somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ক্যালেন্ডার সংবাদ

১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ বিকাল ৪:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রতিটি নতুন বছরের আগমনের সাথে সাথে যেমন বিদায় নেয় অনেক কিছুই, তেমনি নতুন অনেক কিছুকেও আমরা জানাই স্বাগতম। এমনই একটি উপকরণ হচ্ছে-ক্যালেন্ডার। ক্যালেন্ডারের বাংলা নাম ‘বর্ষপঞ্জী’। কিন্তু ক্যালেন্ডার শব্দটিই এখন সব জায়গায় ব্যবহার করা হয়। এখন এটিকে আর ইংরেজি শব্দ হিসাবে মনেই হয় না । নতুন বছর এলে পুরনো ক্যালেন্ডারের বদলে সেখানে উঠে আসে নতুন-সুদৃশ্য ক্যালেন্ডার। ঘরের দেয়ালে, পড়বার টেবিলে কিংবা ডায়েরীর পাতায় অথবা পকেটে রাখা খুদে একটি কাগজের একপিঠে, কোথায় নেই ক্যালেন্ডার। সবাই চায় নতুন বছরে সুন্দর একটি ক্যালেন্ডারের মালিক হতে। কেউ ক্যালেন্ডার সংগ্রহ করেন দোকান থেকে কিনে, কেউ চেয়ে নেন পরিচিত কারও কাছ থেকে, কেউ দেয়ালে সাটেন দৈনিক পত্রিকার সরবরাহকৃত ক্যালেন্ডার, কেউ আবার ক্যালেন্ডার পান নানান প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এমনও দিন গেছে যখন হাতে লিখে তৈরি করতে হত ক্যালেন্ডার কিংবা দেয়ালে দাগ কেটে হিসাব রাখা হত দিনক্ষণের । কিন্তু এখন দিন বদলে গেছে, প্রযুক্তির উন্নয়নের ছোঁয়ায় ক্যালেন্ডার হয়ে উঠেছে ভীষণ সহজলভ্য, পৌছে গেছে সবার হাতে হাতে। তবে নিরীহদর্শন এই ক্যালেন্ডার, যেটি দেখে এখন আমরা অনায়াসে হিসাব করতে পারি দিনক্ষণ, সেই ক্যালেন্ডার তৈরির পিছনে রয়েছে অনেক ঘটনা, ভীষণ চমকপ্রদ সব ইতিহাস । যদি বেড়িয়ে আসতে চান ক্যালেন্ডারের সেই অজানা জগৎ থেকে, তা হলে আর দেরি না করে সঙ্গী হয়ে যান আমাদের।
‘ডেনিস’ নামে এক গণিতজ্ঞ ষষ্ঠ শতকে বাস করতেন রোমে। এই ভদ্রলোক ছিলেন এক আশ্রমের অধ্যক্ষও। আমাদের বর্তমান হিসাব মতে ৫২৫ সালে পোপ জন ডেনিস সাহেবকে ভবিষ্যতের সবগুলো ঈস্টার উৎসবের তারিখগুলো খুঁজে বের করতে বলেন। ডেনিস বসে গেলেন কাজে । হিসাব-নিকাশ করে, সূর্য আর চাঁদের অবস্থানগুলো পর্যবেক্ষণ করে ৫৩২ সাল এর পর থেকে তিনি ঈস্টার এর তারিখগুলোকে বের করতে লাগলেন। ক্যালেন্ডার প্রণয়নের পথে অনেকগুলো প্রচেষ্টার মধ্যে এটিও ছিল একটি, তবে বলাই বাহুল্য নানান ভুল-ভাল করেছিলেন ডেনিস।
বর্তমানে আমরা সবাই অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী সকলে যে ক্যালেন্ডারটি ব্যবহার করে তার নাম ‘গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডার’। ১৬ শতকের পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরী’র নামানুসারে এহেন নামকরণ। বিশ্বব্যাপী এই ক্যালেন্ডার এর জয়যাত্রা শুরু হয় ১৯৪৯ সালে, মাও-সে-তুং-এর ক্ষমতায় আরোহণের সময়কাল থেকে। তবে গ্রেগরী’র আগে এই কাজে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিলেন রোমান সম্রাট জুলিয়াস সীজার । ডেনিস এর ক্যালেন্ডারটিকে পরিমার্জন করে আধুনিক ক্যালেন্ডারে রুপান্তরিত করতে চেয়েছিলেন জুলিয়াস সীজার । তবে জুলিয়াস সীজার যে পদ্ধতিটি অনুসরণ করেছিলেন, সেটি কিন্তু তার নিজের নয়। পদ্ধতিটি তিনি ধার করেছিলেন প্রাচীন মিশরের নীল নদের তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষদের কাছ থেকে যারা কিনা ৪ হাজার বছর আগে থেকেই এক বিশেষ পদ্ধতিতে দিনক্ষণের হিসাব করত। অর্থাৎ আধুনিক ক্যালেন্ডার এর ধারণাটি নতুন হলেও ক্যালেন্ডার তৈরির প্রয়াস চলছিল অতি প্রাচীন কাল থেকেই।
তবে ক্যালেন্ডার তৈরিতে যত প্রয়াসই নেওয়া হোক না কেন, সবগুলোতেই বেরুতে লাগল নানান ত্র“টি। আর এর পিছনে মূল কারণ হচ্ছে যে এক বছরে দিনের সংখ্যা হচ্ছে ৩৬৫.২৪২১৯৯। এই খটখটে সংখ্যাটিকে আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া ক্যালেন্ডার তৈরির কাজে ব্যবহার করা যে ভীষণ কঠিন সেটি বলাই বাহুল্য, আর এই কারণেই হচ্ছিল ভুলত্র“টি । আবার বছরে বছরে সূর্যের ঘূর্ণনকালে ব্যবধান ঘটে ক'সেকেন্ডের, ক্যালেন্ডার তৈরির কাজটি হয় জটিলতর। যতদুর জানা যাই আজ থেকে প্রায় ত্রিশ হাজার বছর আগে ইউরোপ আর আফ্রিকার ক্রো-ম্যাগনন মানুষেরাই বিশ্বে প্রথম দিনক্ষণের হিসাব রাখবার চেষ্টা করে। তারা খেয়াল করেছিল যে চাঁদের বিভিন্ন অবস্থা এলোমেলোভাবে হয় না, পূর্ণিমা-অমাবস্যা ইত্যাদি নানান অবস্থা তৈরি হয় একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর, হিসাব মেনে । সে সময়ের মানুষেরা পাথরের গায়ে কিংবা জীবজন্তুর চওড়া হাড়ে খোদাই করে রাখতে লাগল তাদের পর্যবেক্ষণগুলো, পৃথিবীর প্রথম ক্যালেন্ডার সম্ভবত ছিল এটিই। প্যালিওলিথিক যুগের এক মানুষের খোদাই করা নানান চিহ্নে চিহ্নিত চাঁদের বিভিন্ন অবস্থার এক চিত্র পাওয়া গেছে ফ্রান্সের দরগনে নদীর তীরে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে হাড়ের উপর খোদাই করা ওই ফলকটির বয়স কম করে হলেও তেরো হাজার বছর। এসব হিসাব নিকাশের দরকার ছিল কী? সম্ভবত, পূর্ণিমার দিনে শিকার করা কিংবা অন্য গোত্রের মানুষকে আক্রমণ করবার সুবিধা হত বলে, কবে পূর্ণিমা হবে জানলে সুবিধা হত । অথবা কবে শীত আসবে, কখন থেকে তৈরি হতে হবে শীতকালের তীব্র ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচবার জন্য, সেসব জানবার জন্যই দিন-ক্ষণের হিসাব রাখাটি হয়ে উঠেছিল দরকারি। তবে শুধু চাঁদ নয়, কখন একদল বিশেষ জাতের পাখি উড়ে যাচ্ছে দক্ষিণে, সেটি দেখে বোঝা যেত শীতের আগমনধ্বনি। বিশেষ বিশেষ তারা পর্যবেক্ষণ করেও আন্দাজ করা হত সময়ের । খ্রিস্টপূর্ব ৮ম শতকের গ্রীক কবি হেসোইডের কবিতাতেও খোঁজ পাওয়া গেছে এমনতর ক্যালেন্ডারের। প্রকৃতির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে বছরের কিংবা ঋতুর হিসাব করবার সা¤প্রতিক উদাহরণও পাওয় যায়। মিসিসিপি নদীর তীরবর্তী মানুষেরা বিভিন্ন ঋতুর নামকরণ করে হরিণ মাস, স্ট্রবেরী মাস ইত্যাদি নামে। কখন কোন পশুর প্রজনন কাল, কোন ফল কখন ধরে এসবের ভিত্তিতেই এমন নামের উদ্ভব। মাদাগাসকারের মালাগাছি অধিবাসীরাও যেমন তাদের ঋতুগুলোর নামকরণ করেছে ‘তেতুল আর শিম পাকানো মাস, দড়ি পঁচানো বৃষ্টি’ এমন সব আজব নামে । তবে এতকিছুর পরও প্রাচীনকালে চাঁদের উপর নির্ভর করেই দিনক্ষণের হিসাব করাটা ছিল সবচে বেশি প্রচলিত, সবচে জনপ্রিয়। এসবের মধ্যে দিয়ে অনেক গোত্রের মানুষের কাছে চাঁদ হয়ে ওঠে রীতিমত পূজনীয়-দেবী। তবে চান্দ্র মাস (প্রায় ২৯.৫ দিন) এর ভিত্তিতে বছর হিসাব করলে সৌর বছরের চেয়ে এগারো দিন কম হয়ে যায়, দেখা যায় সমস্যা। এসব সমস্যা দূর করবার চেষ্টাও করা হয়েছে নানান সময়ে । খ্রিস্টপূর্ব ২৩৫৭ সালে চীনা সম্রাট ইয়াও নিয়ম করেছিলেন যে চান্দ্র মাস এবং সৌর বছরের ব্যবধান কমাতে প্রতি পাঁচ বছরের সাথে যোগ করা হবে বাড়তি দু’মাস । পরে ঠিক করা হয় যে প্রতি উনিশ বছরের সাথে যোগ হবে বাড়তি সাত মাস। খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতকে ব্যাবিলনীয় আর গ্রীক সভ্যতাতেও অনুরুপ পদ্ধতি চালূ হয়। জ্যোর্তিবিজ্ঞানী ‘মেটোন’ এর নামানুসারে ওই পদ্ধতির নামকরণ হয় ‘মেটোনিক’ ।
তবে বাড়তি সময় যোগ করেও পার পাওয়া গেল না। দেখা দিতে লাগল হেরফের । আমেরিকার মায়া (যারা পরবর্তীতে তারিখ গণনার বিস্তারিত পদ্ধতির প্রবর্তন করেন) এবং অ্যাজটেক সভ্যতার লোকেরা এসব বাড়তি সময় যোগ করবার প্রথা বাতিল করে সরাসরি ৩৬৫ দিনকে সৌর বছর ধরে হিসাব আরম্ভ করে। ক্যালেন্ডারের অগ্রযাত্রায় এটি ছিল বিশাল এক অগ্রগতি। এছাড়া প্রায় ৪ হাজার বছর আগে ইংল্যান্ডের সলসব্যারী প্লেইনে স্টোনহেজ এর রহস্যঘেরা পাথরের চাঁইগুলো দিয়ে সূর্যের দক্ষিণানয়ন হিসাব করে বছরের হিসাব করা হয়, যার ব্যাপ্তি ছিল ৩৬৫ দিন কয়েক ঘন্টা। অত প্রাচীনকালে এমন নিখুত হিসাব-নিকাশ চমকপ্রদ তো বটেই, রীতিমত রহস্যময়। তবে ৩৬৫ দিনকে সৌর বছর হিসাবে প্রথম ধারণাটির মালিক ছিল মিশরীয় সভ্যতার অধিবাসী। এ ব্যাপারে তারাই সবার অগ্রজ।
মিশরীয় এ সময় সিরিয়াস এবং লুব্ধক নক্ষত্রের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে কখন নীল নদে বান ডাকবে সেই হিসাবও বের করতে সক্ষম হয়েছিল । কিন্তু এক্ষেত্রে তারা দেখতে পেল যে এভাবে হিসাবে প্রতিবছর ছ’ঘন্টা করে কম হচ্ছে, অর্থাৎ এই পদ্ধতিতে প্রতি চার বছরে পুরো একটি দিন গায়েব হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ সমস্যা কিন্তু থেকেই গেল ।
লোকমুখে এও প্রচলিত যে রোমের কিংবদন্তীর রাজা রমিউলাসও নাকি মাত্র দশটি চান্দ্র মাসের সমন্বয়ে ক্যালেন্ডার প্রণয়ন করেন। কবি অভিডের মতে এমন করবার কারণ নাকি হাতের আঙুল যেহেতু দশটি তাই গুনবার সুবিধার জন্য মাসও দশটি। কিন্তু কারণ যাই হোক এসবের ফলে বছর থেকে কমে গেল ৬১ দিন। খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ সাল নাগাদ নুমা পমপিলিয়াস ৩৫৪ দিনের বছর ঘোষণা করেন । তবে রোমানদের আবার জোড় সংখ্যার উপর কুসংস্কার ছিল বলে ৩৫৪ এর সাথে একদিন যোগ করে করা হয় ৩৫৫ দিন।
খ্রিস্টপূর্ব ৪৮ সালের অক্টোবর মাসে জুলিয়াস সীজারের সময়ে হঠাৎ করে পাল্টে গেল সব। আর এর পেছনে রয়েছে একটি প্রেমের গল্প। এ সময় ২১ বছর বয়সী ক্লিওপেট্রা আর ৫২ বছর বয়সী সীজার কাছাকাছি আসেন । তবে ইতিমধ্যেই তৎকালীন জ্ঞানকেন্দ্র ‘আলেকজান্ড্রিয়া'তে নানান মনীষীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এক বছরের ব্যাপ্তিকাল এসে দাড়িয়েছে প্রকৃত এক বছরের সময়কালের খুবই কাছাকাছি। ব্যবধান ছিল মাত্র মিনিট ছয়েকের। খ্রিস্টপূর্ব ৪৭ সালে ক্লিওপেট্রা আর সীজার মিলে মিশরীয় ক্যালেন্ডার চালু করেন রোমে। অবশ্য ততদিনে রোমে প্রচলিত ক্যালেন্ডারের দিক থেকে তারা পিছিয়ে গেছে ৯০ দিন। এসব সমস্যা দুর করতে জুলিয়াস সীজার বছর নির্ধারণ করে দিলেন ৩৬৫ দিনে, আর প্রতি চার বছর পর পর একদিন বর্ধিত করবার অর্থাৎ লীপ ইয়ারেরও প্রচলন ঘটালেন তখনই। ঠিক করা হলো মাসগুলো হবে ত্রিশ বা একত্রিশ দিনে, আর ফেব্র“য়ারী মাস হবে উনত্রিশ দিনে, খালি লীপ ইয়ারগুলোতে ফেব্র“য়ারী মাসে থাকবে ত্রিশ দিন । অবশ্য এর ফলেও সব গোলমাল মেটেনি, প্রতি বছরে রয়ে যাচ্ছে এগারো মিনিটের হেরফের। দিন ক্ষণের হিসাবকে ঠিক করবার জন্য আরও একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পিছিয়ে পড়া দিনগুলোকে নতুন ক্যালেন্ডারের সাথে সংযুক্ত করবার জন্য যোগ করলেন বাড়তি ৯০ দিন । অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ সালে বছর হয়েছিল ৪৪৫ দিনে।
এরপর আবারও রোমে ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন ঘটান সম্রাট ‘কনস্টানটাইন’, সীজারের তিনশো বছর পর। এ সময় ক্যালেন্ডারে বিজ্ঞানের সাথে যোগ হয় ধর্মীয় অনুভুতি, ক্যালেন্ডার হয়ে ওঠে চার্চের সম্পত্তি। ফলে এর বদল ঘটানো হয়ে ওঠে কঠিনতর, যদিও তখন পর্যন্ত প্রতিবছরই ঘটছিল ১১ মিনিট ১৪ সেকেন্ডের গরমিল । এর পরবর্তী সময়ে পট পরিবর্তন ঘটে, জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র চলে আসে পূর্বের ক্রমবর্ধমান মুসলিম সাম্রাজ্যে। আবু আবদাল্লাহ মোহাম্মদ ইবন যাবীর আল-বাকানী নামক একজন মুসলিম পণ্ডিত ক্যালেন্ডারকে নিয়ে আসেন শুদ্ধতার অনেক কাছাকাছি, প্রতি বছরে গরমিল থাকে মাত্র ২২ সেকেন্ডের। সময়কালটি ছিল ৯ম শতক । এরও দু'শো বছর পর পারস্যের কবি এবং বিজ্ঞানী ওমর খৈয়াম এই অগ্রগতিকে আরও ত্বরান্বিত করেন । তবে এই ক্যালেন্ডারের পাশাপাশি চান্দ্র মাসের হিসাবও চালু থাকে মুসলিম সমাজে। একাদশ-দ্বাদশ পর্যন্ত ইউরোপিয়ানদের কাছে এই খবর পৌছায়নি। কিন্তু এরপর তারা বুঝতে পারেন আরব দেশগুলোতে প্রচলিত ক্যালেন্ডারই অপেক্ষাকৃত সঠিক। কিন্তু চার্চের ভয়ে নিজেদের ক্যালেন্ডার পরিবর্তনের কথা বলতেও ভয় পাচ্ছিলেন ইউরোপের পণ্ডিতেরা। অবশ্য সবাই তো আর ভয় পাননি। ইংরেজ যাজক রজার বেকন ১২৬৫ সালে পোপ ক্লেমেটের কথামত ক্যালেন্ডারে পরিবর্তন আনবার কথা লিখিত আকারে সুপারিশ করেন। এ জন্য তাকে রোষানলে পড়তে হয়, যেতে হয় জেলে । এরও তিনশো বছর পর চার্চ স্বীকার করে যে তাদের ক্যালেন্ডারের ত্র“টি রয়েছে । ১৫৮২ সালের ২৪ ফেব্র“য়ারী পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরী ক্যালেন্ডারে পরিবর্তন ঘটাবার কাজ আরম্ভ করেন । গরমিল কমাতে ওই বছরের অক্টোবর মাস থেকে কেটে নেওয়া হয় দশ দিন। এ নিয়ে ঘটেছিল ব্যাপক গোলযোগ। সুদের হিসাব, বেতনের হিসাব এসব ব্যাপারে ঝামেলা হয়েছিল বিস্তর। তবে সবাই কিন্তু এই নিয়ম মেনে নেয়নি । ফলে কোন দেশে প্রচলিত থাকে সনাতন পদ্ধতি, কেউ গ্রহণ করে আধুনিক পদ্ধতি। গরমিল মেটাতে নানান বদল ঘটেছে নানা জায়গায় । ব্রিটেনে ক্যালেন্ডারের বদল ঘটে ১৭৫১ সালে । তাদের জীবন থেকেও হারিয়ে যায় এগারো দিন। ১৯১৮ সালে বলশেডিকের শাসনামলে হিসাব মেলাবার জন্য কেটে নেওয়া হয় তেরো দিন। এখন পর্যন্ত প্রচলিত রয়েছে এই গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডারই। অবশ্য এখনও এই প্রচলিত ক্যালেন্ডারে রয়ে গেছে কিছু গরমিল । ইতিমধ্যেই আমরা পিছিয়ে গেছি প্রায় তিনঘন্টা। হিসাব করে দেখা গেছে ৪৯০৯ সালে আমরা পিছিয়ে পড়ব পুরো একটি দিন। তবে অত পরের কথা এখন মনে হয় না ভাবলেও চলে ।
বাংলাদেশে গ্রেগরীয়ান (ইংরেজি সন হিসাবে পরিচিত), হিজরি এবং বাংলা এই তিনটি সনই প্রচলিত। খ্রিস্টাব্দের সূচনা যিশুখ্রিস্টের জন্ম থেকে, হিজরি সনের সূচনা হযরত মুহম্মদ (সা:) এর মদিনা হিজরতের সময় (৬২২ খ্রিস্টাব্দ) থেকে এবং এর প্রচলন ঘটান হযরত ওমর (রা:), সময়টা ছিল ৬৩৯ খ্রিস্টাব্দ। আমাদের এই অঞ্চলে গুপ্ত শাসনামলে (৩১৯-৫১০ খ্রিস্টাব্দ) প্রচলিত ছিল ‘গুপ্ত সংবৎ’ । পালযুগে (৭৫০ থেকে ১১৫০ খ্রিস্টাব্দ) আবারও পরিবর্তন হয় ক্যালেন্ডার। সেন রাজবংশের আমলে চালু ছিল ‘শকাব্দ’ এবং ‘লক্ষণাব্দ’। ১২০১ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজি বাংলাদেশ জয় করবার পর এ অঞ্চলে গুরুত্ব বৃদ্ধি পায় হিজরি সনের। মোগল সম্রাট আকবর (১৫৪২-১৬০৫) ফসল এর সময় খাজনা আদায়ে সুবিধার জন্য ঋতুর উপর ভিত্তি করে জ্যোতির্বিদ আমির শিরাজীকে তৈরি করতে বলেন একটি বিশেষ ক্যালেন্ডার । ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দে চালু এই সনই হচ্ছে বাংলা সন। ইংরেজরা এ অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপনের পর থেকে এখানে প্রচলিত হয় ইংরেজি বা গ্রেগরীয়ান সন। বাংলা সন তারিখের উপর স্থিতি আনবার জন্য পাকিস্তান আমলে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র নেতৃত্বে বাংলা একাডেমী গঠন করে পাঁচ সদস্যের এক কমিটি। ১৯৬৬ সালের ১৭ ফেব্র“য়ারী ওই কমিটি পেশ করে প্রস্তাব। বলা হয় বৈশাখ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত মাসগুলো হবে ৩১ দিনে আর আশ্বিন থেকে চৈত্র পর্যন্ত মাসগুলো হবে ৩০ দিনে । লীপইয়ার হবে চৈত্র মাসে ৩১ দিনে। যেই সনগুলো ভাগ করা যাবে ৪ দিয়ে সেটিকেই বিবেচনা করা হবে লীপ ইয়ার বা অধিবর্ষ হিসাবে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত বাংলা সনের এই নিয়মই চালু রয়েছে বাংলাদেশে।
নিরীহদর্শন এই ক্যালেন্ডারকে দেখে কে বলবে যে এর পেটে লুকানো আছে এত কান্ড।




তথ্যসূত্র:সংগ্রহীত

১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×