শয়তান যে মানুষকে নেক সুরতে ধোকা দেয়, এ বিষয়টি ভালভাবে অনুধাবন করেছিল শয়তানের অনুচর ইহুদী এবং খৃষ্টানরা। মুসলমানদের সোনালী যুগ এসেছিল শুধু ইসলামের পরিপূর্ণ অনুসরণের ফলে। শয়তানের চর ইহুদী খৃষ্টানরা বুঝতে পেরেছিল মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ, অনৈক্য, সংঘাত সৃষ্টি করতে পারলেই ইসলামের জাগরণ এবং বিশ্বশক্তি হিসেবে মুসলমানদের উত্থান ঠেকানো যাবে। আর তা করতে হবে ইসলামের মধ্যে ইসলামের নামে নতুন মতবাদ প্রবেশ করিয়ে। শুরু হয় দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা যার মূলে থাকে খৃষ্টীয় বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ। জন্ম হয় ওহাবী মতবাদের। ওহাবী মতবাদ সৃষ্টির মূলে থাকে একজন বৃটিশ গুপ্তচর- হ্যাম্পার। মিশর, ইরাক, ইরান, হেজাজ ও তুরস্কে তার গোয়েন্দা তৎপরতা চালায় মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার জন্য। বৃটিশ গোয়েন্দা হ্যাম্পার তুরস্কের শায়খ ইফেন্দীর নিকট ছদ্ধবেশী মুসলমান সেজে কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ চর্চা করে মুহম্মদ বিন আব্দুল ওহাবের একান্ত বন্ধু ও সহযোগী হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল। দ্বীন ইসলামের বিভিন্ন মৌলিক বিষয় নিয়ে তাদের (উভয়ের) মধ্যে যে আলাপ-আলোচনা হয়, তা হ্যাম্পার তার ডায়েরীতে লিপিবদ্ধ করে। বৃটিশ গোয়েন্দা হ্যাম্পারের উক্ত ডায়েরীটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন জার্মানীর হস্তগত হয়, তখন জার্মান পত্রিকা ইসপিগল তা "Memoirs of Hempher, The British Spy to The Middle East" শিরোনামে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করে। এতে বৃটিশদেরকে বিশ্ব সমাজের কাছে অত্যন্ত লজ্জিত হতে হয়। ডায়েরীটি ফরাসী পত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়। জনৈক লেবাননী বুদ্ধিজীবী তা আরবীতে অনুবাদ করেন। তুরস্কের ওয়াকফ্ ইখলাছ প্রকাশনা হ্যাম্পাররের স্বীকারোক্তি মূলক উক্ত ডায়েরীটি "Confession of British Spy and British enmity against Islam" নামে গ্রন্থাকারে ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রকাশ ও প্রচার করে। হ্যাম্পারের স্বীকারোক্তির তুর্কী অনুবাদ এবং লেখক এম. সিদ্দিক গূমূজের ব্যাখ্যা মিলিয়ে ইংরেজীতে এটি প্রকাশিত হয়। সেই বইয়ের প্রথম অনুচ্ছেদ হতে বৃটিশ গুপ্তচরের স্বীকারোক্তমূলক জবানবন্দীর বঙ্গাণুবাদ তুলে ধরা হলো।
▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓
(ধারাবাহিক)
পঞ্চম পর্ব
নজদের মুহম্মদের সঙ্গে আমার (হ্যাম্পার) যখন খুব ঘনিষ্ঠতা ছিলো, সেই সময়ে একদিন লন্ডন থেকে একটি বার্তা পেলাম যে, আমাকে কারবালা এবং নাজাফের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে হবে। কারবালা এবং নাজাফ হচ্ছে শিয়াদের ধর্মীয় জ্ঞান এবং আধ্যাত্মিকতার জন্য দু’টি গুরুত্বপূর্ণ শহর। সুতরাং নজদের মুহম্মদের সাহচর্য ত্যাগ করে আমাকে বসরা ছাড়তে হলো। তথাপি আমি খুব খুশী এবং নিশ্চিত ছিলাম এই কারণে যে, নৈতিকভাবে অধঃপতিত এবং মূর্খ এই লোকটি (নজদের মুহম্মদ) একটা নতুন ফিরক্বাহ তৈরী করতে যাচ্ছে, যা ইসলামকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দেবে এবং আমি হচ্ছি সেই নতুন ফিরক্বাহর উত্তরাধিকার সৃষ্টির রূপকার।
সুন্নীদের মতে চতুর্থ খলীফা এবং শিয়াদের মতে প্রথম খলীফা হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু নাজাফে শুয়ে আছেন। নাজাফ থেকে এক ঘন্টার হাঁটার পথ বা এক ফেরসা হচ্ছে কুফা। কুফা ছিলো হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর খিলাফতের সময় রাজধানী। যখন হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু শহীদ হন তখন তার দুই ছাহেবজাদা হযরত ইমাম হাসান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে নাজাফে সমাহিত করেন। সময়ে নাজাফে উন্নতির ছোঁয়া লেগে যায় এবং কুফা শহর ধীরে ধীরে ম্লান হতে থাকে। শিয়া ধর্মানুসারীরা নাজাফে এসে জামায়েত হয় এবং এভাবে সেখানে বসতবাড়ী, মাদ্রাসা এবং বাজার গড়ে উঠে।
নিম্নলিখিত কারণে ইস্তাম্বুলের খলীফা ছিলেন নাজাফবাসীদের উপর সহানুভূতিশীল-
১. ইরানের শিয়া প্রশাসন এখানকার শিয়াদের সমর্থক। খলীফার হস্তক্ষেপ এখানে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে এবং এক পর্যায়ে যুদ্ধ-বিগ্রহের কারণ হতে পারে।
২. নাজাফের অধিবাসীরা একদল সশস্ত্র উপজাতীকে তাদের দলে ভিড়িয়েছিল, যারা শিয়াদের সমর্থন করতো। যদিও অস্ত্র এবং দলগত দিক থেকে তাদের অবস্থান তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, সে কারণে খলীফা কোন অহেতুক ঝামেলায় জড়িয়ে যাওয়াটাকে বুদ্ধিমানের কাজ মনে করতেন না।
৩. সমগ্র বিশ্বের সকল শিয়ার উপর বিশেষত আফ্রিকা ও ইন্ডিয়ার শিয়াদের উপর নাজাফের শিয়াদের ছিল কর্তৃত্ব। খলীফা কর্তৃক তাদের বিরক্তির কিছু কারণ ঘটালে সমগ্র শিয়ারা খলীফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পারতো।
হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দৌহিত্র এবং হযরত ফাতিমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর পুত্র হযরত ইমাম হুসাইন বিন আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু শহীদ হন কারবালাতে।
ইরাকের অধিবাসীগণ মদীনায় গিয়ে হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে আমন্ত্রণ করেন যেন তিনি ইরাকে এসে খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। কিন্তু হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং তাঁর পরিবারবর্গ যখন কারবালায় এসে পৌছেন ইরাকবাসীরা তখন তাদের সংকল্প পরিত্যাগ করে এবং দামেস্কে বসবাসরত উমাইয়া খলীফা ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়ার নির্দেশে হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে গ্রেফতার করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং তাঁর পরিবারবর্গ শহীদ হওয়ার আগ পর্যন্ত বীরত্বের সাথে ইরাকী বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করেন। হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং তাঁর পরিবারবর্গের শহীদ হওয়ার মাধ্যমে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। যদিও এতে আপাত বিজয়ী হয় ইরাকী বাহিনী। সেদিন থেকে শিয়ারা কারবালাকে তাদের ধর্মীয় আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে মেনে নিয়েছে। সারা পৃথিবী থেকে শিয়ারা এখানে এসে জামায়েত হয় এবং এত বড় সমাবেশের মত কোন সমাবেশ আমাদের খৃষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে দেখা যায় না।
কারবালা হচ্ছে শিয়াদের শহর এবং রয়েছে অনেক শিয়া মাদ্রাসা। নাজাফ এবং কারবালা শহর একে অপরকে সহযোগিতা করে। এই দু’টো শহরে যাবার জন্যে আমি বসরা ত্যাগ করে বাগদাদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। পরে সেখান থেকে চলে যাই ‘হুল্লা’ নামের একটি শহরে যা ইউফ্রেটিস (ফোরাত) নদীর অববাহিকায় অবস্থিত। টাইগ্রীস (দজলা) এবং ইউফ্রেটিস (ফোরাত) নদী দু’টো তুরস্ক থেকে আরম্ভ হয়ে ইরাকের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পারস্য উপসাগরে গিয়ে পড়েছে। ইরাকের কৃষি এবং সাফল্যে এই দুই নদীর অবদান রয়েছে।
আমি লন্ডনে ফিরে গিয়ে উপনিবেশ মন্ত্রণালয়কে প্রস্তাব করলাম, এই নদী দু’টোর পানি প্রবাহের গতি পরিবর্তন করার মাধ্যমে আমরা ইরাককে আমাদের প্রস্তাবে রাজী করাতে পারি এবং এ ব্যাপারে একটা প্রকল্প হাতে নেয়া যেতে পারে। যখন ইরাকের পানি বন্ধ করা হবে তখন ইরাক বাধ্য হবে আমাদের দাবী মেনে নিতে।
একজন আজারবাইজানী ব্যবসায়ী হিসেবে ছদ্মবেশ ধারণ করে আমি হুল্লা থেকে নাজাফে ভ্রমন করি। শিয়া ধর্মের লোকদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করে আমি তাদের বিভ্রান্ত করতে শুরু করলাম। আমি তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে যোগ দিতে শুরু করলাম। একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, সুন্নীদের মত শিয়ারা বিজ্ঞান মনস্ক নয় এবং সুন্নীদের মত সুন্দর নৈতিক গুণাবলীও তাদের নেই। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে-
১. তারা ছিলো তুর্কী শাসক শ্রেণীর ঘোর বিরোধী। কেননা, তারা ছিল শিয়া আর তুর্কীরা সুন্নী। শিয়াদের মত অনুযায়ী সুন্নীরা কাফির।
২. শিয়া পন্ডিতরা ছিল সম্পূর্ণভাবে তাদের ধর্মীয় শিক্ষাদানে মশগুল, পার্থিব বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান ছিলো না যেমনটা ছিলো আমাদের অতীতের স্থবির ইতিহাসের কারণ সেই ধর্মযাজকদের মত।
৩. ইসলামের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে শিয়াদের কোন ধারণা ছিলো না। এমনকি সমকালীন বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি উন্নতি সম্পর্কে নূন্যতম ধারণাও তাদের ছিলো না।
একদিন আমি নিজেকে বললাম, শিয়ারা কেমন বিধ্বস্ত একটি জাতি। এরা এখনও ঘুমিয়ে আছে যেখানে সমস্ত পৃথিবী জাগ্রত। একদিন বন্যা এসে সবাইকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। অনেকবার আমি তাদের বুঝিয়েছি খলীফার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার জন্য। দুর্ভাগ্যবশত কেউ আমার কথায় সাড়া দেয়নি। শিয়াদের কেউ কেউ আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো যখন আমি তাদের তুর্কী সভ্যতা ধ্বংস করে দিতে বললাম। তাদের ধারণা, খলীফা হচ্ছে দূর্গের মত যাকে কখনই ধরা যাবে না। তাদের ধারণা অনুযায়ী, যখন হযরত ইমাম মাহদী আলাইহিস্ সালাম আসবেন তখনই তারা খলীফার নাগপাশ থেকে মুক্তি পাবে।
তাদের মতে, হযরত ইমাম মাহদী আলাইহিস্ সালাম হচ্ছেন দ্বাদশ ইমাম। যিনি আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উত্তরপুরুষ এবং যিনি ২২৫ হিজরীতে অদৃশ্য হয়ে যান। তাদের বিশ্বাস তিনি এখনও জীবিত এবং একদিন তাঁর পুনঃআগমন ঘটবে এবং তখন পৃথিবীর সমস্ত অন্যায় অত্যাচার দূর করে দিয়ে পৃথিবীতে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠিত করবেন। এটা এক অবাস্তব কল্পনা। কি করে শিয়ারা এত কুসংস্কারে বিশ্বাস করে! এটা যেন খৃষ্টানদের ধারণার মত যে একদিন যীশুখৃষ্ট ফিরে আসবে এবং দুনিয়াতে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবে।
একদিন আমি তাদের একজনকে বললাম, ইসলামের নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মত অন্যায় প্রতিরোধ করা তোমাদের জন্য ফরয নয় কি? উত্তরে সে বললো, তিনি অন্যায় প্রতিরোধ করেছিলে কারণ আল্লাহ পাক তাঁকে সাহায্য করেছিলেন। যখন আমি বললাম, আল্লাহ পাক কুরআন শরীফে বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহ পাককে সাহায্য করলে আল্লাহ পাক তোমাদেরকে সাহায্য করবেন।’ (সূরা মুহম্মদ ১৪) তোমরা শাহের নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে আল্লাহ পাক তোমাদেরকে সাহায্য করবেন। উত্তরে সে বললো, তুমি একজন বণিক। এগুলো বৈজ্ঞানিক বিষয়। তুমি এটা বুঝবে না।
আমিরুল মু’মিনীন হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর মাযার শরীফ অত্যন্ত কারুকার্যময়। মাযার শরীফ সংলগ্ন রয়েছে বড় খোলা প্রাঙ্গন, স্বর্ণযুক্ত গম্বুজ এবং দুটো লম্বা মিনার। প্রতিদিন অনেক শিয়া দর্শনার্থী মাযার শরীফে আসে। তারা এখানে এসে জামা’য়াতে নামায আদায় করে। প্রত্যেক প্রবেশ পথের চৌকাঠে এসে মাথা অবনত করে সেখানে চুম্বন করে এবং পরে মাযার শরীফের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে। তারা অনুমতি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। মাযার শরীফ সংলগ্ন রয়েছে বিশাল প্রাঙ্গন সেখানে ধর্মানুযায়ী এবং দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে অসংখ্য কক্ষের ব্যবস্থা।
কারবালায় আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর মাযার শরীফ সংলগ্ন রয়েছে আরো দুটো মাযার শরীফ। একটি ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালার আনহুর এবং অপরটি তাঁর ভাই আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর যিনি ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম সঙ্গে কারবালায শহীদ হন। নাজাফের মত কারবালাও শিয়ারা একই রকম আচার অনুষ্ঠান করে থাকে। কিন্তু কারবালাতেও আবহাওয়া নাজাফের চেয়ে ভাল। কারবালার চারিধার অনেক ফলের বাগান এবং ছোট ছোট নদী দ্বারা বেষ্টিত।
ইরাকে আমার মিশন চলাকালীন সময়ে আমি একটি দৃশ্য দেখতে পেয়েছিলাম যা আমার হৃদয়ে অনেক প্রশান্তি এনে দেয়। কিছু কিছু ঘটনা তুর্কী শাসনের পতন ত্বরানিত করে। ইস্তাম্বুলের কর্তৃপক্ষ, যে গভর্ণরকে ইরাকে নিয়োগ দিয়েছিলেন সে ছিল অশিক্ষিত এবং নিষ্ঠুর প্রকৃতির। সে যা খুশী তাই করতো। জনগণ তাকে পছন্দ করতো না। সুন্নী সম্প্রদায় একটা অস্বস্তিকর অবস্থায় ছিল কেন না গভর্ণর তদের কোন মূল্যায়ন করতো না বরং তাদের স্বাধীনতা হরণ করেছিল আর শিয়া সম্প্রদায়ও তুর্কী শাসকগণ দ্বারা শাসিত হয়ে নিজেদের হেয় মনে করতো। তাদের মধ্যে ছিল অনেক সাইয়্যিদ (হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর উত্তরপুরুষ) এবং শরীফ (হযরত ইমাম হাসান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর উত্তরপুরুষ) বংশীয় লোক যারা নবীর বংশধর এবং গভর্ণরের দায়িত্বপালনের জন্য আরও উপযুক্ত ছিল।
শিয়ারা ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক পরিস্থিতিতে তারা অনেক দুঃস্থ এবং জীর্ণশীর্ণ পরিবেশে বাস করতো। রাস্তায় চলাচলও নিরাপদ ছিল না। চলার পথে ডাকাতদল আক্রমণের জন্য ওৎ পেতে বসে থাকতো, যখন তারা দেখতো কোন কোন সৈন্য-সামন্ত তাদের পাহারায় নেই। সে কারণে সরকারীভাবে কোন পাহারার ব্যবস্থা না থাকলে কোন কাফেলা যাত্রা শুরু করতো না।
শিয়ারা নিজ গোত্রের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ করতো। দৈনিক একে অপরকে হত্যা ও লুণ্ঠন করতো। অজ্ঞতা আর অশিক্ষা ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করেছিলো। শিয়াদের এ অবস্থা দেখে ধর্মীয় যাজকের দ্বারা শাসিত ইউরোপের অবস্থা আমার মনে হতো। নাজাফে এবং কারবালায় বসবাসরত কয়েকজন ধর্মীয় নেতা এবং অল্প সংখ্যক ভোটার ছাড়া এক হাজার জনের মধ্যে একজন শিয়াও জানতো না কি করে লিখতে পড়তে হয়। অর্থনীতি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো এবং লোকজন দারিদ্রতার মধ্যে বাস করতো। প্রশাসনিক ব্যবস্থাও ছিলো সম্পূর্ণ অচল। শিয়ারা রাস্ট্রদ্রোহীতার কাজে জড়িত থাকতো। সরকার এবং জনগণের মধ্যে ছিল অনেক দূরত্ব। ফলে তাদের মধ্যে কোন পারস্পরিক সহযোগিতা ছিলনা। শিয়া ধর্মীয় নেতারা একমাত্র সুন্নীদের গালমন্দ করা ছাড়া জ্ঞানে, ব্যবসায়, ধর্মীয় এবং পার্থিব বিষয়ে একেবারে শেষ পর্যায়ে উপনিত হয়েছিলো।
আমি কারবালায় ও নাজাফে চার মাস অবস্থান করেছিলাম এবং নাজাফে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। আমার অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে, সুস্থ হওয়ার আশা একেবারেই ত্যাগ করেছিলাম। আমার অসুস্থতা তিন সপ্তাহ স্থায়ী ছিলো। আমি একজন ডাক্তারের শরানাপন্ন হলে তিনি একটি প্রেসক্রিপশান দিয়েছিলেন। সেই ঔষুধ ব্যবহারে আমি আরোগ্য লাভ করেছিলাম।
আমার অসুস্থতার পুরো সময়টাই আমি মাটির নিচে একটি রুমে অবস্থান করেছিলাম। যেহেতু আমি অসুস্থ ছিলাম আমার গৃহকর্তা নিজেই ঔষুধ এবং খাবার প্রস্তুত করে দিত। বিনিময়ে সে অল্প মূল্য নিতো এবং শুধু সওয়াবের আশায় সে এই কাজগুলো করতো, কারণ আমি ছিলাম আমিরুল মু’মিনীন হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর জিয়ারত প্রার্থী।
ডাক্তার আমাকে উপদেশ দিয়েছিলেন অসুস্থতার প্রথম কয়েকদিন শুধু মুরগীর সূপ খেতে। পরবর্তীতে তিনি মুরগী খাওয়ার অনুমতি দেন। তৃতীয় সপ্তাহে আমি খেয়েছিলাম ভাতের সূপ। সুস্থ হয়ে আমি আবার বাগদাদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলাম। আমার নাজাফে, হুনায়, বাগদাদে এবং পথের সব অভিজ্ঞতার ওপর একশ’ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছিলাম। উপনিবেশ মন্ত্রণালয়ের বাগদাদ প্রতিনিধির নিকট আমি আমার প্রতিবেদন জমা দিলাম। আমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের অপেক্ষা করছিলাম যে ইরাকেই থাকবো না লন্ডনে ফিরে যাবো। আমি লন্ডনে ফিরে যেতে চাইলাম কারণ, অনেকদিন ধরেই দেশের বাইরে অবস্থান করছি। আমার দেশ এবং পরিবারের কথা খুব মনে হচ্ছিলো। বিশেষতঃ আমার ছেলে রামপুটিনকে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিলো, যে আমার দেশ ত্যাগের পর জন্ম নেয়। এ কারণে, আমার রিপোর্টের সঙ্গে একটা দরখাস্তও দিয়ে দিলাম অন্তত অল্প কিছুদিনের জন্য হলেও আমাকে যেন ছুটি দেয়া হয়। এছাড়া আমার ইরাকে তিন বছরের মিশনের ব্যাপারে একটা মৌখিক প্রতিবেদন দিতে চাইলাম এবং একই সময়ে কয়েকদিন বিশ্রাম নিতে পারবো।
উপনিবেশ মন্ত্রণালয়ের ইরাকী প্রতিনিধি আমাকে উপদেশ দেন, তাকে যেন প্রায়শঃই ফোন না করা হয় যাতে আমি কোন সন্দেহের সৃষ্টি না করি। তিনি আমাকে আরো পরামর্শ দেন, দজলা নদীর কাছে কোন সরাইখানায় একটি রুম ভাড়া করে সেখানে অবস্থান করবে। তিনি বললেন, “আমি তোমাকে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত জানাবো যখন লন্ডন থেকে চিঠি পাবো।”
বাগদাদে আমার অবস্থানকালেই আমি বুঝতে পারি আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে খিলাফতের রাজধানী ইস্তাম্বুল এবং বাগদাদের মধ্যে একটা ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। নাজাফ এবং কারবালার উদ্দেশ্যে আমি যখন বাগদাদ ত্যাগ করি তখন আমার দুঃশ্চিন্তা হলো, নজদের মুহম্মদ হয়তো আমার দেখানো পথ ছেড়ে অন্য পথে ধাবিত হতে পারে। কেননা, সে ছিলো অতি মাত্রায় অস্থির এবং নার্ভাস প্রকৃতির লোক। আমি ভয় পাচ্ছিলাম, যে উদ্দেশ্য নিয়ে তাকে তৈরী করেছিলাম তা না ভুণ্ডল হয়ে যায়।
আমার চলে আসার সময় সে (নজদের মুহম্মদ) ইস্তাম্বুলে যাওয়ার কথা ভাবছিল। আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করলাম তার এই চিন্তা থেকে তাকে সরিয়ে আনতে। আমি বললাম “আমি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন যে তুমি সেখানে গিয়ে এমন কোন উক্তি করবে যাতে প্রকাশ পাবে তুমি ভিন্নমতালম্বী এবং শেষে তোমাকে তারা হত্যা করবে।”
অবশ্য আমার মনে ধারণা ছিল ভিন্ন রকম। আমি ভীত ছিলাম এই ভেবে যে, সেখানে গেলে দেখা হবে অনেক ধর্মীয় আলিম ব্যক্তিদের সাথে যারা তার এই ভ্রান্ত মতগুলো খণ্ডিয়ে দেবেন এবং সুন্নী মত অনুযায়ী তাকে তৈরী করবেন, তাতে আমার সকল স্বপ্ন বন্ধ হয়ে যাবে। কেননা ইস্তাম্বুলে ছিল ইসলামের গভীর ইলম এবং আদর্শের উপস্থিতি।
যখন আমি দেখলাম নজদের মুহম্মদ বসরায় অবস্থান করতে চাচ্ছে না আমি তাকে সুপারিশ করলাম যাতে সে ইস্পাহান এবং সিরাজে যায়। এই দুটো শহর ছিল যথেষ্ট সুন্দর এবং শিয়া অধ্যূষিত। শিয়ারা জ্ঞানে এবং আদর্শে অপরিপূর্ণ সুতরাং তারা নজদের মুহম্মদের ওপর কোন প্রভাব ফেলতে পারবে না। এভাবে আমি নিশ্চিত হলাম যে, আমি তাকে যে পথ নির্দেশনা দিয়েছি সেখান থেকে সে সরে যাবে না। বিদায় নেবার সময় আমি তাকে বললাম “তুমি কি তাকিয়া বিশ্বাস কর”?
উত্তরে সে বললো হ্যাঁ করি। কাফেরগণ একজন ছাহাবীকে বন্দী করে এবং তার পিতামাতাকে শহীদ করে। এতে তিনি তাকিয়া অবলম্বন করেন এবং প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে তিনি মুশরিক হয়ে গেছেন। আল্লাহ পাক-এর হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই ছাহাবীকে ভর্ৎসনা করেননি।
(উল্লেখ্য, উক্ত ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম সম্পর্কে হ্যাম্পারের এ বক্তব্য মোটেই শুদ্ধ নয়। কেননা ছাহাবী হযরত আম্মার রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু কাফির, মুশরিক কর্তৃক পিতা-মাতার মর্মান্তিক শাহাদত বরণের দৃশ্য দেখে তাঁর যবান দিয়ে যা উচ্চারিত হয়েছিল তা ছিল সম্পূর্ণরূপে অনিচ্ছাকৃত। তা কখনই ইচ্ছাকৃত ছিলনা। কাজেই তাঁর সাথে তাকিয়ার কোন মিল বা সম্পর্ক নেই। মূলতঃ বাহ্যিক ও আন্তরিক সবদিক থেকেই উক্ত ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ঈমানে অটল ছিলেন।)
আমি তাকে উপদেশ দিলাম “যখন তুমি শিয়াদের মধ্যে থাকবে, তাকিয়া করবে। কিন্তু তাদের বলবে না যে তুমি একজন সুন্নী। পাছে তারা তোমার জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাড়াবে। তাদের দেশ এবং পাণ্ডিত্যকে কাজে লাগাবে। তাদের ঐতিহ্য এবং সংষ্কৃতি শিখে নেবেন। কারণ তারা হচ্ছে মুর্খ এবং একগুয়ে প্রকৃতির লোক। আমি চলে আসার সময় তাকে কিছু যাকাতের পয়সা দিলাম। যাকাত হচ্ছে ইসলামের কর যা গরীবদের দেয়া হয়। অতিরিক্ত উপহার হিসেবে তাকে কিছু ভারবাহী পশু দিলাম।
আমার চলে আসার পর তার সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেছিলাম। ফলে আমি অস্বস্তি অনুভব করতে থাকি। অবশ্য বিদায়কালে আমরা ঠিক করেছিলাম, আমরা উভয়েই বসরায় ফিরে আসবো। যে প্রথমে ফিরবে, ফিরে অন্যকে না দেখলে দ্বিতীয় জনকে চিঠি লিখবে এবং চিঠি আব্দুর রিদার নিকট রেখে যাবে। (পঞ্চম পর্ব-সমাপ্ত)
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে অক্টোবর, ২০০৯ বিকাল ৫:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



