somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এন্ডিস পর্বত মালার বাঁকে বাঁকে - ১৩তম পর্ব

২০ শে এপ্রিল, ২০১৭ সকাল ১০:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আবারও অনিশ্চয়তা! কুফা যেন পিছু ছাড়ছে না কিছুতেই। একদিনে এত ঝামেলা সহ্য করার জন্যে চাই বায়োনিক শরীর! মাছে ভাতে বাঙ্গালীর শরীর এমন বিরামহীন হাঙ্গামার জন্যে মোটেও তৈরি নয়, এ সহজ সত্যটা আগেই বোধহয় বুঝা উচিৎ ছিল। অস্থিরতা ধীরে ধীরে হতাশায় পরিণত হল। হাতের লাগেজটা মাটিতে বিছিয়ে জিন্দা-লাশ হয়ে বসে পরলাম খোলা আকাশের নীচে। সূর্যটা বিদায় নিয়েছে অনেকক্ষণ হল। একদিকে হায়েনার মত এন্ডিসের বিশাল চূড়া, বিপরীত দিকে লাখ লাখ নিয়ন বাতির রহস্যময় লা পাস নগরী। এ যেন কল্পরাজ্যের স্বপ্ন-পূরীর মত, চোখে দেখা যায় কিন্তু কাছে যাওয়ার উপায় নেই! যমজ বাসটাকে দেখা গেল বেশ কিছুক্ষণ পর। ক’জন যাত্রী উঠিয়ে ওটাও চলে গেল একই কথা বলে। মহিলাদের প্রাধান্যের কারণে আমার জায়গা হলোনা এ যাত্রায়। তীর্থের কাকের মত বসে রইলাম পরবর্তী বাসের আশায়। প্রায় ৪০ মিনিট পর থামল দ্বিতীয় বাসটা। এবার মিস হলে হয়ত সাড়াটা রাত এখানেই কাটাতে হতে পারে, তাই পরি মরি করে উঠে পরলাম। বসার জায়গা নেই, গাদাগাদি করে কোন রকমে দাড়িয়ে রইলাম লাগেজটা হাতে নিয়ে। যে সমস্যার কথা ভেবে এতক্ষণ উৎকণ্ঠিত ছিলাম এসে গেল সেই মহেন্দ্রক্ষণ! বাস কন্ডাক্টর জানতে চাইল, কোথায় যাচ্ছি আমরা? একজন আরেকজনের দিকে তাকাই, কিন্তু কারও মুখে কোন উত্তর পাওয়া গেলনা। সাহস করে আমিই বললাম, সানফ্রানসিসকো প্লাজা! ট্যুর গাইডের মুখে উচ্চারিত নামটা মাথায় গেঁথে গিয়েছিল। সময় মত মনে করতে পারায় সহযাত্রীরা প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে। ভাড়া পরিশোধ করতে হল ডলারে। এক ডলার সমান কত বলিভিয়ানো আর কতই বা গন্তব্য-স্থলের ভাড়া তার কোন ধারণা না থাকায় ৫ ডলার নোটের সবটাই রেখে দিল ভাংতির অজুহাতে। এ সব নিয়ে চিন্তিত হওয়ার মত মানসিক অবস্থা ছিলনা কারও। শুধু তজ্‌বী গোনার মত বেহুশ হয়ে গুনছিলাম অন্তিম মুহূর্তের। এবং শেষ পর্যন্ত এলো সেই মুহূর্ত। বাস কন্ডাকটরদের কেউ একজন প্রায় গলাধাক্কা দিয়ে ছুড়ে ফেলল বাস হতে। লাগেজটাও ছিটকে পরল হাত হতে।

ব্যাগটা কুড়িয়ে সোজা হয়ে চারদিক চোখ ফেরাতে সহযাত্রীদের কাউকে খুঁজে পেলামনা কাছাকাছি। ওরা কেউ নামেনি। মনটা দমে গেল নতুন আশংকায়। সানফ্রানসিসকো প্লাজা! প্লাজার বিশাল ঘড়িটায় ঢং ঢং করে রাত ৯টা বাজার সময় সংকেত বেজে উঠল। ৪ ঘণ্টার পথ ১৫ ঘণ্টায় পাড়ি দিয়ে শেষ পর্যন্ত দাড়িয়ে আছি লা পাস শহরের কেন্দ্রস্থলে; ক্লান্ত, শ্রান্ত, অবসন্ন, বিষণ্ণ এবং বিধ্বস্ত! ধাতস্থ হতে ৫টা মিনিট কেটে গেল। এ ধরনের অমানুষিক অভিজ্ঞতা জীবনে এই প্রথম নয়। জার্মানির বার্লিন শহর তখনও এক হয়নি। ঐতিহাসিক বার্লিন দেয়াল পার হয়ে পশ্চিম বার্লিনের জুওলঝিশিয়া গার্টেন ষ্টেশনে হাজির হয়েছি নেদারল্যান্ডের হোক-ভ্যান-হল্যান্ড গামী ট্রেন ধরব বলে। শেষ গন্তব্য হারউইচ হয়ে লন্ডনের লিভারপুল ষ্টেশন। পূর্ব বার্লিনে অযথা ঘুরাঘুরির কারণে শেষ ট্রেনটা মিস হয়ে যায়। হোটেল ভাড়ার যথেষ্ট টাকা নেই হাতে, তাই ষ্টেশনে রাত কাটাবার সিদ্ধান্ত নেই বাধ্য হয়ে। সেপ্টেম্বরের শুরু, কনকনে শীত আর পুলিশের অত্যাচারে সাড়াটা রাত দৌড়ের উপর কাটাতে হয়। সকালের প্রথম ট্রেনটা ধরতে বেলা বেজে যায় ১১টা।

ভেঙ্গে পরলে চলবে না। এখনও অনেক পথ পাড়ি দেয়া বাকি। নিজকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করলাম! প্লাজায় ঠায় দাড়িয়ে রইলাম অনেকক্ষণ। কোনদিকে গেলে হোটেল মিলবে তার কোন হদিস করতে পারলাম না। হরেক রকম মানুষের ভীরে গিজগিজ করছে চারদিক। সাহস করে একজনকে জিজ্ঞাস করতে বাধ্য হলাম, ‘দন্ডে এস্তা এলো হোতেল?‘। অল্প বিদ্যা ভয়ংকরী সন্দেহ নেই, কিন্তু এই অল্পতাই অনেক সময় বিশাল কাজে আসে, বিশেষ করে অজানা অচেনা ভাষার দেশে। কাজ হল এ যাত্রায়! আঙ্গুল উঁচিয়ে দেখানোর চেষ্টা বুঝতে অসুবিধা হলোনা আমার। হাটতে শুরু করলাম হোটেলের সন্ধানে। কয়েক গজ যেতেই রাস্তাটা ৪৫ ডিগ্রী কোণ হয়ে উপরে উঠতে শুরু করল। জ্বিহ্‌বাকে জায়গা মত ধরে রাখায় অসুবিধা দেখা দিল। ম্যারাথন দৌড়ের গতিকে পাল্লা দিয়ে হার্ট-বীটও বাড়তে থাকল। মুখের থুথুতে এই প্রথম লবণের অস্তিত্ব অনুভব করলাম। প্রথম হোটেলটা চোখে পরল কাইয়ে পতোসির উপর, ’হোটেল প্রেসিদেন্তে’। ভাগ্য এ যাত্রায় বিমুখ করল আমায়, সীট নেই একটাও। দূরে অন্য একটা হোটেলের সাইন দেখে আশান্বিত হয়ে রওয়ানা দিলাম সে দিকে। আরও অনেক উপরে উঠতে হবে। শরীরের শেষ শক্তি ব্যয় করে হোটেল দরজায় হাজির হতেই দেখি দরজা বন্ধ! প্রচণ্ড শব্দে নক করে ইয়া নফ্‌সি ইয়া নফ্‌সি ঝপতে থাকলাম। কেউ এগিয়ে এলো মা। ঘুসি মারতে বাধ্য হলাম। রাজ্যের ক্ষুধা মগজের চিন্তা শক্তিকে গ্রাস করে নিয়েছে ইতিমধ্যে। খুট করে ছোট বুথের মত জানালা খুলে উঁকি দিল কেউ একজন। ’সিনিওরা, উস্তেদ হাবলা ইংলেজ?’। অন্য একজন মাথা বের করে জানাল ’পকি্‌ত‘, অর্থাৎ অল্প স্বল্প। সীট পাওয়া গেল ৬ তলায়, আলাদা বাথরুম। এটা আসলে একটা হোস্টেল, ভাড়া মাত্র ৭ ডলার। হঠাৎ মনে হল পৃথিবীটা আসলে অতটা খারাপ নয় যতটা আমি ভাবছি!

’হোস্তাল নাইরা’, আসলেই নাইড়্যা (ন্যাড়া), ভেতরের সবকিছুতে অযত্ন, অবহেলা আর দারিদ্রের ছাপ। এলিভেটর নেই, তাই সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠতে হল ৬ তলায়। চাবি ঘুরিয়ে দরজা খোলার চেষ্টা করতে মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরল, খুলছে না দরজা! নীচে নামা এ মুহূর্তে অসম্ভব আমার পক্ষে! বসে পরলাম দরোজার সামনে। আধা ঘণ্টা পর রুম সার্ভিসের একজনকে দেখা গেল নতুন গ্রাহকের সাথে উপরে উঠতে। হাউমাউ করে বুঝাতে চাইলাম আমার অবস্থা। সুন্দর একটা হাসি দিয়ে অপেক্ষা করতে বলল। আরও প্রায় ১৫ মিনিট পর প্রায় ৮০ বছরের এক বৃদ্ধাকে দেখা গেল সিঁড়ি ভাঙ্গছে। পাগলের মত হাঁপাচ্ছে সে। শেষ পর্যন্ত অন্য একটা রুমে ঠাঁই নিতে হল। ধবধবে সাদা বিছানা, রঙ্গিন টিভি আর বড় মত আয়নাটা দেখে চোখে পানি আসার মত অবস্থা। হঠাৎ মনে হল আমার বিশ্বজয়ের এখানেই বোধহয় সমাপ্তি! এবার বিশ্রামের পালা!!

শরীরে শুটকির গন্ধ, পরনের কাপড়ে দশ ইঞ্চি ধূলা, জুতা জোড়া বলছে এইমাত্র হালচাষ শেষে ঘরে ফিরেছি, এমন একটা অবস্থায় বিছানায় গেলে সহসাই ঘুম ভাঙ্গবেনা। তাই সাদা শুভ্র বিছানাটায় ঝাঁপিয়ে পরার লোভ সামলাতে হল জোড় করে। প্রথমত গোসল করতে হবে যে কোন মূল্যে। পেট শান্ত করাও জরুরী হয়ে পরেছে। প্রায়োরিটি সেট করে প্রথমে গোসলখানায় ঢুকে পরলাম। আধা ঘণ্টা মরার মত দাড়িয়ে রইলাম ঝরনাটার নীচে। গরম পানির উষ্ণ ছোঁয়ায় দিনের ক্লান্তি অনেকটাই কেটে গেছে মনে হল। পোশাক বদলে রাতের খাবারের সন্ধানে বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। সিঁড়ি ভাঙ্গা এখন আর ততটা কঠিন মনে হলোনা। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল হোটেল ফটকে! বন্ধ হয়ে গেছে রাতের জন্যে। অল্প ইংরেজি জানা মহিলার দেখা পাওয়া গেল লবিতে। সারাদিন পেটে কিছু পড়েনি জানতে পেরে তার চোখে মুখে মমতা ঝড়ে পরল। আমাকে সাথে নিয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া ক্যান্টিনটায় ঢুকে পরল। দশ মিনিটের ভেতর গরম সুপ, সিদ্ধ আলু এবং সাথে মুরগীর ফ্রাই নিয়ে হাজির হতেই হায়েনার মত ঝাঁপিয়ে পরলাম প্লেটে। খাওয়া শেষ হতে মনে হল হাত-পা কাঁপছে আমার। চক্কর দিয়ে মাথাটাও ঘুরছে। এক কাপ কফি নিয়ে মহিলা কখন পাশে দাঁড়িয়েছে টের পাইনি। ’খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে তোমাকে, উপরে যাও এবং ভাল করে ঘুমিয়ে নাও, সব ঠিক হয়ে যাবে’, মা’র মমতা নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল মহিলা। চোখ ঝাপসা হয়ে এলো আমার। এবার ঘুমের পালা।

- চলবে

সর্বশেষ এডিট : ২০ শে এপ্রিল, ২০১৭ সকাল ১০:৪৯
১৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাকশাল থামাতে সিআইএ শেখ সাহেবকে হত্যা করেছিল

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৫ ই আগস্ট, ২০১৭ বিকাল ৫:১৫



যথাসম্ভব, আপনিও বাকশাল পছন্দ করেন না; কারণ, বাকশাল করার সময় শেখ সাহেব মানুষের মতামত নেননি, তিনি মানুষের কাছে ব্যাখ্যা করেননি: তিনি রেসকোর্স, পল্টন, লালদীঘিতে সভা করে মানুষকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মরণে মরণ নাই

লিখেছেন বিদ্রোহী ভৃগু, ১৫ ই আগস্ট, ২০১৭ বিকাল ৫:৪০


সকল ইয়াতিম জানে পিতা হারানোর যাতনা
আমাকে প্রশ্ন করো না কষ্টানুভুতির
ভবন চাপা পড়া মুমর্ষের কাছে-
অনুভূতি জানতে চাওয়ার বোকামোতে!

হারায় একটি দিনে, যাতনা আজীবন।
প্রতি পল প্রতি মুহুর্ত
যাপিত দিনের প্রতিটি ক্ষনে
শুন্যতা... ...বাকিটুকু পড়ুন

*************** মানুষ *************

লিখেছেন ওমেরা, ১৫ ই আগস্ট, ২০১৭ বিকাল ৫:৫১



রক্তে মাংসে গড়া মানুষ আমরা।

মানুষ বলেই, আমার কুৎসিত,কদাকার,পাষান একটা মন আছে
কারো সুখ দেখলেই হিংসায় সেই মন অনল জ্বলে
সুখটুকু কেড়ে নিজের করতে নাও যদি পারে, নষ্ট করার প্রচেষ্টায় থাকে।
রাগে সেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা ভাষায় কমার্শিয়াল ব্লগিংকে এগিয়ে নিতে হবে।

লিখেছেন আশরাফুল ইসলাম (মাসুম), ১৫ ই আগস্ট, ২০১৭ সন্ধ্যা ৬:১৫

কমার্সিয়াল ব্লগিং হলো ব্লগে লিখে টাকা রোজগার করার সুযোগ।বাংলাদেশে এ সুযোগ খুবই সীমিত।সম্প্রতি প্রযুক্তি বিষয়ক বাংলা ব্লগ টেকটিউনস এমন সুযোগ দিচ্ছে বলে তাদের ব্লগে প্রচার করা হচ্ছে।এদিকে গুগল এ্যাডসেন্স বাংলা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অখন্ড ভারতের স্বপ্ন!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৬ ই আগস্ট, ২০১৭ ভোর ৪:০১


এই উপমহাদেশের জন্য আগষ্ট মাস আসলে অপয়া! ১৯৪৭ সালে এই আগষ্ট মাসের ১৪ তারিখে পাকিস্তানের জন্ম হয় আর ১৫ তারিখে ভারত স্বাধীনতা পায়। সত্যিই কি স্বাধীনতা পায় এতবড় দেশকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×