somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মানুষ খুন করে কেন?

০৭ ই অক্টোবর, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

লস অ্যাঞ্জেলসের সিনেটর রবার্ট কেনেডিকে হত্যার পরের দিনের ঘটনা। বোস্টনের মাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালে অল্প বয়সী এক তরুণ এসে বলল,‘আমার কী হয়েছে জানি না। আমার বাবাকে খুন করার জন্যে আমার হাত নিশপিশ করছে! আমি জানি এটা উচিত নয়। জানি, এটা অপরাধ। বাবাকে খুন করার ইচ্ছাও নেই আমার। তবুও কী যেন হয়েছে আমার, হঠাৎ কাউকে খুন করতে পারি। আমাকে ভাল কিছু ওষুধ দিতে পারেন?’
ভাগ্যিস তরুণটি সঠিক জায়গায় এসেছিল। ডাক্তাররা সাথে সাথে তাকে হাসপাতালের সদ্য তৈরি একটি সেকশনে স্থানান্তরিত করল। এই নতুন সেকশনে মানুষের ‘হিংসাত্মক ও ধ্বংসাত্মক’ আচরণের চিকিৎসা করা হয়। চিকিৎসা শাস্ত্রের এটি একটি নতুন শাখা। নাম সাইকোবায়োলজি। এই বিভাগের মূল উদ্দেশ্য কেন মানুষ ধ্বংসাত্মক কাজ করে তার কারণ নির্ণয় করা।
পরীক্ষা করে দেখা গেছে একজন ব্যক্তির খুনী মনোভাব মূলত তিনটি মানসিকতার সংমিশ্রণ। প্রথমত বিদ্বেষ, দ্বিতীয়ত আক্রমণের ইচ্ছা এবং তৃতীয়ত ব্যর্থতা বা প্রবল নেশা। আর্থিক বা সামাজিক দিক দিয়ে পর্যুদস্ত একটা ব্যর্থ পরিবারে একই ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা কয়েকটি ছেলেমেয়ের মানসিকতা কিন্তু এক রকম হবে না। হতাশার সাথে দেখা যাবে কেউ কেউ হিংস্র আবার কেউ বা নমনীয়। বস্তী এলাকায় বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষ আর্থিক, মানসিক এবং সামাজিক দিক দিয়ে একেকটা ব্যর্থতার প্রতিমূর্তি। তবু তাদের সবাই হিংস্র নয়। সকলের মধ্যে খুনী মনোবৃত্তি নেই। এমনকী বিশৃঙ্খল একটি মিছিলে দেখা যায় মাত্র কয়েকজনই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে।
কিন্তু মুশকিল হলো, এই হিংস্রতা ও খুনী মনোবৃত্তির সংজ্ঞা দেওয়া। প্রথমত, খুনীর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে আমরা বলতে পারি, অমুক ব্যক্তিটি রাগী এবং হিংস্র। এই হিংস্রতা পেয়েছে সে পৈতৃক সূত্রে। পৈতৃক সূত্রে সে হিংস্রতা পেলেও অন্যরা তা পেল না কেন দ্বিতীয়ত, সামাজিক এবং মানসিক পরিবেশ তাকে হিংস্র করেছে। তাই যদি করে থাকে তা হলে ওই একই সমাজ ব্যবস্থায় আর সকলে খুনী নয় কেন? খুনী মনোবৃত্তির মূল কারণ যাই হোক না কেন, মোটামুটি এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে খুন করবার কারণ এবং এই মনোবৃত্তি দূরীকরণের একটাই স্থান এবং তা হলো মস্তিষ্ক। মস্তিষ্কই মানুষকে সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে পরিচালিত করে। মানুষের মস্তিষ্কের দুটি স্তর রয়েছে। উপরের স্তরে আছে বিবেক, যুক্তি এবং যুক্তি বিচারের ক্ষমতা। নীচের স্তরে থাকে রাগ, ঘৃণা, বিদ্বেষ, হিংস্রতা এবং সর্বোপরী খুনী মনোবৃত্তি।
অনেক বানরকে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, রেডিও সিগন্যাল বা অন্য কোন ভাবে মস্তিষ্কের এই নীচের স্তরকে উত্তেজিত করলে নেহাত শান্তিপ্রিয় বানরও মুহূর্তের মধ্যে হিংস্র হয়ে উঠছে। এবং পাল্টা আক্রমণ করে বসছে। আবার আক্রমণের মাঝে সুইচ টিপলে পুরোপুরি শান্ত হয়ে যাচ্ছে বানরটি! একই ভাবে ষাঁড়ের মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে তেড়ে আসা ষাঁড়কেও মাঝপথে থামিয়ে দেওয়া গেছে। এতে একটি জিনিস বেশ পরিষ্কার হয়, মস্তিষ্কের হিংসাত্মক অংশগুলোকে উত্তেজিত করলে প্রাণী হিংস্র হয়ে ওঠে। আবার অনুত্তেজিত অবস্থায় সেটাই শান্তিপ্রিয় থাকে। মানুষের মস্তিষ্কের গঠন বানর বা ষাঁড়ের চেয়ে আলাদা। মানুষের মস্তিষ্কের উপরের স্তর সব সময় নীচের হিংস্র স্তরটিকে প্রাকৃতিক নিয়মে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু যাদের উপরের স্তর সঠিক ভাবে নীচের স্তরকে নিয়স্ত্রণ করতে পারে না, তারাই সাধারণত পার্থিব যাবতীয় অকাজ-কুকাজ করে থাকে। অর্থাৎ স্বল্প ক্ষমতার মস্তিষ্কধারীরাই খুন, জখম, মারপিট, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি ইত্যাদি করে। মস্তিষ্কের এই নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা পুরুষ বা নারী উভয়ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হতে পারে।
এ ধরনের মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিরা সাধারণত অলৌকিক কল্পনাপ্রবণ হয়। সামান্য সেলফ ডিসিপ্লিন সম্পন্ন। জুয়ার দিকে এদের ঝোঁক প্রচুর, মদ খেতে ভালবাসে, সেই সাথে ভালবাসে নারী সঙ্গ। অবশ্য নারীকে ভালবাসে ভালবাসার খাতিরে নয়। নারীকে ভালবাসে শুধুমাত্র যৌন ইচ্ছা চরিতার্থের জন্য। ফাইটিং জাতীয় ছবিও এদের খুব প্রিয়। আরও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, খুনী মনোবৃত্তি সম্পন্ন ব্যক্তিরা সাধারণত নিঃসঙ্গ, আত্মকেন্দ্রিক এবং উচ্চাভিলাষী। সর্বদা তাদের ইচ্ছা কিছু একটা করে ‘কেউকেটা’ বা ‘আমিই অমুক হওয়া’। এই ‘কিছু একটা’ করতে যেয়ে তারা বিখ্যাত ব্যক্তি স্বনামধন্য কাউকে বিনা কারনে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতে শুরু করে। প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থাৎ শত্র“। শত্র“তার যবনিকা হলো নিধন। অবশেষে এই যুক্তির বশবর্তী হয়ে আত্মতৃপ্তি, উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ এবং প্রতিদ্বন্দ্বীকে সরানোর জন্য হত্যা করে বসে তারা। এই খুনী মনোবৃত্তি ভাবাপন্ন ব্যক্তিরা কখনোই প্রতিযোগিতায় যেতে পছন্দ করে না।
এরপর আসে মানসিক অসুস্থতা। মানসিক অসুস্থতা এবং মস্তিষ্কের অসুস্থতাও অনেক সময় খুনী মনোবৃত্তি গঠন করতে সাহায্য করে। যেমন আমেরিকার টেক্সাসের সেই নাবিকটির কথাই ধরা যাক। নাবিকটি একটি রাইফেল হাতে উঠল স্কুলের ছাদে। তারপর একের পর এক গুলি করে হত্যা করে পথচারীদের। পরে দেখা গেছে তার মস্তিষ্কের ভিতর রয়েছে বিরাট একটি টিউমার। এই টিউমার দ্বারা সৃষ্ট অহেতুক বিদ্যুৎ তরঙ্গই তার খুনী মনোবৃত্তিকে জাগিয়ে তুলেছে।
টেক্সাসের ওই খুনী নাবিকের মত মানসিক অসুস্থতা সম্পন্ন বা মস্তিষ্কে আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তি আমাদের সমাজেও প্রচুর রয়েছে। মাঝে মাঝেই দেখা যায়, গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে একজন, এমন সময় দ্বিতীয় আরেকজন ওভারটেক করল তাকে। ব্যস অমনি খেপে গেল সে। প্রতিযোগিতায় নামল। একের পর এক অ্যাকসিডেন্ট হচ্ছে, পথচারী গাড়ি চাপা পড়ছে সেদিকে খেয়াল নেই । তার একমাত্র লক্ষ্য দ্বিতীয় গাড়িটির সাথে পাল্লা দেওয়া। হয়তো ওভারটেক করবার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় গাড়িটি জোরে চালাচ্ছে না, হয়তো কাজ আছে বা সময় নেই তার। কিন্তু ওসব যুক্তিতে কখনোই সাড়া দেবে না প্রথম গাড়ি চালক। এমন করে তিলে তিলে যুক্তি, বিবেক, সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান লোপ পাবে তার মন থেকে। শেষে মস্তিষ্কের উপরের স্তর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে নীচের স্তরের। তখনই খুন করবার মত মানসিকতা গড়ে উঠবে তার মস্তিষ্কে।
৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×