শিউলিতলার আশে পাশে ঝরা ফুলের রাশে রাশে
শিশির ভেজা ঘাসে ঘাসে অরুণরাঙ্গা চরণ ফেলে
নয়ন ভুলানো এলে...
প্রিয় ফুল বলতেই প্রথমেই কেন জানি শিউলির ছবিটিই চোখের সামনে ভেসে উঠে। সবুজ ঘাসের বুকে শুভ্র কোমল চাদর বিছানো। শৈশব, কৈশোরের শরৎএর ভোর মানেই শিউলি কুড়িয়ে মালা গাথা। কখনো কখনো শিউলির বোটা ছিড়ে রোদে শুখিয়ে আম্মাকে দেয়া। ওগুলো দিয়ে নাকি জর্দা রঙ বানাবেন। বানিয়েছিলেন কিনা তা মনে নেই। একবার মুখে দিয়ে স্বাদ পরখ করে দেখেছিলাম। কী তিতা।
ব্যাকুল বকুলের ফুলে ভ্রমর মরে পথ ভুলে...
ভ্রমর সত্যি মরে কিনা তা না জানলেও আমি যে ব্যাকুল হয়ে যেতাম তা সত্যি মনে আছে।
প্রথম যখন স্কুলে গেলাম, সেখানে অনেক বকুল গাছ দেখেই স্কুলের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। গরমের দিনে তখন সকালে স্কুল হত। সাত সকালে উঠেই ছুটে যেতাম। বকুল কুড়িয়ে স্বর্নলতা দিয়ে বিশাল বিশাল মালা গাঁথতাম। বকুলের সে মিষ্টি গন্ধ আজো আমায় শৈশবে নিয়ে যায়।
বেলকুঁড়ি দুটি করে ফুটি-ফুটি অধর খোলা।
মনে পড়ে গেল সেকালের সেই কুসুম তোলা..।।
আর একটি প্রিয় ফুল হল বেলী। এটার সাথেও খুব ছোট থাকতেই পরিচয়। মাঝে মাঝে দেখতাম আব্বা কলাপাতায় মোড়ানো বেলী ফুল বা বেলী ফুলের মালা নিয়ে আসতেন। সে মালাকে বলত বেলকুড়ির মালা। ফুটন্ত ফুল নয়, শুধু কুড়ি দিয়ে সে মালা গাথা হত। ফুলগুলো আম্মা পিরিচে রেখে পানি ছিটিয়ে টেবিলে রাখতেন। ভুরভুর করে মিষ্টি গন্ধ ছড়াতো। আর বেলকুড়ির মালাটা যত্ন করে আম্মার বিশাল খোপা নয়তো দীঘল বেনীতে জড়িয়ে নিতেন।
ফুটবে আবার দোলনচাঁপা চৈতী রাতের চাঁদনী
আকাশ ছাওয়া তারায় তারায় বাজবে আমার কাঁদনী...
নজরুল কত সুন্দর করে দোলনচাঁপার কথা বলেছেন। অতো সুন্দর করে না বলতে পারলেও নজরুল থেকে কম ভালবাসিনা। এটা আমার অনেক প্রিয়। যখনই বাগান করেছি প্রিয় সব ফুলের সাথে অবশ্যই দোলনচাপাও বাগানে লাগিয়েছি। গুচ্ছ গুচ্ছ সাদা এই ফুলটিও বর্ষায় ফোটে। তখন একসাথে বকুল, বেলী, দোলনচাপা এক সাথে পাল্লা দেয়। কিন্তু কেও কাউকে হারাতে পারেনা। দোলনচাপা বই বা খাতা ভাজে রেখে দিতাম। বহু বছর পর হঠাৎ করে চোখে পড়ত। বাদামি ফিনফিনে পাতলা হয়ে আছে। শুভ্রতা হারিয়ে গেলেও ভালবাসা জড়ান থাকত।
কাননের ফুল এরা তো ভোলে নি, আমরা ভুলি
সেই তো ফুটেছে পাতায় পাতায় কামিনীগুলি...
কামিনী। এই ফুলটি খুব ভালো লাগে। কিন্তু কখনোই একে তোড়ায় বাঁধতে পারিনি। এতো ভঙ্গুর, আর ক্ষনস্থায়ী ফুল এটি। যখন ফোটে সারা গাছ সাদা হয়ে যায়। আর কি মিষ্টি তীব্র গন্ধ। ঝরে পড়া পাপড়িতে ভরে থাকে গাছের তল। সিলেট সরকারী গার্লস ইস্কুলে অনেক কামিনীর গাছ ছিল। জানিনা এখন আছে কিনা।
হাসনাহেনা, রাতের রানী। এই তীব্র সুগন্ধি ফুলটি রাতের বেলায় এমন ভয়ংকর সুন্দর সুগন্ধ ছড়ায় কিন্তু দিনের বেলায় এর চেহারা দেখলে কেউ বুঝতেই পারবেনা এই নিরিহ চেহারার ভিতর তার কি ভয়ংকর সম্মোহনী শক্তি লুকিয়ে আছে। এই ফুলটি যেহেতু রাতে ফোটে তাই রাতে আশেপাশের কয়েক বাসা পর্যন্ত হাসনাহেনার তীব্র সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ত। কিন্তু তখন আম্মা কিছুতেই ঐ গাছের ধারে-কাছে যেতে দিতেন না। বলতেন হাসনাহেনা ফুলের সৌ্রভে সাপ এসে গাছের ঝোপে লুকিয়ে থাকে। যদিও বড় হয়ে জেনেছি এসব কু-সংস্কার।
আর একটি ফুল থাকতো আমার বাগানে সেটা হল গন্ধরাজ। এটাও সাদা। আচ্ছা, সাদা ফুলগুলির কি সুগন্ধ বেশী হয়? কি জানি? যাই হোক। গন্ধরাজও গুচ্ছ গুচ্ছ ফুটে সাদা হয়ে থাকতো। খুব সুন্দর গন্ধ। এই ফুলগুলিও আমি তোড়া বেঁধে ঘরে এনে রাখতাম। দু/চারদিন দিব্বি ফুঁটে থাকতো। একটি শুখিয়ে যেতে না যেতেই অন্য কলিটি ফুঁটে উঠত।
আমি যদি দুষ্টুমি করে চাঁপার গাছে চাঁপা হয়ে ফুঁটি,
ভোরের বেলা, মা গো, ডালের পরে, কচি পাতায় করি লুটোপুটি...।
কনকচাঁপা, স্বর্নচাঁপা এটাও আমার আর একটি প্রিয় ফুল। কোনটা কমলা হলুদ, কোনটা পুরো হলুদ রঙের হয় এ ফুল। এর মৃদু মিষ্টি গন্ধ আমার ভিষন প্রিয়। এই ফুলগুলিও আমাদের বাসায় পানি ছিটিয়ে রাখা হত। আর দু'একটা আমার বই খাতার ভাজে। এখনো আমি গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদ উপেক্ষা করে রিকশা দিয়ে ঘুরে ঘুরে এ ফুল খুঁজে বেড়াই।
তখন ময়মনসিংহে থাকতাম। বাসার সামনেই ছিলো দুর্গাবাড়ীর ভাঙ্গা প্রাচীর। সে প্রাচীরের ফাঁক দিয়ে ঢুকতাম ওদের বাগানে। অনেক গাছ ছিল। ঘন বুনটের কারনে বাগান অন্ধকার হয়ে থাকত। একদিন বাগানে শাক-আলু খুঁজছি, এমন সময় পাকা কাঠালের তীব্র গন্ধে চারিদিকে তাকিয়ে কোন কাঠাল গাছ নজরে পড়ল না। ঘন ঝোপের ভিতর একটি ফুল খুঁজে পেলাম। যেটা অনেকটা পাকা কাঠালের গন্ধের মত। তবে অনেক তীব্র। বাসায় নিয়ে আসার পর আব্বা বললেন এটা কাঠালিচাঁপা।
ছবিঃ গুগুল মামুর বাগান থেকে নেয়া।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জানুয়ারি, ২০১১ বিকাল ৪:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



