somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমাদের সরলতা, ধৈর্য্য আর ক্ষুদ্র ব্যক্তি স্বার্থের উর্ধ্বে না উঠতে পারাটাই তাদের দানব হয়ে উঠার প্রধান রসদ

১৮ ই জুন, ২০১০ রাত ১১:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১.
কিছুদিন আগের কথা, প্রায় শ'খানেক বাংলাদেশি শ্রমিক বেশ কষ্টে আছে, ঠিক মতো বেতন পাচ্ছে না, থাকার জায়গাও স্বাস্থ্যসম্মত নয়, অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। কিন্তু এইসব ছোটলোকগুলোর জন্য ভাবার কেউ নেই, করারও কেউ নেই।
দূতাবাসের প্রথম শ্রমসচিব নতুন এসেছেন, এদের দরবস্থার কথা শুনেই ছুটে গেলেন দেখতে। জিজ্ঞেস করলেন, "কেমন আছেন আপনারা"?

-জবাবে তারা বললেন, "ভালো আছি স্যার, কিছু সমস্যাতো থাকবেই, তারপরেও সবমিলিয়ে আল্লাহের রহমতে ভালো আছি"।

আপনাদের জন্য কী কিছু করতে পারি?

-নাহ, স্যার কিছু করা লাগবে না। কেউতো দেখতে আসে না, কোন খবরও নিতে আসে না, আপনি আমাদের কথা শুনে, দেখতে এসেছেন। এটাই আমাদের পরম পাওয়া; আপনি এসেছেন এতেই আমরা খুশি। আমাদের আর কিছু চাওয়ার নেই।

আহা! এই ছোটলোক গুলোর কতই না বড় হৃদয়! আমরা বাঙ্গালিরা কত অল্পতেই না খুশি হই, কত সহজেই না আমাদের ভুলিয়ে রাখা যায়, কতই না সীমিত আমাদের চাহিদা। এই বড় হৃদয়ের ছোটলোকগুলোই যখন বলে, "হারামজাদা, সব শালা চোর, গুষ্টিকিলাই বালের সরকারের"-তখন কত ক্ষোভই না মিশে থাকে তাদের কথায়, তাদের হৃদয়ে?

এমন কোন জাতি কী পৃথিবীর বুকে আছে যে এমন দুঃখেও নির্দ্বিধায় বলতে পারে এমন কথা? হায়! আমাদের মহানূভবতাই আজ আমাদের কাল হয়ে দাড়িয়েছে।

২.
বেশি না, এই তো প্রায় চল্লিশ বছর আগের ঘটনা ছেলেটির বয়স তখন এগারো কী বার হবে। তার চাচা হাতে গোলাঘরের চাবি দিয়ে বললো, “আমি একটা জরুরী কাজে বের হচ্ছি, তুই সন্ধ্যার কিছু পরে পিছনের দরজা দিয়ে ঘোলাঘরে ঢুকবি। ওখান থেকে একটা ধানের বস্তা তুলে ওমুকের বাড়ি দিয়ে আসবি। সে বস্তাটা রেখে তোকে কিছু টাকা দিবে। তারপর বাজারে গিয়ে বড়বড় কিছু সারের কাগজ (পলিথিন পেপার) আর কিছু চিড়ামুডিগুর কিনে ঘাটের কাছে ওমুকের বাড়ি আসবি”

ছেলেটি কথা মত সব কাজ সেরে ঘাটের ঐ বাড়িতে পৌছে দেখে আরও সাত আট জন তরুন একজোট হয়েছে।এমন সময় একজন দৌড়ে এসে খবর দিলো, “এই সবুর, শরীফ (আসল নামটা ভুলে গেছি, বুঝার সুবিধার জন্য প্রতিকী একটা নাম ব্যবহার করলাম), তোদের বাবা আসতেছে তোদের সাথে দেখা করতে”।

বড়ভাই সবুর আস্তে উঠে গিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলে সবাই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “কী রে? বাবার সাথে শেষ দেখা করবি না?”

সবুরের নির্বিকার জবাব, “নাহ, আমাদের আর কোন ভাইবোন নেই, এখন বাবার সাথে দেখা করলে দুইভাইকে একসাথে যেতে দেবে না, যেকোন একজনকে রেখে দিবে।”

তাদের বাবা সামনের দরজায় ধাক্কাচ্ছে, আর পিছন দরজা দিয়ে এরা চলে যায় নদী পার হয়ে ইন্ডিয়ার। কত বিশাল হৃদয় হলে এমনটি কর যায়? কত বড় আত্মত্যাগ! নিজেকে ঐ স্থানে চিন্তা করে মাঝেমাঝে ভাবি আমি কী পারতাম এভাবে সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে শুধু দেশের টানে নিজেকে এভাবে বিলিয়ে দিতে?

আবেগের আতিশয্যে অনেক রাজা উজির মারি, বুক চিঁড়ে বেরিয়ে আসে আর্তনাদ, আফসুস ! আহা যদি একাত্তুরে যৌবন থাকত বুক চিতিয়ে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়তাম! আসলেই কী তাই? চোখের সামনে ছিনতাই হয়, না দেখে চলে যাই! রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে দেখেও না দেখার ভান করি বখাটেদের উৎপাত, প্রজেক্টের কস্ট ইস্টিমেশনের সময় বস বলেন, এইখানে প্রোফিট মার্জিন বাড়িয়ে দাও কারন এই টেক্স এই ভাবে ফাঁকি দেওয়া যাবে, কিছু বলতে পারি না; চাকরী চলে গেলে আগামি মাসে যে বউকে প্রমিজ করেছি নতুন একটা মোবাইল কিনে দিব, সেটা কীভাবে হবে? যে এতটুক স্বার্থের কাছে হেরে যেতে পারে সে আবার যুদ্ধে যাবে?

সবুর যদি জানতো তার আর ফিরে আসা হবে না মায়ের কোলে, আর দেখা হবে না বাবার সাথে এই শ্যামলছায়ায়, তাহলেও কি সে এমন কঠোর হতে পারতো? শরীফের বুকে কি আগুন জ্বলছে সেটা কী কোনদিন অনুধাবন করতে পারবো?

নিজেকে বড়! বড়! ভন্ড মনে হয়।

৩.
সরকার যখন মাঝখানে কিছুদিনের জন্য ইউটিউব বন্ধ করে দিলো, আমার কোন কষ্ট হয়নি; কারন আমার এখানেও ইউটিউব বন্ধ। দেশে বন্ধ কী খোলা এইটাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি নাস্তায় ওমলেট ঠিক মত পেলেই হলো।

একে একে যখন পাঁচটা প্রাইভেট দেশি টেলিকম কোম্পানি সরকার বিশেষ দক্ষতায় বন্ধ করে দেয় তখন আমার কোন সমস্যা হয় না, আমি এদের সার্ভিস ব্যবহার করতাম না, এমন কী আমার চেনা পরিচিত কেউই এদের সার্ভিস ব্যবহার করতো না। আমার সার্ট প্যান্ট ঠিক মত ইস্ত্রি থাকলেই আমি খুশি।

ফেসবুক যখন হারাম ঘোষণা করা হয় তখনো আমার কোন সমস্যা হয় নি, আমার এখানে তো আর বন্ধ না, আমার পরিচিত সবাই মোটামুটি প্রক্সি ব্যবহার করতে শিখে গেছে সাথে সাথে। কেউ আমার ঘুমের সমস্যা না করলেই হলো।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধ শেখ মজিবুর রহমানের কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদের (কে যেন বলেছিলো উনার নামের আগে ‘মাননীয়’ না লেখার কারনে এরেস্ট হয়েছে এক ছেলে, সত্য মিথ্যা জানি না, তবে কোন দিকে কোন রকমের রিস্কেই আর গেলাম না) ব্যাঙ্গচিত্র আঁকার কারনে যে ছেলেটিকে আটক করা হয়েছে সে আমার পরিচিত কেউ না, তাকে আটক করেছে তো কী হয়ছে, আমার প্রিয়দল আর্জেন্টিনা আজকে জিতলেই হলো।

আমার দেশ পত্রিকার প্রিন্ট কপি জীবনে একবার ধরেও দেখি নাই, অনলাইনে শুধু একদিন ঢুকেছিলাম, তাও এক বন্ধুর পাঠানো লিংক ধরে, সরকার যখন অসাধারন নৈপুন্য দেখিয়ে এটা বন্ধ করে দিল আমার একবারের জন্যেও মনে হয়নি, “আহা! প্রিয় পত্রিকাটা বন্ধ করে দিলো!, এখন কী পড়বো?”। মতিউর রহমান ভাইকে লাল সালাম।

মাহমুদুর রহমান লোকটাকে আমার কখনোই পছন্দ হয় না, কেন যেন মনে হয় সাকার দূর্গন্ধযুক্ত মুখ শুধু মাত্র দুইতিন বার মাউথ ওয়াশ দিয়ে পরিষ্কার করলে এই দুই জনের মধ্যে আর কোন পার্থক্য থাকবে না। এই লোকটাকে যখন এরেষ্ট করা হয়, রিমান্ডে নেওয়া হয় তখন আমার হৃদয়ে তার জন্য দরদ উথলিয়ে উঠে না। যাহ! আশরাফুলরে লাথি দিয়া দল থেকে বের করে দেওয়া হোক।

চ্যানেল ওয়ান? থাক, এমনিতেই অনেক বলে ফেলেছি আর কথা না বাড়াই।

৪.
আমার মনে শুধু একটা শঙ্কা জাগে এইটা কী আইনের শাষন, যদি না হয় তাহলে আমিতো স্বাধীন নই! এটা কি ন্যায় বিচার? যদি না হয় তাহলে আমিও তো নিরাপদ নই! এইটা কি পরমত সহিষ্ণুতা? যদি না হয় তাহলে তো আমার উপরও পড়তে পারে হিংস্র ক্ষুধার্ত খড়গ! আমার কী বাক স্বাধীনতা আছে? যদি না থাকে তাহলে আমার বেঁচে থাকার কী মূল্য!

রাগ ক্ষোভ আর ভয়ের মিশ্র একটা অনুভূতি এসে আমার চারপাশ ঘিরে ধরে। প্রতিবাদের ঝড় তুলতে ইচ্ছা করে, বিদ্রোহের ফেটে পড়তে ইচ্ছা করে, বিপ্লবের ডাক দিতে ইচ্ছা করে, পরমুহূর্তেই জাগতিক ভয় এসে কাবু করে দেয়। আগামি সপ্তাহে দেশে আসছি, সরকার যদি আমাকে আটক করে? ব্যাক্তি আমি কী বিশাল রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে অসহায় নই? আমার বাবা মার কী হবে? আমার কিছু হয়ে গেলে পরিবারের দেখাশোনা কে করবে? আমি পিছিয়ে যাই, আত্মসমর্পণ করি নিজের অজান্তেই।

শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যায় সেই সব ছোটলোক শ্রমিকগুলো প্রতি, আবার মাথা নত হয়ে যায় সবুর, শরীফ প্রতি। আমি যোদ্ধা নই, কোনদিন ছিলাম না, হতেও পারবো না, আমি প্রেমিক নই কোনদিন ছিলাম না, হতেও পারবো না; আমি ভালো অভিনেতা মাত্র, যে নিজের সাথেও সুনিপুন অভিনয় করে যেতে পারে দিনের পর দিন।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জুন, ২০১০ রাত ১:২৩
২৬টি মন্তব্য ২৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×