ঘটনাটা এত হাজার বার নানি, দাদি আর মার শুনেছি যে মনে হয়না যে পুরা ঘটনাটা সুধুই তাদের মুখে শুনা। মনে হয় যেন প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি দৃশ্য আমি চলচিত্রের মত দেখতে পাচ্ছি। তার পরেও কিবোর্ড হাতে এক ঘন্টার মত বসে আছি কিন্তু লেখা বের হচ্ছেনা ! বারবার চোখ ভিজে যাচ্ছে ।
আমার জন্মের সময় আম্মু গ্রামের স্কুলে ক্লাশ এইটে পড়ে, ১৪ কি ১৫ হবে বয়স। তো গ্রামের বাচ্চা প্রসবের কাজ ধাইমারাই করতো। যথারীতি ধাইমা হাজির এবং যথারীতি আমিও পৃথিবীতে পদার্পন করলাম। কিন্তু আম্মুর অবস্হা খারাপ থেকে আরও খারাপ হচ্ছিলো। শেষে অবস্হা এতই খারাপ হয়ে গেল যে, গ্রামের ডাক্তার বললো যে ঢাকায় নেওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। লোকাল ট্রেন ছাড়া সেই সময় নানার বাড়ি থেকে ঢাকায় যাওয়ার আর কোন উপায় ছিলো না। সারারাত সবাই বেশ উৎকন্ঠার মধ্যে ছিলো। এই দিক দিয়ে আম্মু সারারাত অজ্ঞ্যান।
এরই মধ্যে নানা আব্বুকে টেলিগ্রাফ করে দিয়েছে যার সারমর্ম ছিলো এই রকম, "তোমার একটা ফুটফুটে ছেলে হয়েছে , পারুলের অবস্হা ভালোনা, ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছি"। আব্বু তখন চিটাগাং ইন্জিনিয়ারিং কলেজের তৃত্বীয় বর্ষের ছাত্র।
নানার একটা নৌকা ছিলো, যেটা সবসময় বাড়ির পিছনের ঘাটে বাধা থাকতো। তো ভোরের দিকে আমাকে দাদির কাছে দিয়ে নানা, নানি, চাচা আরও কয়েক জন আত্মীয় আম্মুকে নিয়ে নৌকায় করে স্টেশনের দিকে রউনা হলো। স্টেশনে পৌছাতে হলে ঘাটে নেমে আরও এক মাইলের মত পায়ে হাটতে হবে। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, ঘাটে পৌছাতে না পৌছাতেই ট্রেনের পৌছানোর ঘন্টা দিয়ে দিলো!
নানা তাড়াহুড়া করে নৌকা থেকে নামেই বললো, "আমি গিয়ে ট্রেন আটকাচ্ছি তোমরা পারুলকে নিয়ে আস"। এই বলে নানা এক দৌড়ে স্টেশনে গিয়ে স্টেশন মাস্টারকে পাঁচ টাকা বক্সিস দিয়ে ট্রেন আধা ঘন্টার জন্য আটকে রাখলো। অতঃপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
দুইদিন পর আম্মুর জ্ঞ্যান ফিরে এবং এই দুইদিন আব্বু আম্মুর মাথার কাছে ঠাঁই বসেছিলো একটুও ঘুমায়নি।আম্মুর অবস্হা একটু ভালো হলে আব্বু দোতালার সিরির উপর বসে একটু রেস্ট নিচ্ছিলো, কিন্তু এতো ক্লান্ত ছিলো যে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছিলো টেরই পায়নি।এবং গড়াতে গড়াতে যখন নিচে পরে কপাল কেটে ফেললো, হাত ঘড়ি ভেঙ্গে ফেললো তখনও ঘুমাচ্ছিলো !
পনের দিন পর আম্মু বাড়ি ফিরলো এবং এই পনের দিন আমার দাদি আমাকে চোখের আড়াল করেনি, কোলে করে বসে ছিলো আর আঙ্গুল ভিজিয়ে ভিজিয়ে মধু আর দুধ খাইয়েছিলো। বাড়ি ফিরে আম্মু আমাকে কোলে নিয়ে সে কি কান্না !!
গল্পটা কিভাবে শেষ করব ভেবে পাচ্ছিনা, বারবার চোখ ভিজে যাচ্ছে আর মায়ের কথা মনে পরছে। মা মা করে চিৎকার করতে ইচ্ছা করছে !

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

