সি. সি. টিভি স্হাপন এবং হজ্জ নষ্টের সূক্ষ ষড়যন্ত্র (২)
কা’বা শরীফ, মক্কা শরীফ-এর হিফাযতকারী আল্লাহ পাক স্বয়ং নিজেইঃ নিরাপত্তা বা পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে পবিত্র স্থানসমূহে ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়টি শুধু শরীয়তেই হারাম নয়, মুসলমানদের কাছে তা একটি অবান্তর এবং বিবেক বর্জিত বিষয়। সাধারণভাবে যা ধারণা করা হয় তার চেয়েও অনেক বেশী ক্যামেরার সাহায্যে হাজ়ীদের পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং তাদের ছবি রেকর্ড করা হয়। ২০০৫ সালে মক্কার পবিত্র স্থানসমূহে স্থাপিত ৯০০০ এরও বেশী সি. সি. টিভির মাধ্যমে হজ্জের মৌসুমে হাজীদের নিরাপত্তার নামে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। মসজিদুল হারাম, মিনা, আরাফা এবং অন্যান্য পবিত্র স্থানগুলোকে সৌদী আরবের সিভিল ডিফেন্স পরিদপ্তর নিরীক্ষণের জন্য সি. সি. টিভি ক্যামেরার আওতায় রয়েছে। জামারাত ব্রীজের চারদিকে (যে জায়গায় অতীতে অনেকগুলো দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল) প্রায় ১০০০টি সি. সি. টিভি স্থাপিত রয়েছে। জামারাত এবং অন্যান্য জায়গায় গৃহীত সকল ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হল শুধু ক্যামেরার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা যেন এই সতর্কতামূলক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা অপ্রীতিকর ঘটনাকে প্রতিরোধ করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে অপরাধ এবং অসামাজিক কার্যকলাপ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সি. সি. টিভি দ্বারা নিরীক্ষণের কার্যকারীতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ এবং বিতর্ক রয়েছে। যা আপনারা ইতিপূর্বের বর্ণনা দ্বারা অবগত হয়েছেন। নিরীক্ষণের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত সি. সি. টিভি ক্যামেরাগুলো যখন চালু থাকে তখন এগুলো প্রতি সেকেন্ডে ৪০০টি ছবি তুলতে সক্ষম। প্রশ্ন হলো কেন মুসলমানরা নিরাপত্তা বা পর্যবেক্ষণের নামে তাদের ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় বিষয়ে অন্য কারো অবৈধ হস্তক্ষেপ মেনে নিবে? তাছাড়া পবিত্র মক্কা শরীফ ও মদীনা শরীফ-এর হিফাযতের দায়িত্ব কি কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সি. সি. টিভির উপর ন্যস্ত করা হয়েছে? হয় নাই। বরং পবিত্র মক্কা শরীফ ও মদীনা শরীফ-এর নিরাপত্তা ও হিফাযতের জিম্মাদারী হচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ পাক।
যেমন যমীনের বুকে বাইতুল্লাহ বা কা’বা শরীফই হচ্ছে প্রথম ঘর। যা মানবজাতীর ইবাদতের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে। আল্লাহ পাক সর্বপ্রথম ফিরিস্তাদের মাধ্যমে এই সম্মানিত ঘর তৈরী করেন। আর এ ঘরের হিফাযতকারী তিনি নিজেই। হযরত নূহ আলাইহিস্ সালাম-এর যামানায় সারা বিশ্বব্যাপী যখন প্লাবন হয়েছিল তখন আল্লাহ পাক এ পবিত্র ঘরকে আসমানে তুলে নিয়ে হিফাযত করেন।
কালামুল্লাহ শরীফ-এর সূরা ফীল-এ আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, “(হে আমার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আপনি কি দেখেননি অর্থাৎ আপনি তো দেখেছেন যে, আপনার রব হস্তিওয়ালাদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করেছেন এবং তাদের কূটকৌশল কিভাবে ধূলিস্যাত করেছেন, এবং প্রেরণ করেছেন তাদের উপর ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি, উহারা তাদের উপর কঙ্করময় পাথর নিক্ষেপ করেছে, অতঃপর তিনি তাদেরকে ভক্ষিত তৃণের ন্যায় করেছেন।”
সূরা ফীল-এর মধ্যে বাইতুল্লাহ বা কা’বা শরীফের হিফাযতকারী যে স্বয়ং আল্লাহ পাক নিজেই সে বিষয়টা স্পষ্ট করে দুনিয়াবাসীকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। সূরা ফীল-এর শানে নূযূল সম্পর্কে তাফসীরে ইবনে জারীর ত্ববারী, কবীর, কুরতুবী, মাদারিক, খাযিন, বাগবী, ইবনে কাছীর, দুররে মানছূর, জালালাইন, মাযহারী, আমীনিয়া, কাশ্শাফ ইত্যাদি তাফসীরগ্রন্থে লিখিত আছে, আবিসিনিয়ার রাজার অনুমতিক্রমে তার প্রতিনিধি হিসেবে আব্রাহা নামে এক ব্যক্তি ইয়েমেনের শাসনকর্তা হিসেবে নিযুক্ত হয়। আব্রাহা লক্ষ্য করলো, হজ্জের সময় লক্ষ লক্ষ লোক প্রচুর মাল-সম্পদ নিয়ে মক্কা শরীফে হজ্জ করতে যায়, তা দেখে সে ঈর্ষান্বিত হয় এবং চিন্তা করে, ইয়েমেনে সানআ’ শহরে একটা সুন্দর গির্জা তৈরী করে মানুষদেরকে হজ্জ করার জন্য আহবান করবে। তার ডাকে লোকজন যদি সাড়া দিয়ে হজ্জ করতে আসে তাহলে সমস্ত পশুপাল ও মাল-সম্পদ দ্বারা সে ফায়দা লাভ করবে। এ খেয়ালে সে ইয়েমেনের সানআ’ শহরে মূল্যবান পাথর দিয়ে একটা গির্জা তৈরী করে। সে গির্জাকে ‘খলীছ’ নামে নামকরণ করে। গির্জার দেয়ালগুলো স্বর্ণ, মণি-মুক্তা, হীরা-জহরত দিয়ে প্রলেপ দেয় এবং নানা রকম মূর্তি,প্রতিমা স্থাপন করে। অতঃপর সে তার দেশ ও আশেপাশের এলাকায় ঘোষণা করে দেয়, যাতে সকলে মক্কা শরীফ না গিয়ে তার এ ‘খলীছ’ গির্জায় হজ্জ করতে আসে। এতে আরববাসী বিশেষ করে মক্কাবাসী ও তার অধিবাসী কুরাইশগণ অসন্তুষ্ট হন।
ঘটনা প্রবাহে কেনানা গোত্রের এক ব্যক্তি পূর্বোক্ত গির্জায় চাকুরী নেয়। অতঃপর সে সুযোগ বুঝে এক রাত্রিতে সে গির্জায় প্রবেশ করে সেখানে ইস্তিঞ্জা করে অপবিত্র করে সেখান থেকে চলে যায়।
অপর এক বর্ণনায় রয়েছে, এক ব্যবসায়ী কাফেলা সেখানে রাত্রি যাপন করে। তারা আলো এবং খাবার পাক করার জন্য আগুন জ্বালায় সে আগুন হঠাৎ গির্জার একটা অংশ পুড়ে যায়। আব্রাহার কিছু লোক যারা সেখানে পূজা করতো তারা সে স্থান ত্যাগ করে চলে যায়। এটা শুনে আব্রাহা অত্যন্ত ক্ষুদ্ধ হয় এবং শপথ করে, কা’বা শরীফ সে ধ্বংস করে দিবে। (নাঊযুবিল্লাহ) কারণস্বরূপ সে বলে, মক্কা শরীফের অধিবাসীরাই তার গির্জা অপবিত্র করেছে এবং পুড়িয়ে দিয়েছে। তখন সে আবিসিনিয়ার রাজাকে ব্যাপারটা জানিয়ে মক্কা শরীফের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। অনেক সৈন্য-সামন্ত ও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হস্তি মাহমুদসহ ১৩টি হস্তি নিয়ে মক্কা শরীফের দিকে রওয়ানা হয়। আব্রাহা চেয়েছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ৮টা হস্তি দিয়ে কা’বা শরীফের ৪টা ভিতের সাথে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে সজোরে টান দিয়ে কা’বা শরীফকে সহজেই ভূপাতিত করবে। রাস্তায় অনেক বাধা দেয়া সত্ত্বেও সে বাধা উপেক্ষা করে মক্কা শরীফে পৌঁছে। সেখানে মক্কাবাসীদের উটসহ অনেক চতুষ্পদ জন্তু লুটপাট করে নেয়। তারমধ্যে হযরত আব্দুল মুতালিব আলাইহিস্ সালাম-এর ২০০ উটও ছিল। এ সংবাদ শুনে হযরত আব্দুল মুতালিব আলাইহিস্ সালাম আব্রাহার সাথে দেখা করেন এবং উনার ২০০ উট ফেরত চান। আব্রাহা উনাকে দেখে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত তা’যীম-তাকরীম করে এবং বিস্ময় প্রকাশ করে বলে, আপনি কা’বা শরীফ হিফাযতের কথা না বলে শুধু আপনার উট চাইলেন, এর কি কারণ?
জবাবে হযরত আব্দুল মুতালিব আলাইহিস্ সালাম বলেন, উটের মালিক আমি সেজন্য উটগুলি হিফাযত করা আমার দায়িত্ব। আর কা’বা শরীফের মালিক আমি নত। কা’বা শরীফের মালিক হচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ পাক। আর আমি হচ্ছি কা’বা শরীফের খাদিম। কাজেই আল্লাহ পাক-এর ঘর কা’বা শরীফ আল্লাহ পাক নিজেই হিফাযত করবেন; তা বলার অপেক্ষাই রাখে না। আর তোমাদের সাথে যুদ্ধ করার আদৌ কোন ইচ্ছা আমাদের নেই। এখন তোমার যা ইচ্ছা তুমি তা-ই করতে পার। আমরা অতিসত্ত্বর স্থান ত্যাগ করে নিরাপদ দূরত্বে আশ্রয় নিব।
অতঃপর আব্রাহা হযরত আব্দুল মুতালিব আলাইহিস্ সালাম-এর উট ফিরত দিল। হযরত আব্দুল মুতালিব আলাইহিস্ সালাম কিছু লোকজনসহ কা’বা শরীফে গিয়ে গিলাফ ধরে আল্লাহ পাক-এর নিকট রোনাজারি করে দু’য়া করলেন এবং বললেন, আয় আল্লাহ পাক! আপনি ঘরের মালিক ও হিফাযতকারী। আমি এ ঘরের দেখাশুনার দায়িত্বে ছিলাম তা যথাযথ পালন করার চেষ্টা করেছি। এখন আব্রাহা এসেছে কা’বা শরীফের ক্ষতি করার জন্য। সে যে পরিমাণ সৈন্য-সামন্ত ও অস্ত্রপাতি নিয়ে এসেছে তাকে বাধা দেয়ার মত আমাদের ক্ষমতা নেই। কাজেই আপনার ঘর আপনার হিফাযতে দিয়ে আমরা নিরাপদ দূরত্বে আশ্রয়ে চলে যাচ্ছি।
পরের দিন আব্রাহা তার সমস্ত বাহিনী নিয়ে কা’বা শরীফের ক্ষতি করার জন্য অগ্রসর হল। কিন্তু হস্তিগুলো একটাও সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল না। কিছুক্ষণের মধ্যে দেখা গেল, কিছু ক্ষুদ্র আকৃতির পাখি যা আকারে কবুতরের চেয়ে ছোট, কতগুলি সাদা বর্ণের, কতগুলি কালো বর্ণের, কতগুলি নীল বর্ণের। সমুদ্রের দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে আস্তে লাগল। উহাদের মাথা ছিল হিংস্র জন্তুর মত, ঠোট ছিল হস্তির শুঁড়ের মত আর নখগুলি ছিল কুকুরের মত। প্রত্যেকটি পাখি ৩টি কঙ্করময় প্রস্তুর বহন করে এনেছিল। ১টি ঠোটে, ২টি পায়ে। আব্রাহা ও তার বাহিনীর উপরে এসে সে কঙ্করগুলি নিক্ষেপ করতে লাগল। এর ফলে তৎক্ষনাৎ কিছু ধ্বংস হয়ে গেল। কিছু আহত অবস্থায় পালায়ন করার পথে ধ্বংস হল। কঙ্করগুলি উপর দিক থেকে পড়ে নিচ দিয়ে বের হয়ে মাটিতে অদৃশ্য হয়ে যেত। আর কারণে আব্রাহার সৈন্য বাহিনী, হস্তিবাহিনী ভক্ষিত তৃণের ন্যায় দলিত-মথিত হয়ে গেল। কুরাইশগণ দূর থেকে এ ঘটনা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করলেন। আর কঙ্করগুলি ছিল ডাল অপেক্ষা বড় ও ছোলা বুট থেকে ছোট। আব্রাহা ইয়েমেন পর্যন্ত পৌঁছলো। এবং তার উপর দিয়ে পাখিগুলি উড়তে থাকল। সেখানে পৌঁছার পরে পাখির কঙ্কর নিক্ষেপের কারণে সেও ভক্ষিত তৃণের ন্যায় দলিত-মথিত হয়ে গেল। আর তার মন্ত্রী ইয়াকছুম পালিয়ে আবিসিনিয়ায় রাজার কাছে এ সংবাদ পৌঁছায়। তার উপর দিয়েও একটি পাখি উড়ছিল। সে সংবাদ পৌঁছানোর পর পাখিটি কঙ্কর নিক্ষেপ করায় সেও ভক্ষিত তৃণের ন্যায় দলিত-মথিত হয়ে যায়।
এ সূরায় বর্ণিত ঘটনা থেকে বান্দা ও ঊম্মতকে এ নছীহত গ্রহণ করতে হবে যে, আল্লাহ পাক তাঁর ঘর কা’বা শরীফকে সবসময়ই কুদরতীভাবে হিফাযত করেছেন, করেন এবং করবেন। কাজেই এই ঘর হিফাযত করার জন্য বান্দাদের কখনও চিন্তিত ও পেরেশান হওয়ার প্রয়োজন নেই। কা’বা শরীফ, মক্কা শরীফ-এর হিফাযতকারী আল্লাহ পাক স্বয়ং নিজেই। সি. সি. টিভি বা কোন ব্যক্তি বা কোন গোষ্ঠী এর হিফাযতকারী নয়।
অথচ দেখা যাচ্ছে, সৌদী ওহাবী সরকার ও উলামায়ে ‘ছূ’, যারা ইহুদী-নাছারা, কাফির-মুশরিক এক কথায় বেদ্বীনের গোলাম তারা একত্রিত হয়ে কা’বা শরীফ হিফাযতের নাম দিয়ে মক্কা শরীফ-এর হেরেম শরীফ-এর ভিতরে অর্থাৎ কা’বা শরীফ, ছাফা-মারওয়া, মিনা, মুজদালিফা, আরাফা ইত্যাদি স্থানে প্রায় ১০ হাজারেরও বেশী সি. সি. টিভি স্থাপন করেছে। অনুরূপ মদীনা শরীফেও করেছে। অথচ অসংখ্য হাদীস শরীফে রয়েছে, “ছবি তোলা, আঁকা হারাম।” অর্থাৎ সৌদী ওহাবী সরকার ইহুদী-নাছারাদের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে হজ্জের সময় মুসলমানদের দ্বারা হারাম কাজ করিয়ে মুসলমানদের পবিত্র হজ্জ নষ্ট করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। তাই সৌদী ওহাবী সরকারের জন্য ফরয হলো, এই সমস্ত সি. সি. টিভিগুলো খুলে ফেলা। আর যদি না খুলে তাহলে দুনিয়ার সমস্ত মুসলমানদের জন্য ফরয হলো এর শক্ত প্রতিবাদ করা। (চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



