শয়তান যে মানুষকে নেক সুরতে ধোকা দেয়, এ বিষয়টি ভালভাবে অনুধাবন করেছিল শয়তানের অনুচর ইহুদী এবং খৃষ্টানরা। মুসলমানদের সোনালী যুগ এসেছিল শুধু ইসলামের পরিপূর্ণ অনুসরণের ফলে। শয়তানের চর ইহুদী খৃষ্টানরা বুঝতে পেরেছিল মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ, অনৈক্য, সংঘাত সৃষ্টি করতে পারলেই ইসলামের জাগরণ এবং বিশ্বশক্তি হিসেবে মুসলমানদের উত্থান ঠেকানো যাবে। আর তা করতে হবে ইসলামের মধ্যে ইসলামের নামে নতুন মতবাদ প্রবেশ করিয়ে। শুরু হয় দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা যার মূলে থাকে খৃষ্টীয় বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ। জন্ম হয় ওহাবী মতবাদের। ওহাবী মতবাদ সৃষ্টির মূলে থাকে একজন বৃটিশ গুপ্তচর- হ্যাম্পার। মিশর, ইরাক, ইরান, হেজাজ ও তুরস্কে তার গোয়েন্দা তৎপরতা চালায় মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার জন্য। বৃটিশ গোয়েন্দা হ্যাম্পার তুরস্কের শায়খ ইফেন্দীর নিকট ছদ্ধবেশী মুসলমান সেজে কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ চর্চা করে মুহম্মদ বিন আব্দুল ওহাবের একান্ত বন্ধু ও সহযোগী হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল। দ্বীন ইসলামের বিভিন্ন মৌলিক বিষয় নিয়ে তাদের (উভয়ের) মধ্যে যে আলাপ-আলোচনা হয়, তা হ্যাম্পার তার ডায়েরীতে লিপিবদ্ধ করে। বৃটিশ গোয়েন্দা হ্যাম্পারের উক্ত ডায়েরীটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন জার্মানীর হস্তগত হয়, তখন জার্মান পত্রিকা ইসপিগল তা "Memoirs of Hempher, The British Spy to The Middle East" শিরোনামে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করে। এতে বৃটিশদেরকে বিশ্ব সমাজের কাছে অত্যন্ত লজ্জিত হতে হয়। ডায়েরীটি ফরাসী পত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়। জনৈক লেবাননী বুদ্ধিজীবী তা আরবীতে অনুবাদ করেন। তুরস্কের ওয়াকফ্ ইখলাছ প্রকাশনা হ্যাম্পাররের স্বীকারোক্তি মূলক উক্ত ডায়েরীটি "Confession of British Spy and British enmity against Islam" নামে গ্রন্থাকারে ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রকাশ ও প্রচার করে। হ্যাম্পারের স্বীকারোক্তির তুর্কী অনুবাদ এবং লেখক এম. সিদ্দিক গূমূজের ব্যাখ্যা মিলিয়ে ইংরেজীতে এটি প্রকাশিত হয়। সেই বইয়ের প্রথম অনুচ্ছেদ হতে বৃটিশ গুপ্তচরের স্বীকারোক্তমূলক জবানবন্দীর বঙ্গাণুবাদ তুলে ধরা হলো।
▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓
(ধারাবাহিক)
দ্বিতীয় পর্ব
হিজরী ১১২২ সালে (১৭১০ খৃষ্টাব্দে) উপনিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে আমাকে মিশর, ইরাক, হিজাজ এবং ইস্তাম্বুলে পাঠানো হয়েছিল, গুপ্তচর বৃত্তি এবং প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত পরিমাণ তথ্য সংগ্রহের জন্যে, যাতে মুসলমানদের মধ্যে ভাঙ্গন সৃষ্টি করা যায়। একই সময়ে এবং একই উদ্দেশ্যে মন্ত্রণালয় আরো ৯ জন উদ্যমী এবং সাহসী লোককে নিয়োগ করে। অর্থ, তথ্য এবং মানচিত্র যা আমাদের প্রয়োজন ছিল তা ছাড়াও অতিরিক্ত হিসেবে আমাদের দেয়া হয়েছিল, সরকারী আমলা, আলিম-উলামা, এবং গোত্র প্রধানদের নামের তালিকা। আমার স্মৃতি থেকে কখনই মুছে যাবে না যে, যখন আমি মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে বিদায় নিতে যাই, তিনি বলেছিলেন- আমাদের রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তোমার সাফল্যের উপর। সুতরাং তোমার সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করা উচিত।
আমি সমুদ্র পথে ইসলামী খিলাফতের প্রাণকেন্দ্র ইস্তাম্বুলের পথে যাত্রা শুরু করি। আমার প্রাথমিক দায়িত্ব ছাড়াও আমাকে ভালভাবে সেখানকার মুসলমানদের স্থানীয় তুর্কী ভাষা খুব ভালভাবে শিখতে হয়েছিল। ইতিমধ্যে আমি লন্ডনে বেশ পরিমাণ তুর্কী ভাষা, কুরআনের ভাষা আরবী এবং ইরানীদের ভাষা ফার্সী শিখে ফেলেছিলাম। যদিও কোন ভাষা শেখা আর স্থানীয় লোকজনদের মত করে কথা বলা, এ দু’য়ের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। কয়েক বছরে ভাষাটা শিখতে পারলেও, বলাটা শিখতে হয়েছিল খুব সূক্ষ্মভাবে, যাতে লোকজন আমাকে সন্দেহ করতে না পারে।
আমি অবশ্য ভীত ছিলাম না যে তারা আমাকে সন্দেহ করবে। কারণ মুসলমানরা খুব সহনশীল, উদারমনের, পরোপকারী যা তারা তাদের নবী হযরত মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শিখেছে। তারা আমাদের মত সন্দেহপ্রবণ নয়। সর্বোপরি, সে সময় গুপ্তচরকে গ্রেফতার করার মত তুরস্ক সরকারের কোন সংস্থা ছিলনা।
দীর্ঘ ক্লান্তিকর সমুদ্র যাত্রা শেষে আমি ইস্তাম্বুল গিয়ে পৌছি। আমি আমার নাম বললাম ‘মুহম্মদ’ এবং মুসলমানদের ইবাদত গৃহ মসজিদে আসা যাওয়া শুরু করলাম। মুসলামানদের শৃঙ্খলাবোধ, পরিচ্ছন্নতা এবং আনুগত্য দেখে আমি মুগ্ধ। মুহুর্তের জন্য নিজেকে প্রশ্ন করি, কেন এই নিরীহ লোকদের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করছি? তাই করতে কি আমাদের প্রভু মসিহ্ আমাদের উপদেশ দিয়েছিলেন? পর মুহুর্তেই ভাবি, একি শয়তানী চিন্তায় মগ্ন হলাম? এবং আরো ভালভাবে নিজের কর্তব্য পালন করার জন্য সিন্ধান্ত নিলাম।
ইস্তাম্বুলে ‘আহমদ ইফেন্দী’ নামক একজন বুযূর্গ লোকের সাথে আমার পরিচয় হয়। রুচিশীল আচরণ, খোলামনের ব্যবহার, আধ্যাত্মিক নির্মলতা আর পরোপকারী মনোভাব ইত্যাদির বিচারে আমাদের ধর্মের (খৃষ্টধর্মের) কোন ধার্মিক ব্যক্তিকেই তাঁর সমকক্ষ দেখিনি। হযরত মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদর্শে নিজেকে গড়ে তোলার জন্যে তিনি দিন রাত পরিশ্রম করতেন।
সে বুযূর্গ ব্যক্তির মতে হযরত মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বদিক থেকে উচ্চতম ও আদর্শ ব্যক্তিত্ব। যখনই তিনি হযরত মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম মুবারক উচ্চারণ করতেন তাঁর চোখ অশ্রুসজল হয়ে পড়তো। নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান মনে করছিলাম এ কারণে যে, তিনি আমাকে প্রশ্ন করেননি আমি কে এবং কোথা থেকে এসেছি।
তিনি আমাকে ‘মুহম্মদ ইফেন্দী’ বলে সম্বোধন করতেন। তিনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিতেন এবং স্নেহ মমতায় সমাদর করতেন। আমি একজন মেহমান, ইস্তাম্বুলে এসেছি কাজ করতে এবং খলীফার ছায়াতলে বসবাস করতে, এমনি বিবেচনায় আহমদ ইফেন্দী আমাকে দেখতেন। বলতে কি, এ ছল চাতুরির মধ্যেই আমি ইস্তাম্বুলে অবস্থান করতে লাগলাম।
একদিন আমি আহমদ ইফেন্দীকে বললাম ‘আমার বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই, আমার কোন ভাই-বোনও নেই এবং পৈত্রিক সূত্রে কোন জমি-জমাও পাইনি। আমি এসেছি ইসলামের এ প্রাণকেন্দ্রে কাজ করে বেঁচে থাকার জন্য এবং কুরআন-সুন্নাহ শেখার জন্যে অর্থাৎ ইহকাল এবং পরকালের পাথেয় সঞ্চয়ের জন্য। আমার এ কথায় তিনি অত্যন্ত প্রফুল্ল হলেন এবং বললেন, “তিনটি কারণে তুমি শ্রদ্ধা পাওয়ার যোগ্য। (তিনি যা বলেছিলেন তা হুবহু বর্ণনা করছি।)
এক. তুমি একজন মুসলমান এবং সব মুসলমান ভাই ভাই।
দুই. তুমি একজন মেহমান। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “মেহমানদের প্রতি আতিথেয়তা প্রদর্শণ কর।”
তিন. তুমি কাজ করতে চাও; হাদীছ শরীফে আছে, যে কাজ করে, সে আল্লাহ পাক-এর নিকট প্রিয়।
তাঁর কথাগুলো আমাকে খুব মুগ্ধ করলো। আমি মনে মনে বললাম, খৃষ্টধর্মেও কি এমন উজ্জ্বল সত্যের সন্ধান আছে? লজ্জার বিষয় সেখানে তা নেই।” যা আমাকে অবাক করে তা হচ্ছে, ইসলামের মত একটি মহান ধর্ম, এমন কিছু আত্ম-অহংকারী লোকের হাতে পরে অবহেলিত এবং অধঃপতিত হচ্ছে, যারা জীবন সম্পর্কে অসচেতন।
আহমদ ইফেন্দীকে বললাম যে, আমি কুরআনুল কারীম শিখতে চাই। তিনিও আমাকে খুশী মনে শিখাবেন বলে জানালেন এবং সে অনুযায়ী সূরা ফাতিহা শিখাতে শুরু করলেন। আমরা যা পড়তাম, তিনি তার ব্যাখ্যা ভাল করে বুঝিয়ে দিতেন। কিছু শব্দ উচ্চারণে আমার যথেষ্ট সমস্যা হলেও দু’ বছর সময়ের মধ্যে আমি সম্পূর্ণ কুরআন পড়ে ফেললাম। প্রতিটি ছবকের পূর্বে তিনি অজু করতেন এবং আমাকেও অজু করতে বলতেন এবং ক্বিবলামুখী হয়ে বসে শিখাতে শুরু করতেন। অজু বলতে মুসলমানরা যা বোঝায় তা হচ্ছে নীচে বর্ণিত একের পর এক ধোয়ার তালিকা- (১) সমস্ত মুখ ধোয়া, (২) ডান হাত আঙ্গুল থেকে কনুই সহ ধোয়া, (৩) বাম হাত আঙ্গুল থেকে কনুই সহ ধোয়া, (৪) মাথা, কানের পেছন, ঘাড়ের পেছন উভয় হাত দিয়ে মাসেহ করা, (৫) উভয় পা ধোয়া।
মিসওয়াক ব্যবহার করাটা ছিল আমার জন্য এক বিড়ম্বনা। ‘মিসওয়াক’ হচ্ছে একটি ছোট্ট গাছের ডালা যা দিয়ে মুসলমানরা তাদের মুখ এবং দাঁত পরিস্কার করে। আমি ভেবেছিলাম এ গাছের ডালটি দাঁত ও মুখের জন্য ক্ষতিকর। মাঝে মাঝে ডালটি দিয়ে মুখে ব্যথা লাগতো এবং রক্ত ঝরতো, তথাপি তা আমাকে ব্যবহার করতে হত। মুসলমানদের মতে মিসওয়াক ব্যবহার হচ্ছে নবী হযরত মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নত এবং এর ব্যবহার খুবই উপকারী। বাস্তবেই আমার দাঁতের রক্তপড়া বন্ধ হয়ে গেল এবং আমার মুখে যে দুর্গন্ধ ছিল তাও দূর হয়ে গেল। যদিও অধিকাংশ বৃটিশদের মুখেই এ দূর্গন্ধ থাকে।
ইস্তাম্বুলে থাকাকালে মসজিদের সেবায় নিয়োজিত এক খাদিমের কাছ থেকে আমি একটি রুম ভাড়া নিয়েছিলাম। সে খাদিমের নাম ছিল ‘মারওয়ান ইফেন্দী’। মারওয়ান ছিল হযরত মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একজন ছাহাবার নাম। মসজিদের খাদিম ভদ্রলোক ছিল নার্ভাস প্রকৃতির তিনি তার নিজের নামের জন্য গর্ববোধ করতেন এবং বলতেন “ভবিষ্যতে আমার ছেলে হলে তার নাম রাখবো মারওয়ান, কেননা মারওয়ান ইসলামের একজন বীর যোদ্ধা।”
মারওয়ান রাতের খাবার তৈরী করতো। শুক্রবার মুসলমানদের ছুটির দিন বলে আমি কাজে যেতাম না। সাপ্তাহিক বেতন ভিত্তিতে, অন্যান্য দিনগুলো আমি খালিদ নামের একজন কাঠ মিস্ত্রীর জন্য কাজ করতাম।
যেহেতু আমি সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত খন্ডকালীন কাজ করতাম, সে অন্যান্য কর্মচারীদের বেতনের অর্ধেক বেতন আমাকে দিতো। কাঠমিস্ত্রী খালিদ তার অবসর সময় ব্যয় করতো খালিদ বিন ওয়ালিদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর গুণাবলী বর্ণনা করে। খালিদ বিন ওয়ালিদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ছিলেন হযরত মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছাহাবী এবং একজন শ্রেষ্ঠ মুজাহিদ। তিনি অনেক যুদ্ধে জয়লাভ করেছেন। তারপরেও উমর বিন খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু কর্তৃক তাঁর পদচ্যুতির ঘটনা এই কাঠমিস্ত্রীর মনে দারুন আঘাত করেছে।
(খালিদ বিন ওয়ালিদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর স্থলে নিয়োগ দেয়া হয় আবূ উবায়দা বিন র্জারাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে এবং তিনিও অব্যাহত বিজয় লাভ করেন। তার মানে বিজয় অর্জিত হয়েছিল আল্লাহ পাক-এর ইচ্ছায়, খালিদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর জন্যে নয়। খালিদ বিন ওয়ালিদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে সেনাপতির পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে খালিফা উমর বিন খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন।)
আমি খালিদ নামের যে কাঠ মিস্ত্রীর জন্য কাজ করতাম, সে ছিল একজন অসচ্চরিত্র ও অত্যন্ত খেপাটে লোক। সে যেকোন কারণেই হোক আমাকে অত্যন্ত বিশ্বাস করত। আমি জানিনা কেন, তবে বোধ হয় সর্বদা তার অনুগত থাকতাম বলে হয়ত। সে তার নিজস্ব জীবন প্রণালীতে শরীয়ত মেনে চলত না। যদিও তার সঙ্গী-সাথীদের সামনে সে শরীয়তের পাবন্দ বলে জাহির করত। সে জুমুয়ার নামাজ আদায় করত, তবে পাঞ্জেগানা নামাজের ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই।
আমি দোকানে নাস্তা করতাম। কাজ শেষে আমি যুহরের নামাজের জন্য মসজিদে যাই এবং আছরের নামাজ পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করি। আছরের নামাজের পর আমি আহমদ ইফেন্দীর দরবারে যাই যেখানে তিনি কুরআনুল কারীম, আরবী ও তুর্কী ভাষার উপর দুই ঘন্টাব্যাপী তালিম দেন। আমি প্রতি শুক্রবার আমার সাপ্তাহিক সঞ্চয়গুলো তাকে প্রদান করি যেহেতু তিনি আমাকে অত্যন্ত যত্নসহকারে শিক্ষা দান করেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি আমাকে অত্যন্ত ভালভাবে শিক্ষা দান করেন কিভাবে কুরআনুল কারীম তিলাওয়াত করতে হয়, ইসলাম ধর্মের প্রয়োজনীয় বিষয়াদি এবং আরবী ও তুর্কী ভাষার সূক্ষ্মকৌশল।
আহমদ ইফেন্দী যখন জানতে পারলেন যে আমি অবিবাহিত তখন তিনি তার এক মেয়ের সাথে আমাকে বিয়ে দিতে চাইলেন। আমি তার আবেদন নাকচ করে দেই। কিন্তু ফলশ্রুতিতে তিনি বলেন যে, বিবাহ হচ্ছে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একটি সুন্নত এবং হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণনা করেন যে, “যে ব্যাক্তি আমার সুন্নত থেকে সরে যাবে সে আমার সাথে নয়।” এই ঘটনায় আমাদের পারস্পারিক সম্পর্ক বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে আমি তাকে এই মিথ্যা বললাম যে, আমি শারীরীকভাবে অক্ষম। এভাবে আমি আমাদের অল্প সময়ের পরিচিতি ও বন্ধুত্বের স্থায়ীত্ব নিশ্চিত করলাম।
যখন আমার ইস্তাম্বুলে অবস্থানকাল দুই বছর পূর্ণ হলো, আমি আহমদ ইফেন্দীকে বললাম আমি বাড়ী ফিরে যেতে চাই। তিনি বললেন, “না, যেওনা। তুমি কেন যাবে? তুমি ইস্তাম্বুলে যা চাও তার যেকোন কিছু খুঁজে নিতে পার। আল্লাহ পাক একই সময়ে একই শহরে দ্বীন ও দুনিয়া উভয়টি দান করবেন। তুমি বলেছিলে যে তোমার বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই, তোমার কোন ভাই-বোনও নেই। কেন তুমি ইস্তাম্বুলে স্থায়ী বসতী স্থাপন করছো না?.....” আমার সংশ্রবের উপর আহমদ ইফেন্দী একটি বাধ্যবাধকতা আরোপ করল। এটা একারণে যে তিনি আমার সঙ্গ ত্যাগ করতে চাইলেন না এবং গোঁ ধরলেন যে আমার ইস্তাম্বুলে বাড়ী তৈরী করা উচিত। কিন্তু আমার স্বদেশের প্রতি কর্তব্য বোধ আমাকে লন্ডনে ফিরে যেতে, খিলাফতের প্রাণকেন্দ্র সম্পর্কিত বিস্তারিত প্রতিবেদন অর্পণে এবং নতুন নির্দেশ গ্রহনে বাধ্য করেছে।
ইস্তাম্বুলে অবস্থানকালীন পুরো সময়টিতে আমি উপনিবেশ মন্ত্রণালয়ে আমার পর্যবেক্ষনের মাসিক প্রতিবেদন পাঠাতাম। আমার স্বরণ আছে আমার এক প্রতিবেদনে প্রশ্ন পাঠিয়েছিলাম, আমি যে ব্যক্তির জন্য কাজ করি সে ব্যক্তি তার সাথে পায়ুকামের জন্য আহ্বান করছে আমার কি করা উচিত? উত্তর ছিল: যদি তোমার কার্য সিদ্ধিতে সহায়তা করে তবে তুমি এ কাজটি করতে পার। এই উত্তরে আমি অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হলাম। আমার মনে হলো সমস্ত আসমান ভেঙ্গে আমার মাথার উপর পড়ল। আমার জানা আছে যে, এই অশ্লীল কর্মটি ইংল্যান্ডে খুবই সাধারণ ব্যাপার। যদিও আমি কখনও এই কর্মটি করিনি আমার উর্ধ্বস্থ কর্মকর্তা এটি করতে নির্দেশ দেয়। আমি কি করতে পারি? মদের বোতল নিঃশেষ করা ছাড়া আমার কোন উপায় থাকল না। তাই আমি নিশ্চুপ রইলাম এবং আমার কাজে চলে গেলাম।
আমি যখন আহমদ ইফেন্দীর কাছ থেকে বিদায় নিতে গেলাম তার চোখ অশ্রুতে ভরে উঠলো এবং তিনি বললেন হে বৎস! আল্লাহ পাক তোমার সহায় হোন। তুমি আবার ইস্তাম্বুলে এসে যদি দেখ আমি আর নেই তবে আমাকে স্মরণ করে আমার আত্মার জন্যে সূরা ফাতিহা পাঠ করো। শেষ বিচারের দিনে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে আবার আমাদের দেখা হবে ইনশাআল্লাহ। আমার মন এতটাই বেদনাক্লিষ্ট হয়ে পড়ে যে আমার দু’চোখ বেয়েও অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। তারপরেও আমার কর্তব্য বোধ স্বাভাবিকভাবেই ছিল অধিকতর শক্তিশালী। (দ্বিতীয় পর্ব-সমাপ্ত)
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ১১:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


