
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য, সীমান্তে ফের বিএসএফের হামলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংঘর্ষসহ সাম্প্রতিক কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আমরা কথা বলেছি বিশিষ্ট সাংবাদিক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি শওকত মাহমুদের সাথে । তার সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো
রেডিও তেহরান : জনাব শওকত মাহমুদ,আমরা দেখেছি আজ ২২শে জানুয়ারী শুক্রবার ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক যায় যায় দিনে বিএনপি মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের বরাত দিয়ে লেখা হয়েছে, তিনি বলেছেন,মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই প্রমাণ করেছেন যে, তিনি সংকীর্ণমনা । এ খবরটি অবশ্য আরো অনেক পত্রিকাতেও ছাপা হয়েছে। পত্রিকাগুলোর ভাষ্যমতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন তার তীব্র সমালোচনা করে বিএনপি মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন তাকে সংকীর্ণমনা বলেছেন। পাশাপশি জিয়াউর রহমানকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এ মন্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বেশ সমালোচনা হচ্ছে এমনটি দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন মিডিয়ার খবরে । তো আমি জানতে চাচ্ছিলাম যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হঠাৎ করে কেন এমন আক্রমণাত্মক কথা বল্লেন ?
শওকত মাহমুদ : দেখুন, বিষয়টি নিয়ে অনেকের মতো আমরাও বেশ বিষ্মিত হয়েছি, আশ্চর্য হয়েছি এবং দু:খিত হয়েছি এই জন্যে যে হঠাৎ করে কেন প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের কথা বললেন । এ ধরনের মন্তব্য করার আগের দিনই সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সংসদে আসার আহবান জানিয়ে বলেছেন, তিনি সংসদে এসে ভারতের সাথে যেসব চুক্তি হয়েছে বা সমঝোতা স্বারক স্বাক্ষরিত হয়েছে সে ব্যাপারে যতক্ষণ খুশি আলোচনা করতে পারবেন । তারপরই তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে নিয়ে যে মন্তব্যটি করলেন তাতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবার যে ঘোলাটে হয়ে গেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই । প্রধানমন্ত্রীর ঐ মন্তব্যের পর এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে তিনি কি সত্যি সত্যিই চান যে বিরোধী দল সংসদে আসুক ! কারণ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কফিনে লাশ ছিল কি ছিল না এ বিষয়ে অনেক আগে প্রধানমন্ত্রীর দলের নিম্নস্তরের নেতারা কথা বলেছেন । প্রধানমন্ত্রী বা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা সরাসরি সেসব আলোচনায় সে সময় অংশ নেননি । কিন্তু এখন তিনি যে মন্তব্য করলেন তাতে অনেকে আশ্চর্য হয়েছে । এবং এর কারণ হিসেবে অনেকে মনে করছেন বিরোধী দল যাতে সংসদে না আসে সেজন্যেই তিনি এ ধরনের মন্তব্য করেছেন। তো আমার মনে হয় - ঐ ঘটনার পর বিরোধী দলের সংসদে যাওয়ার পরিবেশ নষ্ট হওয়ার একটি প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিএনপি এ বিষয়টি কিভাবে নেয় সেটি দেখার বিষয় যদিও বিএনপি এরই মধ্যে ঐ ঘটনার তীব্র সমালোচনা করেছে । শুধু তাই নয়, আমি মনে করি বিএনপি ছাড়াও বিদগ্ধমহল, সিভিল সোসাইটি-তারাও প্রধানমন্ত্রীর ঐ মন্তব্যে মর্মাহত হয়েছেন।
রেডিও তেহরান : আমি একই প্রসঙ্গ ধরে এবারে জানতে চাইবো, দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের সাথে সাম্প্রতিক চুক্তির ব্যাপারে মানুষের মনে যে নেতিবাচক ধারণা তৈরী হয়েছে তা থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানোর উদ্দেশ্যে প্রতিবেশী একটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থা সরকারকে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছে । এসব পরামর্শের মধ্যে যেমন ধরুন- বিশ্ববিদ্যালয়ে অশান্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি করা বা ছাত্র সংঘর্ষ কিংবা রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত করা। তো দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এ ধরনের খবরের ব্যাপারে আপনি কি মনে করেন ?
শওকত মাহমুদ : দেখুন, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরামর্শক্রমে এ ধরনের কাজ করা হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই বা এ বিষয়ে সঠিক করে আমি কিছু বলতে পারব না । তবে এটি একটি পুরনো রাজনৈতিক কৌশল যে, দৃষ্টি সরিয়ে নেয়ার জন্যে আরেকটি নতুন ইস্যু তৈরী করা । বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ বিষয়টি দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসছে। কিন্তু ভারত বিরোধীতার বিষয়টি কিম্বা ভারতের সংগে প্রধানমন্ত্রীর যেসব চুক্তি বা সমঝোতা হয়েছে সে বিষয় থেকে জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে এমনটি হতে পারে বা হলেও তা আশ্চের্যের কোনো বিষয় হবে না । তো আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এটি করলেও যে চুক্তি হয়েছে বা সমঝোতা হয়েছে -তার নেতিবাচক মূল্যায়ন , বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন বা দূর্বলতার দিকগুলো সমালোচনার মধ্যে পড়বেই । আর সেজন্যে যদি দৃষ্টি অন্যত্র ফিরিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে ঐ সব কথা বলা হয় ; তাতে কোনো লাভ হবে না । বরং যারা বলবেন তাদেরই ক্ষতি হবে।
রেডিও তেহরান : জনাব শওকত মাহমুদ, আজ (শুক্রবার) দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি খবরের শিরোনাম এ রকম যে, মেহেরপুরে বিএসএফের গুলিতে এক গরু ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে । তো আমরা দেখেছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর শেষে বলেছেন তার ঐ সফর শতভাগ সফল হয়েছে যদিও বিরোধী দল বিএনপি এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছে । তবে প্রধানমন্ত্রীর ঐ সফরের সফলতা সম্পর্কে যেসব পত্রিকা খবর ছেপেছিল তার মধ্যে প্রথম আলো ছিল । আর আজ আবারও প্রথম আলোতে বিএসএফের হাতে বাংলাদেশী নিহত হওয়ার খবরটি আমাদের দেখতে হ'ল। ছাপা হলো । আপনার মূল্যায়ন কি ?
শওকত মাহমুদ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে যে যৌথ ইশতেহার প্রকাশিত হয়েছে তাতে কিন্তু বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একটি সমস্যা - বিএসএফের গুলিতে নিরিহ বাংলাদেশীরা যে মারা যাচ্ছেন সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো উল্লেখ নেই । সেখানে কেবলমাত্র বলা হয়েছে দুদেশের সীমান্তরক্ষীরা যথাসম্ভব সংযম প্রদর্শন করবে । তাছাড়া ঐ যৌথ ইশতেহারে তারা সীমান্তে হত্যাকান্ডের বিষয়ে মৃদু উদ্বেগ প্রকাশ করেছে । আমার মনে হয় ভারতের যে মাইন্ড সেট এবং বিএসএফের যে মাইন্ড সেটা কিন্তু উচ্চ পর্যায়ের যতই সমঝাতা হোক না কেন তা বাস্তবে রূপ নিচ্ছে না । আমি বলবো বাংলাদেশ এবং ভারতের এমন এক সীমান্ত যে বিশ্বের আর কোথাও এমন সীমান্ত আছে কিনা - যেখানে প্রতিদিনই বড় প্রতিবেশী দেশের সীমান্তরক্ষীরা নিরিহ বাংলাদেশীদের গুলি করে মারছে এবং এক্ষেত্রে তারা আগাম কোনো সতর্কতাও দিচ্ছে না । আর এ বিষয়টি বিশেষ করে বিএসএফের দ্বারা সীমান্তে নিরিহ বাংলাদেশী হত্যার ঘটনাটি একটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে । সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে কি সমঝোতা করে এসেছেন ভারতের সাথে সে বিষয়টি জনগণের মধ্যে একটি বড় প্রশ্ন । প্রধানমন্ত্রীর সমঝোতার রেশতো এখনও ফুরোয়নি । সেই রেশ ফুরোনোর আগেই যদি বিএসএফ আবারও নিরিহ বাংলাদেশীদের গুলি করে মারা শুরু করে তাহলে তো মনে করতে হবে দিল্লির ঐ সমঝোতা ছিল আসলে কৃত্রিম সমঝোতা ।
রেডিও তেহরান : জনাব শওকত মাহমুদ, আমি সবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংঘর্ষ নিয়ে আজ শুক্রবারের গুরুত্বপূর্ণ খবরের দিকে দৃষ্টি দেব। দৈনিক নয়া দিগন্তের একটি শিরোনামে বলা হয়েছে - ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘর্ষ - অস্ত্রধারীরা আত্মগোপনে , গ্রেফতারের দাবী শিক্ষার্থীদের । অন্যদিকে আমরা গত কয়েক দিনের প্রধান প্রধান জাতীয় দৈনিকের খবরে দেখেছি যে, পুলিশের সামনে অস্ত্রধারীরা হামলা চালিয়েছে অথচ পুলিশ সেখানে নির্লিপ্ত। পুলিশের এ ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছে বিভিন্ন মহল। তাছাড়া ঘটনাটির ক্ষেত্রে দৈনিকগুলোতে বলা হয়েছে - জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কমিটির নেতারা ক্যাম্পাসে ঢুকতে চেয়েছিল তখন কথিত পদবঞ্চিত ছাত্রদলের একটি গ্রুপ এবং তাদের সহযোগীতা করেছে ছাত্রলীগ - তারা ছাত্রদলের সভাপতির উপর পুলিশের সামনে হামলা চালিয়েছে। ছাত্রদলের সভাপতি তাতে আহত হয় এবং অসুস্থ অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় । তারপর আজকের দৈনিক আমাদের সময়ের একটি খবরে বলা হয়েছে - কলাবাগান থানায় ডাকাতি মামলা - ওসি বললেন তদন্তে প্রমাণ হলেই ছাত্রদলের সভাপতিকে গ্রেফতার করা হবে । তো সংঘর্ষের সময় ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ যারা মার খেলেন আহত হলেন আবার তাদের বিরুদ্ধেই বিভিন্ন মামলা হচ্ছে - তো আসলে ঘটনাটি কি ?
শওকত মাহমুদ : এতে করে প্রমাণ হচ্ছে যে ছাত্রদল সভাপতির উপর হামলায় সরকারের একটা ইন্ধন ছিল । কেননা পরিষ্কারভাবে দেখা গেছে যে পুলিশের সামনে ; তাদের নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে তারা ছাত্রদল সভাপতিকে আঘাত করেছে । এরপর পুলিশ বলছে আঘাতকারীকে খোঁজা হচ্ছে - কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে না । আর তখন কেন গ্রেফতার করা হয়নি সে প্রশ্নের জবাবে পুলিশ বলছে আমরা তখন তাকে চিনতে পারিনি । তো পুলিশের এ ধরনের বক্তব্য এবং আপনি যে ডাকাতি মামলা বিষয়ক শিরোনামটি তুলে ধরলেন এবং তাতে ছাত্রদল সভাপতিকে জড়ানোর কথাটি বল্লেন - তাতে আমার মনে হয় যে এতে আরো প্রমাণিত হচ্ছে যে সরকার ছাত্রদল সভাপতির উপর হামলার সাথে সরাসরি জড়িত ছিল এবং উল্টো তাকে গ্রেফতার করে তাকে হয়রানি করার একটি ষড়যন্ত্র হচ্ছে। যাতে করে ছাত্রদল সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সাথে সমঝোতার প্রতিবাদে যাতে বিরোধী দল কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারে । কারণ ছাত্ররা হচ্ছে আন্দোলনের একটা বড় শক্তি । তো আমার মনে হয় -বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের অনেক রাজনৈতিক সন্ত্রাস দেখেছি; ছাত্র সংঘর্ষ দেখেছি কিন্তু এবারের সংঘর্ষের যে নমুনা আমরা দেখলাম এবং সরকারের পক্ষ থেকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মীরা যে নির্লিপ্ততা দেখিয়েছে তা সত্যিই অবাক করার মতো । আমরা দেখেছি পুলিশের বেষ্টনীর মধ্যে ছাত্রদলের সভাপতির উপর হামলা করা হয়েছে। এখন পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ঐ ঘটনার সাথে জড়িত ছেলেটি এখন ভারতে পালিয়ে গেছে । অবশ্য এটি এক ধরনের প্রচারণা মাত্র। যাতে করে তাকে গ্রেফতারের ব্যাপারে আর কোনো অভিযান চালানো না হয়। আমার মনে হয় সেই আক্রমণকারী ছেলেটি সরকারের কোনো জায়গায় আত্মগোপন করে আছে । এবং এ বিষয়টি নিয়ে সরকার যতই পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করুক না কেন মানুষ কিন্তু পরিষ্কারভাবে বুঝে গেছে যে এটি সরকারের ষড়যন্ত্র ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

