বৎসরের এই শেষ মাসটা অনেক কারণে উল্লেখযোগ্য। একটা বছর ঝরে যাওয়া জীবন থেকে সাথে একটা বছর বড় হয়ে উঠা। নতুন করে বহু কিছু শুরু করার অঙ্গীকার নিজের সাথে, নতুনের আগমনে নতুন দরজা খোলার শুভ সূচনা পরিকল্পনা । আশা উদ্দীপনা, জল্পনা কল্পনার বীণা বাজিয়ে নব প্রভাতের অরুণ উদয় হয়। যাত্রা শুরু হয় নতুন বৎসরের। অনেকের অনেক রকম ভাবনা ইচ্ছা অনেক কিছু করার। আজ আমি বলব কেবলই যাদের যাত্রা শুরু জীবনের পথে তাদের কথা।
নতুন বৎসর শুরুর সাথে হাঁটি হাঁটি পা পা বাচ্চারা আজকাল স্কুলে যেতে শুরু করে। যাদের কথা ফুটেনি ভালো করে, মুখে দুধের বোতল তারা তৈরী হয় শিক্ষা জীবন শুরু করার। মা,বাবা সন্তানের সব চেয়ে বড় আশ্রয়। জন্ম থেকে তাদের মুখ দেখেই বছর তিন, চার সময় পার হয়েছে, ভালোবাসা আর আদর অবগাহনে। আজকালকার একক পরিবারের বাচ্চাদের কাছে মানুষের গণ্ডি বড় সীমাবদ্ধ, মা বাবার আদর ভালোবাসা অপরিসীম। সেই ছোট গাণ্ডির শিশুটিকে হঠাৎ করে যেতে হয় অনেক অচেনা মানুষের ভিড়ে। শুধু তা নয় এতটুকু জীবনে পরিচিত আদর আহ্লাদ হঠাৎ কেমন অচেনা হয়ে উঠে। বাবা, মা বলতে থাকেন স্কুলে যেতে হবে, পরীক্ষা দিতে হবে, ভর্তি হওয়ার জন্য। আর এই ভর্তি পরীক্ষা বিভীষিকাময় অনেক পরিবারের জন্য। ভালো একটা স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য কয়েকটি স্কুলে একে একে পরীক্ষা দিয়ে যেতে হয়, অবুঝ শিশুদের।। খেলাধুলার মজার জীবনটা কেমন ব্যস্ত হয়ে উঠে। সাথে পরিচিত মা, বাবা কেমন অচেনা রাগী যেন, আর স্কুল নামের জায়গায়, অচেনা মানুষগুলো শিক্ষকের মুখ নয় যেন দৈত্য দানো। এক ঝটকায় বদলে দেয় শিশুদের জীবন যাপন। বাবা মা কে দোষ দিয়ে লাভ নাই তারা থাকেন মহা টেনসনে। স্কুল খুঁজে পাওয়া, ফর্ম পূরণ, কাজের মাঝে ছুটি নেয়া তারপর অনেক বাহুল্য খরচের হিসাব। যাদের সীমবদ্ধ আয়ে চলতে হয় আমি তাদের কথাই বলছি। তারা চান সন্তান যেন ভালো স্কুলে ভর্তি হয় সঠিক শিক্ষা পায়। কোনটা যে ভালো শিক্ষালয় এ বিষয় অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন। যারা প্রথম সন্তান ভর্তি করাবেন তারা নতুন জমানার নতুন স্কুলের ঠিক কোনটা যে সঠিক শিক্ষা দেয় তা বুঝে উঠতে পারেন না। নিজেরা যখন বাবা মায়ের হাত ধরে স্কুল শুরু করেছেন তা থেকে এ সময়টা পঁচিশ থেকে ত্রিশ বৎসর পরে।
সরকারি প্রাইমারী, কিন্ডারগার্টেন, মাদ্রাসা শিক্ষা এমন তিন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চালু।ইংলিশ স্কুলগুলো আবার কেউ আমেরিকা পন্থি, কেউ ইউরোপ পন্থি। তাছাড়া সরকারি স্কুল বা ইংরেজী স্কুলগুলোর মধ্যেও শিক্ষার মানের তারতম্য আছে। স্বাভাবিক ভাবে অভিভাবকের চাপ তৈরী হয় ভালো স্কুলগুলোর উপর। ঢাকার বাইরে জেলা শহর গুলোতে দু তিনটার বেশী স্কুল নাই। তার মধ্যে এইটাই হয়তো সবচেয়ে ভালো পড়ালেখা হয়। তাই ঐ একটা স্কুল সবার প্রথম র্টাগেট থাকে।
আধুনিক শিক্ষিত বাবা, মা ইংরেজী স্কুলগুলোকে প্রাধান্য দিচ্ছেন সামর্থ অনুযায়ী। অনেক ইংলিশ স্কুল, যাদের নাম অনেক দামও বেশী, ঐ সব স্কুল আবার অভিভাবকের আয়ের অনুপাতে বাচ্চা ভর্তি করা হয়। সেখানে স্বল্প আয়ের লোকজন ঢুকতে পারেন না। এছাড়া একটা সময় জানতাম যে, গর্ভধারন করার সাথে সাথে কিছু স্কুলে বাচ্চার ভর্তি সংরক্ষন করা হতো টাকা জমা দিয়ে। সে সব বাচ্চা জন্মের আগেই সোনার চামুচ মুখে দিয়ে রাখত। এখনও ব্যাপারটা তেমন আছে কিনা জানা নেই।
ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ বা জানুয়ারীর শুরুর দিকে যখন পত্রিকার পাতায় লাখো শিশুর করুণ মুখের ছবি সাথে অভিভাবকের উদ্বিগ্ন চেহারা দেখি তখন এতো খারাপ লাগে, জাতির আগামী ভবিষ্যত কী অসহায় তাকিয়ে আছে।
একটা বাচ্চার জীবনের শুরুটা কী ভয়ানক যুদ্ধ দিয়ে শুরু হয় আমাদের দেশে। পরিবারের বাইরে বেড়িয়েই কী অসহায় অবস্থায় পরে ছোট্ট শিশুটি। অভিবাবকের সাথে এক ধরনের দূরত্ব হয়ে যায় এই সময়ই বাচ্চাদের। একটি বাচ্চা ঘরে যত চটপটে, তুখোর কথা বার্তায়, অপরিচিত মানুষের সামনে এসে একে বারে ভরকে যেতে পারে, লজ্জায় মিইয়ে যেতে পারে। বাচ্চার মনে নানা রকম ভয় ভীতি বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া তৈরী হতে পারে। অভিভাবক কিন্তু স্কুলে ভর্তির বাইরে বাচ্চার মনস্তাত্বিক বিষয়ের উপর খুব একটা গুরুত্ব দেন না। আমরাও পরীক্ষা দিয়েছি বা এমনটাই নিয়ম ওদেরও পারতে হবে এই ভবনায় ব্যস্ত থাকেন। এখন তো প্রথম ভাগে উঠার আগে আরো তিন চারটা ধাপ পার হতে হয়। এবার ভর্তি হতে না পারলে এক বছর পিছিয়ে যাবে জীবন থেকে এক বৎসর ঝরে যাওয়ার মতন অবস্থা।
যারা পরীক্ষায় কৃতকার্য হলো তারা বেঁচে গেলো কিন্তু যারা অকৃতকার্য হলো বা যে অভিভাবকদের খুঁটির জোড় নাই, তাদের কি অবস্থা? বাচ্চাটি পরীক্ষায় টিকল না, ভর্তি হতে সমর্থ হলো না বলে অবচেতনেও হয়তো বাবা, মা মনঃক্ষুণ্ন হতে থাকেন বাচ্চাটির উপর। যা এতদিনের ব্যবহার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। হয়তো অভিভাবক তাদের তিরিক্ষি মেজাজের খবর নিজে টের পান না কিন্তু বাচ্চারা অনুভব করে মা, বাবা আগের মতন ভালোবাসে না যেন। শুধু আদর নয় রাগ করে এখন। যে বাচ্চারা স্কুলে ভর্তি হতে যায় শিক্ষা জীবন শুরু করার জন্য তারা কিসের পরীক্ষা দিবে? তাদের কী শিখতে হবে পরীক্ষা দেয়ার জন্য, স্কুলে যাবার আগেই, কে শিখাবে তাদের এবং কেন?
চলবে......
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে ডিসেম্বর, ২০১১ রাত ১২:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



