এত কথার পরও মনে হয় শেষ হচ্ছে না আমার বলা। তবে আর বেশী না বাড়িয়ে উপসংহার টানি। স্কুল এলাকা ভিত্তিক গড়ে তোলা, কাছের স্কুলে ভর্তি বাধ্যবাধকতা করা যেন পূব থেকে পশ্চিমে না দৌড়াতে হয়। প্রত্যেক স্কুলের শিক্ষার মান এক থাকা, তখন অন্য স্কুলে না পড়তে পারার আক্ষেপ থাকবে না। বাংলা এবং ইংরেজী দুটো বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া। স্কুল ইউনিফর্ম জরুরী যেন সবাই এক পর্যায়ে থাকে। সবাইকে একরকম স্বাস্থ্য সম্পন্ন টিফিন দেয়ার ব্যবস্থা করতে পারলেও খুব ভালো হয়। স্কুল হবে এমন এক মাধ্যম যেখানে সবাই সমান। শিক্ষক ছাত্রছাত্রীকে চিনবেন তাদের অভিভাবককে না। শিক্ষক হবেন মানবিক। স্কুলগুলো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়। ভর্তি পরীক্ষা রেওয়াজ উঠিয়ে দেওয়া সর্বপর্যায়ে উচ্চ মাধ্যমিক, বা বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজাল্ট অনুপাতে ভর্তি হবে।
বাংলাদেশ থেকে কানাডার শিক্ষা ব্যবস্থার নিয়ম জানার জন্য আমার পরিচিতর মধ্যে দুজন শিক্ষা অধিদপ্তরের উচ্চ পদস্থ অফিসারকে বিশাল দল নিয়ে কানাডার বিভিন্ন প্রভিন্সে ঘুরে শিক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান নিয়ে যেতে দেখলাম। এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা দেখে তারা রীতিমত অভিভূত। এই পদ্ধতি চালু করার জন্য উদ্বুদ্ধ, উচ্চপদস্থ অফিসার দুজনই অনেক সুস্থ মানসিকতার ছিলেন কিন্তু তারা ফিরে যাওয়ার বছরখানেকের মধ্যে তাদের রিটার্য়াটমেন্টের সময় হলো। দেশের খরচে তারা যে শিক্ষা নিয়ে গেলেন তা প্রয়োগ করার সুযোগ পেলেন না। শিক্ষিত করার জন্য আরো অল্প বয়সের অফিসার পাঠানো প্রয়োজন মনে করি।
আসলে এই বিষয় নিয়ে কথা বলতে, এর অনেকগুলো দিক নিয়ে আলোচনা করা দরকার। আর প্রয়োজন অনেক নিয়ম বদলে ফেলা। বিদেশে আমি যা দেখেছি বাচ্চাদের পড়ালেখায় গুরুত্ব দেয়া হয় মেধা বিকাশের মাধ্যমে, কে কী হবে তার অনেকগুলো দ্বার উন্মোচন করা হয়। বাচ্চারা বড় হতে হতে নির্ধারণ করে নেয় নিজের জায়গাটা। আমাদের দেশের অনেক অভিভাবক নিজের অভিজ্ঞতা থেকে ভাবেন এখানে পড়া ভালো হয়না। কিন্তু সুযোগ পাওয়া ছেলে মেয়েরাই আবিষ্কারের পরে আবিষ্কার করছে নতুন কিছু। সম্প্রতি বাঙালি ছ্ত্রাদের সাফল্যের খবর শুনছি যারা বিদেশে পড়াশুনা করছেন। হঠাৎ কখনও দেশের পত্রিকার পাতায় দেখি দু একটা খবর যা আশার চেয়ে নিরাশ করে। যেমন একটি গরিব ছেলে ইউনিভার্সাল রিমোট আবিষ্কার করে ছিল বা স্বল্প জ¦ালানী ব্যয়ের ইঞ্জিন কিন্তু তাদের এই আবিষ্কার কতটুকু পৃষ্টপোষকতা পায়? অনেক সুযোগ পাওয়া একটি নিরেট ছাত্রের চেয়ে শিক্ষার সুযোগ না পাওয়া সম্ভাবনাময় একটি মেধা নিরবে নিভৃতে ঝরে যায়। আপনারা জানেন খুব সম্প্রতি সতের বছরের যে মেয়েটি ক্যানসারের ঔষধ আবিষ্কারের সম্ভাবনার কথা বলার পরে, রির্সাসের জন্য তাকে মাথায় তুলে নেয়া হলো আমাদের দেশে এমন বয়সের কাউকে তো বাচ্চা কি বলে, প্রতিযোগিতা আর রির্সাস এক নয়, চুপ করে থাকো ছাড়া অন্য কিছু বলা হবে না?
দশ বছরের একটি বাচ্চা যে থাইল্যাণ্ডের সমুদ্রতটে ছিল ২০০৬ এর সুনামির সময়, সমুদ্রে বুদবুদ উঠতে দেখে সে সর্তক বার্তা দিয়ে তার পরিবারের লোকজনসহ অন্য অনেকে সরিয়ে আনতে পেরেছিল। এখানে প্রায় সময় দেখা যায় বাচ্চারা বিপদে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কারণ তারা বিষয়গুলো স্কুলে শিখে। মনে রাখবেন বাচ্চার শিখার বয়স এক থেকে পাঁচ পর্যন্ত খুব বেশী থাকে। তাই আপনি যে ব্যবহার করবেন তাই কিন্তু বাচ্চা শিখছে। তাদের দিগন্ত উন্মোচন করার দায়িত্ব আপনার। ভুল সিদ্ধান্ত ভুল গাইডেনস, একটি সম্ভাবনাকে ভুল পথে নিয়ে যায়।
শিশির, তুষার নামের দুই ভাই মেধা সম্পন্ন ছিল। মায়ের ইচ্ছা ওরা প্রথমের চেয়ে প্রথম হোক। পড়া ছাড়া ওদের আর কোন জীবন ছিল না। উচ্চ মাধ্যমিকের পর একজন পাগল হয়ে গেলো, অন্যজন মেধা থেকে হারিয়ে গেলো। অভি নামের যে ছেলেটি অনেক ভাল রেজাল্ট করল উচ্চ মাধ্যমিকে । ভুল গাইডেন্সে বন্দুকযোদ্ধা হয়ে গেলো বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে। আমাদের সাথে যে মেয়েটি প্রথম স্থান পেয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ তে। এখন সে এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়। শিক্ষকের লেকচারের প্রতিটি শব্দ সে লিখে ফেলত। কিছু বোঝার জন্য সবচেয়ে পড়ালেখা না করা,ক্লাসে কম আসা ছেলেটার সাহায্য নিত কারণ তার জ্ঞান ভা-ার ছিল ক্লাসরুমের বাইরে অফুরন্ত। শিক্ষা মানে নিজের চিন্তা শক্তিকে বিকশিত করা, জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ করা আর তা মানুষের কল্যানে ব্যয় করা। একটা সময় পরিবার এত বেশী নিয়ন্ত্রণে রাখত বাচ্চাদের যে অভিভাবকের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের কিছু করার সাধ্য ছিল না। তারপরও মানুষের সহজ প্রবৃত্তি তাকে টেনে নিয়ে যায় তাই কতো লুকিয়ে ছাপিয়ে বেগম রেকেয়া, জয়নাল আবেদিন, আব্বাস উদ্দিন, নিজের প্রতিভা মেলে দিয়েছেন। সন্তানকে তার মতন নিজেস্ব মানুষ হতে দেয়াই বাঞ্জনীয়।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে ডিসেম্বর, ২০১১ রাত ১:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



