কালো সোনা বা ব্ল্যাক গোল্ড হল কিছু মিশ্রিত তেজস্ক্রিয় খনিজ পদার্থ যেমন –জিরকন, ইলমেনাইট, রুটাইল, গার্নেট, ম্যাগনেটাইট, মোনাজাইট ইত্যাদি। কক্সবাজার সুবিশাল সমুদ্র সৈকতে রয়েছে অফুরন্ত কালো সোনা বা ব্ল্যাক গোল্ড। বঙ্গোপসাগরের কত তরঙ্গমালা যে ব্ল্যাক গোল্ড সমৃদ্ধ ওই সৈকতে আছড়ে পড়েছে, এর কোন হিসেব নেই। সরকার কয়েক কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল। হওয়ার মধ্যে হয়েছে কক্সবাজারের সৈকতের নিকটে আনবিক গবেষণা কেন্দ্রের ছোট্ট একটি ভবন।
কক্সবাজারের বিস্তৃত সমুদ্র সৈকতের প্রতি ধূলিকণাতেও ছড়ানো ছিটানো রয়েছে ওই মহামূল্যবান ব্ল্যাক গোল্ড। খালি চোখে তা শুধুই বালু। কিন্তু ওই বালু যে কত মূল্যবান রত্ন বুকে ধারণ করে রয়েছে, কে তার খোঁজ রাখে? কক্সবাজারের এই সুদীর্ঘ বালুকাবেলায় প্রাপ্ত খনিজ সম্পদের মধ্যে রয়েছে জিরকন, মোনাজাইট, ইলমেনাইট, রুটাইল ও ম্যাগনেটাইটসহ প্রায় ৮ ধরনের উপাদান। যা রত্নের চেয়ে মূল্যবান। উল্লেখ্য, অস্ট্রেলিয়ার সমুদ্র সৈকতে এ ধরনের ব্ল্যাক গোল্ডের পরিমাণ শতকরা মাত্র ৫ ভাগ। তাই নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় খনিজশিল্পে ব্ল্যাক গোল্ড তৃতীয়স্থানে। তাই রফতানি করে তারা বিদেশের চাহিদার ৯০ ভাগ পূরণ করে। আর আমাদের কক্সবাজার সৈকতের বালুতে ব্ল্যাক গোল্ড পরিমাণ শতকরা ১৫ ভাগ। অথচ আমরা যে তিমিরে ছিলাম, সেই তিমিরেই রয়ে গেছি।
২০০২ সালে ৮ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় এদেশের একটি সাময়িকী (সাপ্তাহিক ২০০০) এই ব্ল্যাক গোল্ড উপরে কভার স্টোরি করে। হেডিং ছিলঃ 'বিলিভ ইট অর নট'। 'এই বালুতে আছে ১৪৫ লাখ কোটি টাকারও বেশী সম্পদ।' পত্রিকাটিতে কক্সবাজারের কোন কোন স্থানের বালুতে কোন কোন খনিজ পদার্থ কী পরিমাণে মজুদ রয়েছে, তারও বিশদ বিবরণ তুলে ধরা হয়। যতদূর জানা যায় কক্সবাজারের প্রতিটি বালুকণার সাথে রয়েছেঃ
(১) রুটাইলঃ যা রঞ্জক পদার্থের কাঁচামাল, ওয়েল্ডিং রডের বহিরাবরণ ও টাইটেনিয়াম মেটাল হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
(২) ইলমেনাইটঃ টাইটেনিয়াম মেটাল তৈরিতে এর গুরুত্ব সর্বাধিক। টাইটেনিয়াম মেটাল লোহার চেয়ে ৪/৫ গুণ শক্ত অথচ লোহার চেয়ে অর্ধেক হালকা। বিভিন্ন যানবাহনের যন্ত্রাংশ এমনকি এ্যারোপেস্ননের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ তৈরিতেও এর চাহিদা বিশ্বব্যাপী।
(৩) লিউকক্সিনঃ এর কার্যকারিতা অনেকটাই রুটাইলের মত।
(৪) কায়ানাইটঃ একটি এ্যালুমিনিয়াম খনিজ।
(৫) গারনেটঃ এটি লোহা, এলুমিনিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ ও সিলিকা মিশ্রিত ধাতু। গারনেটের গহনার চাহিদা উন্নত বিশ্বে সমধিক।
(৬) মোনাজাইটঃ এটি একটি তেজষ্ক্রিয় খনিজ। পারমাণবিক চুলিস্নতে জ্বালানি হিসাবে তো বটেই, এমনকি এটমবোমার কাঁচামাল হিসাবেও এটি ব্যবহার হয়। তাছাড়া মোনাজাইট ব্যবহৃত হয়ে থাকে গ্যাসপস্নান্ট ও কালার টেলিভিশনেও।
(৭) ম্যাগনেটাইটঃ আকরিক লৌহ। বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রের চুম্বক তৈরীতে ব্যবহৃত হয়। তেজষ্ক্রিয় বিকরণের ঢাল হিসাবেও সর্বত্র এর প্রচুর চাহিদা।
(৮) জিরকনঃ এমন এক খনিজ যা সিরামিক কারখানায় ও গহনা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় জিরকন দিয়ে সিনথেটিক ডায়মন্ড তৈরী হচ্ছে। এই জিরকন দিয়ে তৈরি ১০০ গ্রাম কৃত্রিম হীরার দাম ২০০ ডলার। কক্সবাজারের এই বালু থেকে উপরোক্ত ৮ ধরনের খনিজ পদার্থ দেশীয় প্রযুক্তিতেই আহরণ করা হবেন এবং বিশ্বের বাজারে গ্রহণীয় করে তোলা সম্ভব বলে মনে করেন এ বিষয়ে আগ্রহীদের কেউ কেউ।
AUSIMM জার্নালে প্রকাশিত “Physical, Chemical and Mineralogical Investigations on Bangladesh Zircon” নামক এই পাবলিকেশনে দাবী করা হয়েছে বাংলাদেশে প্রাপ্ত জিরকনের বিশুদ্ধতা প্রায় ৯৫.৮৯ শতাংশ। খাঁদ হিসেবে যা আছে সেটাও বেশ দামী এক আকরিক, টাইটেনিয়াম অক্সাইড। তারা এক্সরে ডিফ্র্যাকশন এর সাহায্যে এই উপাত্ত পেয়েছেন যা নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। আনুমানিক হিসেবে বাংলাদেশের এই কোস্টাল অঞ্চলে প্রায় ১৬০ হাজার টন জিরকন, ৭০ হাজার টন রুটাইল, ১০২৬ হাজার টন ইলমেনাইট, ২২৫ হাজার টন গার্নেট, ১৭ হাজার টন মোনাজাইট ও প্রায় ৮১ হাজার টন ম্যাগনেটাইট মজুদ আছে।
সোনার বাংলায় সোনার খনি নেই। কিন্তু আমাদের যা আছে এটা সোনা থেকে মোটেই কম নয়। এ খাত থেকে শত-শত কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। বিজ্ঞানী ড. কুদরাত-এ-খুদা রেডিওএকটিভ মেটিরিয়াল মূল্যবান খনিজ সম্পদ রুটাইল, মেগনেটাইট, মোনাজাইট, গার্নেট, ইলমিনাইট এবং জিরোকোন 1950 সালে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে আবিষ্কার করেন। ষাটের দশকে আবিষ্কৃত হওয়া এ খনি, সকল সরকারের আমলে তাদের রহস্যময় নিরবতা শঙ্কাজনক। বাংলাদেশ পরমানু শক্তি কমিশনের নাম-কা-ওয়াস্তে একটি প্রকল্প চালু আছে এ খাতে, কিন্তু কোনোই গবেষণা নেই, সরকারী বরাদ্দ নেই তো গবেষণা করবে কি দিয়ে। আমরা আমাদের এই সম্পদকে অতল সাগরে বিলীন হয়ে যেতে দিতে পারিনা, পারিনা অন্য বৃহৎ কোন শক্তি এসে আমাদের এ সম্পদ লুটে নিয়ে যাক। আমাদের কিছু অন্তত করা উচিৎ। আশা করা যায় সরকার আশু পদক্ষেপ নেবেন এই ব্যাপারে, আমাদের সকলের-ই এটা কাম্য।
________________________________________
এটি শেয়ারকৃত লেখা। পেয়েছি ___
এখানে

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



