারে। এর মধ্যে একটা পোস্টারে হঠাৎ চোখ আটকে গেল আমার। সেখানে এরশাদ সাহেবে হাসি হাসি ভঙ্গিতে একটি চমৎকার গোলাপ ফুল মুখের কাছে ধরে আছেন। অবশ্য ফুলটি বিদিশা নাকি রওশান আপার জন্য ব্যাপারটি মোটেও স্পষ্ট নয়। তবে এক দেখাতে মনে হতে পারে এরশাদ সাহেব গোলাপ ফুলটি খেয়ে ফেলার চেষ্টা করছেন!

এরপর আমি হাটতে হাটতে জাপা সম্রাজ্য থেকে মানে স্টেডিয়াম থেকে বের হয়ে বঙ্গবন্ধু এভিনিউর দিকে চলে এলাম। সেখানে তখন মহাজোট সরকারের এক বছর পূর্তি উপল্েয আয়োজিত সমাবেশ শুরু হয়ে গেছে। তবে সেটা জাপার বিশাল আয়োজনের তুলনায় অনেক কম বলা যায়। সেখানে গিয়েই দেখি এক বিশাল বাঁদর ক্যামেরা হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। উনার মতো কয়েকজনকে দেখলেই মানুষের উৎপত্তি আসলে কোথা থেকে সেটা জানার জন্য ডারউইনের তত্ত্ব আলাদা ভাবে পড়ার বা জানার প্রয়োজন হবে না। যাই হোক বিবর্তনের ফাঁদে আটকা পরে যাওয়া ফটোগ্রাফার একটা ছোট্ট লাফ দিয়ে স্টেজের পেছনে চট করে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমি ওখান থেকে সরে আরো খানিকটা সামনে চলে এলাম।

সমাবেশের আশেপাশের খাবারের দোকানের ব্যাবসা ভালো হলেও রাস্তার ফুটপাতে বসে থাকা মুচিদের অবস্থা একেবারে করুণ। এমনি সময় এসব সমাবেশে ভীড় ঠেলাঠেলি করতে গিয়ে অনেকেরই জুতা-স্যান্ডেল ছিঁড়ে যায়। কিন্তু এখন শীতকাল বলে বেশীরভাগ নেতা-কর্মীই জুতা বা কেডস পরে চলে এসেছে। তাই স্যান্ডেলও ছিড়ছে না মুচিও সিলাতে পারছে না।

মহাজোটের সমাবেশ আয়োজনে সবার মাঝেই কেমন যেন একটা ছন্নছাড়া পরিবেশ। চারপাশে কেমন একটা নি¯প্রাণ ভাব। নেতারা কে কি বলছেন তাতে কর্মীদের তেমন কোন আগ্রহ নেই। একপাশে দেখলাম প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে কয়েকজন মিলে গল্প করছে। আবার কেউ কেউ চারপাশে বাদামের খোসা ছড়িয়ে উদাসী মনে বাদাম চিবুচ্ছে। কারও বক্তব্য শেষে কর্মীদের কেউ করতালিও দিচ্ছে না। একজন একজন করে আসছেন আর বলে চলে যাচ্ছেন।

দাঁিড়য়ে দাঁিড়য়ে মহাজোটের বক্তব্য শুনছি এ সময় মোটরবাইকের হেলমেট পরা এক পুলিশ হঠাৎ আমাকে ঠেলে সারিয়ে দিল। বাইক ছাড়া এমনিতেই সে কেন হেলমেট পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ব্যাপারটা বুঝতে পারছিলাম না। হেলমেটধারী পুলিশটা আমার আশেপাশে দাঁড়ানো সবাইকেই সাইড করে দিল। একটু পরেই আমার পাশ দিয়ে মতিয়া চৌধুরী হেটে গেলেন। আমি আবার হাটতে শুরু করলাম।

জাপা আর মহাজোটের মাইকদের অমায়িক ব্যাবহারে পল্টন আর গুলিস্তানে ততণে ভয়াবহ সাউন্ড পলিউশান শুরু হয়ে গিয়েছে। একদিকে জাপার ‘তাহের’ মাইক আর অপরদিকে মহাজোটের ‘কলরেডি’। গুলিস্তানের দিকে হেটে খানিকটা এগুতেই খেয়াল করলাম এক লাইন কানে আসছে জাপার তাহের মাইক থেকে আরেক লাইন আসছে মহাজোটের কলরেডি মাইক থেকে। দু’রকম বক্তব্য মিলিয়ে অদ্ভূত শোনাচ্ছিল। যেমন একবার জাপা থেকে একজন বলছিলেন, ‘এই দেশে আগে কোন মাটি ছিল না।’ আর মহাজোট থেকে এরপরপরই শোনা যাচ্ছিল, ‘কিন্তু মহাজোট দেশের মানুষের জন্য তার ব্যাবস্থা করেছে।’ উদ্ভট পরিস্থিতি!

হাটতে হাটতে আবার চলে এলাম পল্টনের ময়দানে। এরশাদ তখন তার সমাবেশের সমাপনী বক্তব্য দিচ্ছেন। এসে দেখি পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন। যাদেরকে চেয়ারে বসে থাকতে দেখে গেছি এবার দেখি তারা সবাই সেই চেয়ারের উপর দাঁড়িয়ে পরেছে। আর একটু পরপরই করতালি। এরশাদ সাহেব ‘জিন্দাবাদ’ দিয়ে যখন তার বক্তব্য শেষ করলের তখন নগর ভবনের বিশাল ঘড়িতে বাজে ঠিক পৌনে পাঁচটা। ততণে মানুষজন সব ফিরতে শুরু করেছে।

এর পরপরেই উপস্থাপক ঘোষণা করলেন, ‘এখন শুরু হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গান গাইবেন কনক চাঁপা।’ কিন্তু ঘোষণার অনেণ পরেও কনক চাঁপাকে না দেখা যাওয়াতে আশেপাশের সবাই বিষয়টিকে চাপাবাজি হিসাবে যখন ধরে নিচ্ছিল তখনই স্টেজে এলেন কনক চাঁপা। এসেই প্রথমে একটি দেশের গানের চার লাইন গাইলেন। তারপর শুরু করলেন বাংলা সিনেমার গান, ‘সাগরিকা বেঁচে আছে তোমারই ভালোবাসায়।’


ব্যাস যারা যারা তখনও চেয়ারের উপরে দাঁড়ায়নি। তারাও সটান হয়ে চেয়ারের উপর দাড়িয়ে গেল। চা-সিগারেট বিক্রেতা বিক্রি-বাট্টা বন্ধ করে চেয়ারের উপর স্টান্ডবাই। কেউ কেউ একটা চেয়ারের উপর দাড়িয়ে সন্তুষ্ট নয়। তারা তিন-চারটি চেয়ার একটার উপর একটা বসিয়ে আইফেল টাওয়ার হয়ে গেল। চারপাশে এত এত স্ট্যাচু অব লিবার্টি আর আইফেল টাওয়ারদের কারণে আমি আর কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। অবশেষে আমিও একটা প্লাস্টিকের চেয়ার সিস্টেম করে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লাম।

কনক চাঁপা পরে এসেছিলেন আকাশী নীল শাড়ি আর ডান পাশে ভাঁজ করে ফেলে রাখা ছাই রঙা চাদর। গান গাইছিলেন হাত নেড়ে নেড়ে। এর মাঝে স্টেজ থেকে একজন অর্ডিয়েন্সদের নাচতে উৎসাহিত করতে নিজেই খানিকটা নেচে দেখালেন। কিন্তু তার নাচের ভঙ্গিমা সুবিধার না হওয়ায় জনতা নাচের প্রতি খুব একটা উৎসাহ দেখালো না। এর মধ্যে দুই বুড়ো চাচা স্টেজের গায়িকাকে দেখার জন্য ভীড় ঠেলে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু দেখেই সাথে সাথে ফিওে এলেন দু’জনেই। শুনতে পেলাম, একজন আরেকজনকে বললেন, ‘এইডা তো বুড়ি, ভাবছিলাম কোন ছেমড়ি হইবো।’ পাশেরজন তার কথায় বোদ্ধার ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন।

এক ঝলক তাকিয়ে দেখি নগর ভবনের ঘঁিড়র কাঁটায় তখন বাজে পাঁচটা দুই। আমি চেয়ার থেকে নেমে পড়লাম। নেমে দেখি প্লাস্টিকের চেয়ার দিয়ে আমার পেছনে ইকারুসের গোলকধাঁধা তৈরি হয়ে গেছে। একটা চেয়ারও আর বসার উপযুক্ত নেই। সব ধুলো আর ময়লায় একাকার অবস্থা। পরিস্থিতি মগের মুল্লুক ছাড়িয়ে চেয়ারের মুল্লুকের দিকে চলে গেছে।

মানুষজন এখনও কেউ কেউ গান শুনতে ফিরে আসছে। কেউবা চলে যাচ্ছে। সবাই হেটে যাচ্ছে মাটিতে পরে থাকা বিভিন্ন লিফলেট আর পোস্টারের ছেঁড়া অংশের ওপর দিয়ে। সেখানে রয়েছে হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ সহ জাপা’র অন্যান্য প্রেসিডিয়াম সদস্যদের ছবি আর বক্তব্য।

জনতা সত্যিই খুব বিচিত্র। যাদেরকে দেখতে যাদের কথা শুনতে তারা দূর দূরান্ত থেকে এসেছিল যাবার সময় এক অর্থে তাদেরকেই মাড়িয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে। আমি সব পেছনে ফেলে হাটতে হাটতে বের হয়ে এলাম।

 

বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

 

মোট সময় লেগেছে ০.৯৬৩৯ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই