১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরকে ঘিরে জেনারেল জিয়াউর রহমান বিষয়ক অজানা কিছু তথ্য দিয়েছে আজকের প্রথম আলোর এক রিপোর্ট। ব্লগারদের জন্য রিপোর্টটি নিম্নে প্রদত্ত হলো:
১৯৭৫ নভেম্বর মার্কিন দলিল-৬
ডিএফআইয়ের মাধ্যমে জিয়ার শুভেচ্ছা
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের দুপুর। প্রথম প্রহরে জেনারেল জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন। তখনো সেনানিবাসে ‘সিপাই সিপাই ভাই ভাই অফিসারদের রক্ত চাই’ ধরনের ‘বিপ্লবী’ স্লোগান মিলিয়ে যায়নি। খালেদ মোশাররফ নিহত। পরিস্থিতি টালমাটাল। জিয়া এদিন সকালে ধারণ করা বেতার ভাষণে নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও সেনাপ্রধান হিসেবে ঘোষণা দেন। ওই দিন বিকেলেই অবশ্য তিনি উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদমর্যাদা আপাতত মেনে নেন। এ রকম একটি সময়ে বাংলাদেশ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল একটি বিদেশি মিশনে পৌঁছায়। এই প্রতিনিধিদলের প্রধান ছিলেন তত্কালীন এয়ার কমোডর (পরে এয়ার ভাইস মার্শাল) আমিনুল ইসলাম। তিনি তখন ডিএফআইয়ের পরিচালক।
১৯৭৫ সালে বর্তমান সামরিক প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের নাম ছিল ডিএফআই বা ডিরেক্টরেট অব ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এই সংস্থার পরিচালক পদে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার রউফ। তবে তাঁর বদলির আদেশও বহাল ছিল। ১৫ আগস্টের কাছাকাছি সময়ে ব্রিগেডিয়ার জামিলের ওই পদে যোগদান চূড়ান্ত ছিল। জামিল ১৫ আগস্ট ৩২ নম্বরের অভ্যুত্থান প্রতিহত করতে গিয়ে নিহত হন। ১৫ আগস্টের পরপরই খন্দকার মোশতাক সরকার ওই পদে এয়ার কমোডর আমিনুল ইসলামকে বসান।
এখানে লক্ষণীয়, তিন সদস্যের প্রতিনিধিদলে অপর দুজন ছিলেন কর্নেল উল্লাহ ও মেজর মোহসিন। কর্নেল উল্লাহ ছিলেন সংস্থার প্রধান প্রশাসক। পদমর্যাদায় ইসলাম ও উল্লাহর চেয়ে নিচে থাকলেও মেজর মোহসিনই ছিলেন প্রতিনিধিদলের মুখপাত্র। তিনি ছিলেন ডিএফআইয়ের বৈদেশিক মিশনগুলোর লিয়াজোঁ কর্মকর্তা। ধারণা করা চলে তিনি সেখানে কার্যত জিয়াউর রহমানের মুখপাত্র হিসেবেই যান।
মার্কিন দলিলগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায়, জিয়াউর রহমান ৭ নভেম্বর থেকে কোনো প্রকারের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই মার্কিন দূতাবাসের ওপর সর্বাত্মক নির্ভরশীলতা খুঁজতে উদ্যোগী হন। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে তিনি একমুহূর্ত নষ্ট করতে চাননি। তাই ৭ নভেম্বরেই তিনি প্রধানত যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মাধ্যমে চীন ও পাকিস্তানের মন জয় করতে দৃশ্যত নানামুখী ব্যবস্থা নেন।
ভারত ঠেকাও: মার্কিন দলিল অন্তত ত্রিমুখী উপায়ে মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে জিয়ার যোগাযোগ চেষ্টার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। প্রথমত, বোস্টারের সঙ্গে সামরিক গোয়েন্দা প্রতিনিধিদলের সাক্ষাত্। দ্বিতীয়ত জিয়াউর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে ৭ নভেম্বরেই ওই সময়ের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রসচিব নজরুল ইসলামকে (পররাষ্ট্রসচিব ফখরুদ্দিন আহমেদ সম্ভবত ছুটিতে ছিলেন) দিয়ে মার্কিন দূতাবাসের উপপ্রধান আরভিং জি. চেসলকে ডেকে নেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, কূটনীতিক বোস্টারকে ব্যক্তিগত শুভেচ্ছা কূটনৈতিক চ্যানেলে নয়, সামরিক গোয়েন্দাদের দিয়ে পৌঁছে দেওয়াটাকেই জিয়া সঠিক মনে করেছিলেন। পেশাদার কূটনীতিক নজরুল ইসলাম দুটি বার্তা পৌঁছান। প্রথমত, বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সমর্থন চায়। এটা পেলে ভারতীয় যেকোনো প্রচেষ্টা নস্যাত্ হবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের উদ্বেগ যেন মার্কিন প্রশাসন চীন ও পাকিস্তানের কাছে পৌঁছে দেয়।
আর পাকিস্তানকে জানিয়ে দেয় যে, তারা যেন বাংলাদেশের পক্ষে মুসলিম দেশগুলোরও সমর্থন আদায় করে। এ সময় নজরুল ইসলাম আরও মন্তব্য করেছিলেন, ‘পাকিস্তানবিরোধী ও ধর্মনিরপেক্ষ যে চেতনায় বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ শেষ হয়েছিল, আজ জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বস্তরের মধ্যে তার পুরোপুরি উল্টো চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তাঁরা জিয়াউর রহমান ও মোশতাক আহমদ উভয়ের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। তাঁদের মনোভাব স্পষ্টতই পাকিস্তানপন্থী, ইসলামপন্থী, মার্কিনপন্থী ও পাশ্চাত্যপন্থী। এ অবস্থায় সরকার ভারতীয় প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ও স্থানীয় নাশকতার আশঙ্কা করছে। তবে তিনি এও বলেন, ভারতের জনপ্রিয়তা নেই বলে নাশকতার ভয় ততটা নেই।’
জিয়াউর রহমান ভারতীয় জুজু কিংবা কোনো ধারণাগত ভারতীয় হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও পাকিস্তান এবং মুসলিম বিশ্বের কিছু দেশ অর্থাত্ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী আন্তর্জাতিক শক্তির কাছ থেকে সুবিধা আদায়ে দৃশ্যত সচেষ্ট ছিলেন। ৭ নভেম্বর সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেও তিনি ভারত ভীতিকে কাজে লাগান বলে অনেকে মনে করেন।
জেনারেল জিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে তোয়াজ করতে আরও এক লোককে কাজে লাগান। তিনি খুনি চক্রের বিশেষ আস্থাভাজন মাহবুবুল আলম চাষী। চাষী ৭ নভেম্বর সকালে সেনানিবাসে জিয়া, ওসমানী, তাহের প্রমুখের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন। তখন তিনি রাষ্ট্রপতির মুখ্য সচিব। চাষীর সঙ্গে ৭ নভেম্বরেই বোস্টারের সাক্ষাত্ বা কথাবার্তা হতে পারে। যার ইঙ্গিত কিসিঞ্জারের কাছে পাঠানো বোস্টারের ৮ নভেম্বরের এক তারবার্তায় রয়েছে।
কিসিঞ্জারের মধ্যস্থতা: লক্ষণীয় যে, ৭ নভেম্বর বোস্টার ও আরভিং চেসলের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান যে বার্তা পৌঁছান, তা কিন্তু জাদুমন্ত্রের মতো কাজ দেয়। হেনরি কিসিঞ্জার পরদিন ৮ নভেম্বর পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত স্যাক্সবির মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ভুট্টো (দেখুন, কিসিঞ্জার ও ভুট্টোর পছন্দ জিয়া, প্রথম আলো, ৪ নভেম্বর ২০০৯) ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী চ্যাবনের কাছে বাংলাদেশ সরকার প্রশ্নে দুটি চিঠি দেন। এই চিঠি অবশ্য দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে বরফ গলাতে সাহায্য করেছিল। হেনরি কিসিঞ্জার এ সময় অনেকটা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তিনি চ্যাবনকে লেখেন, আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যপূর্ণ খেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিরর্থক। আর বাংলাদেশকে তিনি জানিয়ে দেন, ভারতের সঙ্গে প্রীতিকর সম্পর্ক বজায় রাখাই তার জন্য সঠিক হবে। কিসিঞ্জারের এই দৃষ্টিভঙ্গি দৃশ্যত ভারতের মনঃপূত হয়। ৮ নভেম্বর দুপুরে দিল্লির মার্কিন দূতাবাসের উপপ্রধান (স্যাক্সবি অসুস্থ ছিলেন) কিসিঞ্জারের ওই চিঠি পররাষ্ট্রসচিবের কাছে হস্তান্তর করেন। উভয়ের কথোপকথন ওয়াশিংটনকে জানান স্যাক্সবি ওই দিনই। ‘ভারতের পররাষ্ট্রসচিব কেওয়াল সিং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বার্তার যথেষ্ট প্রশংসা করেছেন। ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার গুরুত্ব ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সম্পর্কে আমরা বাংলাদেশের নতুন নেতাদের যা বলেছি, তা খুবই সহায়ক হওয়া উচিত। মি. সিং বাংলাদেশের বিষয়ে বৈদেশিক সংশ্লিষ্টতা প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখ করেন এবং একমত হন যে, বাইরের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা মেটাতে সক্ষম থাকবে। ভারত মনে করে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি স্থিতিশীল হচ্ছে এবং জেনারেল জিয়া একজন বাস্তববাদী মানুষ। তাঁর নির্দিষ্ট কোনো শক্ত আদর্শিক অবস্থান নেই। ভারত সরকার সেখানে কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিষয়ে উদ্বেগ অনুভব করে। কারণ, সে ধরনের ঘটনা ভারতের হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে গুরুতর সংকট তৈরি করতে পারে। ৮ নভেম্বর কেওয়াল সিং আরও বলেন, ‘সেখানকার পরিস্থিতি গতকালের মতোই গঠনমূলক ও ভালোর দিকেই যাচ্ছে। ভারতের স্বার্থের হানি ঘটার মতো সমস্যা সৃষ্টির কারণ দেখা যায় না। কিন্তু নতুন সরকার যদি তীব্রভাবে সাম্প্রদায়িক রূপ নেয় কিংবা প্রচণ্ডভাবে ভারতবিরোধী হয়ে ওঠে, তা হলেই কেবল ‘ভারত সরকার তার সহযোগিতার মনোভাবে পরিবর্তন ঘটাতে পারে।’ এই বার্তা থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশ নিয়ে চ্যাবনের সঙ্গে কিসিঞ্জারের মধ্যে ওয়াশিংটনেও মতবিনিময় হয়েছিল। স্যাক্সবি লিখেছেন, ‘কেওয়াল সিং স্মরণ করেন, ওয়াশিংটনে তিনি চ্যাবনকে যেমনটা বলেছিলেন যে, বাংলাদেশের কেবল উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। ক্ষমতার ভারসাম্যের অর্থহীন খেলা তার এড়ানো উচিত। আপনাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর সেই কথাই এবারের চিঠিতে পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ভারতের পররাষ্ট্রসচিব এদিন এ কথাও বলেন, তাঁর এ কথা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই যে, জিয়াউর রহমান ভারতের ওই দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে সচেতন নন।’
এদিকে ৮ নভেম্বর ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত বোস্টার তাঁর উল্লিখিত তারবার্তায় কিসিঞ্জারকে যা কিছু অবহিত করেন, তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, বাংলাদেশ সরকার মার্কিন সরকারের মনোভাব জানতে অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছিল। বোস্টার লিখেছেন, ‘আমি ৮ নভেম্বর সকাল নয়টা ৩৫ মিনিটে রাষ্ট্রপতির মুখ্য সচিব চাষীকে টেলিফোন করি। তিনি দ্রুততার স্বার্থে টেলিফোনেই বার্তাটি আমার কাছ থেকে জেনে নেন। আমি জানতে চাইলাম, পরিস্থিতি কি শান্ত? তিনি বললেন, আমরা যখন গতকাল কথা বলেছি তার চেয়ে অনেক ভালো। চাষী বলেন, উসকানিমূলক বক্তব্য বা বিবৃতি দেওয়া থেকে নতুন দিল্লির বিরত থাকাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাতে বাংলাদেশের জনগণ বিরক্ত বোধ করে। তারা যা-ই বলুক, এখানে তার প্রভাব পড়বেই। বাংলাদেশ সরকার সে কারণেই গতকাল একটি বিবৃতি দিয়েছে যে, বাংলাদেশে যা-ই ঘটুক না কেন, তাতে বিদেশি নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তার কোনো সমস্যা হবে না। এই বিবৃতি দেওয়া হয়েছে কারণ, দিল্লি ও কলকাতার বেতার ভারতীয় মুখপাত্রের বরাতে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।’
বিকল টেলিফোন সেট সচল: ৯ নভেম্বরে বোস্টার পৃথক এক তারবার্তায় মার্কিন সরকারের মূল্যায়ন সম্পর্কে নির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। এতে বোস্টার লেখেন যে, “চাষী আমাদের মূল্যায়নের সঙ্গে একমত হয়েছেন। সে কারণে সংখ্যালঘুদের বিষয়ে ভারতীয়দের পুনরায় আশ্বস্ত করেছেন। বোস্টারের বর্ণনায়, আমি আজ একটা ৪৫ মিনিটে তাঁকে ফোন করি। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের কাছে তাঁর সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন এভাবে। ‘আপনাদের নেওয়া উদ্যোগ আমরা সমর্থন করি। অভ্যন্তরীণ ও বহিঃস্থ ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতার স্বার্থে পদক্ষেপ নেওয়ার যে প্রয়োজনীয়তা আপনারা গতকাল উল্লেখ করেছেন, আমরা তার সঙ্গে একমত। কার্যকরভাবে আমরা সংখ্যালঘু হিন্দু ও বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তায় ব্যবস্থা নিয়েছি। এসব পদক্ষেপের বিষয়ে আমরা এখানে ভারতীয় হাইকমিশন ও দিল্লিতে আমাদের হাইকমিশনের মাধ্যমে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। জেনারেল জিয়াউর রহমান অস্থায়ীভাবে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নিয়েই তাঁর একজন প্রতিনিধিকে ভারতীয় হাইকমিশনারের কাছে পাঠান। এর লক্ষ্য ছিল তাঁকে আশ্বস্ত করা যে, ঘটনাবলি একান্তভাবেই অভ্যন্তরীণ। আমাদের মহান প্রতিবেশীর সঙ্গে উদ্ভূত ঘটনাবলির প্রভাব কোনোভাবেই পড়বে না’।” এখানে দুটি দিক কৌতুকপ্রদ। জিয়া ৭ নভেম্বরে ভারতীয় হাইকমিশনার সমর সেনের কাছেও দূত পাঠিয়েছিলেন। তিনি দূতের মাধ্যমে ভারতকে ‘মহান প্রতিবেশী’ বলে বর্ণনা এবং এমনকি সৌহার্দ্য দেখাতে ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের কিছু বিকল ফোনসেট সচল করে দেন। টেলিফোন সেট ঠিক করে দেওয়ার মতো প্রসঙ্গও বোস্টারকে গুরুত্বের সঙ্গে জানিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতির মুখ্য সচিব চাষী। আর মার্কিন কূটনীতিকেরা ওই সময়ে বাংলাদেশে ভারতের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের কোনো নির্দিষ্ট রূপ কখনো খুঁজে পেয়েছেন বলে দাবি করেননি। যদিও জনগণের মধ্যে ওই রকম ধারণা ছিল। ৮ নভেম্বরে চাষী বোস্টারকে জানান, সমর সেন আজ দুপুরে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত্ করছেন। তিনি তাঁকে বলবেন যে হালুয়াঘাট সীমান্তে গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। হয়তো তা স্থানীয় বিষয়, কিন্তু তবুও তিনি তা সেনের নজরে আনবেন।
উল্লেখ্য, মাহবুবুল আলম চাষী এদিন প্রশ্নের জবাবে বোস্টারকে নিশ্চিত করেন যে, ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলিতে ‘রাজনীতি ছাড়াও একান্তভাবে ব্যক্তিগত রেষারেষি ও পুরোনো শত্রুতার শোধ নেওয়ার ঘটনাও ঘটে।’ সিপাহি বিদ্রোহের ঘটনায় নেতৃত্ব দানকারী সাবেক বিপ্লবী গণবাহিনীর সহ-অধিনায়ক হাসানুল হক ইনু ওই সময়ে সেনানিবাসে ১৩ অফিসার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সিপাহিদের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না বলে দাবি করেন। তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘খালেদ মোশাররফ, হুদা ও হায়দারকে হত্যায় সংশ্লিষ্ট এক বা একাধিক কর্মকর্তা সম্ভবত আজও বেঁচে আছেন। আমি ওই সব হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তদন্তের দাবি জানাই।’
ডিএফআই মিশন: ‘জিয়ার কাছ থেকে বার্তা’ শীর্ষক তারবার্তায় ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিস ইউজিন বোস্টার ৭ নভেম্বর লিখেছেন, “তখন দুপুর ১২টা ৪৫। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা বিভাগের উল্লিখিত তিনজন। তাঁরা বোস্টারকে জানালেন, ‘জেনারেল জিয়া আপনাকে তাঁর ব্যক্তিগত শুভেচ্ছা পৌঁছাতে বলেছেন। এবং তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে নিশ্চয়তা দিচ্ছেন যে, আমেরিকার সঙ্গে অতীতে বাংলাদেশের যে ভালো সম্পর্ক ছিল, তাতে কোনো পরিবর্তন আনা হবে না। উপরন্তু ওই সম্পর্কে আরও উন্নতি ঘটানো হবে। তিন সদস্যের ওই প্রতিনিধিদলের মুখপাত্র হিসেবে মেজর মোহসিন (তিনি জিয়াউর রহমানের আমলে মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক ছিলেন। ব্রিগেডিয়ার হিসেবে অবসর নেন) বলেন, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অধিকতর সহযোগিতা এবং সাহায্য আশা করে। জেনারেল জিয়া মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে এটা জানাতেও নির্দেশ দিয়েছেন যে, তিনি (জিয়া) দু-এক দিনের মধ্যেই রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে পারেন’।”
বোস্টার লিখেছেন, রাষ্ট্রদূত জবাবে তাদের বলেন, তিনি জেনারেল জিয়ার তরফে তাঁকে শুভেচ্ছা জানানোতে খুশি হয়েছেন। এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিষয়ে জিয়ার আশাবাদ শুনতে তিনি উদ্গ্রীব থাকবেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে জেনারেল জিয়ার ওই প্রীতিকর মনোভাব তাঁর সরকারকে জানিয়ে দেবেন। তিনি গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমরা কোনো অবস্থান নিইনি। তবে যতদূর সম্ভব আমরা সহায়তা দিতেই সচেষ্ট থাকব। আমাদের অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদানের রেকর্ড থেকেই তা স্পষ্ট।’
এ পর্যায়ে বোস্টার জিয়াকে ‘পুরোনা বন্ধু’ বলে উল্লেখ করেন। বোস্টারের ভাষায়, তিনি জেনারেল জিয়ার সঙ্গে সমঝোতার জন্য অপেক্ষা করবেন, যিনি তাঁর এক পুরোনো বন্ধু (হু ওয়াজ এ ওল্ড ফ্রেন্ড)।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত বোস্টারের প্রশ্নের জবাবে তাঁরা বলেন, ‘সোমবার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে অভ্যুত্থানের পর থেকে জেনারেল জিয়াকে নিরাপত্তা হেফাজতে রাখা হয়েছিল।’
বোস্টার লিখেছেন, জিয়ার প্রতিনিধিদলটি ৭ নভেম্বর তাঁকে বলেছে, রাত একটার দিকে যে লড়াই শুরু হয়েছিল, তা ছিল ব্যাপক। কিন্তু হতাহতের সংখ্যা কম। সংখ্যাটি হয়তো তিন বা তার চেয়ে কম হবে।
খালেদ মোশাররফ কোথায় কেমন আছেন জানতে চাইলে তাঁরা বোস্টারকে জানান, ‘তিনি তাঁদের কাস্টডিতেই ছিলেন।’ কিন্তু তাঁর বিষয়ে প্রতিনিধিদলের কেউই স্পষ্ট করেননি। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের কার্যকর দায়িত্বে জেনারেল জিয়া রয়েছেন কি না, জানতে চাইলে তাঁরা খুব স্পষ্ট উত্তর দেন। বলেন, তিনিই এখন চার্জে আছেন অর্থাত্ সরকার চালাচ্ছেন।
অনেকে মনে করেন, বোস্টারের বিবরণ সত্য হলে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থাকে রাজনৈতিক লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহারের ঘটনা সম্ভবত বাংলাদেশের ইতিহাসে জেনারেল জিয়ার হাতেই প্রথম ঘটে। এবং সে তারিখটি ছিল ৭ নভেম্বর।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

