শয়তান যে মানুষকে নেক সুরতে ধোকা দেয়, এ বিষয়টি ভালভাবে অনুধাবন করেছিল শয়তানের অনুচর ইহুদী এবং খৃষ্টানরা। মুসলমানদের সোনালী যুগ এসেছিল শুধু ইসলামের পরিপূর্ণ অনুসরণের ফলে। শয়তানের চর ইহুদী খৃষ্টানরা বুঝতে পেরেছিল মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ, অনৈক্য, সংঘাত সৃষ্টি করতে পারলেই ইসলামের জাগরণ এবং বিশ্বশক্তি হিসেবে মুসলমানদের উত্থান ঠেকানো যাবে। আর তা করতে হবে ইসলামের মধ্যে ইসলামের নামে নতুন মতবাদ প্রবেশ করিয়ে। শুরু হয় দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা যার মূলে থাকে খৃষ্টীয় বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ। জন্ম হয় ওহাবী মতবাদের। ওহাবী মতবাদ সৃষ্টির মূলে থাকে একজন বৃটিশ গুপ্তচর- হ্যাম্পার। মিশর, ইরাক, ইরান, হেজাজ ও তুরস্কে তার গোয়েন্দা তৎপরতা চালায় মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার জন্য। বৃটিশ গোয়েন্দা হ্যাম্পার তুরস্কের শায়খ ইফেন্দীর নিকট ছদ্ধবেশী মুসলমান সেজে কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ চর্চা করে মুহম্মদ বিন আব্দুল ওহাবের একান্ত বন্ধু ও সহযোগী হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল। দ্বীন ইসলামের বিভিন্ন মৌলিক বিষয় নিয়ে তাদের (উভয়ের) মধ্যে যে আলাপ-আলোচনা হয়, তা হ্যাম্পার তার ডায়েরীতে লিপিবদ্ধ করে। বৃটিশ গোয়েন্দা হ্যাম্পারের উক্ত ডায়েরীটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন জার্মানীর হস্তগত হয়, তখন জার্মান পত্রিকা ইসপিগল তা "Memoirs of Hempher, The British Spy to The Middle East" শিরোনামে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করে। এতে বৃটিশদেরকে বিশ্ব সমাজের কাছে অত্যন্ত লজ্জিত হতে হয়। ডায়েরীটি ফরাসী পত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়। জনৈক লেবাননী বুদ্ধিজীবী তা আরবীতে অনুবাদ করেন। তুরস্কের ওয়াকফ্ ইখলাছ প্রকাশনা হ্যাম্পাররের স্বীকারোক্তি মূলক উক্ত ডায়েরীটি "Confession of British Spy and British enmity against Islam" নামে গ্রন্থাকারে ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রকাশ ও প্রচার করে। হ্যাম্পারের স্বীকারোক্তির তুর্কী অনুবাদ এবং লেখক এম. সিদ্দিক গূমূজের ব্যাখ্যা মিলিয়ে ইংরেজীতে এটি প্রকাশিত হয়। সেই বইয়ের প্রথম অনুচ্ছেদ হতে বৃটিশ গুপ্তচরের স্বীকারোক্তমূলক জবানবন্দীর বঙ্গাণুবাদ তুলে ধরা হলো।
▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓
(ধারাবাহিক)
আব্দুর রিদার বাসায় এক নৈশ ভোজে আমন্ত্রিত ছিলেন কোন এলাকার এক শিয়া পন্ডিত। নাম ছিল জাওয়াদ। সে সময় নজদের মুহম্মদ এবং শিয়া পন্ডিতের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিলো।
শেখ জাওয়াদঃ আপনি যখন স্বীকার করেন হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু একজন মুজতাহিদ ছিলেন তবে তাঁকে অনুসরণ করতে আপনার আপত্তি কিসের?
নজদের মুহম্মদঃ হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। সুতরাং হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর ইজতিহাদকেই কেন দলীল হিসেবে গণ্য করতে হবে। শুধু কুরআন এবং সুন্নাহকেই নির্ভরযোগ্য দলীল বলে মানতে হবে। (মূল বিষয় হচ্ছে হযরত ছাহাবা আজমাঈনগণের ক্বওল হচ্ছে দলীল। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আমি এবং আমার ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ অনুসরণীয়।)
শেখ জাওয়াদঃ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আমি হলাম জ্ঞানের শহর আর হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তার দরজা।” এতে কি এটাই বোঝায় না তিনি অন্যান্য ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের চেয়ে আলাদা?
নজদের মুহম্মদঃ হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর কথাই যদি দলীল হবার যোগ্যতা রাখবে তাহলে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে যেতেন, আমি তোমাদের জন্য কুরআন-সুন্নাহ্ এবং হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে রেখে গেলাম।
শেখ জাওয়াদঃ হ্যাঁ, আমরা তাই ধরে নিতে পারি, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনটিই বলেছেন। কেননা তিনি বলেছেন, আমি রেখে গেলাম আল্লাহ পাক-এর কিতাব এবং আহলে বাইত। হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হচ্ছে আহলে বাইতের একজন সদস্য।
নজদের মুহম্মদ অস্বীকার করলো যে, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনটা বলেছেন। যাই হোক, শেখ জাওয়াদ যুক্তি-প্রমাণ দিয়ে তার ভুলগুলো দূর করার চেষ্টা করলো। নজদের মুহম্মদ বললো, আপনি যদি বলেন যে, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আমি রেখে গেলাম আল্লাহ পাক-এর কিতাব ও আহলে বাইত” তবে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নত মুবারক কোথায় গেল?
শেখ জাওয়াদঃ সুন্নত হচ্ছে কুরআন শরীফের ব্যাখ্যা। “আমি তোমাদের জন্য আল্লাহ পাক-এর কিতাব আর আহলে বাইত রেখে গেলাম” বাক্যে আহলে বাইতের মধ্যে সুন্নত অন্তর্ভুক্ত।
নজদের মুহম্মদঃ আহলে বাইত বলতে যদি কুরআন শরীফের ব্যাখ্যা বোঝাবে তাহলে হাদীছ শরীফ দিয়ে আর কুরআন শরীফের ব্যাখ্যার কি প্রয়োজন?
শেখ জাওয়াদঃ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন বিদায় নিলেন তখন উম্মতগণ ভাবলেন কুরআন শরীফের একটা ব্যাখ্যা থাকা উচিত যা বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজন মিটাবে। এ কারণেই হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আদেশ করেছেন, উম্মতরা মূল কুরআন শরীফের অনুসরণ করবে আর আহলে বাইত কুরআন শরীফের এমন ব্যাখ্যা করবেন যা কিনা বিভিন্ন সময়ের প্রয়োজন মিটাবে।
তাদের এই বিতর্ক আমি খুব উপভোগ করছিলাম। শিকারীর হাতে চড়ূই পাখি যেমন থাকে তেমনি শেখ জাওয়াদের কাছে নজদের মুহম্মদ নির্বাক হয়ে পড়েছিল। নজদের মুহম্মদের মতই আমি একজনকে খুঁজছিলাম। সমকালীন আলিমগণকে অবজ্ঞা করে, খুলাফায়ে রাশিদীনকে এড়িয়ে গিয়ে, কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ বুঝার ক্ষেত্রে নজদের মুহম্মদের স্বাধীন চিন্তাধারাকে কাবু করা সহজ কথা নয়। আমার শিক্ষক ইস্তাম্বুলের আহমদ ইফেন্দীর সাথে এই আত্মঅহংকারী লোকটার যথেষ্ট পার্থক্য। পূর্ববর্তী আলিমগণের মত আহমদ ইফেন্দীর ইলম ছিল গভীর এবং পাহাড় সমান। কোন শক্তিই সেই পর্বতকে নাড়াতে সক্ষম নয়। যখনই তিনি ইমামে আ’যম, হযরত ইমাম আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর নাম মুবারক উচ্চারণ করতেন, তিনি দাঁড়িয়ে যেতেন এবং ওযূ করে আসতেন। একইভাবে যখন তিনি হাদীছ শরীফের কিতাব বুখারী শরীফ পড়তেন তার পূর্বে ওযূ করে নিতেন। হাদীছ শরীফের এই কিতাবের প্রতি সুন্নী মুসলমানদের রয়েছে অগাধ বিশ্বাস। অন্যদিকে নজদের মুহম্মদ হযরত ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর উপর বিরূপভাব পোষণ করতো। সে বলতো, “আবূ হানীফা (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর চেয়ে আমি বেশী জানি।” (কিছু অজ্ঞ, মূর্খ ব্যক্তি যাদের কোন নির্দিষ্ট মাযহাব নেই, তারাও এরকম বলে থাকে।) উপরুন্তু তার মতে বুখারী শরীফের অর্ধেকে ভুলে ভরা। (তার এই উক্তিতে বোঝা যায় হাদীছ শরীফের জ্ঞানের ব্যাপারে সে ছিল অজ্ঞ।)
[আমি যখন হ্যাম্পারের এই যবানবন্দী তুর্কী ভাষায় অনুবাদ করছিলাম, তখন আমি হাইস্কুলের শিক্ষক। ক্লাসে পড়াবার সময় এক ছাত্র প্রশ্ন করলো, “স্যার! একজন মুসলমান যদি ধর্মযুদ্ধে নিহত হয় সে কি শহীদ হবে?” বললাম, “হ্যাঁ, হবে।” “হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি বলেছেন একথা?” বললাম, “হ্যাঁ, বলেছেন।” “সমুদ্রে ডুবে মরলেও কি শহীদ হবে?” জবাব দিলাম, “হ্যাঁ হবে। বরং এ ক্ষেত্রে সে বেশী ছওয়াব পাবে।” ছেলেটি তখন জিজ্ঞস করলো, “এরোপ্লেন থেকে পড়লেও কি শহীদ হয়?” বললাম, “হ্যাঁ হয়।” “আমাদের নবীও কি তাই বলেছেন?” উত্তরে আমি হ্যাঁ বলতেই ছেলেটি মুচকী হাসলো। বললো, “স্যার! সে সময়তো এরোপ্লেন ছিলোনা।” তার প্রতি আমার উত্তর ছিল এরকম। শোন, “আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রয়েছে ৯৯টি লক্বব মুবারক। প্রতিটি নাম মুবারকে রয়েছে অপূর্ব গুণের প্রকাশ। হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একটি নাম মুবারক হচ্ছে, ‘জামিউল কালিম।’ তিনি এক শব্দে অনেক কিছু ব্যাখ্যা করেছেন। যেমন, যে উঁচু স্থান থেকে পতিত হয় সে শহীদ হিসেবে পরিগণিত হয়।” ছেলেটি আমার জবাব শ্রদ্ধার সাথে মেনে নিলো।
একইভাবে কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফে এমন কিছু শব্দ, নীতি, আদেশ, নিষেধ রয়েছে যার প্রতিটির একাধিক অর্থ রয়েছে। গবেষণা করে প্রতিটি শব্দের অর্থ অনুসন্ধান করে সঠিক জায়গায় সঠিক অর্থ প্রয়োগকে বলা হয় ইজতিহাদ। ইজতিহাদের জন্য প্রয়োজন হয় গভীর জ্ঞানের। এই কারণে সুন্নী সম্প্রদায় ধর্মীয় জ্ঞানে অজ্ঞ লোকদের ইজতিহাদ করা থেকে বিরত রাখতে চান। এর মানে এই নয় যে, ইজতিহাদ করা থেকে বিরত রাখা।
হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর পর এমন কোন জ্ঞানী ব্যক্তি জ্ঞানের এমন কোন উচ্চ আসনে পৌঁছেননি যে, স্বয়ং সম্পূর্ণ ইজতিহাদ করতে পারেন এবং প্রকারান্তরে মুতলাক ইজতিহাদের দ্বাররুদ্ধ হয়ে পড়েছে। দুনিয়ার শেষ সময়ে হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালাম নেমে আসবেন এবং ইসলামের প্রত্যাশিত বীর হযরত ইমাম মাহদী আলাইহিস সালাম-এর আবির্ভাব ঘটবে এবং তাঁরাই মুতলাক ইজতিহাদ সম্পন্ন করবেন।
আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আমার পর আমার উম্মতের মধ্যে ৭৩টি দলে বিভক্ত হয়ে পড়বে। তাদের মধ্যে একটি দল হবে জান্নাতী।” যখন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সুওয়াল করা হলো, “কোন সে দল?” জবাবে তিনি বললেন, যারা আমাকে এবং হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের অনুসরণ করবে তারা।”
অন্য হাদীছ শরীফে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আমার ছাহাবায়ে কিরামগণ আকাশের তারকা সদৃশ্য। তোমরা যে কোন একজনের অনুসরণ করলে হিদায়েত পেয়ে যাবে।” তিনি অন্যভাবেও বলেছেন, “তাতেই তোমরা বেহেশতে যাবার রাস্তা খুঁজে পাবে।"
আব্দুল্লাহ বিন সাবা নামের এক ইয়েমিনী ইহুদী মুসলমানদের মধ্যে হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের সম্পর্কে বিদ্বেষ জাগিয়ে তোলে। যে সব অজ্ঞ লোক এই ইহুদীর কথায় আস্থা স্থাপন করে তাদেরকেই বলা হয় শিয়া। আর যে সব লোক হাদীছ শরীফ মেনে চলে এবং হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণদের ভালবাসে ও তাঁদের অনুসরণ করে তাঁরাই সুন্নী বলে পরিচিত। -এম. সিদ্দিক গূমুজ]
আমি নজদের মুহম্মদ বিন আব্দুল ওহাবের সাথে খুব সখ্যতা গড়ে তুললাম এবং চতুর্দিকে তার প্রশংসা করতে লাগলাম।
একদিন তাকে বললাম, “তুমি উমর (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) এবং আলী (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যদি এখন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পৃথিবীতে থাকতেন তবে তিনি তোমাকে খলীফা হিসেবে নিযুক্ত করতেন। আমি আশা করি তোমার হাতে ইসলামের পুনঃসংস্কার এবং উন্নতি ঘটবে। তুমিই একমাত্র জ্ঞানী ব্যক্তি, যে সারাবিশ্বে ইসলামকে ছড়িয়ে দেবে।”
কুরআন শরীফের একটা নতুন ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য আব্দুল ওহাবের পুত্র মুহম্মদ এবং আমি পরিকল্পনা নিলাম। যে ব্যাখ্যাতে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটবে এবং যা হবে সম্পূর্ণভাবে হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম, মাযহাবের ইমাম এবং মুফাসসিরগণের ব্যাখ্যার বিপরীত। আমরা তখন তাফসীর করতে লাগলাম এবং কিছু আয়াত শরীফের নতুন ব্যাখ্যা প্রদান করতে লাগলাম।
আমার উদ্দেশ্য ছিলো এভাবে নজদের মুহম্মদকে বিভ্রান্ত করা। যেহেতু সে তখন নিজেকে একজন বিপ্লবী হিসেবে প্রকাশ করতে চেষ্টা করে যাচ্ছিলো। ফলে সহজেই সে আমার চিন্তাভাবনাগুলোকে আনন্দের সাথে গ্রহণ করলো। যাতে সব ব্যাপারে সে আমার আস্থাভাজন হতে পারে।
একদিন সুযোগ মতো তাকে বললাম, “জিহাদ করা ফরয নয়।”
সে প্রতিবাদ করলো। বললো, “তা কি করে হয়। যেখানে আল্লাহ পাক বলেছেন, “কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করুন।” (সূরা তওবা ৭৩)
আমি বললাম, “তাহলে কেন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ পাক-এর নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন না। ‘আল্লাহ পাক বলেন, জিহাদ ঘোষণা করুন কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে’।” (সূরা তওবা ৭৩)
[অপরদিকে মাওয়াহিবু লাদুন্নিয়া’-এ লিখা আছে যে, কাফিরদের বিরুদ্ধে ২৭টি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। জিহাদে ব্যবহৃত সে সব তরবারী এখন ইস্তাম্বুল যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। মুনাফিকরা মুসলমান হিসেবে ভান করতো, তারা মসজিদে নববীতে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে নামায আদায় করতো। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতেন তারা মুনাফিক, তথাপি তিনি কাউকে বলেননি ‘তুমি মুনাফিক।’
যদি তিনি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেন তাহলে লোকে বলতো, যারা নবীর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে তিনি তাদেরই হত্যা করেছেন। তাই এদের বিরুদ্ধে তিনি মৌখিকভাবে জিহাদ করেছেন। জিহাদ ফরয। এটা হতে পারে দৈহিকভাবে। অথবা সম্পদের মাধ্যমে অথবা বক্তৃতার মাধ্যমে। উপরের আয়াত শরীফে কাফিরদের বিরুদ্ধেই জিহাদ করার হুকুম দেয়া হয়েছে। এই আয়াত শরীফে নির্দিষ্ট বলা হয়নি কোন ধরনের জিহাদ করতে হবে।
কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাই জিহাদ। আর মুনাফিকদের বেলায় জিহাদ করতে হয় ধর্মোপদেশ ও প্রচারের মাধ্যমে। এই আয়াত শরীফে উভয় জিহাদের কথাই ব্যক্ত হয়েছে। -এম সিদ্দিক গূমুজ।]
সে বললো, “হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন উপদেশের মাধ্যমে।”
আমি বললাম, “জিহাদ যদি ফরযই হবে তাহলে মৌখিকভাবে বললেই কেন হবে?”
সে বললো, “হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করেছেন।”
আমি বললাম, “হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন আত্মরক্ষার জন্যে। কেননা, কাফিররা হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যা করতে চেয়েছিলো।”
সে সম্মতি প্রকাশ করলো। অন্য এক সময় বললাম, “মুতা বিবাহ শরীয়ত সম্মত।” (মুতা বিবাহ হচ্ছে একজন পুরুষ ও একজন নারীর মধ্যে একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মিলিত হবার চুক্তি। ইসলামে এ ধরনের বিবাহ নিষিদ্ধ।)
সে প্রতিবাদ করলো, “না তা নয়।”
আমি বললাম, “আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন, তাদেরকে সম্ভোগ করার বিনিময়ে তাদের ধার্য্যকৃত মোহর প্রদান কর।” (সূরা নিসা ২৪)
সে বললো, “হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তাঁর খিলাফতের সময় দুইটি মুতা বিবাহ সম্পাদনে বাধা প্রদান করে ও সতর্ক করে বলেন যে ব্যাক্তি এটি করবে তাকে শাস্তি প্রদান করা হবে।”
আমি বললাম, “তুমি বলছ যে, উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ আবার তাঁরই অনুসরণ করছ। যদিও উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মুতা বিবাহ নিষিদ্ধ করছেন, তিনি বলেন তিনি জানেন যে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা অনুমোদন করছেন। কেন তুমি হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদেশকে উপেক্ষা করে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর মতকে প্রাধান্য দিচ্ছ?”
(মুতা বিবাহ বর্তমান কালের রক্ষিতা রাখার মতো। এটি শিয়াদের মতে শরীয়ত সম্মত। হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এ ধরনের কথা বলেননি। সকল খৃষ্টানদের মতো ইংরেজরাও হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে এবং এই বিষয়েও তাঁর উপর নিন্দা জ্ঞাপন করে। ‘হোজাজ-ই-কাতিয়া’ কিতাবে লিখা আছে: “হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন যে, রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুতা বিবাহ নিষিদ্ধ করেছেন এবং যা আল্লাহ পাকের রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষিদ্ধ করেছেন তিনি তা অনুমোদন করতে পারেন না। সকল ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ খলীফার এই বক্তব্যকে সমর্থন করেছেন। তাঁদের মধ্যে হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুও ছিলেন।”)
সে উত্তর দিলো না। আমি বুঝতে পারলাম সে সম্মতি প্রকাশ করছে। আমি অনুমান করলাম নজদের মুহম্মদ এই মুহুর্তে একজন সঙ্গীনীর জন্য অনুরক্ত কেননা সে ছিল একা।
আমি তাকে বললাম, “এসো, প্রত্যেকে মুতা বিবাহের মাধ্যমে একজন করে স্ত্রী গ্রহন করি। তাদের সাথে আমাদের ভাল সময় কাটবে।”
সে মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করলো। এটা ছিল আমার জন্য সুবর্ণ সুযোগ, তাই আমি তার মনোরঞ্জনের জন্য একজন স্ত্রী খুজতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলাম। আমার উদ্দেশ্য ছিল জনগন সম্পর্কে ভীত এই ব্যক্তিকে সহযোগীতা করা। কিন্তু সে একটি শর্ত আরোপ করে বললো যে, ব্যাপারটি আমাদের এবং উক্ত নারীর মধ্যে গোপন রাখতে হবে এমনকি তার (নজদের মুহম্মদ) নামও বলা যাবে না। আমি তাড়াতাড়ি সেখানকার মুসলমান যুবসমাজকে প্রলুব্ধ করতে উপনিবেশ মন্ত্রনালয় হতে প্রেরিত খৃষ্টান নারীদের কাছে চলে গেলাম।
আমি তাদের একজনকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করলে এ ব্যাপারে সাহায্য করতে সম্মতি প্রকাশ করে। আমি তার নাম দিলাম ‘সাফিয়া।’ আমি নজদের মুহম্মদকে সাফিয়ার বাসায় নিয়ে গেলাম। সে তখন বাসায় একা ছিলো। আমরা এক সপ্তাহের জন্য নজদের মুহম্মদের সাথে বিবাহ্ চুক্তি করলাম এবং সে সাফিয়াকে মোহরানা বাবদ কিছু স্বর্ণ প্রদান করলো। এভাবে নজদের মুহম্মদকে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দিলাম। সাফিয়া ভেতরে থাকে এবং আমি বাইরে থাকি। নজদের মুহম্মদ এখন পুরোপুরিভাবে সাফিয়ার হাতের মুঠোয় চলে গেলো এবং ইজতিহাদ ও স্বাধীন মতাদর্শের নামে শরীয়তের হুকুম-আহকাম অমান্য করার স্বাদ উপভোগ করলো। (চতুর্থ পর্ব-অসমাপ্ত)
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই অক্টোবর, ২০০৯ বিকাল ৫:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



