১.
রাস্তা দিয়ে এলোমেলো হেটে যাচ্ছে উদভ্রান্ত এক যুবক, গায়ের কাপড়ের ঠিক নেই, চুলগুলো উসকোশুষ্ক, বিড়বিড় করে কি যেন বকে যাচ্ছে আপন মনে। কত হবে ছেলেটার বয়স ? ত্রিশ বছর, বা আরও কম পঁচিশ? ছেলে বলা যাবে না কি লোক বলবো? আচ্ছা, আদমই বলি। একটু খেয়াল করলেই বুঝা যাবে আদম সন্তানটি অপকৃতস্হ।
স্বাধীন দেশে; বনীআদমরা মক্তভাবে ঘুরে বেড়াবে এটাই তার অধিকার, সেই হিসাবে পাগলেরও এই অধিকার আছে, পৃথিবীর আর কোন দেশ মনে হয় গনতন্ত্রের এই চরম উৎকর্ষতায় পৌছুতে পারেনি আমরা ছাড়া। তো! কি আর করা ! কপাল মন্দ, কিছুক্ষণের মধ্যেই রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যায় তাকে পুলিশ। তারপরই বাধে বিপত্তি, এই আদম বিড়বিড় করে কি বলে কেউ কিছু বুঝে না, আর পুলিশ কী জেরা করে বনী আদমের সেই দিকে কোন খেয়াল নেই।
শেষে একজন অফিসারের সন্দেহ হওয়ায় খবর দেওয়া হয় বাংলাদেশ দূতাবাসে। তারপরের ইতিহাস খুবই গতানুগতিক। তিন চার মাস আগে হতভাগা বঙ্গদেশের এই আদম সন্তানটি শেষ সম্বল নিজের ভিটে খানা বিক্রী করে নিজের বউ বাচ্চাদের অন্যের ঘরে আশ্রিত রেখে এখানে চলে আসে সুন্দর ভবিষ্যতের আশায়। স্বপ্ন দেখেছিলো এখানে এসেই কাড়ি কাড়ি টাকা পাঠাবে দেশে, সব অভাব দুর হয়ে যাবে। আর এখানে এসে তিনচার মাস ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে পথে পথে; কোন কাজ নেই, যে কোম্পানীর চাকুরির কথা বলে একে আনা হয়েছে সেই কোম্পানীও নেই, দালালও লাপাত্তা। মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে সে এখন সব ধরনের মানসিক চাপের উর্ধ্বে।
২.
বাবার সাথে দাড়িয়ে গল্প করছি। একটা ছেলে আশপাশ দিয়ে ঘুরঘুর করছিলো, কি যেন বলতে চায় আবার লজ্জায় বলতে পারছে না। কিছুক্ষণ পর সাহস করে বলেই বসলো, "স্যার, আজকা চাইর মাস ধইরা ভাত খাই না, খবজা (শক্ত এক প্রকারের রুটি, আকারে এক হাতের মত লম্বা) খাইতে খাইতে মুখে ঘা হয়া গেছেগা"। বলেই মাথা নিচু করে ফেললো।
কত হবে ছেলেটার বয়স ? বিশ, একুশ ? আমি অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে নিলাম, তার চোখের দিকে তাকানোর মত শক্তি আমার ছিলো না। পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে বললান, "কিছু কিনে খেয়ে নিয়েন"
জিজ্ঞেস করলাম, "কবে এসেছেন? কে নিয়ে এসেছে আপনাদের"?
"আসছি পেরায় চার মাসের মতন হইবো। আইসাই দেহি কোম্পানী নাই, কাম নাই" সে বললো। আর দালালের যে নাম বললো সেই নামে কাউকে চিনি বলে মনে হলো না। বাবাকে জিজ্ঞেস করতেই বললো, "দালালরা একেক জায়গায় একেক সময় একেক নাম ব্যবহার করে। আসল নাম খুব কম লোকেরই জানে। এ্যাম্বাসির সাথের ওদের দহরম মহরম। দেশেও উচ্চপর্যায়ে এদের আনাগুনা।
বাসায় এসে মাকে আজকের ঘটনা বলতেই দেখি মার চোখ চিকচিক করে উঠলো, সামলে নিয়ে বললো, "ইস্ ! তাকে বাসায় নিয়ে আসবে না ? পেট পুরে খাইয়ে দিতাম!"।
সেদিন ভাত নামছিলো না গালা দিয়ে, এক গ্লাস পানি খেয়ে গলাটা আগে ভিজিয়ে নিতে হয়েছিলো।
৩.
বিজয়ের মাস, প্রতি বছর মাসটা ঘুরে ঘুরে আসে, সেই কবে ৭১ এ বিজয় ছিনিয়ে এলেছিলাম, তারপর থেকে তিলে তিলে শুধু পরাজিতই হয়ে যাচ্ছি। এইমাসের ষোল তারিখ পুরোটা জুড়ে চলবে সরকারি আর বিরুধী দলের নানা আয়োজন, টিভি টকসো গুলোতে আলাপ আলোচনার ঝড় বয়ে যাবে। আমরা স্মৃতিরোমন্হন করে আনন্দে শিহরিত হবো, আর প্রতিদিনের মত ক্ষুধার অশ্লীল চিৎকারে কাতরাতে থাকবে ভুখা নাঙ্গা আদমসন্তান।
মন্ত্রী-আমলার চকচকে পাঞ্জাবীতে বিলাতি সেন্টের গন্ধ মউমউ করবে চারপাশ আর কোন এক নাম না জানা আদমের মেয়েবউ এর ঠোঁটে লাগবে টকটকে লাল লিপস্টিক, গায়ে গুলিস্তানের কড়া পারফিউমের গন্ধ আর টাকার কাছে পরাজিত হবে নারীত্ব আর এখানে ডলারে ভিক্ষা করবে আদম সন্তান।
ঐদিকে দালাল, চাটুকারেরা বলবে "এভরিথিং এই আন্ডার কন্ট্রোল স্যার, এভরিথিং ইজ নরমাল, মাঝে মাঝে দুই একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে, এগুলো কোন ব্যাপার না। আমরা ম্যানেজ করে নিব।" আর সবকিছু অমনি ম্যানেজ হয়ে যায়।
পরিত্যেক্ত পানির পাইপের মধ্যে শীতে জির্ণ শীর্ন শরীরে কাঁপবে শত শত ছোটলোকের বাচ্চা, আধুনিক কৃতদাস; আর তাদের শেষ রক্তবিন্দুটা চুষে চুষে আদমের প্রভুরা হাটে গিয়ে খুঁজবে কোরবানীর বড় গরু।
এই শেষ নয়, শুয়োরের বাচ্চা.....সময় আসবে একদিন এইসব ছোটলোকের, এইসব হতভাগ্য আদমের, পালানোর পথ পাবি না তখন, হারামজাদা। শুধু অপেক্ষা আর একটা ষোলই ডিসেম্বরের।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ডিসেম্বর, ২০০৯ রাত ৯:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


