মৃত ফড়িং জেগে ওঠে মাঝ রাতে। ঘরের দেয়ালে তার নিত্য বাস। আমার ঘুম লাগেনা; শুধু ঘুমের ভান করে পড়ে থাকি শয্যায়। এই অবসরে ঘুমের বুকে জল গড়িয়ে পড়ে- একটা কপোতাক্ষ, একটা ব্রমহোপুত্রের ধারাজলে আমার সিনান হয়ে যায়- ঘুম হয়না।
ছেলেবেলা, গ্রামের বাতাসে যখন ছড়াতে শিখেছি শিস, পালিত ঘুড়ির হারিয়ে যাওয়াকে প্রশ্রয়ের সুতোয় বেধে অপার আনন্দ লাভ কিংবা রাতে যাত্রানুষ্ঠান দেখতে না পারার চাপা ও যৌক্তিক লোভ যখন পরহেজগার বাবার কাছে পরাজিত, যখন পাশের হিন্দু বাড়ির উলুধ্বনি অনিতার আহবান হয়ে আমাকে ডাকতো- আমি পাঠ্য বইয়ের পৃষ্ঠায় কোনো চিন্হ না এঁকেই উদাসের মতো কলম চিবোতাম...
আজ যৌবনের তীর্যক রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে দেখছি তালাবদ্ধ পৃথিবীর নকশী দরোজাসকল। আমার বয়স্কা প্রেমিকারা আজ কেমন আছেন, তাদের পরিপাটি জানালার কাছে গিয়ে শার্সির বাতাসে হোচট রাখছে আমার অজস্র চোখ-
একই সঙ্গে অধ্যাবধি নাগরিক না হয়ে ওঠা রাজধানীবাসীর সঙ্গে আমার সখ্যতা। তাদের মতো আমিও মানছি না রাস্তার সবুজ-হলুদ- লাল সিগনাল, ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া বন্ধুটির মতো জিপার খুলে পেশাব ছাড়ছি রাষ্ট্রীয় কার্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরই চিপায়, সপ্তাহে দু তিন দিন মদে টালমাটাল ছোট ভাইয়ের মুখে শুনছি হস্তমৈথুনের সিনেম্যাটিক গল্প, দেখছি অটো রিক্সায় ব্যস্থ মোড়ের জ্যামের ঝামেলার ভিতরে কিশোর-কিশোরীর ধস্তাধস্তি, বেসামাল প্রেমের চুম্বন...
২. এবং বিদ্যুত চলে যাওয়া রাত যেন শেষ হতে চায় না, ঘন্টার পর ঘন্টা বসে আছি সিলিং ফ্যানের ঘূর্ণনের অপেক্ষায়, অথবা সাদামাটা রাতেও বেহুদা জাগছি বিপরীত লিঙ্গীয় কারোর সঙ্গে অনৈতিক, অসামাজিক ফোনালাপে- অথচ আমাকে আরো সকাল সকাল বিছানায় যাবার কথা ছিল কিংবা বসার কথা ছিলো বইয়ের টেবিলে- বন্ধুর কাছ থেকে চেয়ে আনা বইটি এরই মধ্যে শেষ করে ফেরত দেবার কথা; কিন্তু আমি কোনো কথাই রাখতে পারছি না, কোনোদিক দিয়েই যেন কুলিয়ে উঠতে পারছি না, চাকরিটা ঝুলে থেকে থেকে অবশেষে যখন হলো ভাবছি ছেড়ে দেবার কথা, প্রতিষ্ঠানের পক্ষপাতি আমি আরো করেছি এখানেও করছি- তবু... এই নাগরিকত্ব আমাকে ক্রমশ: দিচ্ছে পিছিয়ে, আমার হাটুর জোর কমে যাচ্ছে বন্ধু!
নাগরিক হিসেবে আমি প্রায়ই ভাবি আমার মৃত্যু হবে বজ্রপাতে, স্রেফ একটা বজ্রের হুংকার শুনবো এবং লুটিয়ে পড়বো মাটিতে। এরকম মৃত্যু আমি কামনা করছি: যখন স্বাভাবিক মৃত্যুর ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রন করছে অদৃশ্য কেউ, যখন লাশঘরে বাড়ছে বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা, যখন অস্রোপচারের পর মরে যাচ্ছে রোগী, আচমকা গুলিতে যখন মরে যাবার শংকা, যখন গাড়ির তলে বলি হয়ে যাওয়াটা নৈমিত্তিক, সেই সমকালের রক্তাক্ত মাঠে দাঁড়িয়ে আমি কামনা করছি আমার মুত্যু হোক বজ্রপাতে। সিটি করপোরেশনের কাছে নাগরিক হিসেবে আমি কি বেশি কিছু চাইছি? (চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

