somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

।।বিয়ে ও পরিবার প্রথা নিয়ে একপ্রস্থ।।

১২ ই ডিসেম্বর, ২০০৯ বিকাল ৫:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশে পরিবার প্রথার উন্মেষ এক মাইল ফলক। পরিবার প্রথা ঠিক কখন উদ্ভব হয়েছিল তা নিয়ে বিভিন্ন নৃতাত্বিক গবেষণায় মতবিরোধ থাকলেও সেই সুপ্রাচীন কাল থেকেই হয়ে আসছে সে কথা বলাই বাহুল্য। এ বক্তব্যের যথার্থতার প্রমাণ মেলে আমরা যদি খ্রীষ্ট পূর্বকার প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ, যেমন তাওরাত, বেদ, উপনিষদ ইত্যাদিতে বিয়ে সম্পর্কিত নিদেশমালায় আলোকপাত করি। এসব প্রতিটি গ্রন্থেই মানব সমাজে বিয়ে প্রথাকে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। উল্লেখ্য বিয়ে হচ্ছে পরিবার প্রথা উদ্ভবের মূল চাবিকাঠি। ধর্মগ্রন্থের নির্দেশনায় বিয়ের মাধ্যমে পরিবার প্রতিষ্ঠা সাধারণ্যের কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্যতা লাভ করা সহ পরিবার একটি সুসংহত সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।

মানব সমাজে বিয়ে কিংবা পরিবার প্রতিষ্ঠানের উদ্ভবের কারণগুলো হচ্ছে:
১। মানব সমাজে স্বেচ্ছাচার যৌন সম্পর্ককে নিয়ণ্ত্রিত করে শৃঙ্খলা আনয়ন করা।

২।সন্তান-সন্তুদের মাধ্যমে মানব জীবনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা সহ সন্তান-সন্তুদের পিতৃপরিচয় নিশ্চিত কর
৩। বংশগতির মাধ্যমে সহায়-সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা।

৪। সামাজিক জীব মানুষের একাকিত্ব দূর করা।

৫। মানুষের মাঝে মানবিক গুণাবলী যেমন স্নেহ, প্রেম-প্রীতি-ভালবাসা চর্চার সুযোগ করে দেওয়া।

মানব সভ্যতার বিকাশে বিয়ে কিংবা পরিবার প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও অধুনা, বিশেষত: তথাকথিত উন্নত বিশ্বে বিয়ে কিংবা পরিবার প্রথা ক্রমশ: যে অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে তা সামান্য পর্যবেক্ষণেই লক্ষণীয়। ইউরোপ-আমেরিকায় পরিবার প্রতিষ্ঠান বলতে গেলে ভেঙ্গেই পড়েছে। বিয়ের মাধ্যমে পরিবার গঠনের প্রচলন কিছুটা থাকলেও উচ্চহারে বিয়ে বিচ্ছেদের কারণে সেখানকার বেশীরভাগ পরিবারই আজ টেকসই নয়। সেখানকার মূলধারা সমাজে বিয়েপ্রথা প্রায় নেই বললেই চলে। বিয়ে বর্হিভূত 'লিভ টুগেদার' এখন সেখানকার সমাজে গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশী। দূভাগ্যের বিষয়, এই "লিভ টুগেদারের"-ও স্থায়িত্ব খুব বেশী নয়। সমাজের উপর এর প্রতিক্রিয়া ভয়াবহ। বিশেষ করে সন্তান-সন্ততি জন্মের পরে যদি বিয়ে বিচ্ছেদ কিংবা "লিভ টুগেদারে'র সম্পর্ক ভেঙ্গে যায় তাহলে বাচ্চা-কাচ্চাদের স্বাভাবিক মনোস্তাত্বিক বিকাশ হয় ব্যহত। রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ে যুক্তরাজ্যে প্রতিবন্ধী শিশুর হার বৃদ্ধির কার্যকারণ হিসেবে বিবাহ বিচ্ছেদ এবং 'লিভ টুগেদার' সম্পর্ক ভেঙ্গে পড়াকে দায়ী করা হয়েছে।উল্লেখ্য বিয়ে বিচ্ছেদ কিংবা 'লিভ টুগেদার' সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়া প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সন্তান-সন্ততিদের দায়িত্ব নিতে হয় মেয়েদেরকে। এ কারণে উন্নত বিশ্বে নি:সঙ্গ মা (single mother)- দের সংখ্যা নি:সঙ্গ বাবা(single father)-দের চেয়ে বেশী।

পরিবার প্রথা ক্রমশ: বিলুক্তির কারণে সমাজ ভারসাম্যতা হারাচ্ছে। মানুষের মাঝে বাড়ছে নি:সংগতা এবং মানুষ হারাচ্ছে মানবিক গুণাবলী চর্চার সুযোগ। তাই দেখা যায় উন্নত বিশ্বের জনগোষ্ঠির বৃদ্ধবয়সে শেষ আবাসস্থল হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রম।

বিয়ে কিংবা পরিবার প্রতিষ্ঠানের অবক্ষয়ের কারণ হিসেবে ভোগবাদি দর্শন প্রসূত মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতাকে চিহ্নিত করা যায়। ভোগবাদীসমাজের আওতায় চারপাশে অজস্র ভোগ্যপণ্যের হাতছানি। কর্পোরেট ব্যবসার বিঞ্জাপণী ছল চাতুরীতে মানব মনে সৃষ্টি হচ্ছে নানা পণ্যের কৃত্রিম চাহিদা। ভোগের মাঝেই মানুষ খুঁজতে চাচ্ছে সবধরণের সুখ। আর এই ভোগের জন্য প্রয়োজন আরো, আরো, আরো বেশী আয়। তাই উন্নত বিশ্বের নর-নারীরা স্ব স্ব ক্যারিয়ার নিয়ে বড় বেশী ব্যস্ত। এই ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ততার কারণে নর-নারী ক্রমশ: হয়ে পড়ছে সংসারবিমুখ। বিশেষত: নারীদের অনেকেই ক্যারিয়ার অগ্রগতি ব্যহত হবে বিবেচনা করে গর্ভে সন্তান ধারণে অনিচ্ছুক। কানাডা, স্ক্যানডেনেভিয়ান দেশগুলো সহ ইউরোপের বেশ কিছু দেশে জন্মহার নেগেটিভ হওয়ার কার্যকারণ এটিই।

পাশ্চাত্যের তুলনায় প্রাচ্যে, বিশেষত: বাংলাদেশের অবস্থা অনেক ভাল হলেও আশংকামুক্ত নয়। অর্থনৈতিক কারণে এখন আমাদের সমাজে একান্নবর্তী পরিবার বিলুপ্ত। যৌথ পরিবারও প্রায় বিলুপি্তর পথে। নির্মম হলেও সত্য, আজকাল অনেক ছেলে মেয়ে একক পরিবারে (Nuclear family) স্বাচ্ছ্যন্দ বোধ করে। অনেক যৌথ পরিবারেই বাপ-মাকে বোঝা হিসেবে চিহ্নিত হতে দেখা যায়। এ কারণে আমাদের দেশেও দু/চারটা বৃদ্ধাশ্রম গড়ে ওঠেছে এবং ভবিষ্যতে এর ব্যপ্তি যে আরো হবে তা বলাই বাহুল্য।

আমাদের সমাজেও বিবাহ বিচ্ছেদের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই আলামত সুখের নয়। বাংলাদেশে বিয়ে বিচ্ছেদের হার বৃদ্ধির অনেক আর্থ-সামাজিক অনেক কারণ রয়েছে। তবে মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্তের দম্পত্তিদের মাঝে 'ইগো'-র দ্বন্দ্বকে বিবাহ বিচ্ছেদের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। বিবাহ বিচ্ছেদের হার কেন বাড়ছে এবং তা নিয়ন্ত্রণে কি কি ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে সমাজবিঞ্জানীদের তা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চালাতে হবে। সেই সাথে সরকারী/বেসরকারী উদ্যোগে বিবাহ বিচ্ছেদ প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করার আন্দোলন চালাতে হবে।

পাশ্চাত্য সমাজের অধ:পতন থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। আসুন আমরা সবাই এ ব্যাপারে সচেতন হই। আমাদের পরিবার প্রতিষ্ঠান সুসংহত থাকুক। আমাদের মা-বাবারা থাকুক আমাদের সান্যিধ্যে, আমাদের ভালবাসা, শ্রদ্ধার প্রিয় মানুষ হিসেবে।




সর্বশেষ এডিট : ১২ ই ডিসেম্বর, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৪৫
৩৭টি মন্তব্য ৩৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×