somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... (কল্পগল্প)----প্রজেক্ট নস্ট্রাডমাস ভালোই ঠান্ডা পড়েছে আজ, যাকে বলে একেবারে হাড় কাঁপানো শীত; সেই সাথে বেড়েছে কুয়াশাও। খালি চোখে বেশি দূর দেখা যায় না, রাস্তার ফ্লাডলাইটের আলোও কেমন যেন ম্রিয়মান হয়ে আছে কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে। শীতের রাতে ঢাকা শহর যে এত অদ্ভুত তা আগে এভাবে অনুভব করতে পারেনি ফজলুল করিম। অবশ্য আজও পারেনি; কিভাবে পারবে? পেটে খিদা নিয়ে শীতে কাঁপতে কাঁপতে আর যাই হোক রোমান্টিসিজমে ভোগা যায় না। একটা কুকুর একটু পরপর এসে তাকে দেখে গেছে, কী জানি! হয়তো ফজলুল করিমকে সারা রাত একা একা রাস্তার পাশে নির্লিপ্ত বসে থাকতে দেখে ওর মনে কোন এক অজানা প্রকৃতির মায়া তৈরী হয়েছে, শেষরাতের দিকে এসে মায়ার অতিশয্যে ফজলুল করিমের গা ঘেষে শুয়ে পড়ে কুকুরটা; সে দিকে অবশ্য তার কোন খেয়াল ছিলো না, সে গভীর একাগ্রতায় ল্যাম্পপোষ্টে হেলান দিয়ে একটা বই পড়ে যাচ্ছিলো।

শহরের এই দিকে সে আগে কখনো আসেনি, জন্মের পর থেকেই বড় হয়েছে যাত্রাবাড়ীর একটি এতিমখানায়। এত বছরের ঐ জায়গাটা আজ এক নিমিষেই ছেড়ে আসতে তার বুকটা ফেটে যাচ্ছিলো, কিন্তু কাউকে সে তা বুঝতে দেয়নি; হাসিমুখে একে একে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এসেছে; এই এতিমখানায় সারা জীবন কাটিয়ে দেবার জন্য তার জন্ম হয়নি। যাত্রাবাড়ী থেকে উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটতে হাঁটতে সে যখন বনানী পৌছায় তখনি তার মনে হয়, এই সেই স্থান; এখানেই তাকে অপেক্ষা করতে হবে! এটাই তার ভাগ্য নির্ধারনী স্থান; আজই। আজ মানব জাতীর ইতিহাসে এক মহত্ত্বপূর্ণ দিন।

ফজরের নামাজ পড়ে লিয়াকত হাসান চৌধুরী সাহেব হাঁটতে বের হন, এটা উনার ত্রিশ বছরের অভ্যেস। প্রতিদিন বনানী সুপার মার্কেটের সামনে দিয়ে কামাল আতাতুর্কের মোড় ঘুরে এগারো নাম্বার হয়ে বাসায় ফিরেন। যৌবনের প্রথমে যখন বনানীতে স্থায়ী শেকড় গেড়ে বসেন তখন এই এলাকায় দিনে দুপুরে শিয়ালের ডাক শুনা যেত, আর আজকাল তো শুধু ইট পাথরে বস্তি চারদিকে। শুধুমাত্র সকালের বাতাসটায় উনি অতীতের সেই আমেজটা পান। ত্রিশ বছরের অভ্যেসের আজ প্রথম ছন্দপতন হলো চৌধুরী সাহেবের; আতাতুর্কের মোড়ে পৌঁছে দেখেন একটু দূরে ফুট ওভার ব্রীজের পাশের ল্যাম্পপোষ্টের নিচে একটা ছেলে গভীর মনোযোগের সাথে কি যেন পড়ছে। কৌতুহলি হয়ে উনি এগিয়ে গেলেন। মলিন চেহারা, কয়েক জায়গার তালী দেওয়া পাঞ্জাবি, রং চটচটে একটা ব্যাগ; গায়ে লেগে শুয়ে আছে একটি রাস্তার কুকুর। কুকুরটিকে উনি চিনতে পারলেন, এই এলাকায় দেখছেন অনেক দিন ধরে।

-সালাম-ও-আলাকুম, চাচা।

একটু না, বেশ চমকে উঠলেন চৌধুরী সাহেব। ছেলেটি এত স্বাভাবিক ভাবে পড়া থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তাকে সালাম দিলো যেন ওনার জন্যই এখানে অপেক্ষা করছে সে। এতই অবাক হলেন ছেলেটির সালামের জবাব দিতেও ভুলে গেলেন।

“তুমি! তুমি আমাকে চিন?”

হাসি হাসি মুখে ছেলেটি বলল, “না”।

ছেলেটির আচরনে কি যেন একটা ছিলো, চৌধুরী সাহেব মুহূর্তেই স্বাভাবিক হয়ে গেলেন। নাম কি তোমার? কোথায় থাক? এখানে কি করছ? তুমি কি পড়ছিলে? একসাথে অনেকগুলো প্রশ্ন করে বসলেন উনি।

-পুরা নাম ফজলুল করিম সরদার, থাকতাম যাত্রাবাড়ীর নূর-ই-উম্মুল এতিমখানায়। গতকাল বয়স আঠারো হওয়াতে তারা আমাকে আর রাখবে না বলে দিয়েছে। কর্তৃপক্ষ অবশ্য আমাকে সুযোগ দিয়েছিলো এতিমখানার স্কুলে দপ্তরীর পদে কাজ করার জন্য, কিন্তু আমি আরও পড়াশুনা করতে চাই।

হাতে এটা কিসের বই?

-হাতে বইটা দেখিয়ে, “নিকোমাচিয়ান ইথিক্স” দর্শনের উপর লেখা খুব বিখ্যাত একটা বই, সময় কাটানোর জন্য পড়ছিলাম।

কতটুকু পর্যন্ত পড়ালেখা করেছ? একটু কৌতুহল জেগে উঠলো চৌধুরী সাহেবের।

-এইচ.এস.সি পরীক্ষা দিয়েছি এইবার, বিজ্ঞান বিভাগ থেকে।

এস.এস.সি তে কেমন রেজাল্ট ছিলো?

-জিপিএ পাঁচ পেয়েছিলাম, গোল্ডেন।

এইবার চৌধুরী সাহেব অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন, সফল শিল্পপতি উনি; চোখ দেখে মানুষ চিনতে পারেন, ভবিষ্যৎ দেখতে পান। ফজলুলের চোখে উনি অন্যরকম এক জ্যোতি দেখতে পেয়েছেন। বললেন, “তুমি কি আমার সাথে যাবে? আমার বাসায় থাকবে, পড়াশুনা করবে”। বলেই নিজের মনেই একটু অবাক হলেন, এত তাড়াতাড়ি তো কখনো উনি সিদ্ধান্ত নেন না!

অবাক ব্যাপার, ছেলেটি দ্বিতীয় কোন কথা না বলে আকাশের দিকে তাকিয়ে মুচকি একটু হেসে, অতঃপর চৌধুরী সাহেবের চোখে চোখ রেখে খুব স্বাভাবিক ভাবে বলল, “চলেন”

২.
পুরা জার্মান জুড়ে চলছে উৎসবের আমেজ, রাজধানী বার্লিন সেজেছে নব বধূর সাজে; যেদিকে চোখ যায় শুধু লাল আর লাল, ঝকমক করছে শহরের আকাশ ছোয়া প্রত্যেকটি বাড়ি। গতকাল থেকে শুরু হয়েছে বিশ্ব বিজ্ঞান সম্মেলন, “সাইন্স-নভেম্বর” নামে খ্যাত এই উৎসব চলবে পুরা নভেম্বব মাস জুড়ে। বিশ্বব্যাপী আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজার হাজার বিভাগের অসংখ্যা বৈজ্ঞানিক মিলিত হয়েছেন বিজ্ঞানের বরপূত্র এই বার্লিন শহরে। চার বছর অন্তর অন্তর যে দেশে এই “সাইন্স-নভেম্বর” অনুষ্ঠিত হয় সে দেশের জন্য এই সম্মেলন বিশাল গৌরবের ব্যাপার। ধারনা করা হয় পরবর্তী চার বছরে যদি যুগান্তকারী কোন আবিষ্কার হয়, এটা এই দেশ থেকে হবে। অবশ্য কালের আবর্তে এই সম্মেলন আর শুধু বিজ্ঞান সম্মেলন থাকেনি, এটা এখন উৎসবের উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। হবে না কেন? পৃথিবীজুড়ে হাজার হাজার গবেষণাগারে লক্ষ লক্ষ বৈজ্ঞানিক অবিরাম গবেষণা করে যাচ্ছে, কিন্তু প্রায় সবই আগের কোন মৌলিক গবেষণার বর্ধিতরুপ নিয়ে, অনেক বছর ধরে যুগান্তকারী মৌলিক আবিষ্কার হচ্ছে না বললেই চলে।

হোটেল পেন্সিওন হয়ে স্প্রী নদীর উপর দিয়ে যে রাস্তাটা “বার্লিন ভিক্টরি কলাম” স্কয়ারের দিকে এসেছে সেটার পাশের বিস্তির্ণ এলাকা নিয়ে গড়ে তুলা হয়েছে সম্মেলন কেন্দ্রভবন। একপাশে স্প্রী নদীর মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য আরেক দিকে শত বছরের ঐতিহ্য বহনকারী “বার্লিন ভিক্টরি কলাম”; একবিংশ শতাব্দির স্থাপত্ত্বশৈলীর উৎকর্ষতার উজ্জ্বল নিদর্শন এই কেন্দ্র ঐতিহ্য আর প্রকৃতি দুয়ে মিলে হয়ে উঠেছে অভূতপূর্ব।

পড়ন্ত বিকেল, পঞ্চাশোর্ধ এক বৃদ্ধ সম্মেলন কেন্দ্রের মূল চত্বর পেরিয়ে নদীর ধারে একটি বেঞ্চে বসে আছেন। বিষণ্ণ। তাকিয়ে আছেন নদী পেরিয়ে দুরের ঐ ঘন বনের দিকে, উদাস নয়ন। দুপুর থেকে উনি এখানে আছেন, কি যেন একটা দ্বিধা তাকে চেপে ধরেছে। হঠাৎ হাতের ঘড়িটা টিং টিং করে বেজে উঠে, সময় হয়ে গেছে, আর বসে থাকা যায় না, ধিরে ধিরে উঠে দাড়ালেন সব দ্বিধা ঝেড়ে। এখন আর পিছিয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই।

হাজার হাজার মানুষ কিন্তু কোন সাড়াশব্দ নেই, যেন ঝড়ের পূর্বাভাস, সবার মধ্যেই কেমন যেন একটা চাপা উত্তেজনা, একটা গুজব অনেকের কানে এসেছে কোন এক অখ্যাত বৈজ্ঞানিক না কি বিজ্ঞানের চরম আবিষ্কারটি করে ফেলেছেন। কোন দিকে না তাকিয়ে স্টেজে উঠেলেন বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক, একেবারে সাদামাটা বেশভুসা। মুঠোর মধ্যে ধরে থাকা কলমসদৃশ ডিভাইজটি পেনজেক্টারটা চালু করে দেয়ালে ফোকাস করে শুরু করেন লেকচার।

“পঞ্চইন্দ্রীয়ের ধারনা সভ্যতার শুরু থেকে, এগুলো হলো, স্পর্শানুভূতি, স্বাদ, শ্রবনানুভুতি, দৃষ্টি ও ঘ্রাণ। এইসবগুলোই হলো ইন্দ্রীয় গাহ্য কিন্তু আমাদের আরেকটা ইন্দ্রীয় আছে বলে ধারনা করা হয়, কিন্তু বিজ্ঞান এখন পর্যন্ত এটাকে স্বীকৃতি দেয়নি, এটা হলো, “ষষ্ঠ ইন্দ্রীয়”। বিজ্ঞান স্বীকৃতি দেয়নি বলার চেয়ে বলা ভালো গ্রহনযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। মূলত মনে করা হয় এই ইন্দ্রীয়বলে মানুষ ভবিষ্যৎ অনুমান করতে পারে। এত বছরে সভ্যতার এই চরম উৎকর্ষতার পরেও এই ব্যাপারটা অনাবিষ্কৃত থাকার কারণ হলো এ বিষয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা না হওয়া এবং যতটুকুই হয়েছে শুরু থেকেই একটা ভুলকে কেন্দ্রকরে এগিয়ে যাওয়া।

ভুলটা হলো, এটাকে ষষ্ঠ-ইন্দ্রীয় না ধরে, ধরতে হবে সপ্ত-ইন্দ্রীয়। প্রকৃতপক্ষে ষষ্ঠ-ইন্দ্রীয় হলো আমাদের স্মৃতি। এই স্মৃতি হতে পারে দুটি পর্যায়ে, একজনের সমগ্রজীবনের প্রত্যক্ষ স্মৃতি আর বংশ পরম্পরায় জিনের মধ্যে ধারন করে রাখা হাজার হাজার বছরের পরোক্ষ স্মৃতি। পঞ্চইন্দ্রীয়ের সাথে এই ষষ্ঠ-ইন্দ্রীয় একটি নির্দিষ্ট কম্পনাঙ্কে প্রকম্পিত হলে আমাদের ভবিষ্যৎ অনুমান করার ক্ষমতা সপ্ত-ইন্দ্রীয়ের প্রকাশ ঘটে, তবে তা খুবই অল্পমাত্রায়; এভাবে যখন তা সাত মাত্রায় পৌছুবে তখন এর পরম মান পাওয়া যাবে।
আমি কম্পিউটার সিমুলেসন করে দেখেছি পঞ্চইন্দ্রীয় যত প্রখর হবে আর সেই সাথে স্মৃতি যত সমৃদ্ধ হবে তত নির্ভুল ভবিষ্যদ্বানী করা সম্ভব।

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে যুগে যুগে কিছু মহাপুরুষ জন্মেছেন যাদের এই সপ্তইন্দ্রীয় ছিলো অত্যন্ত প্রখর, মানুষের ক্ষেত্রে যেহেতু পঞ্চইন্দ্রীয়ের ক্ষমতা প্রায় একই রকম; তাই এইসব মহাপুরুষদের সাথে সাধরন মানুষের পার্থক্য ছিলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ স্মৃতি শক্তি। উনারা সবাই ছিলেন অসামান্য মেধাবী, যার কিছুটা ছিলো জেনেটিক্যালি পাওয়া আর বাকিটা চর্চা ও ধ্যান।

এখন যদি আমরা পঞ্চইন্দীয় ও ষষ্ঠইন্দ্রীয়কে একটি সিস্টেমের ছয়টি ইনপুট হিসাবে কল্পনা করি, তাহলে তার আউটপুট হলো সপ্ত-ইন্দ্রীয়। আসুন এবার আর একটু জটিল সিস্টেম আলোচনা করি। এই ছয়টি ইনপুট যদি অসীম হয় এবং একটি আউটপুট যদি আরেকটা সিস্টেমে ইনপুট হিসাবে প্রবেশ করাই তাহলে অষ্টম-ইন্দ্রীয় হিসাবে আরেকটা আউটপুট পাবো। এভাবে চলতে থাকলে সপ্তম বারে গিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ বানীর সক্ষমতা অসীম হয়ে যাবে। গানিতিক ভাবে,

ধরি, পাঁচটি ইন্দ্রীয় ফাংশন A, B, C, D ও E এর মান অসীম=অ;
দুনিয়ার তাবৎ জ্ঞান একটি মেমরী, M এ জমা আছে।
আর, আউটপুট সপ্ত-ইন্দ্রীয়, X
এবার এই ছয়টি ইনপুটকে যদি ফাংশনের মাধ্যমে একে প্রকাশ করি তাহলে সেটা দাঁড়ায়,

প্রথম মাত্রার, X1=F(A=অ, B=অ, C=অ, D=অ, E=অ, M=অ)
দ্বিতীয় মাত্রার, X2=F(A=অ, B=অ, C=অ, D=অ, E=অ, M=অ, X1)
তৃতীয় মাত্রার, X3=F(A=অ, B=অ, C=অ, D=অ, E=অ, M=অ, X2)
……………….
………………
সপ্তম মাত্রার, X7=F(A=অ, B=অ, C=অ, D=অ, F=অ, M=অ, X6)

এই সপ্তম মাত্রার, X7 মান অসীম। This is the ultimate result, “Mind of GOD”; যার সন্ধানে মানুষ নানান দিকে হাতড়ে বেড়াচ্ছে লক্ষ বছর। এই কথা বলে বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক চেয়ারে বসে পড়লেন মাথা নিচু করে, ক্লান্ত, বিষণ্ণ, বিধ্বস্ত; যেন উনার উপর অর্পিত কঠিন দায়িত্ব শেষ করে ফেলেছেন এই মাত্র।

পিন পতন নিস্তব্ধতা, পুরা হলরুম জুড়ে, থ মেরে গেছে সবাই, কারো মুখে কোন কথা নেই। কিছুক্ষণ পর আবার উঠে দাঁড়ালেন বৃদ্ধ; আবার শুরু করলেন লেকচার। এবার প্রতিটি ফাংশনের বিসদ ব্যাখ্যা করতে হবে।
……………এইবার ফাংশনগুলোকে ট্রেইন করার জন্য …………………………
………………”

অনেক রাত করে হোটেলে ফিরলেন বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক, সারাদিন অনেক ধকল গিয়েছে ব্রেনের উপর দিয়ে; রাতে কিছু না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছেন। পরবর্তী তিন দিন রুম থেকে বের হননি। গভীর রাত, হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যায় দরজার কড়া নাড়ার শব্দে। উফ! এত রাতে আবার কে আসল? একটু বিরক্তভাব নিয়েই দরজা খুললেন; খুলেই জমে গেলেন বরফের মত; অজানা ভয়ের একটা স্রোত শিরদাঁড়া বেয়ে পায়ের পাতা পর্যন্ত চলে গেলো।

৩.
শায়লা চৌধুরী, লিয়াকত হাসান চৌধুরী সাহেবের মেয়ের ঘরের একমাত্র নাতনী। জন্মের সময় মা মারা গেলে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে কানাডা প্রাবসী, দেশে আর আসবেন বলে মনে হয় না। তার পর থেকে নানার বাসায় থেকেই পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছে শায়লা। তুখোড় মেধাবি হলে কি হবে, নানার লাই পেয়ে পেয়ে মাথায় উঠেছে। সারাদিন ল্যাপটপ আর ইন্টারনেট নিয়ে পড়ে থাকে। এই বয়সেই হ্যাকিং এর নেশায় পেয়ে বসেছে। কয়েকজন মিলে হ্যাকিং এর একটি গ্রুপও বানিয়ে ফেলেছে। মাঝেমাঝে ফজলুল করিমকে নিজেদের কৃতিত্বের কথা খুব গর্ব করে শোনায়। ওদের গ্রুপে নাকি হ্যাকিং এর পারদর্শিতার উপর ভিক্তি করে ব্যাল্ট দেওয়া হয়। ঐদিন চোখ বড় বড় করে বলছিলো, “জানেন ভাইয়া, পঞ্চম মাত্রার মাত্র তিনটা সিস্টেম হ্যাক করতে পারলে আমি ব্ল্যাক বেল্ট পেয়ে যাব”

“উফ! হ্যাকিং হ্যাকিং করতে করতে মেয়েটা না আবার পাগল হয়ে যায়! অবশ্য এখনো তাকে খুব একটা সুস্থ মনে হয় না, নির্ঘাত মাথায় কিছু সমস্যা আছে। না হলে আমি ওর নানাকে ডাকি চাচা বলে আর সে আমাকে ডাকে ভাই!” ভাবে ফজলুল করিম। এই যে এখন! এখনো যে অংকটা করতে দিয়েছে সেটা না করে খাতায় বাইনারি কোডে কি সব হাবিজাবি লিখছে! একবার ভাবলো একটা বিকট ধমক দিবে; অনেক কষ্টে রাগটা সংবরণ করে বলল, “কি করছ তুমি এগুলো? তোমার পরীক্ষা আর তিন মাস বাকি, আর এই পরীক্ষাটাই আসল কথা না, তার পর শুরু হবে এডমিশন টেষ্ট। তুমি যেভাবে সময় নষ্ট করছ, আমি নিশ্চিত তুমি ভালো কোথাও চান্স পাবে না”

-কি যে বলেন না! পরীক্ষা আমার খুবই ভালো হবে, আর এডমিশন টেষ্ট? ওটা নিয়েতো আমি আরও ভাবি না, ঠিকই দেশের সেরা ভার্সিটিতে চান্স পেয়ে যাবো, আপনি দেখেন।

“ধ্যাৎ! ও না পড়লে আমার কি? আমার দায়িত্ব প্রতিদিন দুই ঘন্টা করে ওকে পড়া দেখিয়ে দেওয়া”, ভাবে সে মনে মনে। “গত পাঁচ বছরের মধ্যে একদিনও দেখলাম না স্থির হয়ে একটু পড়তে বসতে; অথচ পরীক্ষায় বরাবরই প্রথম হয়ে এসেছে। মেয়েটির মেধা আছে, যদি একটু মনোযোগ সহকারে পড়ালেখাটা করতো না জানি আরও কত ভালো ফলাফল করতো!”

-আচ্ছা ভাইয়া, “তোমাদের ডিপার্টমেন্টে কোন ছাত্রী নেই?”

হুমম! আসলে মেয়েরা ফিজিক্স একটু কমই পড়তে চায়। আমরা যখন ভর্তি হই তখন আশিটা সিটের মধ্যে মেয়ে ভর্তি হয়েছিলো দশ কি বার জন। এখন ফোর্থ ইয়ার পর্যন্ত টিকে আছে মাত্র পাঁচ জন। কেন? হঠাৎ করে এ প্রশ্ন করছো কেন?

-না, এমনিতেই। মনে হলো, তুমি যে পরিমান ক্ষ্যাত আর গেয়ো, নিশ্চয় তারা সবসময় তোমাকে খেপায়?

ঠিকই বলেছ। আর বলো না। নীলা নামের একটা মেয়ে সেই ফাস্ট ইয়ার থেকে আমার পিছে লেগে আছে। আমাকে দেখলেই শিস দিয়ে উঠে, আর ডাকে “ফজু মাম্মা, কি খবর? বাদাম খাবা?” উফ! চরম বিরক্তিকর। আমাকে দেখলেই বাদাম খাওয়ার কথা কেন বলবে? ফাজিল মেয়ে কোথাকার! রাগে গা জ্বলে যায়। তবে খুবই ব্রিলিয়েন্ট, আমি যদি টিচার হিসাবে জয়েন না করি তাহলে নির্ঘাত সে হবে। একটু অবাক হয় ফজলুল, শায়লার সাথে সে এসব নিয়ে কেন কথা বলছে? নিজের উপর একটু বিরক্তও হয়।

-আজ আর পড়বো না; বলেই গটমট করে উঠে চলে যায় শায়লা।

ধরাম করে বেড রুমের দরজা লাগানোর শব্দ শুনতে পায় ফজলুল, পড়ার টেবিলে কিংকর্তব্যবিমূড় হয়ে বসে থেকে ভাবে, “অদ্ভুত তো! শায়লাকে তো কখনো এমন উত্তেজিত হতে দেখিনি!” হঠাৎ কি মনে করে টেবিলের উপর ফেলে রাখা শায়লার লেপটপটা কাছে টেনে নেয় সে; কেন যেন তার মনে হচ্ছে আজই সেই কাঙ্খিত ইমেইলটি পেয়ে যাবে। ইমেইলটা খুলেই চোখ ছানাভরা হয়ে যায় তার! এক নিশ্বাসে এক পৃষ্ঠার ইমেলটা পড়ে ফেলে সে, ততক্ষণে তার কান দিয়ে গরম বাতাস বেরুচ্ছে, আর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।

৪.
চীন! গত একশ বছরে উঠে গেছে উন্নতির চরম শীখরে, এক সময়ের দরিদ্র, অভাবী, অবহেলিত জাতি আজ বিশ্বের দুই পরাশক্তির একটি। বিশাল বিশাল পাহাড় পর্বত আর খানা খন্দে ভরা চীনের কেন্দ্রে অবস্থিত সানঝি প্রদেশ, এই প্রদেশের প্রতিটি শহর যেন এক একটি প্রাকৃতিক দূর্গ। এই সানঝি প্রদেশের তংচোয়ান শহরের আট কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে তাইহু হৃদের পাড়ে অবস্থিত জিদি উপশহর। তিন দিকে পাহাড় আর একদিকে হৃদ দিয়ে ঘেরা প্রায় ৩৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ছোট এই উপশহরটিকে প্রকৃতি যেন নিজে হাতে ঢেলে সাজিয়েছে, যেমন মনোরম নৈসর্গিক দৃশ্য তেমন দূর্গম। এমন কি শহরের উত্তর দিকে যে হৃদটা আছে, তার চার পাশও পাহাড়ে ঘেরা; যোগাযোগের একমাত্র উপায় আকাশ পথ।

চার বছর আগে অল্প কিছু লোক এই শহরে বাস করতো, হঠাৎ একমাসের নোটিসে তাদের সবাইকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। তারপর থেকে শুরু হয় শত শত কার্গো প্লেন, চপার আর হেলিকাপ্টারের আনাগোনা। কয়েক মাসের মধ্যে তিন বাহিনীর সমন্বয়ে ছোট এই শহরকে ঘিরে গড়ে গড়ে উঠে শতাব্দীর সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা ঘাটি। এয়ারপোর্ট, সেনা ছাউনি, মিসাইল, যুদ্ধবিমান, ক্যান্টনমেন্ট ইত্যাদি দেখে এটাকে শুধু প্রতিরক্ষা দুর্গ ভাবার কোন কারণ নেই, এটার আড়ালে আসলে পরিচালিত হচ্ছে চীনের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং গোপনীয় সায়েন্স প্রজেক্ট। শত্রু স্যাটেলাইটের চোখকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য এই প্রজেক্টের গবেষণাগার পুরোটাই হৃদের নিচে বানানো হয়েছে। প্রায় পনের বর্গ-কিলোমিটার আয়তনের এই হৃদের এক পঞ্চমাংশ এলাকা নিয়ে এই গবেষণাগারের বিস্তৃতি।

প্রজেক্ট নস্ট্রাডমাসের চিফ সাইন্টিস্ট, সরদার ফজলুল করিম চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছেন সেই সকাল থেকে। আজ প্রজেক্ট ভিজিটে আসবেন বিজ্ঞান একাডেমির প্রধান সুসান লী, তিন বাহিনীর যুগ্ম প্রধান এডমিরাল কিম ঝালী, ডিফেন্স সেক্রেটারি এবং আরও কয়েকজন সরকারী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। এদের মধ্যে সুসান লী ও এডমিরাল কিম ঝালীকে সরদার ফজলুল করিম আগে থেকেই চিনেন। এই দুইজন প্রতি ছয় মাস পর পর এসে প্রজেক্টের অগ্রগতি আর নিরাপত্তা ব্যাবস্থা স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করে যান।

সুসান লীর সাথে বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক, সরদার ফজলুল করিমের প্রথম দেখা হয়েছিলো জার্মানির ফিয়াল্লা হোটেলে, গভীর রাতে। দরজা খোলার পর শান্ত মৌন ভঙ্গিতে বলেছিলেন, “আসতে পারি?” পিছনে মূর্তির মত দাঁড়িয়ে ছিলেন এডমিরাল কিম ঝালী যার চোখের দিকে তাকিয়ে ভয়ে জমে গিয়েছিলেন বৃদ্ধ, এমন ভয়ংকর দৃষ্টি মানুষের হতে পারে ধারনা ছিলো না তার।

“দেখুন, গত তিন দিন আমি চায়নার নামকরা বৈজ্ঞানিক, প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয় ও সরকারী নানান ডিপার্টমেন্টের সাথে দিনরাত আলোচনা করে একটা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছি, প্রজেক্টের নাম হচ্ছে ‘কৃত্বিম নস্ট্রাডমাস’, আমি চাই আপনি এই প্রজেক্টের চিফ সাইন্টিস্ট হিসেবে জয়েন করেন”, কোন রকমের ভনিতা না করে সরাসরি মূল প্রসঙ্গে চলে গেলেন সুসান লী।

-প্রজেক্টের নাম শুনেই এর ধরন সম্পর্কে কিছুটা অনুমান করে ফেললেন, ফজলুল করিম। বুঝতে পারার পরেও জিজ্ঞেস করলেন, “ঠিক আছে, কিন্তু আমাকে কেন?”

আপনার আবিষ্কৃত সূত্রের উপর নির্ভর করেই তো এই প্রজেক্ট। আর আমরা জানি আপনি প্রতিটি ইন্দ্রীয়ের ফাংশনগুলো উপস্থাপন করলেও যে ফাংশনটা ছয়টি ইন্দ্রীয়কে একিভূত করে সেটাই প্রকাশ করেন নি। তাই আপনাকে আমাদের দরকার। আর প্রজেক্ট চলা কালে এই ফাংশনগুলোর আপডেট, মডিফিকেশন ইত্যাদি নানান ধরনের প্রতিকূলতা আসবে তখন আপনাকেই এইগুলো সমাধান করতে হবে। নিজে একজন বৈজ্ঞানিক হিসাবে আমি অনুভব করতে পারি থিউরির প্রয়োগ দেখে যাওয়া একজন বৈজ্ঞানিকের কাছে কতটা কাঙ্খিত। আর প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকে বিচার করলে শুধুমাত্র আমেরিকা ও চায়না এ দু’দেশের পক্ষেই সম্ভব এই থিউরির প্রযোগ করা। এখন ভেবে দেখুন আপনি কি করবেন।

-বৃদ্ধের হাতে আসলে দ্বিতীয় কোন পথও খুলা ছিলো না, দেরি না করে বললেন, “কবে যেতে হবে?” অবশ্য রাজি হওয়ার পিছনে আরেকটা জোরাল কারণ ছিলো। ফজলুল করিমের সপ্তইন্দ্রীয়ের বলে মনে হয়েছিলো, এই প্রজেক্টের সফলতার উপর নির্ভর করছে মানব সভ্যতার টিকে থাকা, সামনে ভয়াবহ বিপদ এগিয়ে আসছে।

এক্ষণি, নিচে গাড়ি আর এয়ারপোর্টে জেট অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।
দেখতে দেখতে চারটি বছর কেটে গেছে, মনে হয় এইত সেদিনের ঘটনা! ল্যাবরেটরির নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসে আনমনে অতীত ঘাটছিলেন, হঠাৎ থ্রীডিভিফোন বেজে উঠলে বাস্তবে ফিরে আসেন ফজলুল করিম। ভিজিটররা চলে এসেছেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই লেকের নিচে মূল টানেলের প্রধান ফটকদিয়ে প্রবেশ করবেন, এরিয়া সিকিউরিটির চিফ থ্রীডিভিফোনে জানালেন। ফজলুল করিম বিলম্ব না করে সুপারক্যাপে চড়ে এগিয়ে গেলেন তাদেরকে অভ্যর্থনা করার জন্য।

“হ্যালো! মিস্টার সরদার”, বলে সহাস্যে দুহাত বাড়িয়ে তার দিকে এগিয়ে আসলেন বিজ্ঞান একাডেমির প্রধান সুসান লী। ঠিক পিছনেই এডমিরাল কিম ঝালী কে দেখে পুরানো সেই ভীতিটা আবার অনুভব করলনে ফজলুল করিম। এই সমস্যাটা কিছুতেই ধরতে পারছেন না; ঝালী কে দেখলেই কেন যেন ভেতর ভেতর ভীষণ রকমে চমকে উঠেন, ভয়ের একটা স্রোত বিদ্যুত চমকের মত মেরুদন্ডের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পায়ের পাতা পর্যন্ত চলে যায়।

-“আপনাকে আবার দেখতে পেয়ে ভালো লাগলো, স্যার” হাসিমুখে সুসানের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা করমর্দন করে বললেন।

প্রজেক্টের অগ্রগতি কেমন? কথা বলতে বলতে দুজনে একটি সুপারক্যাপে চড়ে বসলেন। পিছনে পিছনে আরও তিনটি সুপারক্যাপে চড়ে অনুসরন করতে থাকেন অন্যরা।

-এখন পর্যন্ত পরিকল্পনা মাফিক সবকিছু চলছে, আশা করছি চার মাসের মধ্যে ডাটা ফিডিং স্টেজ শুরু করতে পারবো।

কথা বলতে বলতে একটি টানেলের শেষ প্রান্তে পৌছে যায় সবাই। ফজলুল করিম পাসওয়ার্ড প্রবেশ করালে কয়েক সেকেন্ড পর চল্লিশ সেন্টিমিটারের পুরু ইস্পাতের দরজা সাই করে উপরে উঠে যায়। সুপারক্যাপ নিয়ে সবাই প্রায় একশ-বাই-একশ বর্গমিটারের বিশাল আকৃতির একটি কক্ষে প্রবেশ করে। সূর্যমুখি ফুলের পাঁপড়ির মত ছড়িয়ে থাকা এই ল্যাবরেটরির নিয়ন্ত্রন কক্ষ এর কেন্দ্রে অবস্থিত, যার প্রতিটি পাপড়ি একেকটি একশ-বাই-একশ বর্গমিটারের ইউনিট; প্রত্যেকটি ইউনিট টানেলের মাধ্যেমে কেন্দ্রের সাথে যুক্ত। একে একে সবগুলো ইউনিট ঘুরে দেখলেন সবাই, প্রতিটি ইউনিটেই একযোগে কাজ এগিয়ে চলছে। সর্বমোট বারটি ইউনিট, ছয়টি ইন্দ্রীয়ের জন্য ছয়টি ইউনিট, আর ছয়টা রিজার্ভ হিসাবে রাখা হবে ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য।

চারদিকে বড় বড় মনিটরে দেখা যাচ্ছে প্রতিটি ইউনিটে বিপুল উদ্যমে কাজ করছে শত শত বৈজ্ঞানিক, ইঞ্জিনিয়ার, টেকনিশিয়ান। অকল্পনিয় ক্ষমতা সম্পন্ন অত্যাধুনিক সব লক্ষ লক্ষ প্রসেসর, সেন্সর আর মেমরি সেটাপ করা হচ্ছে, কাজ হচ্ছে দিন রাত মিলিয়ে দুই সিফটে, নিরলস। প্রতিটি ইউনিট আবার বিশ্বের সব ডিজিটাল লাইব্রেরি, ওয়েবসাইট, ব্লগ, অনলাইন নিউজপেপার, ট্রাফিক সিগনাল, স্ট্রিট ভিডিউ ক্যামেরা, সার্ভার, স্যাটেলাইট ইত্যাদির সাথে হাইপারনেটের মাধ্যমে যুক্ত।

সব খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছিলেন সুসান লী, আচমকা প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন ফজলুল করিমের চোখে চোখ রেখে, “ডাটা ফিডিং শুরু হলে তো চলবে দুই মাস তাই না? উত্তরের অপেক্ষা না করে নিজেই বলে চললেন, “তার মানে ছয় মাস পর আমরা প্রথম এক্সপেরিমেন্ট করতে পারবো?”

-আশা করছি স্যার।

পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা এডমিরাল কিম ঝালী এর ঠোঁটে কোনায় একচিলতে হাসি দেখা দিয়েই চোখের পলকে মিলিয়ে গেলো, ঠিক সেই মুহূর্তে তার দিকে নজর না থাকলে ফজলুল করিমের চোখে এটা ধরা পড়তো না। ভয়ের সেই অনুভুতটা আবার টের পেলেন। মানুষের মুচকি হাসিও এতটা পৈশাচিক হয় কি করে?

৫.
আজ প্রায় এক বছর ফজলুল করিম আমেরিকায়, পদার্থ বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ সম্মানসূচক স্কলারশীপ “প্রেসিডেন্টশিয়াল স্কলারশীপ” নিয়ে ষষ্ঠ ইন্দ্রীয়ের উপর গবেষণা করছে। ও চলে যাওয়ার পর প্রথম কয়েকমাস প্রচন্ড নিসঙ্গতায় ভুগে শায়লা, নিজের ঘর থেকে বলতে গেলে বেরই হয়নি। আচ্ছা লোকটা কি বোকা? কিছুই কী বুঝে না? না কি স্বার্থপর? অভিমানে শায়লা আর ঢাকাতেই থাকেনি, চলে এসেছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেক্ট্রনিক্স ও কমিউনিকেশন সাবজেক্টে এডমিশন নিয়ে। প্রথম প্রথম ভুলে থাকার অনেক চেষ্টা করেছে, পারেনি; শেষে একদিন বাধ্য হয়ে লিখে ফেলে একটা চিঠি, সত্যিকারের চিঠি, কাগজে-কলমের চিঠি। পোষ্ট করতে গিয়েও অজানা কারনে আর করতে পারেনি, পোষ্ট অফিসেই ছিড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে খামসহ। ফেরত চলে এসেছে। পরের দিন আবার লিখতে বসে, এবারও পোষ্ট করতে পারেনি। আবার পরের দিন চেষ্টা করে, পারেনি। চৌতুর্থ দিনশেষে একটা অভিনব আইডিয়া তার মাথা আসে, আচ্ছা “যদি এমন করি যে চিঠিও লিখলাম কিন্তু সে বুঝতেও পারলো না কি লিখছি, বুঝার জন্যে আবার আমার কাছেই আসতে হবে; তাহলে কেমন হয়?” মনে মনে ভাবে শায়লা।

নতুন এক খেলায় মেতে উঠে শায়লা। প্রতি মাসে একটি করে চিঠি লিখতে থাকে ফজলুল করিমের কাছে, প্রতিটিতে লুকান থাকে একটি করে গোপন মেসেজ, যে মেসেজ উদ্ধার করা একমাত্র শায়লার পক্ষেই সম্ভব।

-হঠাৎ একদিন শায়লাকে ইমেল করে ফজলুল করিম, “শায়লা, গত ছয় মাসে তোমার কাছ থেকে ছয়টি চিঠি পেয়েছি, কিন্তু এইগুলোর তো কোন মানে খুঁজে পাচ্ছি না। তুমি চিঠিতে যা লিখে পাঠাচ্ছ সেটা তো ইমেইলেও পাঠাতে পারো? এভাবে চিঠি লেখার মানে কি?”

“গাধাটা চিঠির মর্ম কি বুঝবে?” মনে মনে ভাবে শায়লা। ইমেইলের জবাবে লিখে, “প্রতিটি চিঠিতে একটা লুকানো মেসেজ আছে। দেখি বের করতে পার কি না। তাহলে বুঝবো কত বড় তোমার ষষ্ঠ ইন্দ্রীয়! আর যদি না পর তাহলে যখন দেশে ফিরবে সবগুলো চিঠি সাথে নিয়ে এসো আর নাকে খত দিয়ে আমার কাছ থেকে বুঝে নিও”

-মেয়েটার মাথা থেকে হ্যাকিংটা আর গেলো না, আর দিনদিন একটু বেয়াদবও হয়ে যাচ্ছে কেমন! ভাবে ফজলুল করিম। কিন্তু ঠিকই আবার চিঠিগুলো নিয়ে বসে যায় মর্মোদ্ধারে।

চার বছর পর দেশে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করে ফজলুল করিম। আমেরিকাতে ভালো সুযোগ পেয়েছিলো, কিন্তু মন বসাতে পারেনি। সে চেয়েছে শিক্ষকতার পাশাপাশি দেশে বসেই নিড়িবিলি গবেষণা করে যাবে। একদিন ব্যাগ ভর্তি শায়লার পাঠানো সব চিঠি নিয়ে হাজির হলো তার বাসায়।

-অনেক চেষ্টা করেছি। যত ধরনের এনক্রিপশন-ড্যাক্রিপশন এলগোরিদম আছে সব গুলো দিয়ে চেষ্টা করেছি, লেটেস্ট সব সফটওয়ার ব্যবহার করেছি। ফলাফল শূন্য। আসলেই কি কোন লুকানো মেসেজ আছে? না কি তুমি আমার সাথে মজা করেছ?

“তাহলে, তুমি হার স্বীকার করছো?” মুচকি হেসে বলে শায়লা।

-আচ্ছা যাও, স্বীকার করছি।

ঠিক আছে, স্তুপ একটা চিঠি টেনে নিয়ে পড়তে শুরু করলো শায়লা,

“সমরসের পূর্ণ আলোর সপ্তকাহনে দিলেম তিনশ দুটি নীলপদ্ম। কিন্তু কি বিপুল তাচ্ছিলে তা ফিরিয়ে দিলে তুমি, নিষ্ঠুর! এই যদি ছিলো তব হৃদয়ে তবে কেন এই অভিনয়? প্রথম জীবনে যদি নাই বা পেলাম, তবে কি পরজনমে? মরে কি তবে হবো অমর, রইবো তব হৃদয়ে? সঙ্গে করে নিয়ে যাব সুখস্মৃতি আমাদের যত হল না; হল না, হেরেই জিতে গেলে তুমি পাষাণ”

কবিতার মত মনে হলেও, আসলে তা নয়, শিরনামটা দিয়ে বাংলা সাহিত্যের ক্ষ্যাতনামা লেখক সমরেশ মজুমদারের “সাত কাহন” বইটির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। আর ২০৩ টি নীলপদ্ম মানে বুঝানো হয়েছে এই বই এর ২০৩ নাম্বার পৃষ্ঠা। এবার চিঠিটির প্রথম বাক্যটি বাদে পরের বাক্যগুলোর প্রথম শব্দ সাতকাহন বই এর ২০৩ নাম্বার পৃষ্ঠার কত নাম্বার শব্দ সেটা গুনে বের কর। সেই হিসাবে, “কিন্তু, এই, প্রথম, মরে, সঙ্গে, হল” এই শব্দগুলি যথাক্রমে ১৯, ২০, ২১, ১৬, ৯ ও ৪ নাম্বার শব্দ। এখন A থেকে Z পর্যন্ত বর্ণগুলোকে ১,২,৩ এভাবে ক্রমান্বয়ে নাম্বারিং করলে, ১৯, ২০, ২১, ১৬, ৯ ও ৪র্থ সংখ্যাগুলোর মানে দাঁড়ায়, S,T,U,P,I,D কিছু বুঝলে? বলেই হি হি করে হেসে উঠে শায়লা।

মেয়েটার কি মাথা পুরাই খারাপ হয়ে গেলো? নাহলে এমন পাগামি করার মানে কী? ভাবে ফজলুল করিম। তুমি বলতে চাচ্ছ যে এ পর্যন্ত তুমি যত কবিতা, চিঠি, কাহিনী লিখে পাঠিয়েছ সবগুলোতে এভাবে আমাকে গালি দিয়েছ?

খিলখিল করে হেসে উঠলো শায়লা। বলল, এতক্ষণে বুঝেছ? বলেই দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায় সে। পিছনে হতবিহ্ববল হয়ে বসে থাকে ফজলুল করিম।

৬.
চারদিকে খুশির আমেজ বয়ে চলছে, সবাই একটু relax ভাব, সেই সাথে চাপা উত্তেজনা। টানা সাড়ে চার বছর কাজ করার পর আজ তিন দিনের ছুটি চলছে “প্রজেক্ট নস্ট্রাডমাসে”। গতকাল হয়ে গেলো প্রজেক্টের উদ্ভোধন, মাননীয় প্রেসিডেন্ট ঝিনঝিং সান নিজে উদ্ভোধন করেছেন। প্রথমেই বৈজ্ঞানিক ফজলুল করিমকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছেন, “মিস্টার করিম, শুভেচ্ছা। আপনি অসাধ্য সাধন করেছেন। চীনা জাতি আপনার কাছে ঋণী থাকবে হাজার বছর”।

ফজলুল করিম মৃদু হেসে বললেন, “ধন্যবাদ, মিস্টার প্রেসিডেন্ট। আমি চাই শুধু চীনা জাতি না, এই আবিষ্কারের সুফল ভোগ করুক সমগ্র মানবজাতি।”
প্রেসিডেন্ট ফজলুল করিমের শেষের কথাগুলোকে এড়িয়ে গিয়ে বললেন, “আপনার এই নস্ট্রাডমাস কত বছর পর্যন্ত নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারবে?”

এখন পর্যন্ত এর ক্ষমতা তিনশ বছর, তবে এই ক্ষেত্রে ভুল হওয়ার সম্ভবনা পঞ্চাশ ভাগ। তবে প্রায় নির্ভুল ভাবে ভবিষ্যৎ বানী করতে পারবে আগামী দুই’শ বছর পর্যন্ত।

“স্যার, সব রেডি, আপনি যে কোন কিছু জানতে চাইতে পারেন আমাদের এই নস্ট্রাডমাসের কাছে”, প্রেসিডেন্টকে লক্ষ করে বললেন এডমিরাল কিম ঝালী।

সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলো প্রেসিডেন্ট কি জানতে চান অদ্ভুত এই যন্ত্রের কাছে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে প্রেসিডেন্ট খুব স্পষ্ট করে উচ্চারণ করলেন,

“আগামি…দুইশত…বছরে…মানবজাতির…সবচেয়ে…গুরুত্বপূর্ণ …ঘটনা…কোনটি…হবে?”

টানা এক মিনিট কোন সারাশব্দ নেই, ঠিক তার এক সেকেন্ডপর মিষ্টি একটি মেয়ে কণ্ঠে নস্ট্রাডমাস উত্তর দিলো, “ধন্যবাদ, আপনার প্রশ্ন গ্রহণ করা হয়েছে, প্রসেস চলছে, উত্তর পেতে সময় লাগবে ৮২ ঘন্টা ২০ সেকেন্ড ৩৫ মিলিসেকেন্ড”

প্রেসিডেন্ট ঝিনঝিং সান মুচকি হেসে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “জ্যান্টেলম্যান, আমি জানি আপনারা গত সাড়ে চার বছর কি পরিমান পরিশ্রম করেছেন। আপনাদের এই অবদান, আত্মত্যাগ ভুলার নয়। আমি আজ থেকে তিনদিনের ছুটি ঘোষণা করছি। তিন দিন পর আমরা আবার এখানে একত্রিত হবো প্রশ্নের উত্তরের জন্য, সে পর্যন্ত ছুটি উপভোগ করুন”

ছুটি একেবারেই উপভোগ করতে পারেন নি ফজলুল করিম সরদার, অসংখ্যা চিন্তা ঘুরে ফিরে আসছে। এই প্রযুক্তি শুধু চীনাদের হাতে তুলে দিয়ে ভুল করলাম কি? কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিলেন না, একটা দ্বিধা সারাক্ষণ কুঁড়েকুঁড়ে খাচ্ছিলো তাকে। কি উত্তর দিবে নস্ট্রাডমাস? তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাব্য তারিখ? পারমানবিক যুদ্ধের ভয়াবহ পরিনতি? নাকি বৈজ্ঞানিক এমন কোন আবিষ্কার যেটা সমগ্র মানব জাতিকে এক কাতারে নিয়ে আসবে? নাকি ভিনগ্রহের প্রাণীর সন্ধান আবিষ্কার ও ওদের সাথে যোগাযোগের বর্ণনা?

তিন দিন পর; চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে সবাই হাজির হয় প্রজেক্ট নস্ট্রাডমাসের নিয়ন্ত্রন কক্ষে, সবার মনেই বয়ে চলছে ঝড়! কি বলবে নস্ট্রাডমাস। পিনপতন নিস্তব্ধতা সমগ্র রুম জুড়ে। হঠাৎ চরম এই নিরবতা ভেঙ্গে দিয়ে সুরেলা কণ্ঠে কথা বলে উঠলো নস্ট্রাডমাস।

“আগামি দুইশত বছরে মানবজাতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, ২১৫৮ সালের নভেম্বরের ২০ তারিখে ১৪:৪৬:২০ সময়ে পৃথিবীতে মৃত্যু হার হবে শূন্য”

হতবিহ্বল হয়ে যায় উপস্থিত সবাই, বিজ্ঞান একাডেমির প্রধান সুসান লীর সবার প্রথমে হতবিহ্বল ভাব কাটিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেন, “মানে? মানে কি ঐদিন মানুষ মৃত্যুকে জয় করবে? প্লিজ সম্পূর্ণ রিপোর্ট প্রকাশ করুন”, উত্তেজনায় উনি ভুলেই গেলেন যন্ত্রকে প্লিজ বলে সম্মোধন করার দরকার নেই।

“নেগেটিভ। ঐটার মানে হলো ঐদিন পৃথিবী থেকে শেষ মানুষটির মৃত্যু হবে, তারপর যেহেতু মৃত্যুর সংখ্যা শূন্য তাই হারও শূন্য হয়ে যাবে। পৃথিবী থেকে মানুষের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কারণ হলো ২০৪৬ সালের ডিসেম্বরের ২০ তারিখে ৮:২০:০৩ সময়ে আমেরিকার আলাস্কার একটি গোপন সামরিক ল্যাবরেটরী থেকে দূর্ঘটনা বসত HAX23 নামের একটি ভাইরাস ছড়িয়ে পড়বে। জেনেটিক্যালি মডিফাই করা এই HAX23 ভাইরাসের বৈশিষ্ট হলো এটা শুধু মাত্র মানুষের ভ্রুনে আক্রমন করবে এবং তিনমাস বয়সের ভ্রুনকে নষ্ট করে গর্ভপাত ঘটাবে। শুধু মাত্র মানুষের দেহেই এই ভাইরাস বংশবৃদ্ধি ঘটাবে কিন্তু পরিবাহিত হবে যেকোন মাধ্যেমে পানিতে ভেসে, পশু পাখির মাধ্যমে, এমন কি বাতাসের মাধ্যেমেও। ২০৪৭ সালে জানুয়ারীর ২৯ তারিখে ১০:৪৫ সময়ে পৃথিবীর সমগ্র মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হবে। এর আর কোন পার্শপ্রতিক্রিয়া নেই”

সবগুলো চোখ একসাথে ঘুরে যায় দেয়ালের উপর টানানো এটমিক ক্যালেন্ডার ও ঘড়িটার দিকে। ওখানে জ্বলজ্বল করছে, “২১ এ ডিসেম্বর ২০৪৬”। সবাই বুঝতে পারে দেরি হয়ে গেছে আর কিছু করার নেই।

“সম্পূর্ণটা একটা পোষ্টে আসছে না, বাকী আংশটা প্রথম কমেন্ট আকারে দিয়ে দিলাম”]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29234728 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29234728 2010-09-03 21:03:20
দেবদূতের ছোট ছোট ভন্ডামীগুলো - ২

১.
ছোট বেলা থেকেই বাবার সাথে আমার সম্পর্ক বন্ধুর মত। শৈশবে একটা সময় কেটেছে কলোনিতে, প্রতি শুক্রবার বাজারে যেতাম বাবার কাধে চড়ে। বাজারে গিয়েই প্রথমে আমাকে কিনে দিতেন আমের আচারের বয়াম, সারা বাজার বাবার কাধে চড়ে ঐটা শেষ করাই ছিলো আমার একমাত্র কাজ। মাঝেমাঝে ইচ্ছে হয় ইস! যদি আবার সেই দিন ফিরে পেতাম! আমাকে যদি সুযোগ দেওয়া হয় শৈশবের কোন একদিনে ফিরে যেতে আমি নির্দিধ্বায় বলবো, “শুধু একটি ঘন্টার জন্য বাবার কাধে চড়ে বাজারে যেতে দাও”।

বাবার বয়স হয়েছে, আমিও আর সেই ছোটটি নেই তার কাধেও আর চড়তে পারি না। এখন কাধে চড়া বাদ দিয়ে যেটা হয় সেটা হলো আলোচনা, নানান বিষয়ে আলোচনা। দেশ, জাতি, অর্থনীতি, সমাজ, ধর্ম, ব্যাবসা আরো কত বিষয়াদি। তবে সবচেয়ে বেশি হয় রাজনীতি নিয়ে, আর যাই হোক বাঙ্গালির ঐতিহ্য বলে কথা! একসময় সক্রিয় বাম রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন; এখনো এমএম আকাশ, মুতিয়া চৌধুরি, মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম এদের নিয়ে আলোচনা করার সময় চোখেমুখে অন্য রকম এক দ্যুতি ঝলমল করে উঠে। অনেক বছর রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে থাকতে এখন উনি ঘোর আওয়ামীলীগার হয়ে উঠেছেন। অবশ্য এখন আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে প্রাক্তন বামদেরই জয় জয়কার।

আমি আবার এই বিষয়ে খুবই লিবারেল। কোনটারই অন্ধভক্ত নই আবার অকারন চুলকানিও নেই। সেই কারনে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বাবার সাথে এটা সেটা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক লেগেই থাকত। যেমন কিছু দিন আগে উনি বললেন, “শেখ হাসিনা একা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তিগুলোকে এক ছাতার নিচে ধরে রেখেছে। হাসিনা না থাকলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী দলগুলো অবস্থা আরও খারাপ হতো”

মনে মনে ভাবলাম এইবার বাগে পেয়েছি; বললাম, “এটা কেমন কথা? মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কি এতই ঠুনকো যে একে কোন এক ব্যক্তির পিছনে আশ্রয় নিতে হবে? এটাত বিশাল এক ব্যার্থতা! বরং, এখন শেখ হাসিনার উচিত দলের অন্য কাউকে সামনে নিয়ে আসা আর এটা জয় না হলে সবচেয়ে ভালো হয়।”

দেখি বাবার মুখটা কেমন পানশে হয়ে গেছে।

এইবার সুযোগ বুঝে মোক্ষম আঘাতটা করলাম, “আর, আমার মতে একমাত্র শেখ মুজিবের মেয়ে হওয়া ছাড়া তার প্রাইমিনিষ্টার হওয়ার আর কোন যোগ্যতা নেই। আর মানুষ এখনো আওয়ামীলীগকে ভোট দেয় নিরুপায় হয়ে। আমার কথাই ধর, তোমার কি মনে হয় আমি বর্তমান আওয়ামীলীগ বা হাসিনা কে ভোট দেই? না। আমি ভোট দেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে; শেখ মুজিবকে। এখানে হাসিনার কোন কৃতিত্ব নেই, বরং ওর লাগামহীন কথা আর ফালতু ব্যক্তিত্বের কারনে অনেক ভোট কমে যায় আওয়ামীলীগের”

চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো বাবা, বলার মত কিছু পাচ্ছিলো ও না।

২.
খাবার টেবিলে, টিভি দেখার সময় বা যেকোন আড্ডায় বাবার সাথে প্রায়ই বিতর্ক হচ্ছে ইদানিং, আর আওয়ামীলীগ/যুবলীগ/ছাত্রলীগের বর্তমান কর্মকান্ডের ফলে আমার তোপের সামনে দাড়াতেই পারছে না ইদানিং।

তিন চারদিন আগে টিভি দেখতে দেখতে সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন বেকায়দা ভাবে। আমি উঠে গিয়ে আলত করে মাথায় হাত বুলিয়ে ডাকলাম, “আব্বু? আব্বু?” নিজের অজান্তেই আমি একটু কেঁপে উঠলাম! ইস বাবাকে ছুঁয়ে দেখিনা কত বছর! শুধু দুই ঈদের কুলাকুলি হয়ে, এই পর্যন্তই! আর না ডেকে কিছুক্ষণ বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম, কি যে ভালো লাগছিলো! ভাবছিলাম, ছোট বেলায় কতদিন সোফায় ঘুমিয়ে পড়েছি, আর বাবা আলতো করে আমাকে বিছানায় নিয়ে যেতেন, হয়ত নিজের শ্বাসও বন্ধ করে রাখতেন যাতে আমার ঘুম ভেঙ্গে না যায়! মায়ের পায়ের আওয়াজ পেলাম, রান্নাঘর থেকে এদিকে আসছে; তাড়াতাড়ি বাবার মাথা থেকে হাত সরিয়ে নিলাম, মা দেখে ফেললে লজ্বায় পড়তে হবে।

একটু ঝাকি দিয়ে ডাকলাম, “আব্বু? আব্বু? উঠ, বিছানায় যাও”
ধরমর করে উঠে, একটা লাজুক হাসি দিয়ে বললেন, “আরে, ঘুমাই নি ত! জেগেই ছিলাম; যাস্ট চোখটা লেগে এসেছিলো”
বললাম, “বুঝেছি, যাও বিছানায় ঘুমাতে যাও”

-------------

কিছুক্ষণ চুপমেরে বসে ছিলাম, খুব খারাপ লাগছিলো, ইস! কত কষ্টই না বাবাকে দিয়েছি বাবার বিশ্বাসে আঘাত করে! মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, আর না। আর কোনদিন বাবার কাছে আওয়ামীলীগের বদনাম করবো না, আওয়ামীলীগ নিয়ে বিতর্ক করবো না, হোক এটা আমার আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক; কারও তো কোন ক্ষতি হচ্ছে না! বাবার জন্য একটু না হয় ভন্ডামিই করলাম।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29229546 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29229546 2010-08-25 17:09:44
কষ্টের রং কাল সন্ধ্যায় সাইট থেকে ফোরম্যান ফোন দিয়ে বললো, “স্যার, সকালে হঠাৎ করে হাবিবের বুকে ব্যাথা শুরু হলে আজ সে কাজে যায়নি। বিকালে ক্যাম্পে ফিরে এসে শুনি ম্যানেজার ওর ইউনিফর্ম আর টুলস ক্লোজ করে নিয়েছে ম্যানেজার। কিছুত বুঝতে পারছি না”

সকালে অসুস্থ হয়েছে আর আমাকে এখন জানাচ্ছ? তোমাদের কি কোন দায়িত্ব জ্ঞান নেই? আচ্ছা আমি দেখছি কি হয়েছে। সাথেসাথে ডাক্তারকে ফোন দিয়ে জানলাম ওর হার্টের সমস্যা, মরুভূমিতে রাখা যাবে না। কাল ভোরেই ওকে হেড অফিসে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। বুঝতে পারলাম আর কিছুই করার নেই, এই সব ব্যাপারে ডাক্তারের রিপোর্টই চুড়ান্ত।

শেষ চেষ্টা হিসাবে ক্লাইন্টের কান্ট্রি-ম্যানেজারকে ফোন দিলাম। উনি ফোন ধরেই বললেন, “ইসলাম, ভালো হয়েছে তুমি ফোন দিয়েছ, আমিই তোমাকে কিছুক্ষণ পরে ফোন দিতাম। তোমাদের একজন টেকনিসিয়ানের হার্টের প্রবলেম দেখা দিয়েছে, ওকে তোমাদের হেড অফিসে ফেরত পাঠাচ্ছি।”

বললাম, “স্যার, রোজার প্রথম দিন, গ্যাস্টিকের সমস্যাও হতে পারে। আর কয়েকটা দিন দেখলে হতো না?”

আমার কিছুই করার নেই, ডক্টর হেজ কনফার্ম দেট ইট ওয়াজ নট ফ্রম গ্যাস প্রবলেম। আই ক্যান্ট টেক এনি রিস্ক। ইফ সামথিং বেড হ্যাপেন্ড টু হিম ইন দ্যা ডেসার্ট, হু উইল টেক দ্যা রেসপনসিবিলিটি? স্যরি, আই কেন্ট হেল্প ইঊ।

কিছুক্ষণ পর হাবিব ফোন দিয়ে কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো, “স্যার, ক্যাম্প বস আমার ইউনিফর্ম নিয়ে নিয়েছে, আর বলছে আমাকে নাকি কালকে ফেরত পাঠিয়ে দিবে। বিশ্বাস করেন স্যার আমার কিচ্ছু হয়নি। সকালে একটু বুকে ব্যাথা হয়েছিলো, ডাক্তারের সামনে গ্যাস্টিকের টেবলেট খেয়েছি সাথেসাথে ব্যাথা সেরে গেছে। আপনারাই আমার বাপ-মা, এখানে আমার থাকার জায়গাটাও নাই, এখন যদি চাকরিটা চলে যায় আমি কৈ যাবো”

মনটা খারাপ হয়ে গেলো, বললাম তুমি চিন্তা কর না। কালকে অফিসে এসে সরাসরি আমার সাথে দেখা করবে। তোমাকে হেড অফিসেই কোন কাজে লাগিয়ে দেব। কতটুকু কি করতে পারবো জানি না, কিন্তু তাকে কেন যেন একটু ভরসা দিতে ইচ্ছা করলো। কাল আবার ডাক্তারি চেকআপ করে যদি দেখা যায় সত্যি সত্যি হার্টের বড় সমস্যা আছে তাহলে তাকে দেশে পাঠানো ছাড়া আর কোন উপায় নেই। গরীব মানুষগুলোর এইসব বড়লোকি অসুখ যে কেন হয়?

২.
হঠাৎ করে সরকারের একটি রুল জারির কারনে গত মাসে আমাদের একটি অয়েল রীগ বন্ধ হয়ে যায়। এই রীগটা প্রায় আড়াই বছর চলেছিলো। হঠাৎ করে এই রীগের প্রায় ৪০/৪৫ জন এক্সপার্ট ও টেকনিশিয়ানের চাকুরি চলে যায়। বেশিভাগই লোকাল, কিছু ইজিপসিয়ান আর কয়েকজন ফিলিপিনি। এই মাসে শুরুতেই ওদের বিদায় করে দেওয়া হয়। কি যে হৃদয়বিদারক দৃশ্য! লোকগুলোর চোখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না, সে কী নিদারুন কষ্টের ছায়া! একেএকে যখন তারা চলে গেলো শুধু মনে মনে বললাম, “আল্লাহ, ওদের ভালো রেখ”

৩.
পাকিস্তানে বন্যার হাজারের উপর লোক মারা গেছে, আরও হাজার হাজার লোক মৃত্যুর মুখোমুখি। একই সময়ে চীনের ভূমিধ্বস, এখানেও হাজারের উপর মানুষ মৃত, কত হাজার যে নিঁখোজ আল্লায় জানে। রাতে পরিবারের সবার সাথে বসে খবর দেখছিলাম। পাকিস্তানের বন্যার দৃশ্য দেখাচ্ছিলো, কিছু লোক পানির মধ্যদিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে পরিবার পরিজন নিয়ে। দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেলো, মানুষ কতই না কষ্টে আছে!

চীনের ভূমিধ্বসের উদ্ধারকাজ দেখাচ্ছিলো। পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে কতগুলো এস্কাভেটর দিয়ে মাটি সরাচ্ছিলো, পাশদিয়ে হেটে যাচ্ছে অসংখ্যা অসহায় মানুষ।

হঠাৎ আব্বু বললো, একটা জিনিস খেয়াল করেছ! দুনিয়ার তাবৎ শোষিত/নির্যাতিত/অসহায় মানুষগুলোর চেহারা এক!

চমকে উঠলাম! তাই তো! চীনাদের সবার চেহারাই আমার কাছে এক রকম লাগে, কিন্তু তারপরেও এদের মধ্যে অন্যরকম একটা মিল দেখতে পেলাম। কী বাংলাদেশি হাবিব, কী পাকিস্তানি, কী চীনা, কী ইজিপসিয়ান বা ফিলিপিনি! সবার কষ্টের একই রং!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29223345 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29223345 2010-08-15 15:10:29
দেবদূতের ছোট ছোট ভন্ডামীগুলো-১ কিছুদিন আগে হঠাৎ করে দেখি অফিসের জানালায় কবুতরের বাসা, আর সেখানে দুটি ডিম। অজানা এক খুশিতে মনটা ভরে গেলো; সেই খুশিটা কলিগদের সাথে ভাগ করে নেওয়ার জন্য সবাইকে ডেকে ডেকে দেখালাম। প্রতিদিন অফিসে ঢুকেই প্রথমে জানালার ধারে গিয়ে উঁকি মেরে ডিমগুলোকে একনজর দেখতাম, মনটাই ভালো হয়ে যেত। একদিন হঠাৎ দেখি ডিমগুলো নেই! মাথা খারাপ হয়ে গেলো! সাথে সাথে অফিসের কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করলাম, "কি ব্যাপার ? এখান থেকে ডিম কোথায় গেলো?"

কেউ কোন উত্তর দিতে পারলো না। গিয়ে ধরলাম ডাইনিং এর মহিলাটিকে। সে বললো, "ও! কবুতরের ডিম? আমি তো ঐদুইটা নিয়ে এসেছি"

কেন? চিৎকার দিয়ে বলে উঠলাম। নিজের গলার আওয়াজ শুনে নিজেই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।

আমার মত শান্ত স্বভাবের মানুষের এমন চিৎকার শুনে মেয়েটি হতভম্ব হয়ে গেলো, ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সে বললো, "আমি তো ভেবেছিলাম আজকে লাঞ্চে তোমাকে ডিমদুটো ভেজে দেব"

"এক্ষণি ডিম দুটো জায়গামত রেখে আস, না হলে তোমার খবর আছে", বলে একটু ঝাড়ি দিতেই সূরসূর করে ডিমদুটো জায়গামত রেখে আসলো।

এর চার/পাঁচদিন পরই ডিমদুটো ফুটে কালোকুচকুচে দুটি বাচা বের হয়েছে, গায়ে, পাখায় কোন লোম বা পালক নেই, প্রথমে একটু ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম। আগে কখনো কবুতরের সদ্য ফোটা বাচ্চা দেখিনি।

আজ দেখলাম বেশ বড় হয়ে গেছে বাচ্চা দুটো, মনে হচ্ছে তিন/চার দিনের মধ্যেই ঊড়াল দিতে পারবে।

২.
গত পরশু বাজার থেকে একটা রাজহাঁস কিনে এনেছি। ঝাল ঝাল করে হাঁসের মাংসের সাথে ভুনা খিচুড়ি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রেসিপি। এইতো একটু আগে হাঁসটা জবাই করে আসলাম। আগামীকাল মা খুব মজা করে রেঁধে দেবে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29213938 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29213938 2010-08-03 01:22:19
বায়ুবৎ কর্তৃপক্ষ, প্রাইভেট-পাবলিক ইউনির্ভাসিটি ও ছাত্র আন্দোলন


১.
আমরা তখন থার্ড ইয়ার ফাস্ট সেমিস্টারে, পি.এল চলা কালে আমাদের ব্যাচের ৪/৫ জনের চিকেনপক্স দেখা দেয়। সাথেসাথে আমরা কয়েক জন ডিপার্টমেন্টাল হেডের কাছে দেখা করে বলি, “স্যার, পরীক্ষা যদি ১০/১২ দিন পিছিয়ে দিতেন তাহলে এই ছেলেগুলোর জীবন থেকে একটা বছর বেঁচে যায়”

স্যার বললেন, “আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে তোমাদের জানাচ্ছি।

‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের’ মারফত জানতে পারলাম, “কেয়ামত হয়ে যাবে, তবুও পরীক্ষা যথা সময়ে হবে”

আমরা বললাম, “ঠিক আছে, পরীক্ষা আমরা যথা সময়ে দেব, কিন্তু যে কয়জন অসুস্থতার কারনে পরীক্ষা দিতে পারবে না তাদের পরীক্ষা; ছুটির মধ্যে নিয়ে নিতে হবে”

‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ’ এইবার জানালেন এমন কোন নিয়ম ইউনিভার্সিটির রেজুলেসনে নেই, তাই দুনিয়া উলট পালট হয়ে যাবে বাট পরীক্ষা-পরবর্তী তিন সপ্তাহ ব্যাপি ছুটিতে কোন পরীক্ষা নেওয়া হবে না।

এইবার আমরা বিক্ষোপে ফেটে পড়লাম, ইত্যবসরে চিকেনপক্স আক্রান্তের সংখ্যা ১১ জন হয়ে যায়, সিদ্ধান্ত নিলাম সি.এস.ই ডিপার্টমেন্টের কোন ব্যাচ পরীক্ষা দিবে না। ১১ জনের জীবন থেকে এক বছর নষ্ট হয়ে যাওয়া থেকে ১৮০ জনের জীবন থেকে দুই সপ্তাহ নষ্ট হওয়া অনেক যুক্তিযুক্ত ও এফোর্ডেবল। আমরা যেহেতু ছিলাম সিএসসি ডিপার্টমেন্টের প্রথম ব্যাচ, তাই ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র মোস্ট হিসাবে আন্দোলনের সিংহভাগ দায়িত্ব এসে পড়ে আমাদের উপর। সব ব্যাচের ছাত্রদের একত্রিত করা, মিটিং কল করা, স্যারদের সাথে যোগাযোগ, কর্মসূচি দেওয়া এইসবই আমাদের করতে হতো।

আজ খুব গর্বকরে বলতে পারি আমাদের এই আন্দোলন ছিলো কুয়েটের ইতিহাসে সফলতম আন্দোলন। আর এটা সফল হওয়ার অন্যতম কারন ছিলো দুটি,

ক) একেবারে প্রথমেই আমরা বাকী দুই ব্যাচের জুনিয়র ছেলেদের ডেকে বলেছিলাম, “শুধু আমাদের ব্যাচের ১১ জনের আজ একবছর শিক্ষা জীবন নষ্টের পথে, তোমাদের এতে কোন কিছু যায় আসে না, তোমরা আমাদের সাথে আন্দোলনে থাকতেও পার আবার নাও পার, পুরাপুরি তোমাদের ইচ্ছা। তোমরা থাকলে আমরা সবাই মিলে অবশ্যই অবশ্যই সফল হব, আর না থাকলে একটু অসুবিধা হবে, কিন্তু তারপরেও আমরা সফল হব, কিন্তু এতে করে তোমরা ভবিষ্যতে আমাদের সব ধরনের সমর্থন থেকে বঞ্চিত হবে। আর একটা কথা মনে রাখবে কর্তৃপক্ষ ২/৩ জনের বিরুদ্ধ্যে লড়তে পারে, ৪/৫ জনের কণ্ঠরোধ করতে পারে কিন্তু কোনভাবেই ১৮০ জনের বিরুদ্ধ্যে জয়ী হতে পারে না, ১৮০ জনের যোক্তিক দাবীকে উপেক্ষা করতে পারে না”। সেই সময় আমাদের ছোট ভায়েরা নিঃস্বার্থ, স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন দিয়েছিলো।

খ) আমাদের মধ্যে নানান ধরনের গ্রুপিং ছিলো, যেমন, “ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, তাবলীগ, ছাত্র ইঊনিয়ন, হলের রুম নিয়ে গ্রুপিং, বিড়িখোর গ্রুপ, গাঞ্জা গ্রুপ, জুয়ারী গ্যাং ইত্যাদি ইত্যাদি (প্রথম গ্রুপটার পাতি-নেতা আর শেষের তিনটি গ্রুপের অন্যতম সক্রিয় সদস্য ছিলাম <img src=" style="border:0;" /><img src=" style="border:0;" /> আহা! সে জীবনের এক অন্ধকার অধ্যায়)। আন্দোলনের প্রথম থেকেই আমরা এইসব গ্রুপিংকে একেবারে বেমালুম ভুলে গিয়ে কি এক অদ্ভুত আবেগে একিভূত হয়ে গেলাম।

তারপরের সে এক বিশাল ইতিহাস, স্যারদের নানান ভয়ভীতি, আবদার, অনুরোধ হাইকোর্ট কোনকিছুই আমাদের টলাতে পারেনি। একেএকে সব গুলো পরীক্ষার ডেট পার হয়ে গেলে এবং আমাদের অসুস্থ ১১ জন সুস্থ হয়ে ফিরে এলে আমরা স্যারকে গিয়ে বলি, “হ্যা, এইবার আমরা রেডী, বলেন কবে পরীক্ষ নিবেন?”

বলা বাহুল্য সেই সেমিস্টারে স্যারেরা কোন পরীক্ষাই নেননি। পরের সেমিস্টারে দশটা পরীক্ষা এক সাথে দিতে গিয়ে জান বের হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু সবাই হাসিমুখে এই কষ্ট মেনে নিয়ে ছিলাম।
অথচ এই সব কিছুই কত সহজেই পাশকাটিয়ে যাওয়া যেত! শুধু যদি আমাদের যোক্তিক যেকোন একটা দাবী মেনে নেওয়া হতো! আসলে আমাদের সমসময় ‘ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষ’ এক বায়বীয় হাইকোর্ট দেখিয়ে দমিয়ে রাখা, নাজেহাল করার এক অদ্ভুত প্রবনতা প্রশাসনে দেখা যায়। এর থেকে যত তাড়াতাড়ি বের হয়ে আসা যাবে জাতির জন্য ততই মঙ্গল।

২.
প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির টিউশন ফী-র উপর সরকার হঠাৎ করে কার বুদ্ধিতে কর বসাতে গেলো সেটা এখনো আমার মাথায় ধরছে না। সরকারের উচ্চপর্যায়ে যে সব নীতি নির্ধারকরা বসে আছেন তাদের বিচক্ষণতার উপর আমার কোন কালেই আস্থা ছিলো না, তাই অবাক হইনি, তবে কিঞ্চিৎ অবাক হয়েছি তুখোড় বাম নেতা নুরুল ইসলাম নাহীদ শিক্ষামন্ত্রী থাকা অবস্থায় এটা হলো বলে। অবাক হয়েছি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নির্লিপ্ততা, উন্নাসিক মনোভাব দেখে। বাম ছাত্রসংগঠন গুলোর প্রতি আমার অন্যরকম আস্থা ছিলো, অন্ততপক্ষে তারা একটি বিবৃতি দিয়ে এর ন্যায্য এই আন্দোলনের সাথে একত্বতা প্রকাশ করতে পারতো।

আমাদের মধ্যে নানান ধরনের গ্রুপিং, দলাদলি, বিভাজন বিদ্যমান। বলার অপেক্ষা রাখে না যে পাবলিক-প্রাইভেট ইসুতে ছাত্র সমাজ সুস্পষ্টভাবে দুটি ধারায় বিভক্ত। এটাকে আমার অসুস্থ অবস্থা মনে হয়; পজিটিভ কারনে এমন বিভাজন মেনে নিয়ে যায়, কিন্তু ন্যায্য দাবিতে আন্দোলনরত লিলিপুটের দল যখন দানবতুল্য পেটোয়াবাহিনীর সামনে বুকচিতিয়ে দাড়িয়ে থাকে তখন কিভাবে এই বিভাজন মেনে নেই?

বাঙ্গালি মাত্রই কৌতুহলি, ঠিক যেভাবে “বিলাই মরে কৌতুহলের কারনে”। রাস্তায় দুই রিকসাওয়ালা কিলাকিলি করলে শত শত লোকের ভিড় জমে যায়, মজাই মজা। রাস্তায় একটু খুড়াখুড়ি হলেও তার চারপাশে দেখা যাবে মজা লুটেরারা ভিড় করছে। প্রাইভেটের ছাত্ররা যখন রাজপথে আন্দোলনের জোয়ারে ভাসছে, সরকারের পেটোয়া বাহিনীর হাতে মার খাচ্ছে পড়ে পড়ে পাবলিকের ছাত্র হিসাবে দূর থেকে বসে মজা নেওয়াটা ঠিক এমনই মনে হয়েছে আমার। অথচ আমরা বারবার ভুলে যাই, স্বতঃস্ফুর্ত আন্দোলনকে চোখ রাঙিয়ে দমিয়ে রাখা যায় না, আর সেই আন্দোলন যদি হয় ন্যায্য দাবিতে তাহলে একে ঠেকাবে সাধ্য কার!

অথচ সব ধরনের গ্রুপিংকে এক পাশে রেখে পাবলিকের ছাত্র বা প্রাইভেটের ছাত্র এই পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে শুধু ছাত্র পরিচয়টাই যদি আমাদের কাছে বড় হয়ে দেখা দিত তাহলে কতোইনা ভালো হতো! যদি প্রাইভেটের ছাত্ররা এই আন্দোলনে সফল না হতো তবে অবধারীত ভাবে পরবর্তীতে প্রাইভেট কলেজ ও স্কুল, কিন্টারগার্ডেনগুলোও এর আওতায় আসতো। প্রাইভেটের ছাত্রদের এই অর্জন জাতীকে সুদূরপ্রসারি এক চক্রান্ত থেকে আপাতত রক্ষা করেছে। এই অর্জন শুধু মাত্র প্রাইভেটের ছাত্রদের। শুধুই তাদের। তোমাদের লাল সালাম ও অন্তর থেকে শুভেচ্ছাবাদ জানিয়ে গেলাম। অথচ আর একবার সালাম জানাতে পারতাম সমগ্র ছাত্র সমাজকে।

৩.
বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ছাত্র যখন ভর্তি হয় তখন তার মাথায় প্রথমেই যা থাকে তা হলো, পড়াশুনা করতে হবে, দেশকে কিছু দিতে হবে, অন্তত পক্ষে আত্মউন্নয়ন করতে হবে। আন্দোলন করতে হবে, ভাংচুর করতে হবে বা মিসিল করতে যাবো এমন চিন্তা ক্ষুণাক্ষরেও কেউ করে কিনা সন্দেহ। কিন্তু আমাদের সিস্টেমে এমন পশ্চাৎদেশ নি:সৃত বায়ুবৎ এক কর্তৃপক্ষ আছে যার কারনে শেষ অস্ত্র হিসাবে ছাত্রদের বেছে নিতে হয় চরমপন্থা।

ঠিক যেমন চলছে চিটাগাং ইউনিভার্সিটিতে। জানি না আমাদের বায়ুবৎ কর্তৃপক্ষ কবে তরল আকার ধরন করবেন। একটা জিনিস তাদের মনে রাখতে হবে ছাত্রদেরকে দমনপিড়ন চালিয়ে যৌক্তিক দাবি থেকে সরিয়ে আনা যায় না, তারুন্যই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। তারা যেকোন মূল্যে বেতন বৃদ্ধি ও ক্রমান্বয়ে প্রাইভেটাইজেশন রুখে দিবে এ আমার বিশ্বাস। যে দুটি কৌশল অবলম্বন করে আমরা সফল হয়ে ছিলাম তাদেরকেও তাই করতে হবে। আমি আশা করবো দেশের আপাময় ছাত্রসমাজ এই অপচেষ্টার বিরুদ্ধ্যে রুখে দাঁড়াবে, কি ঢাবি, কি খুবি, বুয়েট, কি চুয়েট, প্রাইভেট পাবলিক নির্বিশেষে সবাই।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29212627 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29212627 2010-08-01 12:50:17
আমাদের সরলতা, ধৈর্য্য আর ক্ষুদ্র ব্যক্তি স্বার্থের উর্ধ্বে না উঠতে পারাটাই তাদের দানব হয়ে উঠার প্রধান রসদ

১.
কিছুদিন আগের কথা, প্রায় শ'খানেক বাংলাদেশি শ্রমিক বেশ কষ্টে আছে, ঠিক মতো বেতন পাচ্ছে না, থাকার জায়গাও স্বাস্থ্যসম্মত নয়, অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। কিন্তু এইসব ছোটলোকগুলোর জন্য ভাবার কেউ নেই, করারও কেউ নেই।
দূতাবাসের প্রথম শ্রমসচিব নতুন এসেছেন, এদের দরবস্থার কথা শুনেই ছুটে গেলেন দেখতে। জিজ্ঞেস করলেন, "কেমন আছেন আপনারা"?

-জবাবে তারা বললেন, "ভালো আছি স্যার, কিছু সমস্যাতো থাকবেই, তারপরেও সবমিলিয়ে আল্লাহের রহমতে ভালো আছি"।

আপনাদের জন্য কী কিছু করতে পারি?

-নাহ, স্যার কিছু করা লাগবে না। কেউতো দেখতে আসে না, কোন খবরও নিতে আসে না, আপনি আমাদের কথা শুনে, দেখতে এসেছেন। এটাই আমাদের পরম পাওয়া; আপনি এসেছেন এতেই আমরা খুশি। আমাদের আর কিছু চাওয়ার নেই।

আহা! এই ছোটলোক গুলোর কতই না বড় হৃদয়! আমরা বাঙ্গালিরা কত অল্পতেই না খুশি হই, কত সহজেই না আমাদের ভুলিয়ে রাখা যায়, কতই না সীমিত আমাদের চাহিদা। এই বড় হৃদয়ের ছোটলোকগুলোই যখন বলে, "হারামজাদা, সব শালা চোর, গুষ্টিকিলাই বালের সরকারের"-তখন কত ক্ষোভই না মিশে থাকে তাদের কথায়, তাদের হৃদয়ে?

এমন কোন জাতি কী পৃথিবীর বুকে আছে যে এমন দুঃখেও নির্দ্বিধায় বলতে পারে এমন কথা? হায়! আমাদের মহানূভবতাই আজ আমাদের কাল হয়ে দাড়িয়েছে।

২.
বেশি না, এই তো প্রায় চল্লিশ বছর আগের ঘটনা ছেলেটির বয়স তখন এগারো কী বার হবে। তার চাচা হাতে গোলাঘরের চাবি দিয়ে বললো, “আমি একটা জরুরী কাজে বের হচ্ছি, তুই সন্ধ্যার কিছু পরে পিছনের দরজা দিয়ে ঘোলাঘরে ঢুকবি। ওখান থেকে একটা ধানের বস্তা তুলে ওমুকের বাড়ি দিয়ে আসবি। সে বস্তাটা রেখে তোকে কিছু টাকা দিবে। তারপর বাজারে গিয়ে বড়বড় কিছু সারের কাগজ (পলিথিন পেপার) আর কিছু চিড়ামুডিগুর কিনে ঘাটের কাছে ওমুকের বাড়ি আসবি”

ছেলেটি কথা মত সব কাজ সেরে ঘাটের ঐ বাড়িতে পৌছে দেখে আরও সাত আট জন তরুন একজোট হয়েছে।এমন সময় একজন দৌড়ে এসে খবর দিলো, “এই সবুর, শরীফ (আসল নামটা ভুলে গেছি, বুঝার সুবিধার জন্য প্রতিকী একটা নাম ব্যবহার করলাম), তোদের বাবা আসতেছে তোদের সাথে দেখা করতে”।

বড়ভাই সবুর আস্তে উঠে গিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলে সবাই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “কী রে? বাবার সাথে শেষ দেখা করবি না?”

সবুরের নির্বিকার জবাব, “নাহ, আমাদের আর কোন ভাইবোন নেই, এখন বাবার সাথে দেখা করলে দুইভাইকে একসাথে যেতে দেবে না, যেকোন একজনকে রেখে দিবে।”

তাদের বাবা সামনের দরজায় ধাক্কাচ্ছে, আর পিছন দরজা দিয়ে এরা চলে যায় নদী পার হয়ে ইন্ডিয়ার। কত বিশাল হৃদয় হলে এমনটি কর যায়? কত বড় আত্মত্যাগ! নিজেকে ঐ স্থানে চিন্তা করে মাঝেমাঝে ভাবি আমি কী পারতাম এভাবে সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে শুধু দেশের টানে নিজেকে এভাবে বিলিয়ে দিতে?

আবেগের আতিশয্যে অনেক রাজা উজির মারি, বুক চিঁড়ে বেরিয়ে আসে আর্তনাদ, আফসুস ! আহা যদি একাত্তুরে যৌবন থাকত বুক চিতিয়ে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়তাম! আসলেই কী তাই? চোখের সামনে ছিনতাই হয়, না দেখে চলে যাই! রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে দেখেও না দেখার ভান করি বখাটেদের উৎপাত, প্রজেক্টের কস্ট ইস্টিমেশনের সময় বস বলেন, এইখানে প্রোফিট মার্জিন বাড়িয়ে দাও কারন এই টেক্স এই ভাবে ফাঁকি দেওয়া যাবে, কিছু বলতে পারি না; চাকরী চলে গেলে আগামি মাসে যে বউকে প্রমিজ করেছি নতুন একটা মোবাইল কিনে দিব, সেটা কীভাবে হবে? যে এতটুক স্বার্থের কাছে হেরে যেতে পারে সে আবার যুদ্ধে যাবে?

সবুর যদি জানতো তার আর ফিরে আসা হবে না মায়ের কোলে, আর দেখা হবে না বাবার সাথে এই শ্যামলছায়ায়, তাহলেও কি সে এমন কঠোর হতে পারতো? শরীফের বুকে কি আগুন জ্বলছে সেটা কী কোনদিন অনুধাবন করতে পারবো?

নিজেকে বড়! বড়! ভন্ড মনে হয়।

৩.
সরকার যখন মাঝখানে কিছুদিনের জন্য ইউটিউব বন্ধ করে দিলো, আমার কোন কষ্ট হয়নি; কারন আমার এখানেও ইউটিউব বন্ধ। দেশে বন্ধ কী খোলা এইটাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি নাস্তায় ওমলেট ঠিক মত পেলেই হলো।

একে একে যখন পাঁচটা প্রাইভেট দেশি টেলিকম কোম্পানি সরকার বিশেষ দক্ষতায় বন্ধ করে দেয় তখন আমার কোন সমস্যা হয় না, আমি এদের সার্ভিস ব্যবহার করতাম না, এমন কী আমার চেনা পরিচিত কেউই এদের সার্ভিস ব্যবহার করতো না। আমার সার্ট প্যান্ট ঠিক মত ইস্ত্রি থাকলেই আমি খুশি।

ফেসবুক যখন হারাম ঘোষণা করা হয় তখনো আমার কোন সমস্যা হয় নি, আমার এখানে তো আর বন্ধ না, আমার পরিচিত সবাই মোটামুটি প্রক্সি ব্যবহার করতে শিখে গেছে সাথে সাথে। কেউ আমার ঘুমের সমস্যা না করলেই হলো।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধ শেখ মজিবুর রহমানের কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদের (কে যেন বলেছিলো উনার নামের আগে ‘মাননীয়’ না লেখার কারনে এরেস্ট হয়েছে এক ছেলে, সত্য মিথ্যা জানি না, তবে কোন দিকে কোন রকমের রিস্কেই আর গেলাম না) ব্যাঙ্গচিত্র আঁকার কারনে যে ছেলেটিকে আটক করা হয়েছে সে আমার পরিচিত কেউ না, তাকে আটক করেছে তো কী হয়ছে, আমার প্রিয়দল আর্জেন্টিনা আজকে জিতলেই হলো।

আমার দেশ পত্রিকার প্রিন্ট কপি জীবনে একবার ধরেও দেখি নাই, অনলাইনে শুধু একদিন ঢুকেছিলাম, তাও এক বন্ধুর পাঠানো লিংক ধরে, সরকার যখন অসাধারন নৈপুন্য দেখিয়ে এটা বন্ধ করে দিল আমার একবারের জন্যেও মনে হয়নি, “আহা! প্রিয় পত্রিকাটা বন্ধ করে দিলো!, এখন কী পড়বো?”। মতিউর রহমান ভাইকে লাল সালাম।

মাহমুদুর রহমান লোকটাকে আমার কখনোই পছন্দ হয় না, কেন যেন মনে হয় সাকার দূর্গন্ধযুক্ত মুখ শুধু মাত্র দুইতিন বার মাউথ ওয়াশ দিয়ে পরিষ্কার করলে এই দুই জনের মধ্যে আর কোন পার্থক্য থাকবে না। এই লোকটাকে যখন এরেষ্ট করা হয়, রিমান্ডে নেওয়া হয় তখন আমার হৃদয়ে তার জন্য দরদ উথলিয়ে উঠে না। যাহ! আশরাফুলরে লাথি দিয়া দল থেকে বের করে দেওয়া হোক।

চ্যানেল ওয়ান? থাক, এমনিতেই অনেক বলে ফেলেছি আর কথা না বাড়াই।

৪.
আমার মনে শুধু একটা শঙ্কা জাগে এইটা কী আইনের শাষন, যদি না হয় তাহলে আমিতো স্বাধীন নই! এটা কি ন্যায় বিচার? যদি না হয় তাহলে আমিও তো নিরাপদ নই! এইটা কি পরমত সহিষ্ণুতা? যদি না হয় তাহলে তো আমার উপরও পড়তে পারে হিংস্র ক্ষুধার্ত খড়গ! আমার কী বাক স্বাধীনতা আছে? যদি না থাকে তাহলে আমার বেঁচে থাকার কী মূল্য!

রাগ ক্ষোভ আর ভয়ের মিশ্র একটা অনুভূতি এসে আমার চারপাশ ঘিরে ধরে। প্রতিবাদের ঝড় তুলতে ইচ্ছা করে, বিদ্রোহের ফেটে পড়তে ইচ্ছা করে, বিপ্লবের ডাক দিতে ইচ্ছা করে, পরমুহূর্তেই জাগতিক ভয় এসে কাবু করে দেয়। আগামি সপ্তাহে দেশে আসছি, সরকার যদি আমাকে আটক করে? ব্যাক্তি আমি কী বিশাল রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে অসহায় নই? আমার বাবা মার কী হবে? আমার কিছু হয়ে গেলে পরিবারের দেখাশোনা কে করবে? আমি পিছিয়ে যাই, আত্মসমর্পণ করি নিজের অজান্তেই।

শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যায় সেই সব ছোটলোক শ্রমিকগুলো প্রতি, আবার মাথা নত হয়ে যায় সবুর, শরীফ প্রতি। আমি যোদ্ধা নই, কোনদিন ছিলাম না, হতেও পারবো না, আমি প্রেমিক নই কোনদিন ছিলাম না, হতেও পারবো না; আমি ভালো অভিনেতা মাত্র, যে নিজের সাথেও সুনিপুন অভিনয় করে যেতে পারে দিনের পর দিন।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29180016 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29180016 2010-06-18 23:39:07
স্বপ্নগুলো আশার ভেলায় ভাসিয়ে অধীর আগ্রহে বসে আছি সুদিনের আশায়
১.
এ্যাজোকো (AGOCO-Arabian Gulf Oil Company), এখানকার সবচেয়ে বড় চারপাঁচটা তেল কোম্পানির মধ্যে অন্যতম। বছরপাচেক আগের ঘটনা, একটা প্রজেক্টের ব্যাপারে কথা বলতে বাবা গেলেন প্লানিং ডিপার্টমেন্টের চিফের সাথে দেখা করতে। বাবাকে দেখেই উনি জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কী ইন্ডিয়ান?”

-নাহ, আমি বাংলাদেশি।

তারপর ঐ অফিসারের প্রতিক্রিয়া হলো দেখার মত। রীতিমত বাবাকে জড়িয়ে ধরে তার সে কী উল্লাস! সে বললো, “জানো, আমি কানাডায় পিএইচডি করেছি, আমার সুপারভাইজার ছিলেন বাংলাদেশি এক প্রফেসর, উনি আমাকে যে পরিমান সাহায্য সহযোগীতা করেছেন তা বলে শেষ করা যাবে না। তারপর থেকে সুযোগ পেলেই আমি বাংলাদেশিদের সাহায্য করার চেষ্টা করি।”

বলা বাহুল্য এই অফিসারের সাহায্যে বাবার মাধ্যমে সেবার বিশাল একটা প্রজেক্ট পেয়েছিল এখানকার এক বাংলাদেশি কোম্পানি। যাই হোক যে কারনে এত ঘটনার বয়ান তা হলো, “সেই নাম না জানা বাংলাদেশি প্রফেসরের কিছু উপকারের বিনিময় যে এত বছর পর এভাবে পাওয়া যাবে তা কী কেউ ভেবেছিলো?” আমরা অনেকেই ভাবি, “আরে ধুর, এর উপকার করে আমার কী লাভ?” এই ভাবনাটা একেবারেই ভুল। আমরা কেউ যদি কারও কোন উপকারই করি তবে তা কোনভাবেই বিফলে যায় না, অনেক বছর পর হলেও তা শতগুণ হয়ে ফিরে আসবে, এটাই প্রকৃতির রীতি। আমরা যারা দেশের বাইরে আছি তারা প্রত্যেকেই একেকজন এম্বাসেডর, আমরা সবাই কোন না কোন ভাবে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছি। মানুষের প্রতি করা আমাদের ছোট ছোট উপকার, একটু মিষ্টি ব্যবহার, মিষ্টি কথা, নিদেরপক্ষে একটু হাসি হয়তো দেখা যাবে পর্বতসম ঠেউ হয়ে ফিরে আসছে।

২.
প্রায় চল্লিশ বছর লিবিয়া ছিল ইটালির কলোনি এবং ১৯৫১ সালে তারা এই এলাকা ছেড়ে যায়। কলোনি থাকলে যা হয়, অন্যায় অত্যাচার, হত্যা, লুন্ঠন সবই করেছিলো তারা; এইসবের জন্য কিছুদিন আগে ইটালি সরকার লিবিয়ার কাছে ক্ষমা চায় ঠিক এই ভাষায়,

"It is my duty, as a head of government, to express to you in the name of the Italian people our regret and apologies for the deep wounds that we have caused you,"

এতবছর পর ঠিক কী হলো যে ইটালি সরকার এভাবে ক্ষমা চাবে লিবিয়ার জনগণের কাছে? আসল কথা হলো বানিজ্য। এই ক্ষমা চাওয়ার পরপরই লিবিয়ার সাথে তাদের একটা দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয়। চুক্তিমোতাবেক ইটালি আগামি ২৫ বছর, বছরে ২০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে অবকাঠামো খাতে। আর প্রতিবছর কিছু লিবিয়ানদের শিক্ষাবৃত্তি দিয়ে ইটালিতে পড়াবে। এখানে একটা জিনিস খেয়াল করার মত, তারা কিন্তু ক্ষতিপূরন হিসানে নগদ অর্থ দিচ্ছে না, বরং বিনিয়োগ করছে। মোটাদাগে এটা বলা যায়, এই বিনিয়োগের মাধ্যমে এরচেয়েও শতগুণ প্রফিট তারা তাদের ঘরে নিয়ে যাবে, আর ক্ষেত্রবিশেষে এদের স্বার্থ দেখবে স্কলারশিপ নিয়ে ইটালি থেকে পড়াশুনা করে আশা উচ্চপদস্থ এইসব শিক্ষিত ছেলেপুলেরা।


৩.
কিছুদিন আগে এনওসি (NOC-National Oil Corporation, তেল ও গ্যাস সংক্রান্ত যাবতীয় বিনিয়োগ, নতুন নতুন তেলক্ষেত্র অনুসন্ধান ইত্যাদি এই সংস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রন করে সরকার) ১২ জনের এক গ্রুপকে ইঞ্জিনিয়ারিং ও অর্থনীতি পড়ার জন্য দেশের বাইরে পাঠানোর পরিকল্পনা করেছিলো।ইন্ডিয়ান একটা গ্রুপ খুব চেষ্টা করেছিলো এদের যেন ইন্ডিয়াতে পাঠানো যায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেনি। যে সব কারনে তারা পারেনি তার মধ্যে প্রধান কারণ হলো সাধারন লিবিয়ানরা ইন্ডিয়ানদের খুব একটা পছন্দ করে না। কেন যেন এদেশের সাধারন মানুষের ধারন হিন্দুরা নোংরা প্রকৃতির হয়। এই সুযোগটা বাংলাদেশ খুব ভালো ভাবে নিতে পারে। বাংলাদেশের ৫টা পাবলিক ইঞ্জিনিয়ারিং ভার্সিটিতে যদি প্রতিবছর প্রতিটিতে ৫ জনকে বৃত্তি দিয়ে পড়ার ব্যবস্থা সরকার করে তাহলে প্রতি বছর ২৫ জন হয়। ৪ বছরে এই ১০০ জন, এরা সবাই যখন দেশে ফিরে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরি করবে তখন এদের মাধ্যমে বাংলাদেশের যে ভাবমূর্তি এই দেশে গড়ে উঠবে সেটা টাকায় হিসাব করা সম্ভব না। আর ব্যবসায়িক লাভের কথা নাইবা বললাম। যে কোন তরুন যখন একটা দেশে ৪/৫ বছর থাকে সেই দেশ সম্পর্কে তাদের এক ধরনের আবেগ তৈরি হয়, মায়ার বাধনে জড়িয়ে পড়ে। আমি দেখেছি আমাদের ভার্সিটিতে প্রতি বছর কাশ্মির, শ্রীলংকা থেকে বেশি কিছু ছেলে পড়তে আসতো, এদের এভাবে পড়িয়ে বাংলাদেশ সুদুরপ্রসারী কিভাবে লাভবান হচ্ছে সেটা আমার জানা নাই, কিন্তু লিবিয়ার মার্কেট সবে মাত্র প্রস্ফুটির হচ্ছে। এই কারনে ইউরোপ, আমেরিকা, ইন্ডিয়া, চায়না, থাইল্যান্ডের পুরা নজর এদের উপর। বাংলাদেশের কী কোন পরিকল্পনা বা মাথা ব্যাথা আছে এ নিয়ে?

কোন দেশ বাংলাদেশ থেকে কয়েক লক্ষ শ্রমিক নিবে এই খবর শুনে আমার আহ্লাদিত হয়, কিভাবে আরও শ্রমিক পাঠানো যায় সেটাই আমাদের সরকারের টার্গেট, আর আমাদের পাশের দেশ ইন্ডিয়ার টার্গেট এখানকার আইটি মার্কেট ধরার, কন্সট্রাকশন মার্কেট ধরার, কন্সালটেন্সি মার্কেট ধরা। সময় হয়েছে আমাদের নজর উচু করার, বিশ্বাস করার সময় হয়েছে আমরাও পারি। অনেক আশায় বুক বাঁধি একদিন আমাদের দেখে প্রথমেই কেউ বলবে না যে “তুমি কি ইন্ডিয়ান” বরং দক্ষিণ এশিয়ার কাউকে দেখলে প্রথমেই বলবে “ও! তুমি কী বাংলাদেশি”।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29166390 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29166390 2010-05-30 23:44:44
বিচ্ছিন্ন চিন্তা-ভাবনা আর কিছু আক্ষেপ

বয়সটা আমার এখনো তরুন, আসলে ঠিক তরুন বলা যাবে কিনা এই ব্যপারে সন্দেহ আছে, আটাশ বছরের কাউকে কি তরুন বলা যায়? বলা যেতে পারে তরুযুবা। যাই হোক, বয়স কম বলেই আবেগ বেশি; যুক্তির চেয়ে হৃদয় বেশি চলে; এই কারনে দেশের জন্য কিছু করার একটা আকাঙ্খা সবসময় তাড়া করে ফিরে। এখনো কোথাও বাংলাদেশি শ্রমিক দেখলে এগিয়ে যাই, কথা বলি, খোঁজ খবর নেই, কোন সমস্যা আছে কিনা জিজ্ঞেস করি, সাথের কোট টাই পড়া ব্যক্তিটি বিরক্ত হন, নাক শিটকান, আমি থোড়াই কেয়ার করি।

আমাদের নতুন দুইটা প্রজেক্টে ৩০ জন টেকনিসিয়ান, ১০ জন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার আর ৬ জন বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার লাগবে। চেয়ারম্যান স্যার প্রথম থেকেই বলে আসছিলেন সব এক্সপার্ট ফিলিপিন থেকে রিক্রুট করবেন, ওরা ঝামেলা কম করে। আমি সুজোগ বুঝে বললাম স্যার, "সব একদেশ থেকে রিক্রুট করলে আপনি একটা দেশের উপর পুরাপুরিভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন, আর একজন বিজনেসম্যান হিসাবে আপনার সবসময় দ্বিতীয় একটা পথ খোলা রাখা উচিত"

-উনি আমার এডভাইস মেনে নিয়ে বললেন, "ঠিক আছে, কিন্তু বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো তো ঝামেলা করে!"

"আমরা কোন রিক্রটিং এজেন্সির মাধ্যমে যাবো না, বাংলাদেশের অনেক ভালো ভালো জবসাইট আছে, সেখানে রেজিষ্ট্রেশন করে নিলে লক্ষ লক্ষ অনলাই সিভি পাওয়া যাবে। ওখান থেকে ভালো একশ সিভি বাছাই করে ৭ দিনের জন্য আমরা তিনজন ( চেয়ারম্যান , জিএম আর আমি) বাংলাদেশে গিয়ে নিজেরা ২৩ জন সিলেক্ট করে চলে আসবো। যেহেতু ভিসা, টিকেট সহ যাবতীয় খরচ আমাদের কম্পানিই বহন করবে তাহলে শুধুশুধু মাঝখানে রিক্রুটিং এজেন্সিকে জড়ানোর কি দরকার? এই সব রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বসে বসে জনপ্রতি আড়াই লক্ষ টাকা নিবে, তারপরও কত রকমের দুই নাম্বারী থামবে এসবের মধ্যে, তার কোন ইয়াত্বা নেই"
-------------------------------------------------------------

বিডিজবস থেকে শ'খানেক সিভি বাছাই করলাম, চলছিলো এই লিষ্ট একশতে নামিয়ে আনার, সবকিছু ঠিকমতই চলছিলো, হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাত ! কিছুদিন আগে বড় পানির পাইপের ভিতর থেকে শ'খানেকের মত বাংলাদেশি শ্রমিককে পুলিশ আটক করে। তদন্ত করে পাওয়া যায় যে, প্রায় হাজার হাজার শ্রমিক এভাবে পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেখানে বিশজন শ্রমিক দরকার সেখানে দু'শ এনে বাকি দেরকে পথে ছেড়ে দেয়া হয়েছে, এমনও দেখা গেছে কম্পানি নেই, প্রজেক্ট নেই, ভুয়া কাগজ দেখিয়ে হাজার হাজার শ্রমিক আনা হয়েছে। আর এর সাথে টপ টু বটম সবাই কম বেশি জড়িত। এর ফল স্বরুপ, এখন বাংলাদেশের সব ভিসা প্রায় একমাস ধরে বন্ধ করে রেখেছে লিবিয়ান কর্তৃপক্ষ।

এখন সব বাদ দিয়ে তোড়জোড় চলতে ফিলিপিন থেকে সব এক্সপার্ট নিয়ে আসার। ভালো লাগে না আর এসব, কবে যে দেশের মানুষগুলো একটু নিজের ভালো বুঝতে পারবে? নিজেদের ছোট ছোট স্বার্থের কারনে কত বড় বড় বিজনেস যে হারাচ্ছে, তার কোন খরব নেই! আর সরকার যে কি করে? সভাসেমিনারে বড় বড় বক্তৃতা ঝাড়ে, রাজা উজির মারে....সব চোরের দল।

জানি না আর কতদিন মন থেকে এভারে দেশের জন্য কিছু করার তাগাদা অনুভব করতে পারবো! একদিন হয়তো "ধুর শালা! জাহান্নামে যাক সব, নিজে বাঁচলে বাপের নাম" বলে নতুন আমার জন্ম হবে। এমন যাতে না হয় সেটাই কামনা করি।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29159023 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29159023 2010-05-20 18:40:29
দ্যা মাস্কেটিয়ারস থ্রী মাস্কেটিয়ারস

আমরা তিনটি নৌকায় প্রায় ত্রিশ পয়ত্রিশ জন একসাথে যাত্রা শুরু করি। প্রতি নৌকায় একজনের কাছে একটা কম্পাস দিয়ে কিভাবে এটা ব্যবহার করতে হয় তা শিখিয়ে দেওয়া হয়, সেই আমাদের লিডার। দালালদের খপ্পরে পরে সর্বস্ব হারিয়ে শুধু আল্লাহর আল্লাহর করতে করতে জানটা হাতে নিয়ে পাঁচবছর আগে ইতালীর উদ্দ্যেশে যাত্রা শুরু করি।

আমাদের নৌকায় আমরা এই তিনজনই ছিলাম বাংলাদেশি, অন্য দু’নৌকায় আরো দশ জনের মত ছিলো, সাথে দুইদিন চলার মত খাবার আর পানি ছিলো। টানা বিশ বাইশ ঘন্টা চলার পর কোন রকমে আমাদের নৌকাটা তীরে পৌঁছুতে পারে, বাকীদু’টা কিছুক্ষণ যাওয়ার পরই ডুবে যায়। চোখের সামনে দেখলাম আমার ভাইয়েরা পানিতে ডুবে যাচ্ছে, কিছুই করার নেই, তখন শুধু নিজেকে বাঁচানোর তাগিদ। জানি সুযোগ পেলেই ডুবন্ত যে কেউ আমাদের নৌকায় উঠতে আপ্রাণ চেষ্টা করবে, সেই সাথে আমাদেরটাও যাবে, তাই একটু ঘুরিয়ে পাশ কেটে চলে যাই। মৃত্যুকে এত কাছ থেকে আর দেখা হয়নি, কিছুই করার ছিলো চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া।

তীরে পৌঁছে বুঝলাম আমরা ইতালী না, এসে পড়েছি দ্বীপদেশ মাল্টায়। এখানে এসেই পুলিশের হাতে ধরা পড়লাম। তবে, তা নিয়ে ভাববার মত অবস্থা তখন ছিলো না, শুধু বেঁচে আছি এটাই জীবনের চরম পাওয়া। বিচারে দুই বছরের জেল হয়ে গেলো আমাদের।

-মাল্টায় ভিজিটে যাওয়া লিবিয়া দূতাবাসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কাছে এভাবে তুলে ধরেন এই তিন হতভাগা। “তারপর? এখন কেমন আছেন আপনারা?”-জিজ্ঞেস করলেন উনি।

দুই বছর জেল খেটে একসাথে ছাড়া পাই তিনজন। প্রথম দুইদিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছি, কোন কাজ পাইনি, শুধু পানি খেয়ে ছিলাম। তৃতীয় দিন একটা কন্সট্রাকশন কম্পানিতে কাজ চাইলে আমাদের একজনকে কাজ দিয়ে বলা হয় যদি এই এক জনের কাজ পছন্দ হয় তাহলে কাল থেকে তিন জনকে কাজ দেওয়া হবে। ঐথেকে শুরু। এখন মাসে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় পঞ্চাশ ষাট হাজারের মত রোজগার হয়, দেশে ত্রিশ পয়ত্রিশ হাজার টাকার মত পাঠাতে পারি।

-আপনাদের সব কথাই শুনলাম, আমি নিশ্চিত আপনারা বাংলাদেশি, আমি সাথে সবকিছু নিয়ে এসেছি, আপনারা চাইলে এক্ষণি পাসপোর্ট বানিয়ে দিতে পারি, বললেন দূতাবাসের ঐ কর্মকর্তা।

স্যার, আমরা একটু চিন্তা করে আগামীকাল জানাই?

পরের দিন ফোন করে তাদের একজন ঐ কর্মকর্তাকে বললেন, “স্যার, দেশে গিয়ে এখন কি করবো? এখানে তো ভালোই আছি, দেশে গিয়ে মাসে পাঁচ হাজার টাকা আয় করবো সেই নিশ্চয়তা নেই, থাক; পরিবারের জন্য না হয় এই জীবণটা বিলিয়ে দিলাম”


ওয়ান থাওজেন্ড ফাইভ হানড্রেড মাস্কেটিয়ারস
গতপরশুর খবর। দেড় হাজার বাংলাদেশি পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কাজ নেই, থাকায় জায়গা নেই, অনেকে ভিক্ষা করছে, দিনের পর দিন না খেয়ে আছে। যে প্রজেক্টের এদেরকে আনা হয়েছে বেশিভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় প্রজেক্ট তিন মাসেই শেষ অথবা লোক দরকার একশ, দালারা পাঠিয়ে দিয়েছে এক হাজার। স্বভাবতই একশ জনের চাকরী হয় বাকী হতভাগাদের পথে পথে ঘুরতে হয়।

বাঙ্গালি বীরের জাতি, শত প্রতিকূলতার মাঝেও এরা হাসতে পারে, হাসাতে পারে, এরা হারতে জানে না, আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি ফিনিক্স পাখির সেই মিথের জ্বলন্ত উদাহরন আমার দেশি ভাইয়েরা। যতবার গুড়িয়ে দিবে ততবার ঘুরে দাঁড়াবে এরা! বড় আজব এক জাতি, এমন জাতিকে দাবিয়ে রাখ যায় না, কেউ পারেনি, কেউ পারবেও না, এই দেড় হাজার মাস্কেটিয়ারস আবার ঘুরে দাঁড়াবে, নিজের আত্মসম্মান নিয়ে, নিজের পায়ে, সেই বিশ্বাস আমার আছে।

আমার শুধু একটাই ক্ষোভ মাথা চাড়া দিয়ে উঠে, যে প্রবাসীরা সর্বস্ব বিলিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে, এদেরই কোন আর্থিক নিরাপত্তা নেই! এরাই বারবার প্রতারিত হচ্ছে! শালার কপাল! আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত সব শালা চোর, ভাগের টাকা চলে যায় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। ইচ্ছা করে সবগুলারে সমূলে শেষ করে দেই। যাহ! এবার শুন্য থেকে শুরু হোক পথ চলা।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29137590 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29137590 2010-04-19 02:09:06
দেবদূতের বিবাহনামা ----- ৭

১.
এ এক অদ্ভূত সমস্যা আমার; ছুটির জন্য মন আকুলি-বিকুলি করে, আর ছুটি যতই নিকটবর্তী হয় ততই অস্থিরতা বাড়তে থাকে অবশেষে তা চরমে উঠে ছুটির একদিন আগে। আর ছুটির প্রথম দিন? আমাকে পায় কে? স্বর্গ! কিন্তু সপ্তাহ যেতে না যেতেই নাভিশ্বাস! এক সপ্তাহের বেশি ছুটিকে উপভোগ করতে পারিনি কোনদিন। একটানা ছুটি কারইবা ভালো লাগে? তবে এইবার দেশে এসে স্বর্গপতনের এই সময়কাল এক সপ্তাহ থেকে টেনেটুনে দুই সপ্তাহে উত্তীর্ণ করতে পারার পিছনে আমার পূর্ণাঙ্গিনীর অবদান অনস্বীকার্য। ঘুম থেকে উঠতে না উঠতেই ধূমায়িত চা এর সাথে ভাঁজহীন খবরের কাগজ, ভূঁড়িভোজ নাস্তার সাথে শাশুড়ির ফ্রী মিষ্টিমধুর ধমক, “একদম না করবে না! আর একটা পরোটা খাও, এত বড় ছেলে! দুইটা পরোটাতে কি পেট ভরে?”

দুপর হতেই বৌ যখন স্নান সেরে ভেজা চুলে সদ্য ইস্তী করা নতুন কাপড় পরে সামনে আসতো, মনে হতো, আহঃ! জীবনের স্বার্থকতা কিসে? এটাই কি স্বার্থক জীবন নয়? মনে মনে ভাবতাম, আহা! এভাবেই যদি প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় স্নান করে ভেজা চুলে সামনে এসে বসে থাকতো সে, তাহলে ইহজনমে আর জ্যোৎস্না দেখতে চাইতাম না! আর রাত! সেটাতো দাওয়াতে দাওয়াতেই কেটে যেত। দুই দিকের আত্মীয়স্বজন মিলিয়ে পনের ষোল তো হবেই। পনের দিনে পেন্টের বেল্টের ছিদ্র দুই ঘর এগিয়ে দিয়ে তবেই ওনারা খ্যান্ত হয়েছেন।

শুশুর বাড়িতেই উঠেছিলাম, সেই কারনে বউ এর সাথে খুব একটা ঝগড়াঝাটিও হচ্ছিলো না, আর যাই হোক জলে থেকে কুমিড়ের সাথে লড়াই! টারজানের কাজ স্বামীদের দিয়ে হয় না। কি আর করা! পূর্ণিমাও পনের দিনে বিলীন হয়ে যায়, আর আমি তো সাধারন প্রেমিক মদন।

পনের ষোল দিন যেতেই হাঁপিয়ে উঠেছি, শেষে না পেরে তাকে বললাম, “আর তো ভালো লাগছে না, ডেটিং করতে ইচ্ছা করছে”

সে এমন কড়া দৃষ্টিতে তাকালো যে আমি ভষ্ম হয়ে যাবার হাত থেকে বাঁচতে কালক্ষেপণ না করে বললাম, “আরে, এখন কি আর আমার আগের দিন আছে না কি যে শ’য়ে শ’য়ে লাইন পড়ে যাবে? আসলে বলতে চাচ্ছি যে তোমার সাথে অনেক দিন ডেটিং হয় না। চলো না একদিন?”

বুড়া বয়সে ডেটিং? তাও আমার বউ এর সাথে? মাথা ঠিক আছে তো? দেখি জ্বর টর আসলো না কী? বলেই কপালে হাত দিয়ে গায়ের উষ্ণতা মাপতে লেগে গেলো।

আমি শুধু মিনমিন করে বললাম, “আমি কিন্তু মজা করে বলছি না, সত্যি সত্যি হাঁপিয়ে উঠেছি। চল না আগের সেই দিনগুলোর মত একদিন বাহিরে কোথাও দেখা করি, শুধু তুমি আর আমি আর আমাদের স্মৃতিগুলো নিয়ে?”

“আচ্ছা, সে পরে দেখা যাবে নে। এইগুলো নিয়ে ভেবে ভেবে এখনকার সময়টা আর একঘেয়েমিপূর্ণ করে ফেলো না”, বলেই মুখের কোনায় একচিলতে হাসি ফুটিয়ে ঝামটা মেরে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো।


২.
ঘুম থেকে উঠেই আমি আমাদের বাসায় চলে যাবো, সেখানে তোমার ফোনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকবো। তুমি কখন যাবে? জিজ্ঞেস করলাম আমি।

-ক্লাস আছে, আম্মুকে একথা বলে সকাল সাড়ে দশটার দিকে আমি বের হবো। গাড়ি আমাকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে গেটের কাছে অপেক্ষা করতে থাকবে আগের মত। আমি মেইন গেট দিয়ে ঢুকবো আর পিছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে রিক্সায় উঠেই তোমাকে ফোন দিবো। ড্রাইভার আর কেয়ারটেকার বাহিরে অপেক্ষা করতে থাকবে আমার ফিরে আসা পর্যন্ত।

ডেটিং এর পরিকল্পনা করছিলাম দুজনে বসে বসে। জায়গা ঠিক হলো আমাদের ডেটিং এর স্বর্ণযুগের মাইক্রো থেকে ম্যারাথন এমন নানান রকমের ডেটিং এর সাক্ষী, সুখে দুঃখের সাথী সেই ক্লাসিক হ্যালভেশিয়া; সময় এগারটা। রক্তের মধ্যে উত্তেজনা টের পাচ্ছিলাম, অনেকদিন পর বাসায় মিথ্যা কথা বলে, কলেজ ফাঁকি দিয়ে, ড্রাইভার আর কেয়ারটেকারের চোখে ধূলো দিয়ে প্রেমিক প্রেমিকার মত ডেটিং এ বের হচ্ছি, তাও আবার বিয়ে করা বউ এর সাথে! ভাবতেই ভালো লাগার একটা আবেশ ছড়িয়ে পড়ছিলো দেহজুড়ে। বাহঃ! আজ তোমাকে তো অনেক সুন্দর লাগছে!

-থাক! আর পাম দিতে হবে না! এমনিতে তো সারাদিনে একবার ভালো করে তাকিয়েও দেখ না, আর এখন ডেটিং এর কথা শুনে ওনার প্রেমের বান ডেকেছে মনে! আমি কি কিছু বুঝি না মনে করেছ?

আরে না না! তুমি বুঝ না কে বলেছে? কিন্তু তোমাকে আজ সত্যি সত্যি অনেক সুন্দর লাগছে।

পরিকল্পনার শেষ ধাপে অবধারিতভাবে চলে আসলো কে কি পড়ে যাবো। খুব আস্তে আস্তে বললাম, “তোমাকে শাড়িতে অনেক দিন দেখি না”।

-আমি জানতাম তুমি এই অনুরোধটা করবে! তুমি ভালো করেই জান যে আমি শাড়িতে কমফোর্টেবল না, তার পরেও তুমি কেন যে এই আবদারটা কর? না, শাড়ি টাড়ি আমি পড়তে

পারবো না স্যরি।

আমার এমন অনেক আবদার মুখের উপর না করে দিলেও দেখতাম যতো কষ্টই হোক শেষপর্যন্ত আমাকেই সে খুশি করতো। সেই ইতিবৃত্ত স্মরণ করে আমি আশার ভেলা ভাসিয়ে ছিলাম সেদিন।

-শুন, একটা জিনিস পরিষ্কার করে বলে দিচ্ছি, “আমি কিন্তু তোমার জন্য অপেক্ষা করতে পারবো না। যদি হ্যালভেশিয়ার পৌছে দেখি তুমি নাই তাহলে আমি এক মিনিটও বসবো না, সোজা বাসায়া চলে আসবো। ‘রিক্সা পাই নি’, ‘রাস্তায় জ্যাম ছিলো’ বা ‘বাসা থেকে নামার সময় লিফটে আটকে গিয়েছিলাম’, এমন বাহান টাহানা আমি কিচ্ছু শুনবো না। সুতরাং সাবধান!

আরে ধুর! আমি কি আর আগের মত আছি না কী, কাল কোনভাবেই দেরি হবে না, তুমি দেখে নিও।

৩.
অস্থির অস্থির লাগছিলো, ফোনের জন্য অপেক্ষা না করে কিছু সময় হাতে নিয়েই বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম। লিফটে নামবো? নাহ থাক, দেখা যাবে আজকেই মাঝপথে ইলেকট্রিসিটি চলে গেছে, আর আমি আধা ঘন্টা লেইট! এতদিন পর ডেটিং এ যাচ্ছি, আর চারতলা থেকে হেটে নামতে পারবো না?

একবার ভাবলাম এক তোড়া ফুল নিয়ে যাই, পরমুহূর্তেই তা বাতিল করে দিলাম, একটু বেশি বেশি হয়ে যাবে। দেখা যাবে সে খুশি হওয়ার পরিবর্তে রেগে বোম হয়ে গেছে। ইদানিং কিছুতেই তাকে উপলব্ধি করতে পারছি না পুরোপুরি। বিয়ের আগে কোন ভুলভাল করলে ধমক খেতাম, চিৎকার দিত, আর এখন চুপ মেরে যায়, কোন প্রতিক্রিয়া না দেখানোই এখন তার রেগে যাওয়ার লক্ষণ। প্রেমিকাদের চেয়ে বউ এরা বেশি আনপ্রেডিক্টেবল।

কেমন যেন লাগছিলো! বারবার মনে পড়ছিলো বিয়ের আগের পাঁচ বছরের কথা! এভাবেই সপ্তাহে দুই তিন দিন দেখা করতে যেতাম, সময় আসলেই উড়ে উড়ে যায়। মনে হচ্ছিলো এই তো সেদিন, সে একেকদিন একেকটা জামা পড়ে আসতো, আর আগের দিনের জামা নিয়ে আমাকে পরীক্ষা দিতে হতো, আর আমি কেবলাকান্তের মত মুখ করে তাকিয়ে থাকতাম। এ এমন এক পরীক্ষা যেখানে কোন ফেল নেই।

রিকশাটাও যেন আজ বেশি ধীরে চলছে! ভাই, একটু জোরে চালান না! আহা, কি মিষ্টি মৃদু বাতাস! আজ ঢাকা শহর একটু অন্য রকম লাগছে না? কেমন পরিচ্ছন্ন পরিচ্ছন্ন লাগছে! গাছগুলোও যেন একটু বেশি সবুজ লাগছে? আচ্ছা, সে আজ কোন শাড়িটা পড়ে আসবে?

হ্যালভেশিয়ার সামনে রিকশা থেকে নামতেই তার ফোন।

-এক্ষণি রেব হও, আমি কলেজ থেকে বের হয়ে গেছি; এখন রিকশায় উঠছি।

আমি তো হ্যালভেশিয়ায় বসে আছি, খুশিতে গদগদ হয়ে বললাম আমি।

-বাব্বা! সুবোধ ছেলের মত তাড়াতাড়ি চলে এসেছ? খুব এক্সসাইটেট মনে হচ্ছে?

আরে নাহ, রাস্তায় জ্যাম থাকেত তাই আগে আগেই বের হয়ে গিয়েছিলাম, এই আর কি।

-আচ্ছা, তুমি থাক, আমি দশ মিনিটের মধ্যে আসছি।

এই সময়টাতে একদম ফাঁকা থাকে হ্যালভেশিয়ায়, হেঁটে একদম শেষের দিকে গিয়ে প্রিয় সেই চেয়ারটায় বসলাম। আহ! কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই টেবিল চেয়ার ঘিরে! কাটায় কাটায় দশ মিনিট পর সে ঢুকলো। ছোট মত একটা ধাক্কা খেলাম। হালকা মেকাপ করেছে, ঠোঁটে লিপস্টিক, পরিপাটি করে চুল আচড়ানো, বেশ সজীব লাগছিলো তাকে, মনে হলো আসায় আগে স্নান করে এসেছে, সে এক অপার্থীব সৌন্দর্য। সবুজ রঙের একটা সালোয়ার-কামিজ পড়েছে, হ্যাঁ, সালোয়ার কামিজ, এটাই আমার ধাক্কা খাওয়ার মূল কারন। একেবারে শেষ মুহূর্তেও আমার মনে হচ্ছিলো সে শাড়িই পড়ে আসবে। চরম একটা সত্য অনুধাবন করলাম, “বউরা শুধু আনপ্রেডিক্টেবলই না, মাঝে মাঝে চরম নিষ্ঠুরও হয়।”


৪.
মুখোমুখি বসে আছি দুজন, চুপচাপ; দুজনের মুখেই মৃদু মৃদু হাসি। সেও নিশ্চয়ই আমার মতই ভাবছে, “ধুর! কি টিনেজ প্রেমিক প্রেমিকাদের মত পাগলামি করছি! এভাবে বাসা থেকে না পালিয়ে স্বাভাবিক ভাবে বাহিরে খেয়েদেয়ে বসায় ফিরলেই হতো”।

চোখে চোখ পড়তেই সাথে সাথে ফিরিয়ে নিলাম; দুজনেই। কি অদ্ভুত সুন্দর লাগছে তাকে! থুতনির নিচে তিলটা যেন আজ দ্যুতি ছড়াচ্ছে, কালো আলোর দ্যুতি। আলতো করে তার হাতটা ধরলাম, ধরেই থাকলাম শুধু কিছুক্ষণ, তার চোখের পাতা আগের মত কেঁপে উঠনি, আমার হৃৎদকম্পনটাও দ্রুততর হয়ে যায়নি। কেমন যেন পানশে পানশে লাগছিলো, কি যেন নেই! কি যেন নেই মনে হচ্ছিলো। জিজ্ঞেস করলাম, “কেমন লাগছে বিবাহপরবর্তী ডেটিং?”

খারাপ লাগছে না, তবে ঠিক ডেটিং ডেটিং মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে তোমার সাথে বাইরে খেতে এসেছি।

কোন টেনশন নেই, নেই চকিত চাহন, প্রতি মুহূর্তে কেউ দেখে ফেলার ভয় নেই, যতক্ষণ ইচ্ছা তার হাত ধরে বসে থাকতে পারি; ইচ্ছে করলে গালের তিলটাও টুপ করে ছুঁয়ে দেখতে পারি, আমার বুকটা দুরু দুরু কেঁপে উঠবে না, তার নিঃশ্বাস মূহূর্তে দ্রুততত হয়ে উঠবে না; সবচেয়ে বড় কথা, কোন তাড়া নেই, যতক্ষণ ইচ্ছা একসাথে থাকতে পারি!

মনে পড়ে গেলো চার বছর আগের একদিনের কথা। এক সপ্তাহের মত হয়ে গেছে দেখা করতে পারিনি, শেষে তাকে বললাম, “আমি ফ্যামিলি-নিডসে থাকবো, তুমি মা কে গাড়িয়ে বসিয়ে রেখে আইস্ক্রিম কেনার কথা বলে ভিতরে ঢুকবে”। সেদিন শুধু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলাম কয়েক মিনিট দুজন দুদিকে তাকিয়ে টুকিটাকি কেনার অভিনয় করে। চোখে নয়, ঘ্রাণে তাকে অঙ্কিত করছিলাম হৃদয়ে আর পুলকিত হচ্ছিলাম, পাশদিয়ে হেটে চলে যাবার সময় যে দমকা হাওয়াটা গায়ে লেগেছিলো সেটার রেশ চোখ বুঝলে আজও অনুভব করি। ছুঁয়েও গিয়েছিলো তার ওড়নাটা আলতো করে আমার একটা হাত, কাঁপিয়ে দিয়েছিলো আমার প্রতিটি লোমকূপ।


৫.
গাড়িতে উঠেই শুরু হয়ে গেলো তার নিত্যনৈমত্তিক হাত পা নেড়ে চোখ বড়বড় করে অদ্ভুত ভঙ্গিতে বিরামহীন কথা বলা, আমি বরাবরই ভালো শ্রোতা; মনোযোগ দিয়ে অমৃতবানী শুনার ভান করছিলাম আর অবচেতন মনে দর্শন আওড়াচ্ছিলাম। স্মৃতি স্মৃতির পাতাতেই সুন্দর, কবি ঠিকই বলেছেন,“যায় দিন একেবারেই যায়”। মুধুময় অতীতকে নবরূপে আবিষ্কারের চেষ্টা সেটাকে ধ্বংসেরই নামান্তর। ভাগ্যিস সে আজ শাড়ি পড়ে আসেনি। প্রথম যেদিন তাকে শাড়িতে দেখেছিলাম সেই স্মৃতি না হয় অমলিনই থাকলো। তার হাতটা আমার হাতে নিয়ে উলটো পিঠে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে মনে মনে বললাম “আমার জীবনের শুদ্ধতম, সুন্দরতম স্মৃতিটাকে এভাবে অক্ষত রাখার জন্য এই জীবন পুনরায় তোমার তরে সপিয়া দিলাম, দেবী”


---------------------------------------------------------------------------
বি:দ্র: - ভালবাসা দিবস ২০১০ উপলক্ষে পিডিএফ সঙ্কলন "ভালবাসা"য় পূর্বে প্রকাশিত
----------------------------------------------------------------------------
দেবদূতের বিবাহনামা ----- ৬]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29098254 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29098254 2010-02-15 13:40:39
(কল্পগল্প)----সিরাস ভ্রমণ নাহ্ ! সমস্যা কোথায়? কেন হচ্ছে না, কেন? ধ্যাৎ! নিজের উপর চরম বিরক্ত হয় সে।

"শান্ত হও সিরাস, শান্ত হও, তুমি খুব কাছে দিয়ে ঘুরাঘুরি করছো, এই সময় অধৈর্য্য হলে হবে না, "তুমি যদি না পার তাহলে আর কেউই পারবে না" নিজেকে নিজে এভাবেই প্রবোধ দিতে থাকেন মহামান্য নিহেতা সিরাস। কিন্তু আর কত! তিন রাত না ঘুমানোর ক্লান্তি এবার চরমে পৌঁছে আর বিষ্ফোরন ঘটে অকস্মাৎ; ভেঙ্গে যায় সব নিয়ন্ত্রনের বাধ; বিপুল আক্রোশে রাইটিং স্ক্রিনের উপর এলোপাথালি হাত চালিয়ে গত তিনদিন তিনরাত অমানুষিক পরিশ্রম করে দাড় করানো চিত্র, সমীকরন আর সব লেখা এক ঝটকায় মুছে বিছার উপর ধপ করে বসে পড়ে সিরাস

চিৎকার শুনে পাশেরঘর থেকে দৌড়ে আসে মিহান। খুব সন্তর্পনে সিরাসের পাশে বসে, আলতো করে কোলের উপর টেনে নেয় তার এলিয়ে দেওয়া মাথাটা। তার এমন আচরনের সাথে ভালো করেই পরিচিত মিহান। খুব যত্ন করে চুলের ভিতর আঙ্গুল চালাতে চালাতে জিজ্ঞেস করে, "ইদানিং কি হয়েছে তোমার? এত অল্পতেই উত্তেজিত হয়ে পড়ছো?"

চুলে মিহানের হাত পড়তেই একেবারে অন্য মানুষ হয়ে যায় সিরাস, সব অবসাদ, ক্লান্তি আর ক্ষোভ মুহূর্তে কোথায় উবে যায়! বিড়ালের মত আহ্লাদে গুটিসুটি মেরে যায় একেবারে, একটু লজ্জাও পায় নিজের ছেলেমানুষী আচরনের জন্য, হাত পা গুটিয়ে তার কোলে মাথাটা আর একটু এলিয়ে দিয়ে বলে, "আমি পারছি না কেন?"

পারবে, তুমি পারবে। একটু ধৈর্য্য ধর, তুমি পারবে।

জানি পারবো; চোখ বন্ধ করলেই সম্পূর্ণ মডেলটা আমার সামনে জলজ্যান্ত ভেসে উঠে, কিন্তু কোন ভাবেই ধারণ করতে পারছি না, আর ধারন না করতে পারলে সমীকরনেও প্রকাশ করা যায় না, কষ্টটা এমন যে কাউকে বোঝাতেও পারছি না।

তুমি সবসময় একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্নে চিন্তাকর তাই অনেক সহজ জিনিসও পেঁচিয়ে ফেল। এক কাজ কর; তুমি সহজ ভাষায় আমাকে বোঝানোর চেষ্টা কর, দেখবে বুঝানোর সময় চিন্তার অনেক জট খুলে যাবে, নতুন খোরাক পাবে ভাববার আর এতে আমি কিছু না বুঝলেও তোমার কাছে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে।

সিরাসের চোখের দ্যুতি ধপ করে জ্বলে উঠলো মিহানের এই প্রস্তাব শুনে; মনে মনে আসলে এটাই চাচ্ছিলো সে। লেকচার দেওয়ার সুযোগ পেয়ে এক লাফে বিছানার উপর উঠে বসে, কোথা থেকে যেন অপার্থীব এক প্রাণশক্তি সঞ্চারিত হয় তার মনে। বিছানার উপর টেনে নিয়ে আসে রাইটিং স্ক্রিন। আঙ্গুলকে কলমের মত ব্যবহার করে দ্রুত কিছু ছবি আঁকে স্ক্রিনের উপরে, তারপর বিপুল উৎসাহে শুরু হয় তার লেকচার।

“মনে কর এটা সিরাস কনিকা, এই সিরাস কনিকাই হলো স্ট্রিং-থিউরির স্ট্রিং এর একক। প্রথমদিকে বিজ্ঞানীদের ধারনা ছিলো স্ট্রিংই হলো পরমানুর ক্ষুদ্রতম একক আর, পরে দেখা যায় যে ৯ টি এক মাত্রার সিরাস কনিকা মিলে গঠন করে একটি দুই মাত্রার স্ট্রিং ………”

আপাত গুরুত্বপূর্ণ লেকচারের ফাঁকে হঠাৎ অন্যমনষ্ক হয়ে যায় মিহান, কোন কথাই কানে যায় না তার, সিরাসের চোখে তাকিয়ে থেকে চলে যায় আঠার বছর অতীতের সেই ইউনিভার্সিটির ছাত্রজীবনে। ইস! সেই চোখ আর এই চোখ! একদম বদলায়নি এত বছরেও! প্রথম যেদিন ভার্সিটির ক্যাফেটেরিয়ায় সিরাসের চোখে চোখ পড়েছিলো মিহানের, সেদিনই ভিতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠেছিলো কোন এক অপার্থীব সুখানুভূতিতে; মনে হয়েছিলো এই চোখে তাকিয়ে থাকা যায় হাজার বছর; নিষ্পলক। আচ্ছা, সিরাস কি আমাকে এখনো আগের মতই ভালোবাসে? কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার কাছে; আমি নাকি তার গবেষণা? ভার্সিটির তৃতীয় বর্ষে থাকাকালিন সিরাস কী সব একক মাত্রার কনিকা আবিষ্কার করে সারা পৃথিবীতে হৈ চৈ ফেলে দেয়; তারপর থেকে চারদিকে কনিকা পদার্থ বিজ্ঞান ও কোয়ান্টাম মেকানিক্সে শুধু তারই নামডাক। সেই থেকে শুরু, তারপর শুধু সাফল্যের ইতিহাস; একের পর এক পুরস্কার, খেতাব, তার নামে সেই কনিকার নামকরন; সবশেষে সর্বোচ্চ বিজ্ঞান কাউন্সিলের আজীবন সদস্য পদ, আরও কত কী! তারপর থেকেই কেমন যেন হয়ে যায় সে, সারাক্ষণ শুধু গবেষণা, ল্যাব, সেমিনার এইসব হাবিজাবি, ধ্যাৎ! যত্তসব! যদিও তাকে কোনদিন অবজ্ঞা করেনি সে, যেখানে যে সেমিনারে গিয়েছে তাকে নিয়ে গেছে, সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে “মিহান, মাই ওয়ান এন্ড ওনলি, মিহান, দ্যা অনলি থিং ম্যাটার ইন মাই লাইফ ইজ সী, মিহান নেই তো এই সিরাসও নেই”। যতবার মিহানকে এভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে সিরাস, ততবার চোখ ভিজে ভিজে এসেছে তার। অনেক কষ্টে ছলছল চোখকে নিয়ন্ত্রন করতো সে। কতদিন আড়ালে আবডালে চোখ মুছেছে আনন্দে!

সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে যখন একটু অন্যমনষ্ক হয়ে যায় মিহান তখন হঠাৎ সিরাস বলে, “তুমি কি আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছো না?
একটু চমকে উঠে মুহূর্তেই সামলে নিয়ে বলে, “নাহঃ ! শুনছি তো ! তুমি বলে যাও”

মিহানের শুনা বা নাশুনা নিয়ে কোন মাথা ব্যাথা নেই সিরাসের, শুধু লেকচার দিয়ে যেতে পারলেই খুশি সে। আবার শুরু করে সে, “………তৃমাত্রিক সূত্রের সাহায্যে ‘সিরাস-কনিকাগুলোর’ অবস্হান তৃমাত্রিক জগতে খুব সহজেই বের করতে পারার কথা কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, তা কিছুতেই করতে পারছি না। তবে সময়কে মাত্রার চতুর্থ একক ধরে চতুরমাত্রিক সূত্রের মাধ্যমে এর অবস্হান বের করার চেষ্টা করে দেখি, মাঝে মাঝে বের করা যাচ্ছে আবার মাঝে মাঝে বের করা যাচ্ছে না। কিন্তু যদি পঞ্চমাত্রিক সূত্র প্রয়োগ করি তাহলে নিঁখুতভাবে এর অবস্হান বের করা যাচ্ছে, আর এটাই হচ্ছে মূল সমস্যা”

তাহলে পঞ্চমাত্রিক সূত্র খাটিয়েই এর অবস্হান বের করে ফেল না, সমস্যা কোথায়?

মুচকি একটু হাসে সিরাস, যেন সে এমন বোকার মত প্রশ্নই আশা করছিলো। তার মানে বুঝতে পারছো? তার মানে হলো আমার কোথাও ভুল হচ্ছে, কারন আমারা বাস করছি তৃমাত্রিক বিশ্বে, আর সময়কে একটা মাত্রা ধরলে দাঁড়ায় চৌ-মাত্রা, এটা কোনভাবেই পঞ্চমাত্রার হতে পারে না। আর যদি ধরেও নেই আমাদের ধারনার বাইরে আরও মাত্রা আছে তাহলে সেটা হবে সপ্তমাত্রা, কখনো পঞ্চমাত্রা নয়।

কেন? শুধু সপ্তমাত্রাই হতে হবে কেন? আর পঞ্চমাত্রা কেন হতে পারবে না?
আমাদের তিনটি মাত্রা হচ্ছে, ‘দৈর্ঘ’, প্রস্হ আর ‘উচ্চতা’ আর একটি মাত্রা হচ্ছে ‘সময়’। সময় যেহেতু একদিকে প্রবাহমান সেহেতু এটা কোন ভাবেই দ্বিমাত্রিক হতে পারে না। এখন যদি ধরে নেই দৈর্ঘের নিজস্ব দুটি মাত্রা আছে তাহলে মোট মাত্রা হলো পাঁচটি, দুটি দৈর্ঘ, একটি প্রস্হ, একটি উচ্চতা আর একটি সময়। কিন্তু দৈর্ঘ, প্রস্হ আর উচ্চতা মূলত একই জিনিস, শুধু বস্তুকে ঘুরিয়ে দিলেই দৈর্ঘ হয়ে যাবে প্রস্হ অথবা উচ্চতা। তাই দৈর্ঘ যদি দ্বিমাত্রিক হয় সাথে সাথে প্রস্হ ও উচ্চতাও দ্বিমাত্রিক হবে। সুতরাং দুটি দৈর্ঘ, দুটি প্রস্হ, দুটি উচ্চতা আর একটি সময় নিয়ে আমাদের বিশ্ব হবে সপ্তমাত্রিক (সেভেন্থ-ডাইমেনশনাল)। তাই আমরা হয় চৌমাত্রিক অথবা সপ্তমাত্রিক বিশ্বে বাস করছি, কিন্তু কোনভাবেই পঞ্চমাত্রিক বিশ্বে নয়।
ইস! ভালো সমস্যা পাকিয়েছ তো! তবে ঈশ্বর সহায় হলে তুমি খুব তাড়াতাড়ি এর সমাধান পেয়ে যাবে, আমি তোমার জন্য মনে প্রাণে প্রার্থনা করবো।

“উফ! এই মেয়েটি যে কেন এখনো সেই মান্ধাতা আমলের ধ্যানধারনা নিয়ে আছে। আজকালকার দিনে কেউ ঈশ্বর-টিশ্বর বিশ্বাস করে না কী?”, ভাবে সিরাস। বিরক্ত ভাবটা যথাসম্ভব চেপে রেখে বলে, “তোমার ঈশ্বর কখনোই আমার সহায় হবেন না। অতীতে আমরা প্রকৃতির কাছে অসহায় ছিলাম বলে ঈশ্বরের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতাম আর উনি নানা কেরামতি দেখিয়ে আমাদের মন জয় করতেন। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান প্রকৃতিকে প্রায় জয় করে এনেছে তাই ঈশ্বর মহাশয় আজ বেকার, তবে উনাকে সম্মান করে মুকুটহীন সম্রাট বলা যেতে পারে”, বলেই বাচোখটা একটু টিপ দিয়ে ঠোঁটে একটু তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে মিহানের দিকে তাকায় সিরাস।
ছিঃ! সিরাস ছিঃ! এভাবে বলে না। ঈশ্বরের কাছে অতীত বর্তমান বলে কিছু নেই, উনি সময়ের উর্ধ্বে, উনাকে নিয়ে এভাবে কথা বলা তোমার একদম ঠিক না, একদম না! আমি তোমার কথায় অনেক বিরক্ত হয়েছি, অনেক বিরক্ত! বলে মাথা ঝাকাতে ঝাকাতে রান্না ঘরে চলে যায় মিহান।


২.
“ঈশ্বর সময়ের উর্ধ্বে”, “ঈশ্বর সময়ের উর্ধ্বে” কিছুতেই চিন্তাটা মাথা থেকে বের করতে পারছে না সিরাস, এই কথাটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে অনেক্ষণ ধরে, যেন গ্রামোফোনের পিন আটকে যাবার মত আটকে গেছে মস্তিষ্কের কোন নিউরন । উফ! মাঝে মাঝে মিহানটা এমন বোকার মত কথা বলে না! এখন আর কোন কাজই করা যাবে না। চরম বিরক্তভাব নিয়ে বিছানায় গেলো সিরাস, শরীর চরম ক্লান্ত, মনটাও বিক্ষিপ্ত, আর অবচেন মনে আটকে আছে, “ঈশ্বর সময়ের উর্ধ্বে”, কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে টেরই পায়নি। ঘুমের মধ্যেই আবছা আবছা মনে হলো, কে যেন গায়ে চাদরটা টেনে দিয়ে গেলো আর কপালে হালকা চুমুও দিয়ে গেলো একটা।

“ঈশ্বর সময়ের উর্ধ্বে”, “ঈশ্বর সময়ের উর্ধ্বে” কে যেন কানের কাছে ফিসফিস করছে, ভয়ানক চমকে উঠে ঘুম ভেঙ্গে যায় সিরাসের, ঘেমে একাকার অবস্হা, পাশে তাকিয়ে দেখে গভীর ঘুমে অচেতন মিহান, কিছুক্ষণ সময় নেয় ধাতস্হ হতে। তারপর সন্তর্পণে বিছানায় উঠে বসে সিরাস। ধীর ধীরে রাইটিং স্ক্রিনটার দিকে এগিয়ে যায়, কাঁপা কাঁপা হাতে পাওয়ার অন করে স্ক্রিনটার। খুব দ্রুতবেগে কি সব লিখে যাচ্ছে আঙ্গুল দিয়ে রাইটিংস্ক্রিনটার উপর, আশেপাশে কোন খেয়াল নেই তার, একের পর এক সমীকরন লিখে যাচ্ছে, একের পর এক চিত্র এঁকে যাচ্ছে, যেন চাবি দেওয়া কোন রবোট; অভিব্যক্তি হিসাবে মুখের কঠোর ভাবটা কঠোরতর হচ্ছে আর চোখের জ্বলজ্বল ভাবটা আরো উজ্বলতর হচ্ছে।

গতকাল অনেক রাতে ঘুমিয়েছে তাই দেরি করে ঘুম ভাঙ্গে মিহানের। ঘুম থেকে উঠেই দেখে সিরাস রাইটিংস্ক্রিনে ভাবলেশহীন ভাবে লিখে যাচ্ছে তো লিখেই যাচ্ছে। ওকে বিরক্ত না করে মুখ হাত ধুয়ে টেবিলে নাস্তা দিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে মিহান, তারপর একাই খেয়ে নেয়। রাইটিংস্ক্রিনে তখনো লিখে যাচ্ছে সিরাস, ক্রমাগত। সিরাসের পাশে এসে বসে মিহান, রাইটিংস্ক্রিনে লেখা সমীকরন, চিত্রগুলোর মাথামুন্ডু কিছুই তার বুঝে আসে না, শুধু অবাক হয়ে সিরাসের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে আর মনেমনে ভাবে, “আমি তোমাকে এত ভালোবাসি কেন? আচ্ছা, তোমার ভালোবাসাও কি আমার মতই তীব্র? তোমার পাশে আমি এসে বসলাম আর তুমি একবারও তাকিয়ে দেখলে না?” হালকা ঈর্ষা অনুভব করতে থাকে সে রাইটিংস্ক্রিনটার উপর, “ইস, যদি এই স্ক্রিনটা হতাম আমাকে দিনে কতবার ছুঁয়ে দেখতে তুমি?”

হঠাৎ লেখা থামিয়ে মিহানের দিকে তাকায় সিরাস, কেমন ঘোর লাগা দৃষ্টি! যেন মিহানের ভিতর দিয়ে অনেক দুরের কোথাও তাকিয়ে আছে। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে, “আমি সমাধান পেয়ে গেছি, মিহান; আমি সমাধান পেয়ে গেছি।”

৩.
মিঘুয়েল কোস্ত্রা, বিজ্ঞান কাউন্সিলের মহাপরিচালক, বয়স হলেও চোখে তীক্ষ্ণতা একচুল কমেনি, ভ্রু কুচকে মহাবিরক্ত নিয়ে সিরাসের দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি। বিজ্ঞানী সিরাসকে তিনি অসম্ভব পছন্দ করলেও হাবভাবে কখনো তা প্রকাশ করেন না, পাছে তার দূর্বলতা সবার সামনে ধরা পড়ে যায়। দুই বছর আগে সিরাস নিজের মত করে কাজ করার কারন দেখিয়ে বিজ্ঞান কাউন্সিল থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিলেও মহামান্য কোস্ত্রার নির্দেশে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দাবাহিনী তাকে সার্বক্ষণিক চোখে চোখে রেখেছে। সর্বকালের শ্রেষ্ঠ এই বিজ্ঞানীকে কোনভাবেই চোখের আড়াল করতে নারাজ বিজ্ঞান কাউন্সিলের এই মহাপরিচালক। বলা নেই কওয়া নেই গতরাতে হঠাৎ সিরাস ফোন করে যখন বললো আজ সকালে যেন জরুরী ভিক্তিতে কাউন্সিল মিটিং ডাকা হয়, তখনই তিনি বুঝতে পেরেছেন এই পাগল বিজ্ঞানী কোন এলাহীকান্ড ঘটিয়েছে আবার।

উত্তেজনা ঢাকতে না পেয়ে উনি প্রায় চিৎকার করেই বলে উঠলেন, “মহামতি সিরাস, আপনি বলতে চাচ্ছেন প্যারালাল বিশ্ব অস্তিত্বমান?”
স্যার, সাইন্সফিকশন মুভিগুলোতে যেভাবে প্যারালাল বিশ্ব দেখা যায় ঠিক সে রকম প্যারালাল বিশ্ব বললে ভুল হবে। বলতে পারেন সময়ের অন্য স্তরে অন্য বিশ্বগুলো বিদ্যমান।

আপনি কি একটু সহজে সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করবেন?

“আসলে আমরা এতদিন ধরে নিয়েছিলাম সময় একদিকে প্রবাহমান, অতীত থেকে ভবিষ্যৎ, এই ধারনা ভুল ছিলো। আমি প্রমাণ পেয়েছি, সময় নিজেই আসলে দ্বিমাত্রিক। একটা মাত্রা আমরা অনুভব করতে পারছি, যেটা অতীত থেকে ভবিষ্যতে ধাবিত হচ্ছে এটা অনুভূমিক, আর একটা মাত্রা এর লম্ব বরাবর প্রবাহিত হচ্ছে। যেমন ধরুন, আমি এই ভবন এর বারান্দা দিয়ে হেঁটে যাই তাহলে যে গতিপথ হবে সেটাকে যদি অনুভূমিক ধরি তাহলে আমার ঠিক নিচের তলা দিয়ে যে লোকটি হেঁটে যাচ্ছে তার গতিপথও অনুভূমিক তবে সে আমার সাথে একটা নির্দিষ্ট লম্ব দূরত্ব রেখে হেঁটে যাচ্ছে। এভাবেই সময়ের লম্ব বরাবর অসীম সংখ্যক বিশ্ব পাশাপাশি প্রবাহিত হচ্ছে। আর সিরাস কনিকাগুলো পঞ্চমাত্রার এই বিশ্বে অসীম সংখ্যক চৌ-মাত্রিক জগতে প্রতিনিয়ত ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে” এতটুকু বলেই থামলো সিরাস।

ঘরের মধ্যে সবাই রীতিমত ঘামছে, কারও মুখে কোন কথা নেই, নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে তাদের, কিন্তু কিছুই করার নেই, সমীকরনতো আর মিথ্যা বলবে না! তাদের সামনে সিরাস চিত্রসহ সব প্রমান পেশ করেছে। অবশেষে নিরবতা ভাঙ্গলেন মহামান্য কোস্ত্রা, “মহামতি সিরাস, এখন আপনার পরামর্শ কি, আপনি কি করতে চান?”

আমার পরামর্শ হলো, এখন এই থিউরীর যথার্থতা শুধু মাত্র এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমেই প্রমান করা সম্ভব, তাই এই আবিষ্কারের গুরুত্ব অনুধাবন করে যথাসম্ভব দ্রুত এক্সপেরিমেন্টের ব্যবস্হা করা দরকার।

মহামান্য কোস্ত্রা আবিষ্কারের গুরুত্ব ঠিকমতই অনুধাবন করতে পারছেন, বছর তিনেক পর তিনি অবসরে যাছেন, জীবনের শেষ সময়ে এসে এমন কোন এক কালজয়ী এক্সপেরিমেন্টের সাথে যুক্ত হতে পারাটা ভাগ্যের ব্যপার। কিন্তু বিশাল ব্যয়বহুল এই এক্সপেরিমেন্টের জন্য বাজেট পাওয়া যাবে কি না সেটা ভেবে উনি একটু উদ্বিগ্ন। শেষে বললেন, “আমি আমার তরফ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো এই এক্সপেরিমেন্ট চালানোর জন্য, বাকী সরকারের সদিচ্ছা”।

মহামান্য কোস্ত্রার অসাধ্য কিছুই নেই, উনার তরফ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টার আশ্বাস পাওয়া মানে শতভাগ নিশ্চয়তা। মৃদু হেসে সিরাস বললো, “মহামান্য কোস্ত্রা, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ”

৪.
জান, আমাদের এক্সপেরিমেন্টের সবকিছু প্রায় গুছিয়ে এনেছি, আশা করছি আগামী মাসের প্রথম দিকে চালু করতে পারবো। সে এক বিশাল ব্যাপার স্যাপার!

-হুমম!

কিভাবে দেখতে দেখতে দুইটা বছর চলে গেলো, তাই না?

-হুমম

ভাবছি তোমাকে একদিন আমাদের ল্যাবে নিয়া যাব, নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করবে না! মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর ব্যায়বহুল এক্সপেরিমেন্ট এটা।

-আচ্ছা

এই প্রথম আমরা কৃত্রিমভাবে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উৎপন্ন করবো, প্রায় প্লাংক টেমপারেচারের অর্ধেক। স্টিফেনিয়ামকে এই তাপমাত্রায় উত্তেজিত করে অসীম সংখ্যক সিরাস কনিকা নির্গত করা হবে, তারপর এই সিরাস কনিকাগুলোকে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন তড়িৎ-চুম্বক ক্ষেত্রে টেনে এনে একটা টিউবের চারপাশে ছেড়ে দিয়ে তড়িৎ-চুম্বক বন্ধ করে দিলেই ঐ সিরাস কনিকাগুলো টিউবটিকে সহ সময়ের অন্য এক মাত্রায় চলে যাবে।

-ও, আচ্ছা

টিউবের ভিতরে আমরা একজন মানুষকে পাঠাবো। চিন্তা করতে পারো পৃথিবীর প্রথম সেই মানুষ যে সময়ের ভিন্নস্তরে পরিভ্রমন করবে! কত ভাগ্যবান সেই ব্যক্তি! ও, আচ্ছা বলতে ভুলে গেছি, এই ভ্রমণের নাম রাখা হয়েছে আমার নামে “সিরাস ভ্রমণ”। ইতিহাসের এই প্রথম কোন ভ্রমণের নামকরন করা হয়েছে কোন বিজ্ঞানীর নামে।

-ভালো

তুমি কি কোন কারনে আমার উপর বিরক্ত?

-না বিরক্ত না, তুমি কথা পেঁচাচ্ছ কেন? যে কথা বলার জন্য এতক্ষণ ঘুরঘুর করছ সেটা বলে দিলেই তো হয়, ভয় পাচ্ছ কেন?

একটু থতমত খেয়ে যায় সিরাস, সামলে নিয়ে বলে, আসলে এই ভ্রমণে আমি নিজেই যাচ্ছি। বলেই চুপ মেরে যায় সে, মিহানও চুপ; কোন কথা নেই কারো মুখে। শেষে সিরাসই নিরবতা ভেঙে বলে, “অনেক ভেবে দেখলাম, ভ্রমনের সময় বা অন্য জগতে অনেক অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটতে পারে, তাই এই এক্সপেরিমেন্টের ব্যাপারে যার জ্ঞান তাত্ত্বিক ও প্রযুক্তিগতভাবে সবচেয়ে বেশি তার যাওয়াটাই যুক্তিসঙ্গত, এত গুরুত্বপূর্ণ আর ব্যয়বহুল কোন এক্সপেরিমেন্টের ব্যাপারে কোন রকমের রিস্ক নেওয়া ঠিক হবে না।”

-আমি অনেক আগেই জানি তোমার এই পরিকল্পনার কথা, তোমার কম্পিউটার ঘেটে আমি জেনেছি। আমি শুধু অপেক্ষা করছিলাম তুমি নিজের মুখে কবে আমাকে জানাবে। মুখ তুলে সরাসরি সিরাসের চোখে চোখ রেখে তাকায় মিহান।

সিরাসের বুকটা কেঁপে উঠে মৃদু! কি দেখেছে সে মিহানের চোখে? ভালোবাসা? আকুতি? ঘৃণা? না কি শুধুই জল?

হঠাৎ ঝাপিয়ে পড়ে মিহান সিরাসের বুকে, সার্টের কলার চেপে ধরে ঝাকাতে ঝাকাতে বলে তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না, প্লিজ!

কিন্তু তারতো আর ফিরে আসার উপায় নেই! তাদের দুজন মানুষের জীবনের চেয়ে এই এক্সপেরিমেন্ট মানব জাতির জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর সে তো চিরদিনের জন্য যাচ্ছে না, পরীক্ষা সফল হলেই সে দুইদিনের মধ্যে ফেরত আসবে। কিন্তু এই বলে কি আর মিহানের কান্না থামানো যাবে? কাঁদুক বেচারা, কেঁদে বুকটা একটু হালকা করুক।

৫.
আজ সেই মহেন্দ্রক্ষণ! রক্তের মধ্যে উত্তেজনা টের পাচ্ছে সিরাস। যদিও একটু ভয় ভয় লাগছে, বেশি খারাপ লাগছে মিহানের জন্য, বেচারীকে অনেক জোরজবরদস্তি এখানে আনতে পারেনি সে। বারবার চোখ মুছছিলো আর বলছিলো, “মনে হচ্ছে শেষ সময়ে কোন একটা ঝামেলা হবে আর তোমার মারাত্মক কোন ক্ষতি হয়ে যাবে আর চোখে সামনে আমি তা দেখতে পারবো না। তারচেয়ে আমি সারাদিন প্রার্থনা করেই কাটাই”। আপন মনে একটু হেসে উঠলো সিরাস, “ভালোবাসার মানুষের জন্য মানুষের কতই না অযোক্তিক উৎকন্ঠা!” হঠাৎ কি মনে হলো ফোনটা নিয়ে মিহানের নাম্বারটা ডায়েল করা শুরু করলো সে, হয়ত শেষবারের মত কথা বলে নেওয়ার জন্য, কিন্তু একজন ল্যাব ইঞ্জিনিয়ারকে তার দিকে দৌড়িয়ে আসতে দেখে ফোনটা কেটে দিলো।

- মহামতি সিরাস, আপনাকে মহামান্য কোস্ত্রা স্যার এক্ষণি যেতে বলেছেন।
এক্ষণি? আচ্ছা আসছি; বলেই পা বাড়ালো সিরাস, শেষবারের মত আর কথা বলা হলো না মিহানের সাথে।

রুমে ঢুকেই একটু থমকে দাড়ালো সিরাস। বিশ পঁচিশ জনের মত বিজ্ঞানী আর ডাক্তার ভাবলেসহীন মুখে বসে আছে ঘরের মধ্যে, এদের প্রায় কাউকেই সে চিনে না। প্রজেক্টের নিরাপত্তার স্বার্থে উপরের পর্যায়ের চার পাঁচজন বিজ্ঞনীবাদে সবাইকে প্রতি মাসে অন্যত্র বদলি করা হয়, এরা মনে হয় নতুন ব্যাচের হবে সবাই, মনে মনে ভাবে সিরাস। মাহামতি কোস্ত্রা কণ্ঠে জরুরীভাব ফুটিয়ে তুলে বললেন, “কোথায় ছিলে আপনি? আপনাকে অনেক্ষণ ধরে খুঁজছি! আমাদের সিস্টেম লঞ্চ করার কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। আপনাকে কিছুক্ষণের মধ্যে প্রস্তুতি শেষ করতে হবে”

চারদিকে একবার তাকিয়ে, চেপে থাকা নিঃশ্বাসটা ধীরে ধীরে ছেড়ে সিরাস বললো, “আমি প্রস্তুত, স্যার”

মুহূর্তেই তাকে নিয়ে ঘরের মধ্যে হুলুস্থূল পড়ে গেলো, হাজার রকমের যন্ত্রপাতি, রিডার, স্ক্যানারে চারদিক ঘিরে ধরে তাকে, জ্ঞ্যান হারাবার আগে শুধু মনে আছে কে যেন বলছে, “কোয়ান্টাম ঘড়িটা চালু কর ……. রেডি ওয়ান টু থ্রী স্টার্ট”। পিঁপ পিঁপ পিঁপ করে তিনটি শব্দ হয়ে সব নিস্তব্ধ হয়ে যায় সিরাসের কাছে শুধু শেষ এই তিনটি শব্দ গেঁথে যায় তার মস্তিষ্কে, অবচেতন মনে শুনতে থাকে, “পিঁপ পিঁপ পিঁপ”



ল্যাবের শত শত বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়াররা চরম উৎকণ্ঠায় পার করছে শেষের প্রতিটা মুহূর্ত! সবার চোখে মুখে চাপা উত্তেজনার ছাপ, শেষ কয়েক মিনিট আর বাকি, সবাই যার যার স্ক্রিনের সামনে মূর্তির মত বসে আছে, শুধু চোখগুলো বিদ্যুৎ বেগে পড়ে যাচ্ছে নানান রিডিং আর গ্রাফ আর ডাটা। মহামান্য সিরাসকে প্রায় পরম তাপমাত্রার কাছাকাছি তাপমাত্রায় শীতল করে ইন্টেনিয়ামের টিউবে রেখে তা একশ মিটার ব্যাসের একটি বৃত্তের কেন্দ্রে স্হাপন করা হয়েছে আর এই বৃত্তের পরিধি বরাবর বসে আছেন সব টেকনিশিয়ানরা। ইন্টেনিয়ামের টিউবে ঠিক নিচেই ভূপৃষ্ঠের গভীরে বসানো হয়েছে অসীম সংখ্যক সিরাস কনিকা উৎপন্ন করার যন্ত্র।

সবকিছু ঠিক হতেই চিফ সাইন্টিস্ট মহামতি কোস্ত্রার দিকে একবার তাকিয়ে বললেন,“স্যার?”

মহামতি কোস্ত্রা আলতো করে মাথাটা উপর নিচে নেড়ে অনুমতি দিলেন।
সাথে সাথে কম্পিউটারে নারীকণ্ঠে বলে উঠলো “এক্সপেরিমেন্ট ‘ট্রাভেল সিরাস’ ইজ এবাউট টু স্টার্ট, নাইন, এইট, সেভেন, ……… ওয়ান”

কোন পরিবর্তন কারও চোখে ধরা পড়লো না! ইন্টেনিয়ামের টিউবটা শুধু একটু কেঁপে উঠলো বলে মনে হলো, তাও এক সেকেন্ডের লক্ষভাগের একভাগ সময়ের জন্য! আল্ট্রাসনিক সেন্সর ছাড়া এই পরিবর্তন কিছুতেই বুঝা যেত না। বিজ্ঞানীরা একেবারে থ মেরে গেছেন সবাই! এমন তো হবার কথা নয়! ইন্টেনিয়ামের টিউবটাতো এখন সময়ের অন্য স্তরে চলে যাবার কথা! কোথায় গড়মিল হলো? বড় ধরনের কোন ভুল হয়ে গেছে কোথাও নিশ্চয়! কিন্তু সব ডাটা, রিডিং সবকিছু একেবারে ঠিক দেখাচ্ছে! কোথাও কোন বিচ্চুতি, ভুল দেখা যাচ্ছে না! সবাই যতক্ষণে হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি, তখন গমগম কণ্ঠে মহামতি কোস্ত্রা আদেশ দিলেন, “এক্ষণি ইন্টেনিয়ামের টিউবটা খুলে সিরাসকে বের কর, জলদি, রাইট নাও”

৬.
সরি!

কি হয়েছে সিরাসের? কি হয়েছে ওর? নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে কষ্ট হচ্ছে মিহানের, চিৎকার করে যাচ্ছে অনবরত। কোথায় সে এখন? প্লিজ আমাকে একবার ওকে দেখতে দেন, প্লিজ!

মিসেস. নিহেতা, আপনি শান্ত হোন। মহামান্য সিরাসের ভালোর জন্যই আপনাকে এখন শক্ত হতে হবে।

আপনারা কিছু বলছেন না কেন? কি হয়েছে ওর? মনের মধ্যে নানান আশংঙ্কা উকি ঝুকি মারছে, খুব কষ্ট হচ্ছে তার।

আসলে কি হয়েছে আমরা এখনো ঠিক ধরতে পারিনি, তবে আমাদের এক্সপেরিমেন্ট ব্যর্থ হয়েছে, আর কোন এক বিচিত্র কারনে মহামান্য সিরাসের বয়স বেড়ে নব্বই হয়ে গেছে।

নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না মিহান, পাগলের মত এসব কি বলছে এই লোক! ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে কেবিনে ঢুকে যায় সে। থ! এই অতিশয়পর বৃদ্ধ লোকটা সিরাস! নাকে অক্সিজেনের পাইপ, কুচকানো হাতের চামড়া, মুখের চামড়া কুচকে কালো হ্য়ে গেছে, চুল সব সাদা! এটা কি আসলেই সিরাস? ঠিক, সিরাসই তো! আমি কি ওকে দেখে না চিনে থাকতে পারি! ওহ! সিরাস! তোমার একি হয়েছে? বুকের ওপর প্রায় ঝাপিয়ে পড়লো সে। সিরাসে দূর্বল হাতটা তুলে নিয়ে চুমু খায়, চোখের পানি মুছে তার হাত দিয়ে, তারপর মাথা নিচু করে বছানায় মুখ ঢেকে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে মিহান।

কে মিহান? এসেছো? আমার এক্সপেরিমেন্ট ‘সিরাস-ভ্রমণ’ ফেইল করেছে! আমার এক্সপেরিমেন্ট ফেইল করেছে! আর এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আমার বয়স বাড়িয়ে দিয়েছে দ্বিগুণ! এটা নিয়ে আমার কোন আক্ষেপ নেই, কিন্তু আমি এত দূর্বল হয়ে গেছি যে আর গবেষণা করতে পারবো না, আর বের করতে পারবো না কোথায় ভুল হয়েছে আমার, এ আক্ষেপ নিয়ে আমাকে বাঁচতে হবে!

কোন মানুষ এই রকম পরিস+হিতিতে এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে আক্ষেপ করতে পারে! নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না মিহান। অতঃপর তার কথায় সায় দিয়ে বলে, দুঃখ করো না, ঈশ্বর চাইলে সব ঠিক করে দিবেন। আসলে কি হয়েছিলো? তোমার কিছু মনে আছে?

এক্সপেরিমেন্টের শুরুদিকে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলো, আর ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখি আমার বয়স দ্বিগুণ! মাঝখানে আর কিছু মনে নেই আমার।

বিছানা থেকে মাথা তুলে তাকায় মিহান, চোখ পড়ে সিরাসের চোখে, থমকে যায় সে মুহূর্তের জন্য, সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠে তার, হাজার ভোল্টের কারেন্টের শক খেয়েছে যেন! চিৎকার করে উঠে, “কে তুমি, কে? তুমি তো সিরাস নও, না, না ! তুমি সিরাস না! কোথায় আমার সিরাস?”

চিৎকার শুনে ডাক্তার নার্স ছুটে এসে ধরে মিহানকে, আর সে অনবরত চিৎকার করে যাচ্ছে “এ আমার সিরাস নয়, এ আমার সিরাস নয়, এ আমার সিরাস নয়”

অনেক দূর্বল লাগছে সিরাসে, অনেক ঘুম পাচ্ছে তার। ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে সে
শুনতে থাকে ডাক্তাররা পাশের রুমে মিহানকে বুঝাচ্ছে আর বলছে, “আমরা ব্লাড টেস্ট, ফিঙ্গার প্রিন্ট, চোখের আইরিশ চেক করে দেখেছি, এমন কি ডি.এন.এ টেস্ট পর্যন্ত করেছি, আমরা শতভাগ নিশ্চিত উনিই সিরাস”

ঘুমানোর ঠিক আগে কোন এক বিচিত্র কারনে তার কানে অদ্ভুত একটা শব্দ আসতে থাকে, “পিঁপ, পিঁপ, পিঁপ”। এটা কি সে ঠিক ঠিক শুনতে পাচ্ছে, না কি তার অবচেতন মন থেকে আসছে এই শব্দ? ভাবার আর অবকাশ পেল না সিরাস, ঘুমিয়ে পড়লো।

৭.
ধীরে ধীরে চোখ খুলে সিরাস। সে এখানে কেন? সে এখানে শুয়ে আছে কেন? আর সাদা এপ্রোণ পড়ে এত মানুষ তার চারপাশে দাঁড়িয়ে কি দেখছে? কোথায় সে এখন? এরা কারা? একটু ভয় পায় সিরাস।

মহামতি কোস্ত্রার কপালে ভাঁজ পড়লো বেশ কয়েকটা। উনি কিছুই বুঝতে পারছেন না কি হলো। ইন্টেনিয়ামের টিউব সময়ের অন্য ডাইমেনশনে চলে যাবার কথা, সেটা ঠায় এখানে দাঁড়িয়ে আছে, আবার বিজ্ঞানী সিরাসের বয়স কমে বাইশ হয়ে গেলো! কোথাও মারাত্মক কোন ভুল হয়ে গেছে, মারাত্মক ভুল!

৮.
ঘুম ভেঙ্গে গেলে বেল টিপে নার্সকে ঢাকেন মহামান্য সিরাস। দিনের বেশিভাগ সময় ঘুমিয়েই কাটান, বড় দূর্বল লাগে নিজেকে, হয়ত আয়ু ফুরিয়ে এসেছে ওনার। একটাই কষ্ট, এক্সপেরিমেন্টটা সফল করে যেতে পারেন নি।

নার্স, আজ কয় তারিখ?

-বিশে জুন দুই হাজার ত্রিশ।

আমি এখানে কতদিন ধরে আছি? মিহান কি এসেছিলো আর আমাকে দেখতে?

-আপনি এখানে আছেন পাঁচ দিন হলো। আর মিসেস. মিহেতা এখনো মনে করেন আপনি মহামান্য সিরাস নন। উনি কিছুতেই মানতে চাচ্ছেন না এই সত্যটা।

হুমম। কি একটা যেন খুচাচ্ছে মনে মনে সিরাসকে, কিন্তু ধরতে পারছেন না। হঠাৎ বা হাতের কব্জিতে কিসে উপস্হিতি টের পেলেন। হাতটা চোখের সামনে তুলে ধরতেই কোয়ান্টাম ঘড়িটা চোখে পড়ল তার, জ্বলজ্বল করছে “নয় দিন বিশ ঘন্টা পঁচিশ মিনিট ……সেকেন্ড”। একসাথে অনেক কিছু খেলে গেলো তার মাথায়! সে হসপিটালে আছে পাঁচ দিন, তাই এক্সপেরিমেন্টও হয়েছে পাঁচ দিন আগে, কোয়ান্টাম ঘড়ি দেখাচ্ছে প্রায় দশ দিন! চোখ জ্বলে ওঠলো সিরাসের। মনে মনে অনেক কিছু চিন্তা করলেন সময় নিয়ে, তারপর কম্পিত হাতে ফোন করলেন মিহানের নাম্বারে।

-“আপনি কেন ফোন দিয়েছেন? আমি বলিনি যে আমি আপনার মিহান নই, আর আপনিও সিরাস নন! কী বলিনি?” উত্তেজিত হয়ে যায় মিহান।

“আমি জানি আমি সিরাস নই”, দেখ মিহান “কোথায় গন্ডগোল হয়েছে আমি আন্দাজ করতে পারছি। যে রাইটিংস্ক্রিনে আমি সব কিছু লিখে রাখতাম সেটা কি তুমি কি আমার বাসা থেকে এখানে নিয়ে আসতে পারবে?”

-আমি সিরাসের গোপনীয় গবেষণার রেকর্ড কেন আপনাকে দিব?

কারন আমি সিরাসকে, তোমাকে এবং আমাকে সাহায্য করতে চাই, আমার এক্সপেরিমেন্ট ফেইল হয়নি। তুমি প্লিজ আমাকে একটু সহযোগীতা কর, আমার মনে হয় আমি আবার সব আগের মত করে দিতে পারবো।

পরবর্তী দুই দিন অমানুষিক পরিশ্রম করে সিরাস। ক্লান্তির চরমে চলে গিয়েছিল একেবারে এ দুই দিনে। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে রাইটিং স্ক্রিনে একের পর এক সমীকরন মিলিয়েছে, নতুন সমীকরন তৈরী করেছে, আগের সব কাজের রেকর্ড প্রথম থেকে শেষে পর্যন্ত চেক করেছে, খুঁটিনাটি অনেক কিছু আবার ভেরিফাই করে দেখেছে, এখন সবকিছু তার সামনে পরিষ্কারভাবে ফোটে উঠেছে। আশ্চর্য! এত বড় একটা বিষয় কিভাবে তার চোখ এড়িয়ে গেলো? কাঁপা হাতে, কিন্তু অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাস নিয়ে ফোন করে সে মহামতি কোস্ত্রার ইমার্জেন্সি নাম্বারে।

৯.
-আপনি বলতে চাচ্ছেন এক্সপেরিমেন্ট সফল হয়েছে?

আমি শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে বলছি এক্সপেরিমেন্ট ‘সিরাস ভ্রমণ’ সফল হয়েছে।

-হুমম।

আমার ভুল হয়েছিলো আমি সময়ের অন্য স্তরগুলোকে সরলরৈখিক-সমান্তরাল ভেবেছিলাম, আসলে সময়ের ডাইমেনশনগুলো সমান্তরাল ঠিকই আছে, তবে তা সরলরৈখিক নয়, বরং এগুলো এক কেন্দ্র বিশিষ্ট বিভিন্ন বৃত্তের পরিধি বরাবর অবস্হিত।

-একটু সহজভাষায় ব্যাখ্যা করবেন, প্লিজ?

মনে করুন, একটা ফুটবলের ভিতর আরেকটা ফুটবল, তার ভিতর আরেকটা ফুটবল, তার ভিতর আরেকটা, এভাবে চলতেই থাকলো, স্বাভাবিক ভাবেই ভিতরের দিকের ফুটবলের পরিধি কম। এখন দ্বিমাত্রিক সময়ের, একটা মাত্রা এই ফুটবলের পরিধি বরাবর প্রবাহিত হচ্ছে যেটা আমরা অতীত থেকে ভবিষ্যতে প্রবাহমান দেখি, আরেকটা মাত্রা এই ফুটবলের কেন্দ্র বরাবর প্রবাহিত হচ্ছে। এখন বাহিরের বিশ্বের পরিধি যেহেতু বেশি তাই এই বিশ্বে যখন একদিন সময় অতিবাহিত হচ্ছে, তখন ভিতরের কোন বিশ্ব যার পরিধি বাহিরের বিশ্বের পরিধি অর্ধেক সেখানে দুই দিন অতিবাহিত হচ্ছে। আসলে ঠিক করে বলতে গেলে, বাহিরের বিশ্বে যখন চব্বিশ ঘন্টায় একদিন প্রবাহিত হয়, তখন ভিতরের বিশ্বে বার ঘন্টায় একদিন অতিবাহিত হয়, তবে কেন্দ্রের সাপেক্ষে সব বিশ্বের সময় এক।
আসলে অসীম সংখ্যক হুবহু একই রকমের বিশ্ব বৃত্তাকারে ‘একের ভিতর এক’ এভাবে অবস্হান করছে, কোথাও সময় দ্রুত কোথাও সময় ধীর। এই বিশ্বের সিরাস যখন ইন্টেনিয়ামের টিউবে ভ্রমনের জন্য অপেক্ষা করছিলো, তখন অপর বিশ্বের সিরাস মানে আমিও ইন্টেনিয়ামের টিউবে ভ্রমনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম, আসলে এই অসীম সংখ্যক বিশ্বের সবকিছু একই রকম চলছে। আমি এখানে এসেছি বলেই সিরাস ওখানে যেতে পেরেছে, আবার সিরার ওখানে গিয়েছে বলেই আমি এখানে আসতে পেরেছি। দুইটা ঘটনা যুগপৎ ঘটেছে বলে পরিবর্তনটা বুঝা যায় নি।

যখন এক্সপেরিমেন্ট চালানো হয় তখন এই বিশ্বের সিরাসকে নিয়ে টিউবটি আমার বিশ্বে চলে যায়, আর আমাকে এই বিশ্বে নিয়ে আসে। যেহেতু সময়ের দুইটি ভিন্ন মাত্রার বিশ্বের মধ্যে সংযোগ স্হাপিত হয় তাই স্বাভাবিক ভাবেই একে ব্যালেন্স করার জন্য আমার বয়স বেড়ে গিয়েছে, আর নিশ্চই এই বিশ্বের সিরাসের বয়স ঐ বিশ্বে গিয়ে অর্ধেক হয়ে গিয়েছে, এবং তার সব স্মৃতিও স+হিত হয়ে আছে তার সেই বয়সে। যেহেতু সবগুলো বিশ্বই হুবহু একই রকম তাই সবাই ভাবছে যে সে নিজের বিশ্বেই আছে

-এখন আপনি কি করতে বলেন?

সমাধান একদম সহজ। যে এক্সপেরিমেন্ট আমরা করেছি, সেটা আবার করলেই আমি আমার বিশ্বের আর এই বিশ্বের সিরাস এই বিশ্বে চলে আসবে।

-মুহূর্তেই করনীয় ঠিক করে ফেললেন মহামতি কোস্ত্রা। হাতে সময় খুব কম, সিরাসের শারীরিক অবস্হা ভালো না, যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। এক্সপেরিমেন্ট ব্যর্থ হয়েছে ভেবে ল্যাব বন্ধ করে দেওয়ার তোড়জোড় চলছে, ঠিক আছে আমি চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে আবার এক্সপেরিমেন্ট চালানোর ব্যবস্হা করছি।

“অনেক ধন্যবাদ, স্যার” বলেই মহামতি কোস্ত্রা দিকে একটি ডিস্ক বাড়িয়ে দিয়ে সিরাস বললো, আমার একটা রিকোয়েষ্ট স্যার, “এই ডিস্কটা আমি যাওয়ার পর মিহানকে দিবেন। আর বলবেন যেন সিরাস ফিরে আসলে এটা তাকে দেয়”

১০.
“প্রিয় সিরাস, কি অদ্ভুত! তাই না? আমি নিজেকে নিজেই “প্রিয় সিরাস” বলছি! যেহেতু আমিই তুমি, তাই আমি আসলে যা বলতে চাই তা তোমার জানার কথা। কিন্তু আমার ধারনা তুমি তা জান না, কারন তুমি যখন আমার বিশ্বের গিয়েছিলে তখন তোমার বয়স অর্ধেক হয়ে গিয়েছিলো তাই তুমি অনেক কিছুই বুঝতে পারনি। আসলে এই বিশ্ব আমাদের ধারনার চেয়েও অনেক অনেক বেশি রহস্যময় ও জটিল। এখনে অসীম সংখ্যক বিশ্ব গোলক আকারে একের ভিতর এক অবস্হান করছে এক কেন্দ্রীক বৃত্তের পরিধি বরাবর………………”

“……………এই সূত্র মতে যতই কেন্দ্রের দিকে যাবে ততই সময়ের গতি বাড়তে থাকবে, তাহলে একেবারে কেন্দ্রে কি আছে? কেন্দ্রের সময়ের গতি তাহলে অসীম! আবার সর্ববাহিরের বিশ্বের সময় কেমন? সেখানে তো সময় চির স্হির হয়ে আছে! তাহলে কি বিশ্বের কেন্দ্রের অসীম গতির সময় আর সর্ববাহির বিশ্বের চির স্হির সময় নিয়েই ঈশ্বর স্বয়ং? কি জানি, এই প্রশ্নের উত্তর পদার্থ বিজ্ঞান কোন দিন দিতে পারে কি না!”

[শেষের কিছু অংশ পোষ্টে আসছে না, তাই প্রথম কমেন্টে দিয়ে দিলাম]]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29075337 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29075337 2010-01-09 22:42:15
আর একটা ডিসেম্বরের অপেক্ষায় আছে দেবদূত

১.
রাস্তা দিয়ে এলোমেলো হেটে যাচ্ছে উদভ্রান্ত এক যুবক, গায়ের কাপড়ের ঠিক নেই, চুলগুলো উসকোশুষ্ক, বিড়বিড় করে কি যেন বকে যাচ্ছে আপন মনে। কত হবে ছেলেটার বয়স ? ত্রিশ বছর, বা আরও কম পঁচিশ? ছেলে বলা যাবে না কি লোক বলবো? আচ্ছা, আদমই বলি। একটু খেয়াল করলেই বুঝা যাবে আদম সন্তানটি অপকৃতস্হ।

স্বাধীন দেশে; বনীআদমরা মক্তভাবে ঘুরে বেড়াবে এটাই তার অধিকার, সেই হিসাবে পাগলেরও এই অধিকার আছে, পৃথিবীর আর কোন দেশ মনে হয় গনতন্ত্রের এই চরম উৎকর্ষতায় পৌছুতে পারেনি আমরা ছাড়া। তো! কি আর করা ! কপাল মন্দ, কিছুক্ষণের মধ্যেই রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যায় তাকে পুলিশ। তারপরই বাধে বিপত্তি, এই আদম বিড়বিড় করে কি বলে কেউ কিছু বুঝে না, আর পুলিশ কী জেরা করে বনী আদমের সেই দিকে কোন খেয়াল নেই।

শেষে একজন অফিসারের সন্দেহ হওয়ায় খবর দেওয়া হয় বাংলাদেশ দূতাবাসে। তারপরের ইতিহাস খুবই গতানুগতিক। তিন চার মাস আগে হতভাগা বঙ্গদেশের এই আদম সন্তানটি শেষ সম্বল নিজের ভিটে খানা বিক্রী করে নিজের বউ বাচ্চাদের অন্যের ঘরে আশ্রিত রেখে এখানে চলে আসে সুন্দর ভবিষ্যতের আশায়। স্বপ্ন দেখেছিলো এখানে এসেই কাড়ি কাড়ি টাকা পাঠাবে দেশে, সব অভাব দুর হয়ে যাবে। আর এখানে এসে তিনচার মাস ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে পথে পথে; কোন কাজ নেই, যে কোম্পানীর চাকুরির কথা বলে একে আনা হয়েছে সেই কোম্পানীও নেই, দালালও লাপাত্তা। মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে সে এখন সব ধরনের মানসিক চাপের উর্ধ্বে।


২.
বাবার সাথে দাড়িয়ে গল্প করছি। একটা ছেলে আশপাশ দিয়ে ঘুরঘুর করছিলো, কি যেন বলতে চায় আবার লজ্জায় বলতে পারছে না। কিছুক্ষণ পর সাহস করে বলেই বসলো, "স্যার, আজকা চাইর মাস ধইরা ভাত খাই না, খবজা (শক্ত এক প্রকারের রুটি, আকারে এক হাতের মত লম্বা) খাইতে খাইতে মুখে ঘা হয়া গেছেগা"। বলেই মাথা নিচু করে ফেললো।

কত হবে ছেলেটার বয়স ? বিশ, একুশ ? আমি অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে নিলাম, তার চোখের দিকে তাকানোর মত শক্তি আমার ছিলো না। পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে বললান, "কিছু কিনে খেয়ে নিয়েন"

জিজ্ঞেস করলাম, "কবে এসেছেন? কে নিয়ে এসেছে আপনাদের"?

"আসছি পেরায় চার মাসের মতন হইবো। আইসাই দেহি কোম্পানী নাই, কাম নাই" সে বললো। আর দালালের যে নাম বললো সেই নামে কাউকে চিনি বলে মনে হলো না। বাবাকে জিজ্ঞেস করতেই বললো, "দালালরা একেক জায়গায় একেক সময় একেক নাম ব্যবহার করে। আসল নাম খুব কম লোকেরই জানে। এ্যাম্বাসির সাথের ওদের দহরম মহরম। দেশেও উচ্চপর্যায়ে এদের আনাগুনা।

বাসায় এসে মাকে আজকের ঘটনা বলতেই দেখি মার চোখ চিকচিক করে উঠলো, সামলে নিয়ে বললো, "ইস্ ! তাকে বাসায় নিয়ে আসবে না ? পেট পুরে খাইয়ে দিতাম!"।

সেদিন ভাত নামছিলো না গালা দিয়ে, এক গ্লাস পানি খেয়ে গলাটা আগে ভিজিয়ে নিতে হয়েছিলো।


৩.
বিজয়ের মাস, প্রতি বছর মাসটা ঘুরে ঘুরে আসে, সেই কবে ৭১ এ বিজয় ছিনিয়ে এলেছিলাম, তারপর থেকে তিলে তিলে শুধু পরাজিতই হয়ে যাচ্ছি। এইমাসের ষোল তারিখ পুরোটা জুড়ে চলবে সরকারি আর বিরুধী দলের নানা আয়োজন, টিভি টকসো গুলোতে আলাপ আলোচনার ঝড় বয়ে যাবে। আমরা স্মৃতিরোমন্হন করে আনন্দে শিহরিত হবো, আর প্রতিদিনের মত ক্ষুধার অশ্লীল চিৎকারে কাতরাতে থাকবে ভুখা নাঙ্গা আদমসন্তান।

মন্ত্রী-আমলার চকচকে পাঞ্জাবীতে বিলাতি সেন্টের গন্ধ মউমউ করবে চারপাশ আর কোন এক নাম না জানা আদমের মেয়েবউ এর ঠোঁটে লাগবে টকটকে লাল লিপস্টিক, গায়ে গুলিস্তানের কড়া পারফিউমের গন্ধ আর টাকার কাছে পরাজিত হবে নারীত্ব আর এখানে ডলারে ভিক্ষা করবে আদম সন্তান।

ঐদিকে দালাল, চাটুকারেরা বলবে "এভরিথিং এই আন্ডার কন্ট্রোল স্যার, এভরিথিং ইজ নরমাল, মাঝে মাঝে দুই একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে, এগুলো কোন ব্যাপার না। আমরা ম্যানেজ করে নিব।" আর সবকিছু অমনি ম্যানেজ হয়ে যায়।

পরিত্যেক্ত পানির পাইপের মধ্যে শীতে জির্ণ শীর্ন শরীরে কাঁপবে শত শত ছোটলোকের বাচ্চা, আধুনিক কৃতদাস; আর তাদের শেষ রক্তবিন্দুটা চুষে চুষে আদমের প্রভুরা হাটে গিয়ে খুঁজবে কোরবানীর বড় গরু।

এই শেষ নয়, শুয়োরের বাচ্চা.....সময় আসবে একদিন এইসব ছোটলোকের, এইসব হতভাগ্য আদমের, পালানোর পথ পাবি না তখন, হারামজাদা। শুধু অপেক্ষা আর একটা ষোলই ডিসেম্বরের।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29055646 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29055646 2009-12-08 21:16:06
দেবদূতের বিবাহনামা ----- ৬
১.
মালয়েশিয়া থাকা কালিনই অফিস থেকে খবর পেলাম আমার ভিসা বাংলাদেশস্হ লিবিয়ান দূতাবাসে চলে এসেছে। এখন শুধু বাংলাদেশে এসে দূতাবাসে পাসপোর্ট জমা দিব আর পরের দিন লিবিয়ায় উড়াল দিবো। সব শুনে বউ এর গাল গেল ফুলে। ওর এক কথা, "আমি যে দিন তোমাকে যাবার অনুমতি দিব সেই দিন তুমি যেতে পারবে তার আগে না"

কেন ? তোমার আবার কি সমস্যা ?

বউ চোখ বড় বড় করে বলে, পনের ষোল দিন পর রোজার ঈদ, তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে যে কয়েকটা দিনের জন্য ঈদ না করে আমাকে একা রেখে তুমি চলে যাবে !

আচ্ছা রোজার ঈদ করেই যাব।

না শুধু রোজার ঈদ করলেই হবে না ! রোজার ঈদের দশ বার দিন পরে আমার জন্মদিন। তার তিনদিন পর তোমার জন্মদিন। এগুলো কোন ভাবেই মিস করা যাবে না। তার বিশ বাইশ দিন পর আমাদের প্রথম বিবাহবার্ষিকী। এটার আগে তো কোন ভাবেই আমি তোমাকে ছাড়বো না।

মনে মনে প্রমাদ গোনলাম ! বললাম, সবচেয়ে ভাল হয় একে বারেই না গেলে, কি বলো?

আমার সাথে তামাসা করছ ?

আরে নাহ্, তোমার সাথে তামাসা করার মত সাহস কি আমার আছে না কি?

অদ্ভুত সুন্দর তার চোখ, বড়বড় টানা টানা, একেবারে মা দূর্গার মত, এই চোখের দিকে তাকালে আমার দুনিয়া উলট পালট হয়ে যায়। হঠাৎ এই চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু একটা চিৎকার দিয়েই বললো, "আরে ! তার বিশ বাইশ দিন পর তো আবার কুরবানীর ঈদ" । প্লিজ প্লিজ তুমি একেবারে কুরবানীর ঈদ করে যাও, তাহলে সবকিছু শেষ করে যেতে পারবে।

সাঁতার না জানা এই আমি তখন সেই চোখের গভীর দিশেহারা।

২.
দেশে এসে প্রথমবার লিবিয়ান দূতাবাসে গিয়ে বিশাল একটা ধাক্কা খেলাম। দূতাবাসগুলো বাংলাদেশী পাসপোষ্টধারীদেরকে কি পরিমান তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে তা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। প্রথম দুই সপ্তাহের মধ্যে পাসপোর্ট জমাই দিতে পারলাম না। প্রতিদিন যাই ঘন্টা তিনেক লাইনে দাড়িয়ে থাকার পর একসময় ভীতর থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়; আজকে কোন কাজ হবে না, আগামীকাল বা পরশু আসেন।

একেকটা দিন পার হয় আর আমার উৎকন্ঠা বাড়ে, সেই সাথে নতুনভাবে প্রাণিত হয় বউ এর পটোলচেরা চক্ষুদয়। একেকটা দিন পার হয় আমি ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসি, আর ওর আনন্দ ধরে না। একেকটা দিন পার হয় আর আমার অস্হিরতা বাড়তে থাকে, সেই সাথে বাড়তে থাকে বিবাহবার্ষিকীকে ঘিরে তার নিত্যনতুন পরিকল্পনার । শুধু তার চোখের দিকে তাকিয়ে বিশ্রান্ততা পাই, এই চোখের দিকে তাকিয়ে পৃথিবীর সব কষ্ট, সব না পাওয়া, সব ব্যর্থতাকে ভুলে থাকা যায়।

রোজার ঈদ গেল, বউ এর জন্মদিন গেল, আমার জন্মদিন গেল, একরকম মনস্হির করেই ফেলেছি যে একেবারে কুরবানীর ঈদ করেই যাব, ঠিক এমন সময় সাত তারিখের সাতদিন আগে আচমকা ভিসা হয়ে গেল। সাথে সাথে অফিসকে মেইল করে জানালে, ঐদিনই ওয়েষ্টার্ন ইউনিউনের মাধ্যমে টিকেটের টাকা পাঠিয়ে দিয়ে বলল যেন তাৎক্ষণিক ফ্লাইট ধরে চলে আসি।

এয়ারলাইন্সে ফোন করে জানতে পারলাম চার তারিখের আগে ঢাকা-ত্রিপলী কোন ফ্লাইট নাই, তার পরের ফ্লাইট এগার তারিখে।

ফোনটা রেখে তাকালাম তার দিকে, দেখি ঠোঁট জোড়া তিরতির করে কাঁপছে, চোখ ধীরে ধীরে লাল হচ্ছে আর তার কোনায় জমছে বিন্দু বিন্দু জল। সাথে সাথে চোখ ফিরিয়ে কাপড়ে ভাঁজ ঠিক করতে করতে বললাম, "চার তারিখেই যেতে হবে কিছু করার নেই, ব্যাপারটা জরুরী"

৩.
খুব কষ্ট হচ্ছিলো, একদিকে বউ এর আবদার আরেক দিকে অফিস; দায়িত্ব, কিছু করার নেই যেতেই হবে।টিকেট কাটতে যাচ্ছি এমন মোবাইল বেজে উঠলো, সে ফোন করেছে। মনটাকে শক্ত করলাম, ধরলাম না ফোনটা, জানি এখনো শেষবারের মত চেষ্টা করছে আমাকে আটকাতে। এখন ফোন ধরলে নিজেকে নিয়ন্ত্রন করা কষ্টকর হবে। চার পাঁচবার ফোনটা কেটে দেওয়ার পর একটা এস.এম.এস পেলাম।

"Plz don't go. Plz"

বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো, মুহুর্তের কেমন একটা দূর্বলতা এসে ছেয়ে গেল মন, ভাবলাম "কি হয় দশ দিন পরে গেলে? তিন দিনের জন্য জীবনের প্রথম বিবাহবার্ষিকীটা ছেড়ে চলে যাবো ? গিয়ে না হয় কোন কিছু একটা বানিয়ে বলে দেবো" । মুহূর্তের জন্যেই, সাথে সাথে মাথা ঝাড়া দিয়ে ক্ষণিকের এই দূর্বলতা ঝেড়ে ফেলে চার তারিখের টিকেট কেটে ফেললাম।

৪.
বিছানায় দু'দিকে মুখ করে শুয়ে আছি পাশাপাশি দু'জন, কারও চোখে ঘুম নেই। টের পাচ্ছিলাম একটু পর পর মৃদু কেঁপে কেঁপে উঠছে তার পিঠ, খুব নিবিড় ভাবে কান পেতে শুনা যাচ্ছিলো তার চাপাস্বরে কান্নার শব্দ। চুপচাপ তাকে কাঁদতে দিচ্ছিলাম, তার ঐ কান্নাভেজা চোখের দিকে তাকানোর মত শক্তি আমার ছিলো না। কাঁদুক, কাঁদলে কষ্ট কিছুটা হলেও হালকা হবে।তোমাদের কত সুবিধা, একটু কষ্ট পেলেই কেঁদে মনটা হালকা করতে পার, আর আমরা ! আমরা তো কাঁদতেও পারি না, আমরা কিভাবে মন হালকা করবো ? আমাদের কষ্টগুলো কিভাবে প্রকাশ করবো? আমাদের কষ্টগুলো কিভাবে লাঘব হবে?
----------------------------------------------------------------
দেবদূতের বিবাহনামা ----- ৫
---------------------------------------------------------------]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29049799 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29049799 2009-11-26 01:30:50
দেশে আসতাছি <img src="http://cdn.somewhereinblog.net/smileys/emot-slices_71.gif" width="23" height="22" alt="!:#P" style="border:0;" /><img src="http://cdn.somewhereinblog.net/smileys/emot-slices_71.gif" width="23" height="22" alt="!:#P" style="border:0;" /><img src="http://cdn.somewhereinblog.net/smileys/emot-slices_71.gif" width="23" height="22" alt="!:#P" style="border:0;" /><img src="http://cdn.somewhereinblog.net/smileys/emot-slices_71.gif" width="23" height="22" alt="!:#P" style="border:0;" /> " style="border:0;" /><img src=" style="border:0;" />...... পাগল পাগল লাগতাছে..... বাংলাদেশ টাইমে বিকাল পাঁচ ল্যান্ড করবো। সবাই জোরছে দোয়া করেন। ইনশাআল্লাহ অনেকের সাথেই এইবার দেখা করবো.....]]> http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29000849 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/29000849 2009-08-28 09:16:54 অপ্রত্যাশিত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সাধুতার গল্পগাঁথা ও কিছু দুঃখগাঁথা শৈশব ! আহ! শৈশব ! শৈশবের স্ম্বতিগুলো যেন সাদা ক্যানভাসে একটা রঙিন তুলির আঁচড়; আনুসঙ্গিক কিছুই মনে নেই শুধু মূল ঘটনা ছাড়া, যেন রবিঠাকুরের ছোটগল্প। তেমনি একদিনের ঘটনা, ক্লাস ওয়ানে পড়ি, কলোনির ভিতেরই আমাদের স্কুল। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে কি মনে হলো বাসায় না গিয়ে বাবার অফিসে চলে গেলাম। কলোনির ভিতরেই ছিলো বাবার সাইট অফিস। হঠাৎ আমাকে দেখে বাবার কি অনুভূতি হয়েছিলো তা আজ আর মনে নেই, কিছু একটা খেতে দিয়েছিলো এইটুকুই মনে আছে। শৈশব বড়ই অদ্ভুত সময়, যত সব তুচ্ছ জিনিসের প্রতি থাকে অদ্ভুত আকর্ষণ। হঠাৎ চোখে পড়লো টেবিলের উপর রঙিন একটা কাঠপেন্সিল। আমরা তখন কাঠপেন্সিলে লিখতাম, আমাদের পেন্সিলগুলো ছিলো গোল আকৃতির সাদা রঙের আর মাঝে মাঝে লাল গোলাপির রঙে আঁকা ছোট বিড়াল, ফুল আর পুতুল। খুব সম্ভবত সেগুলো চায়না থেকে আনা হতো। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম বাবার টেবিলে পড়ে থাকা পেন্সিলটা ষড়ভুজ আকারের, একটা তল কালো আর পাশের তলটা খয়েরী; আর কোনাগুলো সোনালি রঙ করা। জীবনের এত সুন্দর জিনিস দেখিনি আগে, আমি সাথে সাথে বললাম, "বাবা, এটা নেই?"

নাহ, এটা নেওয়া যাবে না; এটা অফিসের পেন্সিল।

-কাঁদোকাঁদো স্বরে বললাম," আমি এটা নিবো। বাবা, এটা আমি নিবো"

তোমাকে আজকে নতুন একটা কিনে দিবো, এখন বাসায় যাও।

-"না ! না ! আমি এটাই চাই"।

"আচ্ছা নাও; বলে বাবা পিয়নকে ডেকে পকেট থেকে একটা নোট বের করে দিয়ে বললেন, "এক্ষণি এইরকম একটা পেন্সিল কিনে নিয়ে আস"

বাবা ইচ্ছা করলেই আমাকে এমনি এমনিই পেন্সিলটা দিয়ে দিতে পারতেন, অফিসকে কোন হিসাবও দিতে হতো না; বাবার ব্যাবহারের জন্যইতো এইগুলা! তখন বুঝিনি, তবে বুঝতে শিখার পর যখনি ঐ ঘটনা মনে পড়ে শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে।

২.
আমাদের এলাকায় এক ডাকে সবাই স্যারকে চিনতো, ইংরেজির জাহাজ বলতে যা বুঝায় আসলেই তাই ছিলেন উনি। স্যারের ছেলে আমাদের সাথে পড়তো, কিন্তু ছাত্র হিসাবে অতটা ভালো ছিলো না। উনি সাধানত ক্লাস নাইনের ক্লাস নিতেন। তো, আমরা ক্লাস নাইনে উঠার পর উনি ক্লাসের এসে বললেন, "আমি আসলে এই বছর তোদের ক্লাস নিতে চাইনি, কিন্তু হেডস্যার অনেক অনুরোধ করে রীতিমত জোর করে আমাকে এই ক্লাসটা ধরিয়ে দিলেন। তবে আমি একটা শর্ত দিয়েছি যে, ক্লাস আমি নিলেও প্রশ্ন আমি করবো না খাতাও আমি দেখবো না। এই বছর তোদের প্রশ্ন অন্য একজন টিচার করবে"।

-স্কুল শেষে স্যারকে ধরলাম, "স্যার, আমরা কি কোন অন্যায় করেছি? না হলে আপনি ক্লাসে এমন কথা কেন বললেন?"

পাগল। তোদের কোন কিছু না। সমস্যা হচ্ছে আমার পুলা তোদের সাথে পড়ে, আর আমি বাবা হয়ে কিভাবে তার পরীক্ষা নিবো! আমিই প্রশ্ব করবো, আমিই খাতা দেখবো ! ব্যাপারটা কেমন হয়ে যায় না ? তোরা চিন্তা করিস না, তোদের কোন সমস্যা না।

আবার শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসলো। পরে অনেক ভেবেছি; যে স্যার এত নীতিবান সেই উনি নিশ্চয় ছেলেকে কোন রকম অবৈধ সুবিধা দিবেন না, উনি নিশ্চয় ছেলেকে প্রশ্ন আগে থেকে বলে দিবেন না বা খাতায় অতিরিক্ত নাম্বার দিবেন না। তাহলে নিজেকে কেন প্রত্যাহার করে নেয়া ? এটাকেই কি বলে বিবেকের তাড়না ? না কি অতিরিক্ত দ্বায়িত্ববোধ?

৩.
যেহেতু দেশের বাইরে বাংলাদেশি কমিউনিটি স্কুল তাই বোর্ড পরীক্ষা ও বৃত্তি পরীক্ষাগুলোর তত্বাবধানে থাকে বাংলাদেশ এম্বাসি। বাবা স্কুল কমিটির প্রধান, সেই হিসাবে ব্যবহারিক পরীক্ষার সময় ভাইবা বোর্ডে থাকেন এম্বাসি থেকে একজন প্রতিনিধি, কমিটির প্রধান হিসাবে বাবা আর দুই তিনজন শিক্ষক। প্রতিবারই বাবা খুব সূচারুভাবে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেন। শুধুমাত্র যেই বার ছোট ভাই এস.এস.সি পরীক্ষা দিলো সেইবার ইচ্ছা করেই ঐ ভাইবা বোর্ড থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখলেন। অনেক অনুরোধ করেও ঐবার বাবাকে বোর্ডে রাখা যায় নি।

পরে আমি একদিন বাবাকে বললাম, "আচ্ছা, তুমিতো অন্যদের ভাইভা নিতে পারতে। যখন ছোট ভাই আসতো তখন না হয় উঠে চলে যেতে"

বাবা হেসে বললো, "আমার ছেলের ব্যাচের অন্যরাও তো আমার ছেলের মত। আর সবার সাথেই আমার ছেলের একটা অলিখিত প্রতিযোগিতা আছে। এখন আমি যদি বোর্ডে থাকি তাহলে নিজের অজান্তেই হয়তো কোন ভুল হয়ে যেতে পারে। অথবা পরবর্তীতে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে যে নিজের ছেলেকে এগিয়ে রাখার জন্য ওকে কম নাম্বার দেওয়া হয়েছে"

আরও একবার শ্রদ্ধায় নুয়ে পড়লাম। পরে অনেক ভেবেছি। ভেবেছি, বাবা যদি ঐ বোর্ডে থাকতো , তাহলে কি কোন রকম অবৈধ সুবিধা দিতো ছোট ভাইকে? না। অবশ্যই না। তাহলে, আসলে এটা কি ? এটা কি সততা? না কি সতর্কতা? না কি বিবেক?

অনেক ভেবে দেখেছি আসলে এটা হলো সাধুতা। সততা মানুষের অপরিহার্য বিষয়, কোন অতিভৌতিক বৈশিষ্ট নয়। একজন লোক ঘুষ খায় না এটা তার কোন কৃতিত্ব হতে পারে না, বরং এটা হওয়ায় স্বাভাবিক; রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া মানিব্যাগ ফেরত দেওয়া কোন কৃতিত্ব হতে পারে না, বরং না দেওয়াটা অস্বাভাবিক।

হ্যাঁ, এটা সাধুতাই। সাধুতা।

৪.
এইবার আসি মূল বিষয়ে, আমাদের সামরিক বাহিনী। আমাদের সামরিক বাহিনী নিঃসন্দেহে অনেক চৌকশ ও দেশপ্রেমিক একটা বাহিনী । তারা যেমন দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার্তে জীবনের পরোয়া না করে মুহূর্তে মৃত্যুর মুখে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, তেমনি দেশও তাদের অনেক দিয়েছে ও দিচ্ছে। আমরা ব্লাডি সিভিলিয়ানরা শরীরে ঘাম বাষ্প করে প্রতিনিয়ত যে টেক্স দিচ্ছি সেই টেক্সের পয়সায় সামরিক বাহিনীর ঘি জোগার হয়, গলফ খেলার মাঠের কৃত্বিম ঘাস বসানো হয়, রুটিরুজি হয়। এতে আমার কোন আপত্তি নেই।

উচ্চপদস্হ কর্মকর্তারা নানাবিদ সুজোগ সুবিধা পেয়ে থাকে। কেউ কেউ বিভিন্ন সংস্হার প্রধানের দায়িত্বে থাকে, যেমন বিরিআর, কোস্টগার্ড, ডিজিএফআই, এনএসআই ইত্যাদি। যারা এমন সুজোগ পান না তাদেকে পাঠানো হয় বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ এম্বাসিগুলোতে। আবার অনেকে যারা এগুলোতে সুজোগ পায় না তাতের পাঠানো হয় জাতিসংগের মিশনগুলোতে। মুটামুটি কাউকেই পুরাপুরি বঞ্চিত করা হয় না। এতেও আমার কোন সমস্যা নেই।

আমার খারাপ লাগে তখনই যখন দেখি উচ্চপদস্হ সামরিক কর্মকর্তারা অবসরের পরেও বিভিন্ন বড় বড় গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ পদ গুলো দখল করে বসে থাকেন। সিনহা গ্রুপ, হামীম গ্রুপ, পেপসি, কোকাকোলা, বেক্সিমকো এইসব গ্রুপগুলোতে বিগ্রেডিয়ার, এয়ার কমোডর আর কমোডরদের জয়জয়কার।

সবচেয়ে ভয়ের কথা, এইসব কর্মকর্তারা ইচ্ছা করলে প্রশাসনকে অনেক ভাবেই প্রভাবিত করতে পারেন। এইসব প্রাইভেট কম্পানিগুলোর কি এই কারনেই এরকম অবসর প্রাপ্ত উচ্চপদস্হ কর্মকর্তাদেরকে পছন্দ করে? উনারা অবসর নিলেও ইনসার্ভিস অনেক অফিসার থাকে যারা উনাদের জুনিয়র এবং উনাদের নিজ হাতে গড়া।

তারপর, রাষ্ট্রিয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ, স্পর্ষকাতর ও গোপনীয় ব্যাপার উনাদের জানা থাকে। এটা কি একটা ভাববার বিষয় নয়? মানলাম, আপনারা অনেক সৎ, আইনত অবসরের পর যে কোন চাকুরি করতে পারেন, কিন্তু আপনারা কি একটু সাধুতা দেখাতে পারেন না?

কেন আপনাদের কি কম দেওয়া হয়েছে? দেশকে অনেক সার্ভিস দিয়েছেন, এখন একটু অবসরে যান, গলফ টলফ খেলেন, বউ বাচ্চাদের সময় দেন। আর কত? ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28991894 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28991894 2009-08-11 01:36:12
( কল্পগল্প ) --- খস্তগীরের বিস্ময়কর চিত্রগ্রহন যন্ত্র
১.
ছুটির দিন; বারান্দায় বসে আয়েস করে সদ্য ভাজ ভাঙ্গা পত্রিকা পড়ছিলাম, আর মনে মনে সরকারের পিন্ডি চটকাচ্ছিলাম, এমন সময় বেরসিকের মত মোবাইলটা বেজে উঠলো। হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো খস্তগীরের দরাজ কণ্ঠ।

কোন রকম ভূমিকায় না গিয়ে বললো, "দোস্ত, আজ রাতে তোর দাওয়াত। একটু বিকাল বিকাল চলে আসবি, অনেক গল্প জমে আছে। তোর জন্য বিশেষ কবুতরের ফ্রাই রান্না হবে। আমি এস.এম.এসে বাসার ঠিকানা পাঠিয়ে দিচ্ছি", এই কথাগুলো বলেই আমাকে কোন রকম সুযোগ না দিয়ে লাইনটা কেটে দিলো।

আমার বুঝতে বাকী রইলো না যে দাওয়াত হলো বাহানা, নিশ্চই নতুন কোন ঝামেলা পাঁকানোর মতলবে আছে এই পাগল। বিশেষ কবুতরের ফ্রাই? দিব্যলোকে ভেসে উঠলো, পরীক্ষাগারে কবুতরকে মুরগীর মত বড় করার গবেষণায় ব্যার্থ বিকলাঙ্গ বিকৃত কোন এক প্রাণীর ফ্রাই করা দেহ। শিরদাঁড়া বেয়ে ভয়ের একটা স্রোত পায়ের পাতা পর্যন্ত নেমে গেলো। গলায় আটকে থাকা দমটা এক ঢোকে পাকস্হলীতে পাঠিয়ে দিয়ে, করুন মুখ করে পাশে পিস্তল নিয়ে খেলতে থাকা ছেলের দিকে তাকালাম। কি জানি ছেলে কি বুঝলো, হাত থেকে পিস্তল ফেলে দিয়ে আব্বু আব্বু করে কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লো। বাচ্চারা নাকি ফেরেস্তা; সে কি আমার কোন রকম আশংকা আঁচ করতে পরেছে?

দুরু দুর বক্ষে দীপ্ত পদক্ষেপে রোদ থাকতে থাকতে খস্তগীরের বাড়ি হাজির হলাম। ভেবেছিলাম সমগ্র বাড়ি জুড়ে থাকবে কবুতরের জঞ্জালে ভরপুর, আর তাদের বিষ্টার গন্ধে মৌ মৌ করবে চারদিক, নানান যন্ত্রপাতি এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবে, বিছানার উপর স্তূপ হয়ে থাকবে বই আর জার্নাল পেপারের প্রিন্ট আর রান্নাঘর পূর্ণ থাকবে নানা রকমের টেস্টটিউব আর ক্যামিকেল ভর্তি জারে।

কিন্তু ঘরে পা রেখেই প্রথম ধাক্কাটা খেলাম, চমৎকার মিস্টি গন্ধ নাকে টের পেলাম, নিশ্চই মেহমানের আগমন উপলক্ষে সুগন্ধি ছড়িয়েছে ঘরে। সারা ঘর ছিমছাম; সবকিছু এমন টিপটপ গোছানো দেখে একটু অবাকই হলাম। কৌতুহল চাপতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম, "কিরে? তোর কবুতরের ল্যাবরেটোরি কৈ?"

কবুতরের ল্যাবরেটোরি মানে ?

মানে তোর কবুতরের গবেষণাগারের কথা বলছি?

তীর্যক একটা চাহনী দিয়ে খস্তগীর বললো, "তুই কি আমাকে পশুর পাখির গবেষক মনে করিস নাকি?"

আরে , না ! ঐ যে, ঐদিন বাজারে কবুতরকে ঘুষি মারতে দেখেছিলাম!

ও ! ঐটা তো আমি কবুতরের সাহস পরীক্ষা করে দেখছিলাম। মানুষের মত পশু পাখীও দুই ধরনের; পরিশ্রমী আর অলস। অলস কবুতর গুলো বেশিভাগ সময়ই ঝিমিয়ে কাটায়; সেই কারনে এদের মাংশ হয় নরম আর চর্বি বেশি থাকে, খেতেও বেশ মজা।

ওর কথা শুনে আমার প্রায় ভিমরী খাওয়ার দশা; অতঃপর বিশেষ কবুতরের ফ্রাই এর রহস্য উম্মোচন হলো।

২.
কবুতরের আস্ত একটা রান মুখে পুরে চিবাতে চিবাতে বললাম, "কী? তুই বলতে চাচ্ছিস, ঘ্রাণও এক ধরনের কম্পন?"

জ্বী, প্রত্যেকটা ঘ্রাণই একেক ফ্রিকোয়েন্সির কম্পন; যেমন শব্দ এক ধরনের কম্পন। আর আমাদের কান যেমন শব্দ কম্পনের রিসিভার ঠিক তেমনি আমাদের নাকও এক ধরনের ঘ্রাণ কম্পনের রিসিভার। আমাদের কান যেমন বিশ থেকে বিশ হাজার হার্জের বাইরের শব্দ শুনতে পায় না, ঠিক তেমনি আমাদের নাকের ও একটা লিমিট আছে ঘ্রাণ রিসিভ করার। তবে এই লিমিটটা শব্দ কম্পনের মত ফ্রিকোয়েন্সির উপর নির্ভরশীল নয়, এটা নির্ভর করে ঘ্রাণ কম্পনের পাওয়ারের উপর। আমাদের নাকের রিসিভিং লিমিট হলো ১২.৫ মাইক্রোওয়াট থেকে ১৯.২ মিলিওয়াট পাওয়ার পর্যন্ত। প্রতিটি বস্তু থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমান পাওয়ারের কম্পন নির্গত হয়। যদি এই কম্পনের পাওয়ার আমাদের নাকের রিসিভিং লিমিটের বাইরে হয় তাহলে আমার এই ঘ্রাণ অনুভব করতে পারবো না।কুকুরের নাকের লিমিট ৮ ন্যানোওয়াট থেকে ২৫ ওয়াট পর্যন্ত, ফলে কুকুর এমন সব ভিন্ন রকমের ঘ্রাণ অনুভব করতে পারে যেগুলো আমাদের ধারনারও বাইরে। যেহেতু এই রিসিভিং লিমিট ঘ্রাণ কম্পনের পাওয়ারের উপর নির্ভর করে তাই এটার সাথে দুরত্বের একটা সম্পর্ক আছে, কোন একটি ঘ্রাণের উৎস থেকে আমাদের নাক যত দুরে থাকবে আমরা ঘ্রাণ তত কম পাবো, গন্ধ কম্পনের পাওয়ার দুরত্বের সাথে সাথে কমতে থাকে।

খস্তগীরের জটিল গানিতিক হিসেব নিকেস, তত্ত্ব, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মাথা মন্ডু কিছু না বুঝলেও আমি থুতনিতে হাত রেখে বিজ্ঞের মত জিজ্ঞেস করলাম, "শব্দ কম্পনটা না হয় বুঝলাম কিন্তু ঘ্রাণও কম্পন এটা কেমন যেন আজগুবি লাগছে !

-কেন! আজগুবি লাগার কি আছে ? জানিস নাকি যে তুই নিজেই একটা কম্পন?

এইবার সত্যি সত্যি বিষম খেলাম। বেশ কিছুক্ষণ দম বন্ধ ছিলো, শেষে কাশতে কাশতে বললাম, "মানে? তুই কি মানুষকেও কম্পনে রুপান্তরীত করতে চাচ্ছিস না কি?"

-স্ট্রীং থিউরি মতে পরমানুর একক হলো কতগুলো এক মাত্রার স্ট্রীং এর কম্পন। সেই হিসাবে যে কোন বস্তুই আসলে অসীম সংখ্যক স্ট্রীং এর কম্পন ছাড়া কিছু না।

নিজের অজান্তেই আমার হাত শরীরের বিভিন্ন জায়গার বুলাতে লাগলাম, এই পিঠ, এই পা, এই মুখ হাত, এই আমি আসলে কতক দড়ির নাচানাচি বই কিছু না! মাথাটা কেমন যেন চক্কর দিয়ে উঠলো।

হ্যাঁ, যা বলছিলাম। এখন আমরা ক্যামেরায় যে ছবি তুলি সেগুলো আসলে ত্রিমাত্রিক জগৎ এর কিছু জিনিসকে দ্বিমাত্রিক তলে প্রতিস্হাপিত করে ঐ বস্তুর আকার, আয়তন, রং ইত্যাদি সেভ করা হয়। কিন্তু ঘ্রাণ ধরে রাখার মত কোন ক্যামেরা আজ পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি। আর এটাই আমি করতে চাচ্ছি, একবার চিন্তা করে দেখ যে তুই একটা গোলাপ ফুলের ছবি তুললি সাথে সাথে ঐ ফুলের ঘ্রাণটাও সেভ হয়ে থাকলো ছবির সাথে।

কিন্তু এটা কি এতোই সহজ?

নতুন জিনিস আবিষ্কার হওয়ার আগ পর্যন্ত কঠিনই থাকে, একবার আবিষ্কার হয়ে গেলে তা হয়ে যায় একেবারে সহজবোধ্য। আর কাজ প্রায় শেষ করে এনেছি; মূলত কাজটার দুইটা অংশ, ঘ্রাণ কেপচার ও ঘ্রাণ ইমিটার ডিভাইস। ঘ্রাণ কেপচার ডিভাইসের কাজ হলো যখন কোন ছবি তোলা হবে তখন ফ্রেমের মধ্যে থাকা ঐ বস্তুর ঘ্রাণ কম্পন রেকর্ড করে রাখা, আর ঘ্রাণ ইমিটার ডিভাইস পুনরায় সেই কম্পনকে নির্গত করবে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপার হলো এই ইমিটার ডিভাইসের পাওয়ার এমপ্লিফাই করে ঘ্রাণের ক্ষমতা হাজার গুণ বাড়িয়ে নেওয়া যাবে।

দস্তগীরের চোখ জ্বলজ্বল করছিলো আবিষ্কারের নেশায়, একটু চমকে উঠলাম ভিতর ভিতর; না জানি এই পাগল আবার কোন বিপদ ডেকে আনে! বাড়ি ফিরার পথে বারবার মনে হচ্ছিলো, "আমার অস্হিত্ব কতক একক মাত্রার দড়ির কম্পন ছাড়া কিছু নয়"। নিজের অজান্তেই বারবার সারা শরীরে হাত বুলাচ্ছিলাম; অবশেষে প্রতিজ্ঞা করলাম, ভুলেও দস্তগীরের ছায়া মাড়াতে যাবো না, চাচা আপন প্রাণ বাঁচা বলে কথা।

৩.
তাবত দুনিয়ার একমাত্র আমিই কি দস্তগীরের নিকটজন; নাকি এটা আমার নিয়তি যে তার সাথে না চাইলেও জড়িয়ে পড়তে হবে? না হলে ক্লিনিকের অভ্যর্থনা থেকে আমাকেই কেন ফোন করা হলো? এড়িয়ে চলবো সিদ্ধান্ত নিলেও প্রাণ প্রিয় বন্ধু দুর্ঘটনাজনিত কারনে ক্লিনিকে ভর্তি হয়ে আছে আর এই সময়ে দেখা না করাটা অমানবিক হয়ে যায়। সাতপাঁচ ভেবে শেষমেষ ক্লিনিকে গিয়ে হাজির হলাম। কেবিনে ঢুকতেই ডাক্তার আমাকে বললেন, "আপনি কি উনার আত্মীয় হন?"

না, আসলে আমরা কলেজ ফ্রেন্ড।

ও, আসলে দুঘটনার পর থেকে আপনার বন্ধু স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। ডাক্তারি ভাষায় আমরা এক বলি, এ্যামনেসিয়া। উনি এখন কাউকেই চিনতে পারছেন না; এমন কি নিজের নামটাও ভুলে গেছেন।

একটু চমকে উঠে তার দিকে তাকালাম, একটু অন্যরকম, অচেনা অচেনা লাগছে চেহারাটা; আমি ধীরে ধীরে তার বেডের পাশে বসলাম।

দস্তগীর ফিসফিস করে বললো, "দোস্ত, কেবিনের দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে পাশে এসে বস"

অবাক হলাম, কৌতুহলও জেগে উঠলো, আমি তাড়াতাড়ি কেবিনের দরজাটা আটকিয়ে এসে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দস্তগীর বললো, "বুঝলি, সবই আমার কপাল; শুধু কপাল ফাটা না হলে কি এমন দুর্ঘটনার মধ্যে পড়তে হয়?"

কি হয়েছে ? ঝেড়ে কাশ।

আর বলিস না! তোকে তো আমার এসসিসির কথা বলেছিলাম বিস্তারিত।

এসসিসি কি জিনিস ?

আরে,এসসিসি হলো স্মেল কেপচার ক্যামেরা। যাই হোক, এসসিসি বানানো শেষ করেছি আজ ভোরে। একশটা ছবি তুলার মত মেমোরিও যুক্ত করেছি। তর সইতে না পেরে ভোরেই এসসিসিটা নিয়ে ফিল্ড টেস্ট করার জন্য বের হই। আমার বাসার পাশে একটা ছোট নার্সারি আছে, বাঁশের বেড়া টপকিয়ে ওটার মধ্যে ঢুকে পড়ি। প্রথমে একটা গোলাপ ফুলের ছবি তুলি। একেবারে পার্ফেক্ট ! এসসিসি থেকে একদম তাজা গোলাপের গন্ধ আসতে থাকে। খুশিতে আমি ঘ্রাণ ইমিটারটাকে একশ গুণ বাড়িয়ে আরেকটা গন্ধরাজ ফুলের ছবি তুলি। চমৎকার ফালাফল ! ইচ্ছা হচ্ছিলো চিৎকার দিয়ে লাফিয়ে উঠতে !

কিন্তু এর পরই ঘটলো আসল বিপর্যয়; হঠাৎ দেখি যে একটা টবের উপর ছোট একটা পোঁকা। ভাবলাম এটার উপর একটা পরীক্ষা চালিয়ে দেখলে মন্দ হয় না। যেই মাত্র না ক্যামেরার ক্লিক বাটনে টিপ দিলাম অমনি তা ফেঁসে যায়। তিন চার সেকেন্ডের মধ্যে পুরা একশ টা ছবি উঠে মেমরী ফুল হয়ে যায়, আর ঘ্রাণ ইমিটারে সেট করা ছিলো এক হাজার গুণ। বুঝতেই পারছিস; একশটা ছবি, প্রতিটির এক হাজার গুণ শক্তিশালী গন্ধ একসাথে নির্গত করছে !

হুমম! সমস্যা কি হলো তাতে?

আরে ! ঐ পোঁকাটা ছিলো গান্ধীপোঁকা! বিকট দুর্গন্ধে চারদিকে কেয়ামতের বিভীষিকা নেমে আসে! দশ সেকেন্ডের মধ্যে আমি অজ্ঞ্যান হয়ে যাই। তারপর এই হাসপাতালে এসে জ্ঞ্যান ফিরে। ডাক্তার আর নার্সদের আলাপ শুনে যতটুকু বুঝেছি, নার্সারীর আশে পাশে একশ মিটারে মধ্যে কেউ যেতে পারছিলো না। আরও বেশ কয়েকজন বিকট দুর্গন্ধে জ্ঞ্যান হারায়। অবশেষে দমকল বাহিনীর লোকজন মাস্ক পড়ে নার্সারীতে ঢুকে প্রথমে গন্ধের উৎস, ক্যামেরাটাকে ভেঙ্গে গুড়াগুড়া করে। তারপর উদ্ধার কাজ চালায়।

শেষে দস্তগীর মুখটা করুন করে বলে, "দেখ, গন্ধের চোটে আমার ভ্রু জোড়া ঝড়ে গেছে!

অনেক কষ্টে হাসি চেপে বললাম, "ঠিক আছে বুঝলাম, কিন্তু তুই স্মৃতিভ্রষ্টের ভান করছিস কেন?"

বুঝলি না! বাইরে দেখ পুলিশের লোকজন ঘুরাঘুরি করছে, যদি বুঝতে পারে এই ঘটনার পিছনে আমার হাত তাহলে আমি শেষ। তুই তো জানিস পুলিশকে আমার ভীষণ ভয়।

হাসতে হাসতে বললাম, "আচ্ছা ঠিক আছে, আমি দেখছি কি করা যায়।"

পরিশিষ্ঠঃ
ভোরে ঘুম থেকে উঠেই পেপার নিয়ে বসলাম, লালকালির বিশাল হেডলাইন প্রথম পাতায় - "রহস্যজনক মহাজাগতিক বস্তু প্রকোপে লন্ডভন্ড ঢাকার জনজীবন"

বিস্তারিত: 'গতকাল প্রাতে মহাকাশ থেকে এক রহস্যজনক বস্তুর ঢাকার প্রাণকেন্দ্র উত্তরায় পাঁচ নাম্বারের নার্সারীতে পতিত হয়। মুহূর্তেই সম্পূর্ণ এলাকা ছড়িয়ে পড়ে বিকট দুর্গন্ধ। অনেকেই এর প্রকোপে সঙ্গা হারিয়ে ফেলেন। এদের সবারই রহস্যজনক ভাবে ভ্রু ঝড়ে পড়ে। সঙ্গা হারিয়ে ফেলে ঐ এলাকার সকল কাক পর্যন্ত.........."]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28988822 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28988822 2009-08-04 22:08:02
( কল্পগল্প ) --- খস্তগীরের স্বাদ সূচক বন্ধু দস্তগীরের নামটা কিভাবে খস্তগীরে রুপান্তরিত হয়েছিলো সেটা আজও এক বিরাট রহস্য। যতটুকু মনে পড়ে, খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে তার এমন কোন বিশেষ আসক্তি ছিলো না যে 'দ' এর স্হলে 'খ' হয়ে যাবে।

"দর্শনশাস্ত্র দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ শাস্ত্র, মাদার অফ অল সায়েন্স, এই শাস্ত্র না থাকলে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জন্মই হতো না", প্রথম ক্লাসেই এমন লেকচার শুনে আমাদের পঁচিশ-পঁচিশ-পঁচিশ পেটা শরীর তখন বিয়াল্লিস-পঁচিশ-পঁচিশ অবস্হা। মুটামুটি সবাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি যে, বাঁচি আর মরি; জীবনে দর্শন ছাড়া আর কোন শাস্ত্রের নিকটবর্তীও হবো না; সে অংকশাস্ত্র কি কামশাস্ত্র, তখনই আমাদের ত্রাণকর্তা হিসাবে দাড়িয়ে যায় বন্ধু দস্তগীর উরফে খস্তগীর।

-ম্যাডাম, প্লিজ দর্শনশাস্ত্রকে দর্শনশাস্ত্র বলবেন না, খোদা না করুন কোন ভাবে যদি হাটু ভাঙ্গা 'দ' দাড়িয়ে গিয়ে বড় 'ধ' হয়ে যায় তখন দর্শনশাস্ত্র কি শাস্ত্রে পরিনত হবে ভেবে দেখেছেন ? বরং বলুন, "ফিলোসফি", আহা ! "ফিলোসফি"

এই হলো আমাদের খস্তগীর, সেই হিসাবে তার নাম ধস্তগীর হওয়াই বেশি যুক্তিযুক্ত ছিলো, কিন্তু কোন এক বিচিত্র কারনে তা আর হয়ে উঠেনি।

কিছুদিন আগে পুষ্পমেলায়, প্রায় বিশ বাইশ বছর পরে অকস্মাৎ দেখা কলেজের সেই বন্ধু খস্তগীরের সাথে। জুলফির নিচে চুলে একটু আধটু পাঁক ধরেছে এই যা, তাছাড়া আর সব আগের মতোই আছে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে ওকে চেনা চেনা মনে হচ্ছিল, কিন্তু আসল নাম ভুলে শুধু "খস্তগীর" নামটাই মনে আসছিলো, তাই ডাকার সাহস পাচ্ছিলাম না। শত হোক বিশ বাইশ বছর পরে খুঁজে পাওয়া বন্ধুকে তো আর বিকৃত নামে ডাকা যায় না হঠাৎ করে। আমি তার পিছু পিছু ঘুরছি আর মনে মনে চলছে ওর নামটা মনে করার আপ্রাণ চেষ্টা।

কিছুক্ষণ অনুসরন করে ওর মধ্যে কেমন একটা অপ্রকৃতস্হ ভাব লক্ষ করি, প্রতিটা স্টলে যায় আর আশপাশ উঁকিঝুকি দিয়ে সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে টুপ করে ফুলের একটা পাঁপড়ি ছিড়ে মুখে দেয়, তারপর কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে আকাশের দিকে মুখ উচিয়ে দাড়িয়ে থাকে। কৌতুহল হচ্ছিলো, কিন্তু কিছুতেই নামটা মনের করতে না পেরে মনে মনে অস্হির হয়ে উঠছি, এমন সময় আমার দিকে চোখ পড়তেই, "আরে তুই" বলে এগিয়ে এসে আমাকে কোন সুযোগ না দিয়ে এমন ভাবে জড়িয়ে ধরে যে আমার ত্রাহি মধুসূদন অবস্হা, আমিও বোকা বোকা হাসি দিয়ে পরিস্হিতি স্বাভাবিক করার চেষ্ট করি।

আমি প্রথমে না চিনার ভান করে বলি, "স্যরি, আসলে আপনাকে ঠিক চিনতে..."
আরে আমাকে চিনতে পারছিসনা ! আমি খস্তগীর !

২.
বন্ধু খস্তগীর আমাকে টেনে পাশের চায়ের স্টলে নিয়ে বসায়। এত বছর পর দেখা, কিন্তু ওর মধ্যে কোন জড়তা নেই, তার সেই শিশুসুলভ সারল্য আজও অটুট আছে।

জিজ্ঞেস করলাম, "তোর ছেলে মেয়ে কয়জন, কোথায় পড়াশুনা ?"

-আরে বিয়েই তো করিনি, ছেলে মেয়ে হবে কি করে ? আর আমি গবেষক মানুষ, সারাদিন গবেষণা নিয়ে পড়ে থাকি, বিয়ে করলে বউকে সময় দিবো কিভাবে, সাথে উটকো ঝামেলা।

মানে ? তুই কিসের উপর রিসার্চ করছিস ?

-আমার প্রশ্ন শুনতেই পায়নি এমন ভাব করে সে বলে,"এখানের চা টা খুব ভালো বানায়, তাই না ?"

স্পষ্ট বুঝতে পারি মুখ ফসকে বলে ফেলেছে, এখন ব্যাপারটা এড়িয়ে যেতে চাচ্ছে। আমার প্রশ্ন শুনতে না পারার শিশুসুলভ কাঁচা অভিনয় দেখে হেসেই দিলাম।

-হাসছিস কেন ?

কিছু না, বাদ দে।

ভিতরে ভিতরে আমিও কৌতুহলী হয়ে উঠি কিছুক্ষণের মধ্যে, কথায় আছে, "বিড়াল মরে কৌতুহলে" যেহেতু এইখানে বিপদ ঘটার মতো কোন কারন আপাতত চোখে পড়েনি তাই কৌতুহল নিবারনের চেষ্টা করাই সমীচীন বলে মনে হলো। বন্ধু খস্তগীরকে ভালো মতোই চিনি, ব্যাটা ঘটনা বিস্তারিত বলার জন্যে মনে মনে ফেটে পড়ছে, কিন্তু আমি চেপে ধরলেই ভাব নিবে। এখন ঘটনার আশপাশ দিয়ে একটু খোঁচাতে হবে; এই যা ।

তোকে দেখলাম স্টলে স্টলে ঘুরে ফুলের পাপড়ি ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতে ?

-ও! দেখে ফেলেছিস ? তাহলে তো আর লুকানোর কিছু নাই। ওর চেহারায় তৃপ্তির একটা ভাব ফুটে উঠে, প্রাণপন চেষ্টা করেও খুশি খুশি ভাবটা আড়াল করতে পারেনি।

-আসলে আমি স্বাদ সূচক নিয়ে গবেষণা করছি।

হঠাৎ বিষম খেলাম, কাশতে কাশতে বললাম, "কী ! কি সূচক?"

-আরে স্বাদ সূচক, স্বাদ; "টেস্ট স্কেল।"



-পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সমস্যা কি জানিস ? পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো খাদ্য সমস্যা, আর আমার এই গবেষণা সফল হলে পৃথিবীতে খাদ্যের সমস্যা চিরতরে দুর হয়ে যাবে।

ছোটবেলা থেকে খস্তগীরকে আদ্যপন্ত চিনি, ওর হাতে সমগ্র বিশ্বের খাদ্য সমস্যার সমাধান এটা বিশ্বাস করতে সেই কারনে একটু বেশি কষ্ট হচ্ছিলো।

-আমার গবেষণা প্রায় শেষ করে এনেছি, মাঠ পর্যায়ের কিছু ডাটা দরকার ছিলো বলে আজকে মেলায় আসা। ব্যাপারটা তোকে খুলে বললেই বুঝতে পারবি, পানিবৎ তরলং।

জলবৎ তরলং

-ঐ হলো, একই ব্যাপার। এখন বল, আমাদের মৌলিক স্বাদ কয়টা ?

তিন, না না চারটা মনে হয়।

-না, আমাদের মৌলিক স্বাদ আসলে পাঁচটা, টক, ঝাল, নোনতা, মিষ্টি ও তিতকুটে। যখন কোন খাবার আমাদের জিহ্বায় ছোঁয়াই তখন জিহ্বার অনুভূতি সেন্সরগুলো ঐ পাঁচটি স্বাদের একটা বা একাধিক মিশ্রণ অনুভূতি আমাদের মস্তিষ্কের স্বাদ প্রক্রমন কেন্দ্রে পাঠায়। মস্তিষ্কের এই অংশ স্বাদগুলোকে প্রসেস করে একটা বাইনারী মান আমাদের মস্তিষ্কের মূল কেন্দ্রে পাঠায়। আমার কথা বুঝতে পারছিস ?

যদিও কিছু আমার মাথায় ঢুকছে না, তারপরও বিজ্ঞের মত মাথা নেড়ে বললাম, পানিবৎ তরলং। শুধু একটা জিনিস বুঝি নাই, বাইনারী মান বলতে কি বুঝচ্ছিস ? শুন্য আর এক? কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক তো আর কম্পিউটার না !

-হুমম, কে বলেছে এই উদ্ভট কথা? আমাদের মস্তিষ্ক দুনিয়ার সবচেয়ে জটিল কম্পিউটার। যাক সেই কথা, এখন এই বাইনারী '০' আর '১' কি সংকেত পাঠাচ্ছে সেটাতো বুঝেছিস ? শুন্য মানে হলো খাবারটা অখাদ্য নয় আর এক মানে হলো সুখাদ্য।

-তারমানে দাড়াচ্ছে, পূর্ণাঙ্গ স্বাদের অনুভূতিকে যদি একটা ফাংশন মনে করি তাহলে এর পাঁচটি চলক হচ্ছে টক, ঝাল, নোনতা, মিষ্টি ও তিতকুটে। এই চলকগুলোর মান শুন্য থেকে অসীম পর্যন্ত হতে পারে। আর এই ফাংশনের মান হলো শুন্য '০' অথবা '১' । এখন এই ফাংশনের ডিফানশিয়াল ইকুয়েশন সমাধান করলেই আমরা মুল সমীকরন পেয়ে যাবো। সাথে পাবো পাঁচটা ধ্রুবক রাশি। এই ধ্রুবক রাশিগুলো কি কি হতে পারে অনুমান করতে পারছিস ?

না

-হাসির পরিধি কর্ণ প্রায় বিস্তৃত করে সে বললো, একটা ধ্রুবকের মান হলো খাদ্যে বস্তুর ঘ্রাণের সমমান। এখন নিশ্চই বুঝতে পারছিস, আমাদের স্বাদ অনুভূতির সাথে ঘ্রাণের একটা যোগসূত্র রয়েছে ? আর একটা হলো উষ্ণতা, যেমন ঠান্ডা গরমের অনুভূতি। আর বাকি তিনটা ধ্রুবকের মান এখনো মানুষের অজানা।

মুখে করুন হাসিটা কোন রকমে ধরে রেখে বললান, পরিষ্কার বুঝতে পারছি। কিন্তু এই সমীকরনের সাথে দুনিয়ার খাদ্য সমস্যা সমাধানের সম্পর্ক কি ?

আরে এতক্ষণের এটাই বুঝতে পারিসনি ! আরে এখন আমি এই ইকুয়েশনটি ইলেকট্রিক সিগনালে রুপান্তরিত করে এর চলকের মান কম বেশ করে যেকোন স্বাদের অনুভূতি জিহ্বা থেকে মস্তিষ্কের পাঠাতে পারবো। ফলে আমরা যেকোন কিছুকে সুস্বাদু খাবারে রপান্তরিত করতে পারবো। তখন ঘাস, পাতা, গাছের বাকল, ইঁদুর, কেঁচো ইত্যাদি যেকোন জৈবিক বস্তু মানুষ অত্যন্ত সুস্বাদু খাবার হিসাবে খেতে পারবে।

আমি ভিতরে ভিতরে ভীষণ চমকে উঠলাম ! কি ভয়ংকর ! সভ্যতা কোন দিকে যাচ্ছে ? বন্ধু খস্তগীরের গবেষনার টেকনিকেল দিকগুলো কিছু না বুঝলেও এর ফালাফল বিবেচনা করে আমি শিউরে উঠি।

আর কিছুক্ষণ গল্প করে, বন্ধু খস্তগীরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসি। ধীরে ধীরে ব্যাস্ততার কারনে আর যোগাযোগ করতে পারিনি ওর সাথে, কালে ভুলেই গেলার তার কথা। কি জানি হয়ত আমার অবচেতন মন এটাই চাচ্ছিলো।

৩.
গতকাল হঠাৎ বাজারে বন্ধু খস্তগীরের সাথে দেখা। দেখি সে বাহাতে জ্যান্ত একটা কবুতর ধরে রেখে ডান হাতে ঘুষি দেয়ার ভান করছে। হাত দুরে সরিয়ে নিয়ে আবার হঠাৎ করে বিপুল বেগে মুষ্টি এগিয়ে নিয়ে আসছে। বুঝতে পারলাম নতুন কোন গবেষণার অংশ হবে এটা। আমি পিছন থেকে কাঁধে হাত রেখে বললাম, "বন্ধু, দস্তগীর, কি খবর?"

এইবার তার মধ্যে কেমন যেন একটু পালিয়ে যাবার তাড়া দেখলাম, আমিও ছাড়বার পাত্র নই, জোর করে পাশের এক রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলাম। আজকে কোন তাড়া নেই, অনেকক্ষণ গল্প করা যাবে। প্রথমেই জিজ্ঞেস করলাম , "তোর স্বাদ সূচকের খবর কি"?

-গলার স্বরটা নিচু করে মিন মিন করে বললো, তোর কাছে কি আর গোপন কববো, তুইতো সবই জানিস। আসলে হয়েছে কি আমি রিসার্চের একদম শেষধাপে পৌঁছে গিয়েছিলাম। স্বাদসূচক বানানো শেষ, পরীক্ষা পর্যায় চলছে, একটা তার ক্লিপ দিয়ে জিহ্বার দুই পাশে কানেকশন লাগিয়ে পাওয়ার সাপ্লাই অন করে দিয়ে ভাবছি কি স্বাদ পরীক্ষা করবো। তুই তো জানিস ছোট বেলা থেকে আইসক্রিম আমার খুব পছন্দ, তাই প্রথম পরীক্ষা হিসাবে আইসক্রিমের স্বাদ চেখে দেখার সিদ্ধান্ত নেই। কতগুলো গরুর হাড্ডি সিদ্ধ করে, স্বাদসূচকে আইসক্রিমের মান সেট করে মুখে পুরে দেই, আহ্ ! কি স্বাদের আইসক্রিম! একটা, দুইটা করে পাঁচটা আইসক্রিম স্বাধের হাড্ডির টুকরা খেয়ে ফেললাম, কিন্তু তারপর আমার আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান ফিরে দেখি আমি হসপিটালে। দুই সপ্তাহ শুধু রক্তলানীতে স্যালাইন দিয়ে খাওয়া খাওয়াতে হয়েছে আমাকে। আসলে হয়েছিলো কি, যতোই আমি অনুভূতি সংকেত পরিবর্তন করি না কেন, বস্তুর ভৌত অবস্হাতো আর বদলাবে না। তাই আমার মস্তিষ্ক আইসক্রিমের স্বাদ পেলেও গরম হাড্ডি পুড়িয়ে দেয় পরিপাকতন্ত্রের সবকিছু, জিহ্বা, খাদ্যনালী, পাকস্হলীর কিছু অংশ।

কিন্তু তারপর গবেষণা চালিয়ে যাসনি কেন?

-চালাবো কিভাবে? হসপিটালে থাকতেই মা আমার রিসার্চের সবকিছু সের দরে বিক্রি করে দিয়েছে, আর বলেছে এইসব পাগলামী বাদ দিয়ে বিয়ে করতে। বলে মুচকি মুচকি আসছিলো বন্ধু খস্তগীর।

বুঝতে পারলাম, নারীকুল জগতের মুল সমস্যাগুলোর একটা হলেও, এবার কোন এক মহিয়সী নারী জগতকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত হতে বাঁচিয়েছে।

আরও কিছুক্ষণ টুকটাক কথাবার্তা বলে খাবারে বিলটা দিয়ে বের হয়ে আসি রেস্টুরেন্ট থেকে। আমার মন তখন বেশ ফুরফুরে, বিশ্বের খাদ্য সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে আমাদের বন্ধু খস্তগীর বিশ্বকে যে সমুহ বিপদের মধ্যে ফেলবার উপক্রম করেছিল আপাতত তা থেকে রক্ষা।

ঐদিকে বন্ধু খস্তগীর বকবক করেই যাচ্ছে, আমিও হু, হা, হ্যাঁ করে যাচ্ছি সাথেসাথে, কিন্তু কোন কথা মাথায় ঢুকছে না ।

তবে "পৃথিবীতে আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে গরম গরম আইসক্রিমের স্বাদ চেখে দেখেছে, সে এক অপার্থিব স্বাদের অনুভূতি, বন্ধু, কাউকে বলে বুঝানো যাবে না" তার এই কথাগুলো মনের মধ্যে গেঁধে গেছে একেবারে।

[ছবি সূত্র: অন্তঃজাল]]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28979303 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28979303 2009-07-16 21:11:21
দেবদূতের বিবাহনামা ----- ৫
১.
অনেক আগে থেকেই আমি বাংলা নাটকের ঘোর ভক্ত। দেশের বাইরে এসেও সেই ভক্তি অটুট ছিলো, আছে এবং আশা করি ভবিষ্যতেও থাকবে। ল্যাবের হাইস্পিড নেট ব্যবহার করে প্রতিদিন দশ বারটা নাটক ডাউনলোড করে নিয়ে যেতাম আর রাতে বসে বসে দেখতাম। গোল বাঁধলো বউ আসার পর, ও বাংলা নাটক দেখে না, ওর পছন্দ হিন্দী সিরিয়াল। সেই কারনে আমার নাটক দেখায় কিছুটা বাঁধা পড়লো, নাটকের পাশাপাশি এখন ইংলিশ ও হিন্দী মুভিও ডাউনলোড করা শুরু করলাম। রাতে খেয়েদেয়ে দুজনে বিছানায় শুয়ে শুয়ে চলতো মুভি দেখা। একটা মুভি দেখা শেষ হলে আমি নাটক দেখা শুরু করতাম, আর বউ মুখ ভার করে পাশে বসে থাকতো অথবা পাশে বসে গল্পের বই নিয়ে বসে যেতো, আবার বেশি বিরক্ত হলে খোলা বারান্দায় বাতাস খেতে চলে যেত।

বিরক্ত হওয়ার সাথে সাথে একটু কষ্টও পেলাম, আমাদের বাংলা নাটক কত বৈচিত্রময়, কত জনপ্রিয় ঐতিহ্যবাহী বাংলা সংস্কৃতির একটা ধারা আর আমার বউই কিনা বাংলা নাটক দেখে না ! মনে মনে একটা জিদ চেপে গেলো, তাকে বাংলা নাটকে ফেরাতে মুটামুটি একটা পরিকল্পনা করে ফেললাম। একদিন শুক্রবার আমার নাটক ডট কম থেকে আনিসুল হক এর "সিক্সটি নাইন" নাটকটার একশত পর্ব নামিয়ে দশটি দশটি পর্বে ভাগ করে মোট দশটি ফোন্ডারে সাজিয়ে প্রথম তিনটি ফোল্ডার বাদে বাকি আটটা ফোল্ডার হিডেন করে রেখে দেই ল্যাপটপে।

রাতে খেয়ে দেয়ে বিছানায় আসতেই বউ বললো, আজ কি মুভি দেখাবে ?

উফ্ ! তোমাকে বলতে ভুলে গেছি, আজকে ল্যাবে নেট ডাউন ছিলো, তাই কোন মুভি ডাউন লোড করতে পারিনি। অভিনয় প্রতিভা শূন্যের কোঠায়, কিন্তু বাঙ্গালি জাতির ঐতিহ্য বলে কথা ! মুখে করুন গোবেচারা একটা ভাব ফুঁটিয়ে তুললাম, অনেক কষ্টে।

তাহলে আজকে কি দেখবো ?

দেখি হার্ডডিস্কে পুরনো কোন কিছু পাই কি না। ওহ ! একটা নাটক পেয়েছি, আনিসুল হকের, "সিক্সটি নাইন", দেখবে না কি ? সুপার হিট নাটক, দেখতে পার।

ধুর ! বাংলা নাটক, ফালতু কাহিনী আর ন্যাকা ন্যাকা ডাইলগে ভরা।

হুমম, তোমার হিন্দী সিরিয়াল তো একেকটা ক্লাসিক কাহিনী আর সুপার ডুপার ডাইলগে ভরা !

তুমি কি এখন নাটক দেখা নিয়ে ঝগড়া করবে ?

ঠিক আছে, ক্ষ্যামা দিলাম মাপ চাই, আমি দেখা শুরু করলাম, আর আগামি দুই দিন কিন্তু ছুটি, তাই এ নাটকই দেখতে হবে সারাদিন। বলেই আমি প্রথম পর্ব থেকে দেখা শুরু করলাম।

বউ পাশে বসে গাল ফুঁলিয়ে কিছুক্ষণ বসে থেকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে না পেরে শেষে হ্যারিপটারের বই নিয়ে পড়া শুরু করলো, ঐ দিকে আমার কোন বিকার নেই, আমি গভীর মনোযোগে সিক্সটি নাইন দেখছি।

বিছানায় আরাম করে পা দুলিয়ে দুলিয়ে নাটক দেখছি, চোখ স্ক্রিনের দিকে কিন্তু মনোযোগ বউ এর দিকে। কিছুক্ষণ পরে খেয়াল করলাম, যখনই কোন সাসপেন্স সীন আসছে তখনই ও বই থেকে মাথা তুলে মিনিট দুয়েক নাটক দেখছে। তারপর আবার বই এ ফিরে যাচ্ছে । আমি মনে মনে হাসছি, যাক মাছ টোপ না গিললেও ঠুকরাচ্ছে।

টানা দশ পর্ব দেখার পর মনে হলো, শেষের দিকে তার মনোযোগ নাটকে আরও বেড়ে গিয়েছে। নাটকের চরিত্র গুলোকে মুটামুটি চিনে ফেলেছে । ছেড়ে ছেড়ে দেখার কারনে কিছু না বুঝলে আমাকে মাঝে মাঝে প্রশ্নও করছে। আমি উত্তরে হালকা ঝাড়ি দিয়ে বলেছি, "নাটক দেখার সময় বিরক্ত করবে না তো, হয় তুমি মনোযোগ সহকারে পুরা নাটক দেখ না হয় বই পড়, আমাকে জ্বালাবেনা"

ঝাড়িটা ওর ইগোতে লাগলো মনে হয়, সাথে সাথে মুখটা ভার করে বই এ পূর্ণ মনোযোগ দিলো।

২.
প্রথম দশ পর্ব দেখা শেষ, পরের দিন পরের দশ পর্ব শুরু করলাম। এই অংশটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এই দশ পর্বের পরেই হয় সে বাকী আশি পর্ব দেখার আগ্রহ পাবে অথবা বাংলা নাটকের প্রতি আকর্ষণ চিরতরে শেষ হয়ে যাবে।

ঘুম থেকে উঠে, সকালে জম্পেস নাস্তা করে আমি "সিক্সটি নাইন" নিয়ে বসে গেলাম, রাতে ভালো ঘুম হয়েছে, তাই দুইজনের মনটা ফুরফুরে, দেখলাম ও নিজ থেকেই আমার সাথে বসে গেলো নাটক দেখতে অবশ্য হাতে বই ছিলো । কিছুক্ষণ পরেই দেখি সে বইটা বন্ধ করে ডান হাতের তর্জনী দিয়ে যেটুকু পড়া হয়েছে সেখানে মার্ক করে পুরা মনোযোগ দিয়ে নাটক দেখা শুরু করলো ! আসলে টোপ হিসাবে "সিক্সটি নাইন" নাটকটা পছন্দ করাটা ছিলো আমার খুব ভালো একটা সিদ্ধান্ত, এই নাটকটা তিন চারটা পর্ব দেখলে যে কারও পক্ষে এর আবেদন উপেক্ষা করা অসম্ভব। বেশ কিছুক্ষণ দেখে আবার বই পড়া শুরু করলো, আবার মজাদার কোন সীন বা ডাইলগ আসলেই নাটক দেখা শুরু করে

এক ফাঁকে, যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব করে তাকে বললাম, "নাটকা খুব জমেছে, তাই না"

হুমম, আনিসুল হক তো ভালো নাটক লেখে !

তাহলে কি আবার প্রথম পর্ব থেকে শুরু করবো ?

নাহ ! থাক ।

বিশতম পর্ব পর্যন্ত একটানে শেষ করে দুপুরের খাবার খেতে গেলাম। খাবার টেবিলে আমি কৌশলে এই নাটক সম্বন্ধে গল্প শুরু করলাম, নাটকের চরিত্রগুলো কোনটা কেমন, কার অভিনয় সবচেয়ে ভালো হচ্ছে, কোন চরিত্রটা সবচেয়ে মজার ইত্যাদি।

রাতের ডিনার শেষে যখন ল্যাপটপ নিয়ে বসে টুকটাক কাজ করছি তখন সে বললো, "নাটক দেখবে না ?"

ইচ্ছে হচ্ছিলো খুশিতে একটা লাফ দেই, অনেক কষ্টে অনুভূতিটা ঢেকে রেখে বললাম, "তুমি দেখলে দেখবো"

তাহলে শুরু কর।

কিন্তু সবগুলো পর্ব তো ডাউনলোড করা নাই, আর মাত্র দশটা অদেখা পর্ব আছে হার্ডডিস্কে, আর সম্পূর্ণ নাটক একশ পর্বের।

সমস্যা নাই, যতগুলো আছে ততগুলোই দেখি, পরেরটা পরে দেখা যাবে।

বুঝলাম, ওকে বাংলার নাটক ঠিক মতোই পেয়ে বসেছে।

রাতের মধ্যেই ত্রিশ পর্ব পর্যন্ত হজম করে ফেললাম। পরের দিন সকালে উঠে বউ নাস্তা বানাচ্ছে আর আমি টেবিলে বসে নাস্তার জন্য অপেক্ষা করছি। হঠাৎ শুনি ও গুনগুন করে গান গাচ্ছে, একটু মনোযোগ দিতেই গানের কথাগুলো কানে আসলো,

"তুমি চেয়ে আছ তাই, আমি পথে হেঁটে যাই
হেঁটে হেঁটে দূর বহুদূর যেতে চাই
আনন্দ হাসি মুখ, চেনা চেনা সবখানে
এরই মাঝে চলো মোরা হারিয়ে যাই
তুমি চেয়ে আছ তাই আমি পথে হেঁটে যাই
হেঁটে হেঁটে দূর বহুদূর যেতে চাই"

সিক্সটি নাইন নাটকের ভয়ংকর সুন্দর একটা গান, সে এই গানটা গুনগুন করছে ! যাক, সে এখন পুরাপুরি নাটকের মধ্যে ঢুকে গেছে, মিশন একোমপ্লিশ !

৩.
পরবর্তী ছয় সাত দিন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম দুইজন, প্রতিদিন দশটা পর্ব করে দেখি আর তার পরের দিনের জন্য অপেক্ষা করি। একদিন ও বলে কি ব্যাপার তুমি দশ পর্ব দশ পর্ব করে ডাউনলোড করো কেন ? একবারে সবগুলো ডাউনলোড করতে পারো না ?

বউ এর আইটি জ্ঞান শূন্যের কোঠায়, বললাম ল্যাবে ডাউনলোড লিমিটেড করা একজন পাঁচশ মেগাবাইটের বেশি একদিনে ডাউনলোড করতে পারে না।

ও! বলে মনটা বিষণ্ণ করে চলে যায় সে।

এটা আমি ইচ্ছা করেই করছিলাম এজন্যে যে, দুই তিন দিনের মধ্যে সব পর্ব শেষ করে ফেললে ঘোর কাটতে না কাটতেই চলে যাবে সময়টা, ফলে হৃদয় দিয়ে উপভোগ করা হয়ে উঠবে না । এটাই যদি দশ সময় নিয়ে দেখা হয় তাহলে অনেক উপভোগ্য ও মনে দীর্ঘ স্হায়ী একটা ছাপ পড়বে ওর।

ক্রমেই জটিল জটিলতর হচ্ছিলো কাহিনী, আমারা তাড়িয়ে তাড়িয়ে গলাধঃকরন করছিলাম প্রতিটি পর্ব । পচাঁনব্বই পর্বের পরে দেখি বউ এর মুখ ভারি হয়ে যাচ্ছে, কাহিনীর এমন করুন টার্ণ নিবে সে মনে হয় কল্পনাও করতে পরেনি। একেবারে শেষ পর্বের আগের পর্ব দেখার সময় তার দিকে তাকিয়ে দেখি ছোখ ছলছল করছে, শেষ পর্বে এসে ক্যান্সারে আক্রান্ত তৃষা যখন মারা যায় তখন তার চোখ দিয়ে ঝড়ছে অশ্রু ধারা !

আমি ডান হাত বাড়িয়ে তাকে টেনে বুকের মধ্যে চেপে রেখে বা হাতটা পিঠের উপর বুলাতে বুলাতে বললাম, "ধুর বোকা ! নাটক দেখে কেউ কি কাঁদে ?" এগুলা তো মিথ্যা কাহিনী।

আমার বুকের মধ্যে এসে মূহূর্তেই তার চাপা কান্ন হাওমাউ কান্নায় রূপ নিল, গোঙ্গাতে গোঙ্গাতে বললো, মানুষের এত কষ্ট কেন ?

মানুষের মন বড়ই বিচিত্র, অনুভূতিগুলোও ভাইরাসের মত সংক্রামক, তার কান্নার চোটে আমার মনটাও কেমন ভারী হয়ে উঠলো। নারী তোমার এই রূপতো আগে দেখি নাই ! যতই দেখছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি । অদ্ভুত ! শত রঙের শত আবরনে জড়ানো এক হৃদয় তোমার, একেকটা আবরন খুলছি আর অপার্থীব এক রঙের ছটায় চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে ! অন্তর্দেশীয় হৃদয়ের রঙের দেখা কি এই জনমে পাবো ?

মনে পড়ে গেলো, লুকিয়ে সিগারেট খাওয়ার কারনে রিকসা থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে চলে গিয়েছিলে, তারপর তিন দিন কোন ফোন পর্যন্ত রিসিভ করোনি। তোমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনিনি বলে বেড রুম থেকে বের করে দিয়েছিলে, ড্রয়িংরুমের সোফায় তিন ঘন্টা শুয়ে ছিলাম। সেই তুমি আজ নাটকের চরিত্রের কষ্টে কেঁদে বুক ভাসাও !

কি জানি ! আমরা মনে হয় নাটকের চরিত্র থেকেও কম গুরুত্বপূর্ণ ! আমরা তো আসলে স্বামী !

নিজের অজান্তেই মুখ দিয়ে হাসি বের হয়ে গেলো ।

মুখ তুলে বউ অবাক হয়ে বললো, " কি ব্যাপার ? হাসলে কেন ? "

নাহঃ ! এই মধ্যরাতে বেডরুম থেকে বের হয়ে তিন ঘন্টার জন্য ডাইনিং রুমে গিয়ে বসে থাকতে পারবো না, তার গালের উপর থেকে কান্নার জলটা মুছতে মুছতে বললাম "মানে কাঁদলে তোমাকে অদ্ভুত সুন্দর লাগে তো তাই দেখছিলাম"
----------------------------------------------------------------------------
দেবদূতের বিবাহনামা ----- ৪র্থ পর্ব

বি:দ্র: তিন মাস আগের ঘটনা, অর্ধের লিখে ড্রাফট করে রেখেছিলাম। আজ কমপ্লিট করে পোষ্ট করলাম । আর, অবশেষে অর্ধ শতক পূর্ণ হলো ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28971444 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28971444 2009-06-29 22:53:31
দেবদুতের খোয়াবনামা - ২
হঠাৎ নিচের রাস্তায় দেখতে পেলাম পাঞ্জাবী পড়ে হেঁটে যাচ্ছে নাদিরুল, আমার বাল্য বন্ধু, আমি চিৎকার করে বললাম, "আরে ! দোস্ত !"

নাদিরুল নিচ থেকে আমার দিকে তাকিয়েই আবার ঘুরে চলে যাবার জন্য উদ্বত হলে, আমার বুকের ভিতরটা কেমন যে করে উঠলো, দোস্ত আমাকে চিনতেই পারেনি !

আমি আবার ডাক দিলাম, কিন্তু এইবার কণ্ঠ দিয়ে কোন শব্দই বের হলো না ! আমি আবার চেষ্টা করলাম, আবার চিৎকার দিলাম, কিন্তু সেই একই অবস্হা, কোন এক বিচিত্র কারনে আমার গলায় শব্দ আটকে গেলো।

হঠাৎ আমাকে অবাক করে দিয়ে নাদিরুল কয়েক পা পিছিয়ে এসে বললো, আরে দোস্ত না ! কত দিন পর ! আমিতো প্রথমে চিনতেই পারিনি । কি ব্যপার ঈদের জামাত তো শুরু হয়ে যাচ্ছে, যাবি না ?

এইবার নিজের মধ্যে একটা ব্যাকুলতা টের পেলাম ! আমার হাতে কোন ঘড়ি ছিলো না, আমি কাওকে সময় জিজ্ঞেস করিনি, কিভাবে যেন আমার মাথার মধ্যে ঢুকে গেলো এখন দুপুর দুইটা বাজে, আরে তাই তো ! জামাত তো দাড়িয়ে গেলো !

আমি দৌড়িয়ে ঘরে ঢুকে বউকে বললাম, তাড়াতাড়ি আমার লাল পাঞ্জাবীটা বের করে দাও।

বউ বললো, তোমার পাঞ্জাবী তো আনা হয় নি।

ভিতরে ভিতরে প্রচন্ড অস্হিরতা অনুভব করছিলাম, ভাবছিলাম দুটা বাজে ! জামাত কি পাবো ? আবার ভাবছিলাম, আরে বাঙ্গালি টাইম , ঠিকই পেয়ে যাবো।

হঠাৎ বউ বললো, এক কাজ কর, পাঞ্জাবীটা প্রিন্ট করে নেও।

তাই তো ! এইটা কেন মাথায় আসলো না ! আমি সাথে সাথে প্রিন্টার দিয়ে পাঞ্জাবী প্রিন্ট করতে লেগে গেলাম, কিন্তু কি অদ্ভুত ! আমার প্রিন্টার হঠাৎ করে সাদাকালো হয়ে গেলে লাল পাঞ্জাবী সাদা-কালো প্রিন্ট হয়ে বের হলো।

ঠিক এই জায়গায় ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো। ঘুম থেকে জাগার পরও বেশ কিছুক্ষণ মনের ভিতর কেমন একটা অস্হিরতা অনুভব করছিলাম। আমার ঘুম খুব পাতলা, মাঝে মাঝে এমন হয়, কিন্তু আমার একটা বিশেষ গুন আছে (মনে হয় অনেকেরই আছে), স্বপ্নের মাঝে ঘুম ভেঙ্গে গেলে, সাথে সাথে মনের উপর একটু জোর খাঁটিয়ে প্রায়ই স্বপ্নটা আবার ঐখান থেকে শুরু করতে পারি। আমি সাথে সাথে আবার ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করলাম, মনের উপর অনেক জোর খাটালাম, আমার মনের সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করলাম, প্রচন্ড অস্হিরতা অনুভব করছিলাম বাল্যকালের সব বন্ধুদের আবার দেখার জন্য, কিন্তু কেন যেন এই স্বপ্নটা কন্টিনিউ করতে পারিনি।

ব্যাখ্যা:
কয়েকদিন আগে "ডিয়ার হান্টার" নামে একটা ক্লাসিক মুভি দেখেছিলাম, ফ্রেন্ডসিপ নিয়ে ! ঐ মুভিটা দেখে বেশ কয়েকদিন বাল্যবন্ধুদের নিয়ে নস্টালজিয়া ভুগেছি, এই স্বপ্নটা তার ফলাফল নিশ্চত।

কিন্তু প্রিন্টার দিয়ে পাঞ্জাবী প্রিন্ট ! এটার কোন ব্যাখ্যা বের করতে পারলাম না, অতিরিক্ত সাই-ফাই আসক্তির কারনে হতে পারে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28968702 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28968702 2009-06-24 02:16:04
একটা খোয়াবনামার খুঁজে --- ১
বউ চিরতার হাসি দিয়ে বললো, "সুন্দরী মেয়ে দেখলেই তোমার হাসির মাত্রা মনে হয় ইদানিং বেড়ে যাচ্ছে ?"

আমি ঘুমের ঘোরেই মনে মনে বলছি, "উফ্! খোয়াবেও ঝাড়ি খেতে হবে ?", খোয়াবের উপর ইচ্ছা শক্তি চাপিয়ে বউ এর মুখটা হাসি হাসি করে ফেললাম।

প্লেন আমাদের বাসার সামনের মেইন রোড থেকে রান শুরু করলো, অনেক টুকু দৌড়িয়ে আকাশে উঠার মুহূর্তে হাই ভোল্টাজের বিদ্যুতের তারকে কোন রকমে পাশ কাটিয়ে আকাশে উঠে গেলো, আমিও চেপে রাখা দমটা ছেড়ে দিয়ে ভাবলাম, আরে এটাতো আমি খোয়াব দেখছি, প্লেন ক্র্যাশ করলেই কি !

ইসরাঈল পার হয়ে প্রায় ইন্ডিয়ার বর্ডারের কাছে চলে এসেছি, এমন সময় বিমানের ইঞ্জিনের সমস্যা দেখা দিলো, প্লেন ঘুরিয়ে তেলাবিবে লেন্ড করতে বাধ্য হলো।

কিছুক্ষণ পরে আমাদের জানানো হলো, বিমান আজ ঠিক হবে না, আগামীকাল সকালে ফ্লাইট। খোয়াবের মধ্যেই একটু উদ্বিগ্ন বোধ করছিলাম, শত্রু দেশ ! না জানি আবার কি করতে কি করে বসে !

যাক কোন ঝামেল আর হয়নি, কিন্তু পরের দিন বলা হলো প্লেন পার্মানেন্টলি ডেমেজ, তাই এখন আপনাদের জন্য অন্য ব্যবস্হা করা হয়েছে।

কি ব্যবস্হা ?

বিমানের পাইলটকে বিশাল একটা দড়ি দিয়ে বেঁধে, সামনে রাখা হবে, তারপর দড়ির এক প্রান্ত দিয়ে বাম দিকে অর্ধেক যাত্রীকে বাঁধা হবে আর বাকী অর্ধেককে বাঁধা হবে ডান দিকের দড়ি দিয়ে । তারপর পাইলট রানওয়েতে দৌড়াবে, তারপর সবাইকে নিয়ে ফ্লাই করবে।

এতটুকু দেখার পরই আমার খোয়াব ভেঙ্গে যায়।

খোয়াব স্টাডি:
ছোট বেলায় কোন খোয়াব দেখলে সকাল ঘুম থেকে উঠেই নানির গলা জড়িয়ে ধরে বলতাম, "নানিভাই, আজকে এই এই খোয়াব দেখেছি"।

আর নানি মহা উৎসাহে উনার সহী-খোয়াবনামা নিয়ে বসে যেতেন, আর পুঙ্খানুপুঙ্খ জানতে চাইতেন, ঠিক করে বল, কি রং দেখেছিস? খেয়েছিস কিছু ? আশে পাশে কোন জঙ্গল ছিলো ? নদীতে ঢুবার সময় আর কিছু দেখেছিস ? ইত্যাদি ইত্যাদি ।

এখন তো আর নানির গলায় ঝুলতে পারি না , তাই নিজে নিজেই স্টাডি করতে বসলাম।

অনেক দিন দেশে যাই না, দেশের জন্যে মন পুড়ে, ঠিক আছে খোয়াবে দেশে যাওয়া দেখার এইটা একটা কারন হতে পরে।

বউকে কয়েকদিন ধরে খুব মিস করছি ! আচ্ছা, খোয়াবে বউকে দেখার এইটা একটা কারন হতে পারে ।

ইসরাঈলের আগ্রাসন নিয়ে মনের ভিতর মাঝে মাঝেই প্রচন্ড ক্ষোভ নাড়া দিয়ে উঠে, খোয়াবে ইসরাঈলকে দেখার এইটা একটা কারন হতে পারে কিন্তু ইন্ডিয়ার বর্ডারে পাকিস্তানের জায়গায় ইসরাঈল কিভাবে আসলো ? আচ্ছা, অবচেতন মনে ইসরাঈলের প্রতি যেমন ক্ষোভ ঠিক তেমনি পাকিস্তানের প্রতিও তো আমার আজন্ম ঘৃণা, এই একটা বিষয়ে দুই দেশ অভিন্নসত্তা। তাই একটা আরেকটার পরিপূরক হতেই পারে।

কিন্তু কোন ভাবেই, পাইলটকে দড়ি দিয়ে বেঁধে প্লেনের মত করে যাত্রীদের উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার আইডিয়া কিভাবে আমার খোয়াবে আসলো ! আজকে সারাদিন ভেবেও কোন কুলকিনারা করতে পারলাম না ।

নাহ, একটা সহী খোয়াবনামার অভাব রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুভব করছি।
---------------------------------------------------------------------------
ছবিসূত্র: ইন্টানেট।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28956700 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28956700 2009-05-27 23:22:08
( কল্পগল্প )--- ফিউশন ট্রেকিং
মধ্য রাত, গভীর ঘুমে অচেতন রাইসা, এ্যালান চোখ খুলে ঘুমন্ত রাইসার মুখের দিকে অপলক চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ; জানালা খোলা, চাঁদের আলোয় সারা ঘর ঝলমল করছিলো, সবচেয়ে বেশি ঝলমল করছিলো রাইসার মুখ, যেন জলের বুকে চাঁদের ছায়া, ছুঁয়ে দিলেই ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। অপার্থিব এক ভালোবাসায় বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠে এ্যালানের, আজকের পর কি রাইসা আগের মত ভালোবাসতে পারবে তাকে, সব জেনেও কি তাকে একান্ত আপন করে নিতে পারবে? ক্ষণিকের তরে মানবীয় আবেগ গ্রাস করে এ্যালানকে, মনে মনে ভাবে, থাক না সব কিছু আগের মতই ! কি দরকার শতবছর ধরে চলে আসা এই সিস্টেমের বিরুদ্ধে একা লড়াই করার ! পরমুহূর্তেই মন থেকে সব দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে সে, পা টিপেটিপে বিছানা থেকে নামে এ্যালান। খুব সন্তর্পনে বিড়ালের মত পা ফেলে কোন রকম শব্দ না করে ঘর থেকে বের হয়ে আসে সে। পরবর্তী দশ মিনিটের মধ্যে সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে যায়, কালো স্কিন টাইট ট্রাউজার, কালো ফুল হাতা স্কিন টাইট টি-সার্ট, কালো হাত মোজা পড়ে অন্ধকারে ঘর থেকে বের হয়ে আসে এ্যালান। ডান হাতে ধরা বড় একটা ব্রিফকেস, তাই ঐ দিকে একটু ঝুঁকে আছে তার দেহটা, বুঝা যাচ্ছে অনেক ভারী কিছু আছে হাতের ব্রিফকেসটায়। রাস্তায় নেমেই প্রথমে পকেট থেকে বের করে তার ফিউশন ট্রেকিং গোলকটা; এক সেন্টিমিটার ব্যাসের ছোট একটি গোলক, তার মধ্যে থেকে হাজার খানেক চুলের মতন চিকন গোল্ডেন তার বের হয়ে আছে, কিছুক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে থাকে এ্যালান এই ফিউশন গোলকটির দিকে। কি অপরিসীম ক্ষমতা ছোট এই গোলকটির! আয়তনে মার্বেলের মতন এই গোলকটি পৃথিবীর দুইশত কোটি মানুষকে একটি অদৃশ্য কারাগারে বন্দী করে রেখেছে গত দুইশত বছর ধরে ! সবকিছু ঠিকমত ঘটলে আজই এর অবসান ঘটবে, এ্যালানের উপর নির্ভর করছে বিশ্বের সমগ্র মানুষের স্বাধীনতা, সে না পারলে জীবিত আর কারও পক্ষেই এই যুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভব না, নাহঃ তাকে কোন ভাবেই বিফল হওয়া চলবে না !

চরম আক্রোশে ফিউশন গোলকটা মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে বুট দিয়ে মাড়িয়ে গুঁড়াগুঁড়া করে দেয় এ্যালান, মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর সমস্ত সিস্টেমের কাছে অদৃশ্য হয়ে যায় সে, পৃথিবীর কোন কম্পিউটার, কোন রোবট, বায়োবট বা কোন স্ক্যানিং সিষ্টেমই আর তাকে চিহ্ণিত করতে পারবে না। চরম তৃপ্তির একটা আবেশ এ্যালানের সমগ্র শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, আহঃ ! স্বাধীনতার এত আনন্দ ! একটু আবেগ প্রবন হয়ে উঠে এ্যালান, আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছা করে তার, মুহূর্তেই নিজেকে সংযত করে সে, এখনও আসল কাজ বাকী ।

হাত ঘড়িতে সময় দেখে নেয় এ্যালান, এখন বাজে একটা, তিনটা বাজার আগে ফিউশন সেন্টারে পৌঁছাতে হবে। প্রতিটি গাড়িতেই ট্রেকিং ডিভাইস লাগানো থাকে, গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার সাথে সাথেই ট্রেকিং এ্যাকটিভ হয়ে যাবে। তাই গাড়ি নিয়ে যাওয়ার কোন উপাই নেই, হেঁটেই যেতে হবে তাকে।

টানা দুই ঘন্টার মত হেঁটে হাঁপিয়ে উঠে এ্যালান, ফিউশন সেন্টারের দেয়ালে হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয় সে, তারপর ছয় ফিট উঁচু দেয়াল টপকিয়ে ঢুকে পরে পৃথিবীর ভয়ংকরতম জায়গা ফিউশন সেন্টারের সীমানায়। বিশাল এলাকা নিয়ে এই সেন্টার, সমগ্র এলাকা জুড়ে এটোমিক ব্লাস্টার হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে ভয়ংকর দর্শন সামরিক রোবট। এ্যালনের সাথে ফিউশন ট্রেকিং গোলকটা না থাকার কারনে এদের কেউই তাকে দেখতে বা ট্রেক করতে পারবে না, এইসব রোবটেদের কাছে আসলে এ্যালানের কোন অস্তিত্বই নেই। তারপরেও স্বাভাবিক আত্মরক্ষার তাড়নায় তার বুকটা ধুকধুক করছিলো, কাঁপা কাঁপা পদক্ষেপে সে একটা রোবটের সামনে দাড়ায়, কিন্তু রোবটটার মধ্যে কোন পরিবর্তন দেখতে না পেয়ে তার ভয় আস্তে আস্তে উবে গিয়ে পূর্ণ আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে। এবার মেইন রোড দিয়ে দীপ্ত পদক্ষেপে হেঁটে গিয়ে মূল ফটকের সামনে দাড়ায় এ্যালান। মূল ফটকে দাড়ানো রোবট গার্ডের পকেট থেকে টান দিয়ে পাঞ্চিং কার্ডটা বের করে আনে সে, রোবটের কোন বিকার নেই। মূল বিল্ডিং এ ঢুকে লিফটে দিকে এগিয়ে যায় এ্যালান, লিফটে ঢুকে ভূগর্ভস্হ পঞ্চাশ তলা নিচে, সেন্টারের হৃৎপিন্ড উপস্হিত হয় সে। বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে যায় সে ! আলোতে চারদিকে মধ্যাহ্ণে মত ঝলমল করছে ; প্রায় পঞ্চাশ মিটার ব্যাসের একটা গোলক, ঠিক ছোট ফিউশন ট্রেকিং গোলকের মতই দেখতে শুধু আকারে বিশাল, তরল হিলিয়ামের উপর ভাসছে, আর চারদিক থেকে লক্ষ কোটি তার এসে এই গোলকের বহিরাবরনে মিশেছে। এ এক অপার্থিব অপূর্ব দৃশ্য ! পৃথিবীর কোন জীবন্ত মানুষ গত দুইশত বছরে এই খানে আসতে পারেনি !

বিহ্বল ভাব কেটে গেলে, কালক্ষেপন না করে কাজে লেগে যায় এ্যালান। ব্রিফকেস খুলে কাঁপা কাঁপা হাতে বের করে আনে ছোট কিন্তু ভয়ংকর বিধ্বংসী টাইম বোমাটা। এই সেন্টার ধ্বংস করার জন্য এত পাওয়ারফুল বোমার কোন দরকার ছিলো না, কিন্তু এ্যালান কোন রকম ঝুঁকি নিয়ে রাজি নয় । বোমাটা জায়গা মত বসিয়ে হাত ঘড়ির সাথে মিলিয়ে ঠিক ছয়টায় সময় সেট করে সে। এখন বাজে সাড়ে চারটা, এখান থেকে বের হয়ে, সাতটার মধ্যে ব্রডকাস্টিং সেন্টারে পৌঁছাতে হবে তাকে। টিভি, রেডিও, ইন্টারনেটে বিশ্ববাসীর কাছে এক যোগে প্রচার করতে হবে তাদের মুক্তির সুসংবাদ। হাতে সময় কম, সবকিছু আবার চেক করে ঠিক পাঁচটার সময় লিফটে করে গ্রাউন্ডফ্লোরে উঠে আসে এ্যালান।

সেন্টারের দেয়াল টপকিয়ে বাইরে এসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয় এ্যালান, অধৈর্য্য হয়ে একটু পরপর হাতের ঘড়িতে সময় দেখতে থাকে সে, শেষে এসে ঘড়ির সাথে সুর মিলিয়ে কাউন্ট ডাউন শুরু করে এ্যালান ...... ফাইভ, ফোর, থ্রী, টু, ওয়ান .... এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড, তিন সেকেন্ড কোন সারা শব্দ নেই ! হঠাৎ পায়ের নিচে মাটি কেঁপে উঠে, থরথর ! পাঁচ সেকেন্ড পর বিকট শব্দের কানে তালা লাগে যায় এ্যালানের।

মুচকি হেসে পকেট থেকে আট পাতার ভাষণের পান্ডুলিপিটা বের একটু চোখ বুলিয়েই আবার পকেটে চালান করে দিয়ে ব্রডকাস্টিং সেন্টারের দিকে পা বাড়ায় এ্যালান, মিশন সফল।


২. ফিউশন গোলক:
একবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে পৃথিবীতে যখন অরাজকতা সীমা ছাড়িয়ে যাবার উপক্রম হয় তখন একদল নিবেদিত প্রাণ বিজ্ঞানী ফিউশন ট্রেকিং ডিভাইসটি আবিষ্কার করে। প্রাথমিক ভাবে আইন করে বাধ্য করা হয় যে, প্রত্যেকেই এই ডিভাইসটি সাথে রাখতে হবে। এতে সারা বিশ্বের প্রতিটি মানুষকে ট্রেকিং করা সম্ভব হয়। প্রতি মুহূর্তের কে কোথায় আছে, কি করছে, কি কথা বলছে, তার সব বিস্তারিত ইনফরমেশন ফিউশন সেন্ট্রালে চলে যেত। ফলে, অবিশ্বাস্য রকম ভাবে কমে আসে অপরাধের সংখ্যা। কিন্তু এর কয়েক বছর পর, আবার ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে হত্যা, ধর্ষণ, ছিনতাই এর হার। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, এবার অপরাধ সংগঠিত হওয়ার স্হানে কাউকে ট্রেক করা সম্ভব হচ্ছে না । পরে জানা গেলো যে, অপরাধীরা এক স্হানে ফিউশন ট্রেকিং ডিভাইসটা রেখে অন্য কোথাও অপরাধ সংগঠিত করে আবার আগের স্হানে ফিরে এসে ট্রেকিং ডিভাইস পকেটে ভরে নেয়। এতে করে ফিউশন সেন্টারে অপরাধ সংগঠিত হওয়ার স্হানে কোন অপরাধীর উপস্হিত থাকার কোন ইনফরমেশন পাওয়া যায় না।

আবার আইন পরিবর্তন করা হলো, প্রতিটি শিশুর জন্মের সাথে সাথে অস্ত্রোপচার করে মস্তিষ্কের ঠিক কেন্দ্রে ফিউশন ট্রেকিং গোলক বসানো বাধ্যতামূলক করা হলো। এতে করে জীবিত অবস্হায়, মস্তিষ্ক অক্ষত রেখে কেউ এই গোলক অপসারন করতে পারবে না। ফলাফল স্বরূপ এক প্রজন্ম পরেই পৃথিবীতে অপরাধের সংখ্যা একেবারে শূণ্যের কোঠায় নেমে আসে। সমগ্র মানব জাতী এক হয়ে নিয়মতান্ত্রিক ভাবে কাজ করতে থাকে, কোথাও কোন অপরাধ নেই, নেই কোন বিশৃঙ্খলা, সবাই যার যার কাজ করে যাচ্ছে সুশৃঙ্খলভাবে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসাবে মানুষের জীবন হয়ে উঠে ভয়ংকর রকম বৈচিত্রহীন, একঘেঁয়েমি পূর্ণ, আত্মহত্যার হার বেড়ে যায় ভয়ংকর রকমভাবে

ধীরে ধীরে বিশ্ববাসী অনুধাবন করতে পারে, সবাই একেকটা জৈবিক রোবটে পরিনত হয়ে গেছে; কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে, মানুষ নিজের অজান্তেই নিজের বানানো পরাধীনতার শিকলে বাঁধা পড়ে গেছে। সম্পূর্ণ ট্রেকিং সিস্টেম এমন ভাবে ডেভেলপ করা হয়েছিলো যে, সে নিজেই নিজেকে আপডেট করতে ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারবে। এই ট্রেকিং সিসটেম এমন ভাবে পরবর্তী প্রজন্মের ফিউশন গোলক তৈরী করে যে, মস্তিষ্কে বসানো এই গোলকের মধ্যেমে একটি নির্দিষ্ট কম্পনের সিগনাল দিয়ে যে কোন মানুষকে মুহূর্তেই হত্যা করা সম্ভব।

কিছু সাহসী যুবক ছোট খাটো বোমা নিয়ে মাঝে মাঝেই সেন্টারে হামলা করে, কিন্তু সেন্টারের কাছে পৌছার আগেই অসহ্য মাথা ব্যাথায় চিৎকার দিয়ে মাটিতে গড়িয়ে পড়ে আর মস্তিষ্কের রক্তক্ষরনে কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পরে। পরবর্তীতে রাষ্ট্রদ্রোহী আখ্যা দিয়ে পরম অবহেলায় এদের দেহকে ইলেক্ট্রিক চুল্লীতে পুড়িয়ে ফেলা হয়। মানুষের স্বাধীনতা স্পৃহা কল্পনাতীত, নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও কত টগবগে তরুন যে এভাবে জীবন জলাঞ্জলি দিয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই।


৩.এ্যালান: (এক বছর আগের ঘটনা)
ফিউশন সেন্টার পার হয়ে এ্যালানের অফিস, প্রতিদিন সকালে এটার পাশ দিয়ে গাড়ী চালিয়ে তাকে অফিসে যেতে হয়, যাবার পথে একরাশ ঘৃণা নিয়ে ফিউশন সেন্টারের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। শুধু ঘৃণার যদি নিজস্ব কোন শক্তি থাকতো, তাহলে পৃথিবী দুইশত কোটি মানুষের ঘৃণায় মুহূর্তেই গুঁড়াগুঁড়া হয়ে ধূলির সাথে মিশে যেতো মানুষের নিজের হাতেই তৈরী ইতিহাসের জঘন্যতম এই সেন্টারটি। আফসোস, মানুষ ঘৃনাকে শক্তিতে রুপান্তরিত করতে পারলেও ঘৃনার নিজস্ব কোন শক্তি নেই।

আজকেও মনে হয় দেরি হয়ে যাবে অফিসে, ভাবে এ্যালান। তাড়াহুড়ো করে গাড়ি পার্ক করে অফিসের দিকে দৌড়ে যায় সে। ঢুকার মুহূর্তে ডিং করে একটা শব্দ হয়ে স্পিকারে আওয়াজ ভেসে আসে, "মিস্টার এ্যালান, আপনি ১ মিনিট দেরি করে অফিসের এসেছেন, আপনার এক ঘন্টার বেতন মাস শেষে কেটে নেওয়া হবে।"

জাহান্নামের যাও তুমি, নিজের অজান্তেই গালিটা মুখদিয়ে বের হয়ে আসে এ্যালানের।

মিস্টার এ্যালান, আপনি এই মাত্র মহামন্য ফিউশন সেন্টারকে কটুক্তি করেছেন, আপনাকে একশত ইউনিট জরিমানা করা হলো।

রাগে গজগজ করতে করতে নিজের ডেস্কের গিয়ে বসে এ্যালান। একটা ঘন্টা যেহেতু বেতন থেকে কাটাই যাবে তাই এই একটা ঘন্টা একটু টিভি দেখা যাক। চ্যানেল বদলাতে বদলাতে একটা চ্যানেলের বিজ্ঞাপন তার চোখ আটকে যায়। মাথাটা একটু ঝাকি দিয়ে আবার শুনার চেষ্টার করে এ্যালান, সে কি ঠিক শুনছে ? নাহঃ ! ঠিকইতো শুনছে !

মেয়েটি একনাগাড়ে বলে যাচ্ছে, "আপনি কি বিষাদগ্রস্ত? নাগরিক বিনোদনের অভাব অনুভব করছেন? আপনি কি নিজেকে বন্দী মনে করছেন ? আপনি কি আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে খুন করতে চান ? তাহলে আমরা আপনাকে খুঁজছি না, আপনিই আমাদের খুঁজছেন, চলে আসুন আমাদের এখানে, জীবনকে উপভোগ করুন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মাত্রায়"

নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না এ্যালান, ফিউশন সেন্টারের অনুমোদন ব্যাতিত কোন কিছু প্রচার করা যায় না, তাহলে খুনের বিজ্ঞাপন কিভাবে প্রচার করছে এই সংস্হা ! এটা নিশ্চই নতুন কোন ব্যাবসায়ীক ধন্দাবাজী। তারপরও ওদের ঠিকানাটা টুকে রাখে এ্যালান। খুন করার স্বাধীনতা ! ওহ! নিশ্চই খুব থ্রিলিং কোন খেলা হবে; গতানুগতিক থিম পার্ক, সী বীচ, পাহাড় ট্রেকিং এইসবের আর মানুষ কোন মজা পায় না, এখন দরকার অপরাধ করার আনন্দ, তার উপর সেটা যদি হয় খুন করার মত অপরাধ তাহলেতো সে এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা !


৪. সি.এন্ড.কে:
"ক্রাইম এন্ড কিলিং সেন্টার" এর বাহিরে দাড়িয়ে আশপাশটা বেশ কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে এ্যালান, বিশাল এলাকা জুড়ে এই সংস্হা, অনেকটা থিম পার্কের মত। ভিতের ঢুকে এ্যালান ইনফরমেশন কাউন্টারের দিকে এগিয়ে যায়।

"হ্যালো স্যার, আমাদের সি.এন্ড.কে সেন্টারে আপনাকে স্বাগতম"

কি সুন্দর মেয়েটা ! কিন্তু হাসিতে কোন প্রাণ নেই কেন? যেন জীবন্ত মমির হাসি! একটু চমকে উঠে এ্যালান। নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, আমি আজ প্রথম এসেছি এই সেন্টারে, আমাকে কি আপনাদের সার্ভিসের ব্যাপারে বিস্তারিত বলতে পারবেন ?

আপনি ঐখানে একটু অপেক্ষা করেন, আমাদের মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনাকে ব্রীফ করবে।

এ্যালান আরও পনের জনের সাথে বসে অপেক্ষা করছে একটা ঘরে, কিছুক্ষণ পর একজন সুদর্শন যুবক এসে মমির হাসি দিয়ে বললো, "আমি এই কোম্পানীর মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ, আপনাদের ব্রীফ করতে এসেছি।"

"এটা হলো ডি.এন.এ. ব্যাংক; এখানে পৃথিবীর ইতিহাসে বিখ্যাত ও কুখ্যাত সব ব্যাক্তিদের ডি.এন.এ সেম্পল আছে; আলেকজেন্ডার, সক্রেটিস, প্লেটো, একেলিস, সিজার, ক্লিউপেটরা, কলোম্বাস, রাইট ব্রাদারস, নিউটন, নেপোলিয়ান, আইনস্টাইন, হিটলার, পেলে, সাদ্দাম হোসেন, বিন লাদেন, মিলেট দম্পতি, পিয়েলা কি নেই এই ব্যাংকে ! " দর্শনার্থীদেরকে বাহির থেকে একটা বড় ভবন দেখিয়ে বললো মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ।

এইটা হলো ক্লোন সেন্টার, এখানে আপনাদের পছন্দমত শিকারকে ক্লোন করা হয়। সবাই কেমন যেন একটু চমকে উঠলো। স্মিত একটা হাসি দিয়ে এক্সিকিউটিভ বললো, "জ্বী, আপনারা ডিএনএ ব্যাংক থেকে সেম্পল পছন্দ করে কাকে হত্যা করতে চান আমাদের জানাবেন, পরবর্তী এক সপ্তাহের মধ্যে আমরা তাকে ক্লোন করে ফেলবো।

সবশেষে এগুলো হলো আমাদের কিলিং জোন, দুর থেকে কতগুলো প্রাচীর ঘেরা জায়গা দেখিয়ে বললো এক্সিকিউটিভ। প্রতিটা ব্লক আয়তনে দুশত বর্গ মিটার, একেকটায় একের রকম পরিবেশ তৈরী করা হয়েছে, কোনটায় পাহাড়ি এলাকা, কোনটা আবার শুধু মরুভূমি, আবার কোনটা ঘন জঙ্গল। নির্দিষ্ট দিনে ক্নোন করা প্রাণীটাকে এখানে ছেড়ে দেওয়া হবে, আর আপনি আপনার পছন্দমত যেকোন একটা অস্ত্র নিয়ে তাকে শিকারে নেমে যাবেন। সে এক ভয়ংকর রকম এডভেঞ্চার !

দর্শনার্থীদের মধ্যে থেকে একজন প্রশ্ন করলো, আচ্ছা যদি শিকারী নিজেই শিকার হয়ে যায় ?

না, এমন হবার কোন সম্ভবনা নেই। আপনাদের হাতে একটা এলার্ম বাটন থাকবে, কোন বিপদ হলে এই বাটনে চাপ দিবেন; সাথে সাথে আমাদের সার্প-শুটার স্নাইপার ক্লোনটাকে গুলি করে ভূপাতিত করে ফেলবে।

এ্যালান একে একে সবার চোখের দিকে তাকায়, সেখানে জ্বলজ্বল করছে অজানা এক আভা, মুহূর্তেই যেন সবার মধ্যে নতুন এক প্রাণের সঞ্চার হয়। হাজার হোক, খুন করার নেশা পৃথিবীর প্রাচীনতম ভয়ংকর নেশা। দুইশত বছর কেন, হাজার বছরেও এই নেশা মানুষের রক্ত থেকে যাবার নয়।

আপনারা আজকে বুকিং দিয়ে গেলে আগামি সপ্তাহে এসে আমাদের এই অভূতপূর্ব খেলায় অংশগ্রহন করতে পারবেন, নির্বিকারভাবে বলে এক্সিকিউটিভ।

সবার মত এ্যালনও বুকিং দেওয়ার জন্য লাইনে দাড়ায়। বেশিভাগই হিটলার আর আলেকজেন্ডারকে বুকিং দেয়। বুকিং এর লোকটা একটু অবাক হয়ে এ্যালানের দিকে তাকায় যখন সে বুকিং দেয় সক্রেটিসকে। একটু নার্ভাস হাসি দিয়ে এ্যালান শুধু বলে, "আমি প্রাচীন গ্রীক দর্শনশাস্ত্রের ভক্ত"।

সঞ্চিত ইউনিটের প্রায় অর্ধেক খরচ করে যখন এ্যালান বাড়ি ফিরলো তখন রক্তের মধ্যে একটা আলোড়ন অনুভব করছিলো সে, এ এক অন্যরকম অনুভূতি। অনেক দিন পর আজ তার শান্তির ঘুম হয় । আহঃ ! এমন শান্তির ঘুম কত দিন হয় না !

৫. প্রথম খুন:
"স্যার, আপনাকে কিছুক্ষণের মধ্যে প্রস্তুত হতে হবে, সক্রেটিসকে বনে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এই মাত্র" বললো লোকটা আর আপনি এখান থেকে যেকোন একটা হাতিয়ার বা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন।

এ্যালান দেখে তার সামনে তীর ধনুক, তলোয়ার, বিংশ শতাব্দির রিভলবার থেকে শুরু করে সর্বাধুনিক এটোমিক ব্লাস্টার পর্যন্ত থরে থরে সাজানো আছে। সব ঘুরে সে শেষমেষ একটা বিটক দর্শন দুইটা তলোয়ার হাতে তুলে নেয় ।

জোরে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকে, তারপর ঘন জঙ্গলে ঢুকে যায় এ্যালান। দুই হাতে দুইটা তলোয়ার নিয়ে সন্তপণে এগিয়ে যাচ্ছে সে, সতর্ক দৃষ্টি, নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ নিজেই শুনতে পাচ্ছে । হঠাৎ চোখের কোনে কি যেন নড়ে উঠতে দেখে সে, এক লাফ দিয়ে গাছে আড়ালে চলে যায় এ্যালান, তারপর ধীরে ধীরে উকি দিয়ে দেখে একটা কাঠবিড়ালী জানপ্রাণ দিয়ে দৌড়াচ্ছে । নিজের মনেই হেসে উঠে এ্যালান।

আরও এগিয়ে যায় সে, বুকের ভীতর ড্রাম বাজানোর শব্দ হচ্ছে, লাফ দিয়ে একটা বালির টিবির উপর উঠে সে, একটু ধাক্কার মত খায় এ্যালান সাথে সাথে, দেখে পনের বিশ মিটার দুরে একটা গাছের নিচে বসে আছে একটা পৌড় লোক, নির্বাক নিশ্চল। এত অল্প বয়সী কাউকে আশা করেনি এ্যালান, কত হবে লোকটার বয়স ! চল্লিশ বিয়াল্লিশ !

খোলা তরবারী নিয়ে সক্রেটিসের দিকে এগিয়ে যায় এ্যালান, সমানে দাড়িয়ে হুংকার দিয়ে উঠে, "আমি আপনাকে হত্যা করতে এসেছি"

মৃদু হেসে উঠে সক্রেটিস, কিছক্ষণ আগে হেমলক পান করিয়ে আমাকে হত্যা করা হয়েছে, তুমি এখন আবার আমাকে কিভাবে হত্যা করবে ? আর আমি এখানেই বা এলাম কিভাবে ? এটা কি মৃত্যুর পরবর্তী জীবন ?

আপনাকে আবার সৃষ্টি করা হয়েছে, আপনাকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে প্রথমবার হত্যা করা হয়েছিলো, মানুষ এখন মানুষ তৈরী করার প্রযুক্তি আয়ত্বে নিয়ে এসেছে ।

বিন্দু মাত্র বিচলিত না হয়ে, মৃদু হেসে সক্রেটিস বললো, "ও! পুনঃপুনঃ যদি সৃষ্টিই করা যায় তাহলে মৃত্যুর কি স্বার্থকতা রইলো ? ঠিক আছে কর হত্যা আমাকে, তবে মৃত্যুর আগে একটা প্রশ্নের উত্তর দাও, আমাকে কেন হত্যা করতে চাও?

একটু থমকে যায় এ্যালান তারপর বলে, এটা একটা খেলা, আপনি শিকার আমি শিকারি, আপনি দৌড়ান ।

হো হো করে হেসে উঠে সক্রেটিস, দৌড়িয়ে এমন কোন জায়গায় কি যেতে পারবো যেখানে মৃত্যু আমাকে ছোঁবে না ! তুমি যদি আমাকে হত্যা করতেই চাও তাহলে চালাও তোমার তরবারী।

রক্তের মধ্যে কম্পন অনুভব করতে থাকে এ্যালান, মৃত্যু মুখেও শিকারকে এমন নির্বাক দেখে হিতাহিত জ্ঞ্যান হারিয়ে ফেলে সে। ডান হাতে ধরা তলোয়ারটা গায়ের জোরে ঢুকিয়ে দেয় সক্রেটিসের বুকে, আর বা হাতের তলোয়ারটা সজোয়ে বসিয়ে দেয় মাথা বরারব।

উহঃ শুব্দ করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সর্বকালের অন্যতম দার্শনিক সক্রেটিস, মৃত্যুর আগে শুধু একটা কথা মুখ দিয়ে বের হয় তার, "হায়! তিন হাজার বছরেও সভ্যতা একচুলও এগোয়নি"

এ্যালানের সারা শরীর রক্তে মাখামাখি, তার পায়ের কাছে পড়ে আছে সক্রেটিসের থেঁতলানো মগজ, পৈশাচিক উল্লাসে গগন চিৎকার দিয়ে উঠে সে। অপকৃতস্হের মত হাসতে হাসতে কিলিং জোন থেকে বের হয়ে আসে এ্যালান।


৬. দ্বিতীয় খুন:
পরবর্তী কয়েকদিন ঠিকমত ঘুমাতে পারেনি এ্যালান, ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে শুধু ভেসে উঠেছে মাটিতে পড়ে থাকা সক্রেটিসের মগজ। উহঃ কি বিভৎস দৃশ্য ! তার অবচেতন মন কিছু একটা ইঙ্গিত দিচ্ছে তাকে, বারবার একই স্বপ্ন দেখিয়ে। কিন্তু ইঙ্গিতটা ধরতে না পেরে তার অস্হিরতা আরও বেড়ে যায়, মাঝে রাইসার সাথে বেশ কয়েকবার তুমুল ঝগড়া হয়ে গেছে তার।

একদিন তুমুল ঝগড়ার মধ্যে হঠাৎ রাগের মাথায় রাইসা বলে উঠে, ফিউশন গোলকের মাধ্যমে তোমার মগজে যদি তীব্র একটা ব্যাথা দিতে পারতাম তাহলে মনটা শান্ত হতো।

হঠাৎ এ্যালানের সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠে, "কি বললেন তুমি ? আবার বলো , আবার বলো।

"ফিউশন গোলকের মাধ্যমে তোমার মগজে যদি তীব্র একটা ব্যাথা দিতে পারতাম তাহলে মনটা শান্ত হতো।", কেন হুমকি দিচ্ছ নাকি ? যতবার বলতে বলবে ততবার বলবো, আমি কি তোমাকে ভয় পাই নাকি ? রাগে গজগজ করতে থাকে রাইসা।

ইউরেকা! ইউরেকা! চিৎকার দিয়ে বউকে জড়িয়ে ধরে আনন্দে ধেঁই ধেঁই করে নেচে উঠে এ্যালান। তার সারা গালে, মুখে চুমু দিতে শুরু করে হঠাৎ।

একটা ঝাড়া দিয়ে এ্যালানকে সরিয়ে দিয়ে বলে "কি ব্যাপার ! পাগল হয় গেলে নাকি?"

পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যে ভয়ংকর পরিকল্পাটা ফাইনাল করে ফেলে এ্যালান। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বার বার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে সে। অবশেষে সন্তুষ্ট হয়, নাহঃ পরিকল্পনায় কোথাও কোন ফাঁক নেই; একদম ফুলপ্রুফ প্ল্যান।

অবশেষে সি.এন্ড.কে সেন্টারে হাজির হয়ে এ্যালান। এগিয়ে যায় ইনফরমেশন কাউন্টারের দিকে। মেয়েটির দিকে তাকিয়ে মৃদু একটা হাসি দিয়ে বলে, "আমি কি কোম্পানির টেকনিকেল ম্যানেজারের সাথে দেখা বলতে পারি ? "

ইন্টারকমে কিছুক্ষণ কথা বলে মেয়েটি বলে, "আপনি এই দিক দিয়ে পাঁচ নাম্বার রুমে যান, ওখানেই টেকনিকেল ম্যানেজার বসেন"

দরজায় নক করতেই ভিতর থেকে একটা ভরাট কন্ঠ বলে উঠে, "আসুন স্যার , আসুন"।

ভীতরে গিয়ে বসে এ্যালান।

তা এবার বলুন কি করতে পারি আপনার জন্য ?

আমি আপনাদের এখানে আগে একবার ক্লোন খুন করেছি, আমি আবারও করতে চাই।

ঠিক আছে, আপনি বুকিং দেন, সমস্যা কোথায় ?

আমি আসলে আপনাদের ডি.এন.এ ব্যাংকের কাউকে খুন করতে চাই না, আমি আমার নিজের ক্লোনকে খুন করতে চাই

কিন্তু আপনিতো বিখ্যাত কেউ নন, তার উপর আপনি কেন নিজের ক্লোনকে খুন করতে চান?

দেখুন, আমি যদি নিজের ক্লোনকে খুন করতে যাই, সেই ক্লোনটাও বাঁচার জন্য লড়াই করবে । কিন্তু দুইজনের চিন্তাধারা যেহেতু একরকম সেহেতু এই লড়াইটা হবে খুবই উচ্চমার্গীয় বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। এতে আপনাদের এই প্রজেক্টে নতুন মাত্রা যোগ হবে। আর আজ আমি বিখ্যাত কেউ নই, কিন্তু কাল যে হবো না সে গ্যারান্টিতো কে দিতে পারবে না , তাই না ?

হুমম, ভালো বলেছেন। ঠিক আছে , আমি টিকনিসিয়ানদের বলে দিচ্ছি , আপনি আজকে ডিএনএ সেম্পল আর বুকিং দিয়ে যান। আমরা আপনাদের লড়াই উপভোগ করতে চাই।

এক সপ্তাহ পর, ধীরে ধীরে চোখ খুলে এ্যালান। নিজেকে একটা ঘন জঙ্গলে আবিষ্কার করে সে । লাফিয়ে উঠে এ্যালান, সি.এন্ড.কে সেন্টারের টেকনিকেল ম্যানেজারের সাথে কথোপকথন পর্যন্ত তার মনে আছে, তারপর আর কিছুই মনে নেই তার। সে এখানে কিভাবে এলো ! দেখেতো জায়গাটা মনে হচ্ছে সি.এন্ড.কে সেন্টারের কিলিং জোন । মানে ! সে ক্লোন ! তাকে এখন হত্যা করতে আসবে সে নিজেই । ধীরে ধীরে সব স্মৃতি ফিরে আসে তার, মনে পড়ে গেলো তার ভয়ংকর সেই পরিকল্পনার কথা । মৃদু হাস্য মুখে সে অপেক্ষা করতে থাকে নিজের জন্য।

মুখোমুখী দুই এ্যালান, দুজনেই চুপ, কোন রা নেই কারো মুখে। দুজনেই জানে একটা টু শব্দ করলে আসল এ্যালনের মাথায় বসানো ফিউশন ট্রেকিং গোলকের মধ্যমে সব ইনফরমেশন চলে যাবে ফিউশন সেন্টারে। কোন কথা না বলে, হাতের তলোয়ারটা মাটিতে ফেলে দিয়ে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে আসল এ্যালান ।

প্রচন্ড বেগে মাথার উপর নেমে আসে বিকট দর্শন তলোয়ার, বিদির্ণ হয়ে যায় আসল এ্যালানের মাথা। মুহূর্তেই এ্যালানের মগজ থেকে ফিউশন ট্রেকিং গোলকটা বের করে পকেটে ভরে নেয় ক্লোন এ্যালান।

রক্ত মাখা শরীর নিয়ে কিলিং জোন থেকে বের হয় আসে দুই শত বছর পর, পৃথিবীর প্রথম স্বাধীন মানুষ


৭. পরিসংহার:
" .... বিশ্ববাসি, আজ আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, তা টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আপনাদের । আমাদের সামনে অনেক কাজ , আমাদের প্রিয় এই পৃথিবীকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। সবাই ভালো থাকুন সুস্হ থাকুন।" একদম শেষে এসে এ্যালান বলে, "আসল এ্যালানের পক্ষ থেকে আমি ক্লোন এ্যালান "। এই বলে দীর্ঘ বক্তৃতা শেষ করে ব্রডকাস্টিং সেন্টার থেকে বের হয়ে আসে এ্যালান।

চারদিকে উৎফুল্ল মানুষের ঢল ! মানুষ আজ মুক্তির আনন্দে পাগল প্রায়। রাস্তায় বের হয়েই এ্যালান দেখে রাইসা দুহাত প্রসারিত করে দাড়িয়ে আছে, তার চোখে বেয়ে ঝরছে জল।

এ্যালান এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বলে, "তুমি কি আমাকে কখনো আগের মত ভালোবাসতে পারবে?"

কেন ?

আমি তো আসল এ্যালান নই, এ্যালানের ক্লোন।

কৈ নাতো ! কোন পার্থক্য তো নেই ! তুমিই আমার এ্যালান, শুধু আসল এ্যালান থেকে এক সপ্তাহের ছোট।

দুইজনেই হো হো করে হেসে উঠে, রাইসার এই কৌতুকে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28952041 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28952041 2009-05-17 22:31:52
দেবদূতের বিবাহনামা ---- ৪
১.
চার পাঁচ দিন আগে কয়েকজন বন্ধু চেপে ধরলো, "চল সমুদ্রের পাড় থেকে বেড়িয়ে আসি", আমি আর না করতে পারলাম না। বউ কয়েকদিন আগে দেশে চলে গেছে, ভাবলাম এইতো সুযোগ। খুব সকাল সকাল গিয়ে বিকাল বিকাল ফিরলেই হবে, সারাদিন আর বউকে ফোন দিব না, রাতে ঘরে ফিরে বলবো, "আমার একদমই ইচ্ছা ছিলো না যাওয়ার, কিন্তু বন্ধুরা জোর করে ধরে নিয়ে গেল, না করতে পারিনি"।

পানিতে নেমে খুব লাফালাফি করছি, ভালোই মজা হচ্ছিলো, যেহেতু সাঁতার পারি না তাই তীরের কাছাকাছিই থাকতাম সবসময়। তীরের কাছাকছি ছিলো কিছু বিশাল আকারের পাথর। এক বন্ধু আঁচড়ে পাঁচড়ে পাথরের উপর উঠে বেশ ভাব নিয়ে কয়েকটা ছবি তুললো, শেষে আমাকেও ডেকে বললো, "আরে কোন ব্যাপার না, উঠে আয়"। আমিও বাহাদুরী দেখাতে গিয়ে পাথরটার উপর উঠার জন্য দিলাম একটা লাফ, ঠিক সেই সময় বিশাল একটা বেরসিক ঢেউ আছড়ে পড়ে আমার উপর। হুড়মুড় করে পাথরটার উপর পড়ার সময় হাত,পা সামনে এগিয়ে দিয়ে কোন রকমে সংঘর্ষটা এড়ালাম। কিন্তু বা হাতের তালুতে আর বা পায়ের হাটুতে বেশ কিছু অংশ কেটে ও থাতলে যায়। আমি পানিতে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে তীরে এসে বালিতে বসে পড়ি ।

কিছুক্ষণ পরেই তার ফোন । প্রথমেই প্রশ্ন তুমি কোথায় ?

আমি মিনমিন করে বললাম, "বন্ধুরা জোর করে সী বিচে বেড়াতে নিয়ে এসেছে"

আমি এতদিন ছিলাম, কৈ আমাকে তো একদিনও সী বিচে নিয়ে যাওনি ?

আসলে সী বিচটা অনেক দুরে তো, তাই তোমাকে নিয়ে আর আসা হয়নি। পরের বার তোমাকে নিয়ে আসলেতো কয়েক দিন থাকবো তাই আগে একবার এসে পর্যবেক্ষণ করে গেলাম।

মনে হলো একটু শান্ত হয়েছে । তার পরপরই বললো, খবরদার কোন বিকিনি পড়া মেয়ের দিকে তাকাবে না ! খবরদার !

আরে নাহঃ ! এখানে কোন বিকিনি পড়া মেয়েই নাই।

তারপর আমাকে চমকে দিয়ে হঠাৎ বললো, "তুমি কেমন আছ ?"

তার গলায় কেমন যেন একটা আকুতি ছিলো, আমি মুহূর্তক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, "হাতে ও পায়ে একটু ব্যাথা পেয়েছি"

সাথে সাথে সে চিৎকার দিয়ে বললো, "আমার মনে টান দিয়েছিলো, যে তোমার কিছু একটা হয়েছে !"

আমি একটু অবাক হলাম, এই মনে টান দেওয়া ব্যাপারটা আমি কখনই ঠিক মত বুঝি না। এই ব্যাপারটা আমার মায়ের মধ্যেও দেখেছি। যখনই মন খুব খারাপ বা অস্হির থাকে, তখনই ফোন দিয়ে বলে, "বাবা, মন খারাপ করে না" আর সাথে সাথে আমার মন ভাল হয়ে যায়।

আগেও দেখেছি, অনেক সময়ই আমার মনের কথা কিভাবে যেন সে টের পেয়ে যায়। আর কিভাবে টের পেলে জিজ্ঞেস করলে বলে, "আমি তোমাকে নিয়ে যেভাবে ভাবি, তোমাকে নিয়ে যেভাবে চিন্তা করি, তোমাকে যেভাবে ভালোবাসি , সেভাবে তুমি বাসলে তুমিও বুঝতে পারবে আমার মনের কথা, আমার কষ্টগুলো, আমার আনন্দগুলো। নিজেকে তখন অনেক ক্ষুদ্র, তুচ্ছ মনে হয়, তার অনুভূতির সামনে।

২.
আজ অনেক দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছি। কাজের খুব একটা চাপ নেই, তাই হাতমুখ ধুয়ে, দুপুরের খাবার খেয়ে একটা মুভি দেখলাম, সাইন্স ফিকশন। তারপর খুব ফুরফুরে মেজাজে ল্যাবে এসে ব্লগিং করতে বসে গেলাম। এক ফাঁকে মেইলটাও চেক করে নিয়েছি। সবকিছুই ঠিকঠাক, কোন অসঙ্গতি নেই কোন দিকে। শিস্ দিতে দিতে কফি বানিয়ে নিয়ে এসে আবার ডেস্কে বসলাম।

একটু পর তার ফোন, এবার প্রথমেই জিজ্ঞেস করলো, দুপুরে কি খেয়েছ ?

বললাম এইতো এটা সেটা খেয়েছি। কিন্তু তোমার গলা এমন শুনাচ্ছে কেন ?

আমার কথা শুনে সে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো বললো, "একটু আগে বারান্দায় হাটতে গিয়ে পড়ে হাত ভেঙ্গে ফেলেছি।"

বুকটা ধ্বক করে উঠলো, নিজের অজান্তেই গলার আওয়াজ বেড়ে গেলো, বললাম, "কি?"

হুমম, এইমাত্র প্লাস্টার করে বাসায় ফিরেছি। উহঃ, কি যে অসহ্য ব্যাথা ! মুহূর্তের মধ্যে মনে হলো আমার হাতটাই নেই হয়ে গেলো। পেইন কিলার খেয়েছি, তারপরও ভয়ানক ব্যাথা করছে। আচ্ছা, এখন রাখি কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে, আজকে আর ফোন দিও না ।

কিছুক্ষণ থ্ মেরে বসে ছিলাম । আমার বউ হাত ভেঙ্গে তীব্র ব্যাথায় কোকাচ্ছে আর আমি মুভি দেখছি, শিস্ দিয়ে দিয়ে কফি খাচ্ছি, আমি কিছুই টের পেলাম না ! ইচ্ছে করছে ছুটে তার কাছে চলে যাই, ইস তার ব্যাথাটা যদি আমি নিয়ে নিতে পারতাম! তার এই তীব্র ব্যাথায় কিছুই আমি অনুভূব করিনি, একেবারে কিছুই না !

হায় ! এখনও তোমার মত করে ভালোবাসতে পারলাম না । ক্ষমা করে দিও ।

দেবদূতের বিবাহ নামা ----- ১

দেবদূতের বিবাহ নামা ----- ২

দেবদূতের বিবাহ নামা ----- ৩]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28947678 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28947678 2009-05-07 22:13:23
( কল্পগল্প ) --- পেইনি দোকানটার উপরে বিশাল জমকালো সাইনবোর্ডে "দ্যা পেইনি" লেখাটা জ্বলজ্বল করছে, প্রীহা অনেকক্ষণ ধরেই আশে পাশে ঘুরাঘুরি করছিলো কিন্তু ঢুকতে সাহস পাচ্ছিলো না। অবশেষে যা হবার হবে ভেবে সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে দোকানে ঢুকে কাউন্টারের দিকে এগিয়ে যায়। একটা মেয়েকে ঢুকতে দেখে কাউন্টারে বসা লোকটা একটু চমকে উঠে, পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলে , "জ্বী, ম্যাডাম বলেন আপনার জন্য কি করতে পারি"

"গতকাল টিভিতে আপনাদের বিজ্ঞাপণ দেখে এসেছি" লোকটার চোখে চোখ রেখে বললো প্রীহা।

কোন রকম ভনিতায় না গিয়ে লোকটা বললো, বুঝতে পেরেছি আপনি কি পেইনি ডোজ নিতে এসেছেন ?

অস্হিরভাবে মাথা নাড়ে প্রীহা ।

ম্যাডাম, প্রথম মাত্রার ডোজটা আমরা ফ্রী দিয়ে থাকি, আর আপনি যেহেতু আমাদের প্রথম মহিলা কাস্টমার সেই হিসাবে আপনাকে আমরা দ্বিতীয় মাত্রার ডোজ পর্যন্ত ফ্রী দিতে পারি।

তাই ?

জ্বী, তাহলে আপনি একটু বসুন আমি যন্ত্রপাতি নিয়ে আসছি, কোন চিন্তা করবেন না, আমি নিজে আপনাকে ব্যবহার বিধি বুঝিয়ে দিবো। আশা করি আপনি আমাদের সার্ভিস পেয়ে নিরাশ হবেন না, বলেই লোকটা নোংরা দাঁত বের এমন বিশ্রীভাবে হাসলো যে এক অজানা ভয়ে সারা শরীর কাঁটা দিয়ে উঠলো প্রীহার। এই মুহূর্তে প্রীহার ইচ্ছা করছে ইস্, এক দৌড়ে পালিয়ে যেতে পারতাম !

কিছুক্ষণ পরে লোকটা এক জোড়া হাত মোজা, একটা পাতলা সিলিকনের প্যাড, এক বোতল ম্যানথল আর দশ ইঞ্চি ব্লেডের একটা ছুরি নিয়ে ঘরে ঢুকলো। প্রীহাকে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে বললো, আপনি এই করিডোর দিয়ে গিয়ে একশ পঁচিশ নাম্বার ব্লকে ঢুকবেন। আপানার সময় হলো এক ঘন্টা বিশ মিনিট তারপর বের হয়ে এলে আমিই আপনাকে বাড়ি পৌছানোর জন্য টেক্সিতে উঠিয়ে দিবো ।

লোকটার হাত থেকে জিনিসগুলো নিয়ে প্রীহা করিডোর দিয়ে হেঁটে হেঁটে একশ পঁচিশ নাম্বার ব্লক খুঁজে খুঁজে এগিয়ে যাওয়ার সময় আশেপাশের ব্লক থেকে গোঙ্গানী, আনন্দধ্বনি, আহ্ উহ্ ইত্যাদি অদ্ভুত সব শব্দ তার কানে আসতে থাকে। এইসব কিছুকে পাত্তা না দিয়ে সে তার নির্দিষ্ট ব্লক খুঁজে পেয়ে তাতে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। দুই মিটার বাই দুই মিটারের ছোট একটা ব্লক, মাঝখানে একটা রোলিং চেয়ার বসানো, আর একটা ছোট গোল টেবিল, মাথার উপর কম পাওয়ারের একটা ডিম লাইট।

হাতমোজা গুলো পড়ে গেঞ্জির বা-হাতাটা টেনে উপরে তুলে উদম বাহুতে সিলিকনের প্যাডটা পেঁচিয়ে নেয় প্রীহা, তারপর সিলিকনের প্যাড থেকে বের হওয়া পাঁচটা স্বর্ণের তার পাঁচটা আঙ্গুলের নোখের মাথায় ক্লিপ দিয়ে আটকিয়ে নিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে তুলে নেয় ছুরিটা।

এক ঘন্টা বিশ মিনিট পর টলতে টলতে "দ্যা পেইনি" থেকে বের হয়ে টেক্সিতে উঠে প্রীহা। এইসময় তার সারা শরীর মন বিষাদে ডুবে ছিলো, বার বার হাটু ভেঙ্গে পড়ে যাচ্ছিলো সে, শুধু চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছিলো অঙ্গারের মত।

২.
সকাল থেকেই অস্হির লাগছে প্রীহার, একটু পরপর সময় দেখছে আর ভাবছে কখন সন্ধ্যা হবে । সারা মাস তীর্থের কাকের মত অপেক্ষা করে কখন মাসের শেষ সাপ্তাহিক ছুটির দিন আসবে ! সবসময়ই শেষে এসে আর ধৈর্য্য ধরে রাখতে পারে না সে, এই দিনে সকাল থেকেই ঘরময় হাটাহাটি শুরু হয়ে যায় তার।

আজ নির্ধারিত সময়ের আগেই সে চলে যায় "দ্যা পেইনিতে" । কাউন্টারে বসা লোকটা একটু মুচকি হেসে বলে ম্যাডাম, আপনার সময়তো এখনও আসেনি !

আমি ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করবো, সময় হলে আমাকে ডেকে দিবেন। ও, আর একটা কথা, আপনারা কি কোন ভাবে সার্ভিসটা মাসিক থেকে সাপ্তাহিক করতে পারেন না ?

ম্যাডাম, আসলে বিজ্ঞান কাউন্সিল থেকে আমাদেরকে মাসে একবারের বেশি পেইনি ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হয়নি, তাই ইচ্ছা থাকলেও আমরা দিতে পারবো না, দুঃখিত ।

পঞ্চম মাত্রার ডোজের সিলিকনের প্যাড বাহুতে পেঁচিয়ে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে থাকে প্রীহা, চাপা নিঃশ্বাসটা আস্তে আস্তে ছাড়ে তারপর ছুরিটা হাতে নিয়ে আচমকা গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে পোঁচ মারে সিলিকনের প্যাডে । গলা চিড়ে বের হয়ে আসে গগন ফাটানো তীব্র চিৎকার, ব্যাথায় হাত পা থরথর কাঁপতে থাকে, হাতের মুঠি জোরে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে থাকে প্রীহা কিছুক্ষণ। তারপর বোতল থেকে কিছু তরল ম্যানথল নিয়ে প্যাডের উপর মালিশ করে দেয় সে, নিজের অজান্তেই পরম সুখের ধ্বনি 'আহঃ' বের হয়ে আসে তার মুখ দিয়ে।

কিছুক্ষণ পর হাতে পেঁচানো প্যাডে আবার গায়ের জোরে ছুরি চালায় সে, মূহূর্তেই প্যাড থেকে ব্যাথার অনুভূতিগুলো স্বর্ণের তারের মধ্যে দিয়ে আঙ্গুল পর্যন্ত পরিবাহিত হয়ে যায়, আঙ্গুল থেকে এই অনুভূতি মস্তিষ্কে যেতে সময় নেয় যেন অনন্ত কাল ! উহঃ কখন শেষ হবে এই ভয়ংকর ব্যাথা !! দশ সেকেন্ডের জন্য চেতনা হারিয়ে ফেলে প্রীহা, তারপর ম্যানথল মালিশের কারনে তীব্র ব্যাথার পর আসে তীব্র সুখের অনুভূতি ! পৃথিবীর কোন অনুভূতির সাথে এর কোন তুলনা নেই, সে এক স্বর্গীয় অনুভূতি ! ইস্ চিরদিন এই অনুভূতি ধারন করতে পারতাম, মনে মনে ভাবে প্রীহা।

আবার ছুরি চালায় সে , আবার ম্যানথল মালিশ, আবার ছুরির পোঁচ আবার ম্যানথল মালিশ, একসময় অনুভূতি সর্বোচ্চ স্তরে পৌছে যায় প্রীহা, ব্যাথা বা সুখের কোন অনুভূতিই আর অবশিষ্ট থাকে না তার। টলতে টলতে ব্লক থেকে বের হয়ে আসে সে, বাড়ি ফেরার তাগিদে, আবার সেই একাকি ফ্ল্যাট, সেই একঘুয়েমি চাকুরি, সেই অনুভূতিহীন জীবন !

৩.
প্রীহাকে দেখে একটু অবাকই হয় কাউন্টারের লোকটা, তার তিন বছরের অভিজ্ঞাতায় সে দেখেছে, কোন কাস্টামারই অষ্টম ডোজের পরে আর এই দোকান মুখি হয় না, সেই হিসাবে প্রীহার আজকে দশম ডোজ হবে। কি জানি , মনে হয় মেয়েদের স্বাভাবিক অনুভূতিগুলো খুব বেশি প্রখর নয়, তাই তারা বাহিরের অতিরিক্ত অনুভূতি সহ্য করতে পারে, ভাবে সে।

দশম মাত্রার ডোজে ছুরির প্রথম পোচেই জ্ঞ্যান হারায় প্রীহা, এমন কি চিৎকার দেওয়ার সময়টাও সে পায় নি। এক ঘন্টা পর তার জ্ঞ্যান ফিরে, ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায় সে, সেই চোখে নেই কোন প্রাণ, নেই কোন অনুভূতি, একেবারে শতভাগ শুন্য দৃষ্টি।

সাথে সাথে এলোমেলো পা ফেলে বের হয়ে আসে সে তার ব্লক থেকে। ট্যাক্সি নিয়ে কিভাবে বাসায় এসেছে বলতে পারবে না, ট্যাক্সি ড্রাইভারকে কোন রকমে শুধু বাসার নাম্বারটা বলতে পেরেছিলো এতটুকুই তার মনে আছে।

ঘরে ঢুকে সোফার উপর বসে থাকে কিছুক্ষণ, চুপচাপ নিথর নিশ্চুপ । বের হওয়ার সময় টিভি বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলো, খবর হচ্ছে তাতে, রিপোর্টার অতি দ্রুতবেগে কি সব বকে যাচ্ছে, সমগ্র বাসায় শব্দ বলতে এতটুকুই, তবে তার কোন কিছুই মাথায় ঢুকছে না প্রীহার। চোখ দিয়ে অনবরত ঝরছে জল, মাঝে মাঝে শুধু ফুঁপিয়ে উঠছে সে, একটু একটু কেঁপে উঠছে সমগ্র শরীর একটু পর পর।

মানুষের অসীম সংখ্যাক অনুভূতির মাত্র একটা অনুভূতিই ধারন করতে পারছে না প্রীহা ! নিজেকে অনেক অনেক তুচ্ছ মনে হয় তার, এই আমাদেরই এত অহংকার ! আমরা পৃথিবীর সর্বকালের সবচেয়ে অগ্রগামী জাতি, জ্ঞ্যান বিজ্ঞানে চরম শিখরে উঠে বসে আছি আমরা ! অথচ মানুষের একটা মাত্র অনুভূতির কাছেই আমার পরাজিত !

ঘোরের মধ্যে চলে যায় প্রীহা, কাঁপা কাঁপা পদক্ষেপে ড্রায়ারটা খুলে, টান দিয়ে বের করে আনে এটোমিক ব্লাস্টার, ধীরে ধীরে মাথায় তাক করে ভয়ংকর এই আগ্নেয়াস্ত্রটা, টেনে দেয় ট্রিগার, মুহূর্তের মধ্যে মাথার অংশটা উধাও হয়ে যায় প্রীহার, শুধু গলার উপর দিয়ে কতগুলো পোড়া তার ও ঝলসানো আই.সি বের হয়ে ঝুলতে থাকে।

ঐদিক দিয়ে রিপোর্টার বলে চলছে, "গত দুই বছরে আত্মহত্যার হার আশংকাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বেশ কিছু দিন আগে সেন্টাল ইন্টিলিজেন্স এজেন্সী তদন্তে নামে। তাদের রিপোর্টে "দ্যা পেইনি" নামক একটা বিনোদনমূলক সংগঠনকে এর জন্য দায়ী করা হয়। আজ সকালে সেই রিপোর্টের উপর ভিক্তি করে বিজ্ঞান কাউন্সিল "দ্যা পেইনিকে" ব্যান ঘোষনা করে এবং পৃথিবী থেকে অপসারিত মানুষের কোন রকম আবেগ অনুভূতির উপর গবেষণা নিষিদ্ধ ঘোষনা করেছে চিরদিনের জন্য ............ "]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28946441 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28946441 2009-05-05 00:54:58
(কল্প গল্প) --- রোবসেপিয়ান্সের ভালোবাসা তিন মাসে ঘটে যাওয়া তিনটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, প্রথম ঘটনাটা খবরের কাগজের প্রথম পাতায় আসে, তার পরেরটা শেষের পাতার আর শেষের ঘটনাটা কোন পত্রিকাতেই জায়গা পায়নি।

ঘটনা এক : মাস্টার্সের শেষ বর্যের ইংরেজী সাহিত্যের মেধাবী ছাত্রী "পিয়েলা লিয়ান" এটোমিক ব্লাস্টার মাথায় ঠেকিয়ে আত্মহত্যা করে ।

ঘটনা দুই : প্রথম ঘটনার এক মাস পর শীর্ষস্হানীয় রোবট প্রস্তুতকারী কোম্পানী "এ্যাথেনা কপোট্রনস লিমিটেড" এর ল্যাব থেকে সর্বাধুনিক কপোট্রন G9 সিরিজের TPT90 কপোট্রনটি চুরি হয়ে যায়।

ঘটনা তিন : দ্বিতীয় ঘটনার এক মাস পর এ্যাথেনা কপোট্রনস লিমিটেডের এযাবৎ কালের সেরা মেধাবী রোবো সাইন্টিস্ট "রিশান ক্লোষ্টা" কোম্পনীর দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দেয় ।

২.
শহরের প্রাণকেন্দ্রের বিলাসবহুল বাড়ি বিক্রি করে রিশান যখন লোকালয় থেকে বহুদুরের নির্জন টেরাসা লেকের পাড়ে ছোট একটা বাংলো বাড়ি কিনে তখন তার বন্ধুরা বলেছিলো, "তুই কি পাগল হয়ে গেলি ?"

উত্তরে রিশান শুধু বলেছিলো পিছনের সবকিছুকে ভুলে যেতে চাই, একেবারে নতুন করে সাজাতে চাই জীবনকে। আসলে রিশান মিথ্যে কথা বলেছিলো বন্ধুদের, সে আসলে ফেলে আসা অতীতকে নতুন করে আবিষ্কার করতে চায়, জয় করতে চায় অতীতের সব না পাওয়াকে।

নতুন বাংলো ঠিকঠাক মত গুছিয়ে উঠতে এক সপ্তাহের মত লেগে যায় রিশানের, এই একটা সপ্তাহ পাগলের মত কাজ করতে হয়েছে তাকে । একলা হাতে এত বড় বাড়ি গুছানো চাট্টিখানি কথা না, সবচেয়ে বেশি সময় আর পরিশ্রম হয়েছে ল্যাবরেটরীটা সেটাপ করতে । সারাদিন অমানুষিক খাটুনির পর রাতের বেলায় লেকের পাড়ে চাঁদের আলোয় বসে ঝিঁঝিঁপোঁকার ডাক শুনতে শুনতে জোনাকি পোঁকা গুনেছে আর কখনো কখনো সেখানেই নরম ঘাসের উপর ঘুমিয়ে পড়েছে নিজের অজান্তে ।

পরের এক সপ্তাহ কোন কাজ করেনি রিশান, শুধু ব্যস্ত ছিলো খাওয়া, ঘুম আর লেকে মাছ ধরা নিয়ে । তবে তার মস্তিষ্ক থেমে থাকেনি, পুরা সপ্তাহ ধরে সে মনে মনে কর্ম পরিকল্পনা গুছিয়ে নিয়েছে। ছোট বেলা থেকে এই একটা সমস্যা রিশানের , কোন কাজ হুট করে শুরু করতে পারে না পুরা ব্যাপারটা মনে মনে গুছিয়ে নিয়ে তারপর কাজে নামতে হয় তাকে ।

মানুষের অনুভূতি প্রধানত দুই প্রকার, ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য ও ইন্দ্রিয় অগ্রাহ্য । স্পর্শ, দৃষ্টি, ঘ্রাণ, শ্রবন এইগুলা ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য অনুভূতি মধ্যে পড়ে আর ইন্দ্রিয় অগ্রাহ্য অনুভূতিগুলো হলো সুখ, দুঃখ, আনন্দ, ঘৃণা, ভালোবাসা, অভিমান, ভয় ইত্যাদি । এই ব্যাপারটা মাথায় রেখে রিশান তিনটা ভাগে ভাগ করেছে তার প্রজেক্টটা, প্রথম পর্যায়ে সে দৈহিক কাঠামোটা নিয়ে কাজ করবে, দ্বিতীয় ভাগে ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য অনুভূতিগুলো একে একে সংযোগ করবে ও উন্নত করবে তারপর ইন্দ্রিয় অগ্রাহ্য অনুভূতিগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে । শেষের অংশটাই সবচেয়ে কঠিন এবং এর আগে আর কেউ এটা নিয়ে কাজ করেনি, সফল হওয়ার সম্ভাবনাও খুব কম, তবে রিশান দৃঢ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তাকে সফল হতেই হবে ।

৩.
খুব সাবধানে রাবারের আবরনটা ছিঁড়ে ৬-৬-৬ ইঞ্চির প্রায় দুই কেজি ওজনের G9 সিরিজের TPT90 কপোট্রনটি বের করে রিশান, ভয় মিশানো বিস্ময় নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে এটার দিকে, আহঃ ! পৃথিবীর প্রথম মানবিক আবেগ ধারন ক্ষমতা সম্পন্ন কপোট্রনট ! কিছুক্ষণের মধ্যেই নড়েচড়ে উঠে রিশান, নাহঃ ! অনেক কাজ বাকি, আগামি এক সপ্তাহের মধ্যে কাঠামো দাড় করাতেই হবে । একে একে প্যাকেট আর বাক্স খুলে সে বের করে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ।

পরবর্তী সপ্তাহে ল্যাবরেটরি থেকে একবারের জন্যেও বের হয়নি রিশান, কখন সূর্য উঠেছে আর কখন অস্ত গিয়েছে সেই দিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল ছিলো না তার, সারাক্ষণ কেটেছে অপটিকেল ফাইবার, ল্যান্স, ঝিনঝেনিয়ামের তার, স্ক্র ড্রাইভার, রাবার, এই সব নিয়ে । পুরা কাঠামোটা দাড় করানো হয়ে গেলে কিছুক্ষণ স্হির চোখের তাকিয়ে থাকে রিশান, আবার ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে প্রতিটি যন্ত্রাংশের সংযোগস্হল, উচ্চতা, ওজন । পুরো কাঠামোটা তার কাছে প্রযোজনের চেয়ে একটু ছোট মনে হতে থাকে, হঠাৎ রিশান মাথাটা একটু ডানে বামে খুব দ্রুত ঝাকিয়ে দুই হাত একটু উপরে তুলে নিজে নিজে বলতে থাকে, " শান্ত হও রিশান, শান্ত হও, মাথা গরম করার কোন দরকার নেই "

পাঁচ সেকেন্ড পর বড় করে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে আবার প্রথম থেকে মাপজোক শুরু করে রিশান। হিসাব আগের বারের মত ঠিকঠিক মিলে যায় কিন্তু খালি চোখে তার কাছে কাঠামোটা এবারও একটু ছোট মনে হয়। তবে এইবার সে ভুলটা ধরতে পারে, আসলে ইস্পাতের পায়ের কাঠামোর ওপর যখন অর্ধ ইঞ্চি পরিমান কৃত্রিম মাংশপেশী ও তার উপর সংবেদনশীল সিনথেটিক চামড়া লাগানো হবে এবং মাথার খুলির উপর সিল্কের কৃত্রিম চুল লাগানো শেষ হবে তখন কাঠামোটা প্রায় দুই ইঞ্চির মত উঁচু মনে হবে।

অবশেষে ঠিকঠাক মত যখন কাঠামোটা দাড় করানো শেষ হয় ততক্ষণে ক্লান্তির শেষ সীমানায় পৌছে যায় রিশান, উত্তেজনার চোটে গত কয়েক দিন ক্লান্তি টের পায়নি সে একফোঁটাও । আর একটা মাত্র কাজ বাকি প্রথম পর্যায়ের, এখন শুধু ইস্পাতের কংকালের উপর কৃত্রিম মাংশপেশী স্তরে স্তরে বসাতে হবে, তার উপর সংবেদনশীল সিনথেটিক চামড়া লাগালেই কাজ শেষ । তবে এই কাজটা সয়ংসম্পূর্ণভাবে কম্পিউটারই করবে, রিশান শুধু ত্রি-মাত্রিক মডেলটার বিভিন্ন প্যারামিটারগুলো সেট করে দিবে। একটা ৪-৬ ফিট ক্যাপসুলটা বিভিন্ন কেমিকেল ঢেলে পূর্ণকরে তারসাথে কম্পিউটারের সংযোগ দেয় রিসান, সাথে সাথে ক্যাপসুলটার দুই পাশে হাজার খানেক সুঁচ সচল হয়ে উঠে । তারপর খুব যত্ন করে ধীরে ধীরে ক্যাপসুলের মধ্যে ইস্পাতের কংকালটা রেখে বিড়বিড় করে " ঈশ্বর আমার এই স্বপ্নটা তুমি বিফল করে দিওনা " বলেই রিমোট কন্ট্রোল চেপে প্রসেস চালু করে দেয় সে । সাথে সাথে ক্যাপসুলের মধ্যে একটা আলোড়ন শুরু হয়ে যায়, খুব দ্রুতগতিতে নড়াচড়া করতে থাকে সুঁচগুলো সমগ্র কংকাল জুড়ে। সমগ্র টিসু প্লানটেশন প্রসেস শেষ হতে চোদ্দ ঘন্টা সময় লাগবে, তারপর সয়ংক্রিয়ভাবে গলে বের হয়ে আসবে সদ্য সৃষ্ট এই রোবটটা ।

আর পারছিলোনা রিশান, টিসু প্লানটেশন প্রসেস চালু করে টলতে টলতে ল্যাবরেটরি থেকে বের হয়ে বেডরুমে গিয়ে বিছানার উপর সটান পড়ে যায়, টানা বিশ ঘন্টা পর ঘুম ভাংগে তার । ঘুম থেকে উঠে বিছানার উপর চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে থাকে রিশান, বাহির থেকে দেখে বুঝার কোন উপায় নাই যে তার হৃদকম্পন দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে । খুব সন্তর্পনে বিছানা থেকে নেমে কাঁপাকাঁপা পায়ে সে হেটে যায় ল্যাবরেটরির দিকে । ল্যাবরেটরির দরজা খুলার সাথে সাথে তার মুখ দিয়ে অস্ফুট আওয়াজ বের হয়ে আসে "ওহঃ ঈশ্বর ! ওহঃ ঈশ্বর !!"

তার সামনে দাড়িয়ে আছে পিয়েলা লিয়ান ! নিজেকে সংযত রাখতে খুবই কষ্ট হচ্ছিলো রিশানের, কাঁপা কাঁপা হাতে আলতো করে পিয়েলার হাতটা ধরে সে, তারপর আস্তে আস্তে কাধ, গাল, কপালের উপর দিয়ে বুলাতে থাকে, আর দু'চোখ বেরে বয়ে চলছে অঝোর ধারা । শেষ পর্যন্ত নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারায় রিশান, পিয়েলার মাথাটা ওর বুকে চেপে ধরে আকাশের দিকে মুখ করে সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠে সে, যেন তার চিৎকারেই জ্যান্ত হয়ে উঠবে নিথর যন্ত্রমানবি ।


৪.
নেশগ্রস্হের মত সারাদিন কাজ করে যাচ্ছে রিশান, তার মাথায় একটাই চিন্তা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পিয়েলার ঈন্দ্রিয়গুলোকে সক্রিয় করতে হবে। কলিংবেলের শব্দে সংবিৎ ফিরে পায় রিশান, হঠাৎ করে সতর্ক হয়ে যায় সে, হাজারটা চিন্তা তার মাথায় আসতে থাকে, তার খোঁজে কে আসলো এই নির্জন প্রান্তরে ?

দরজায় খুলেই সে দেখে একজন সুদর্শন যুবক মুখের মিটিমিটি হাসি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। রিশান জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালে সে বলে, " স্যার, আপনি কি মিস্টার রিশান ক্লোস্টা ? "

রিশান মাথা নেড়ে সম্মতি দিলে সে বলে, " স্যার, আপনার মাসিক অর্ডার ছিলো আমাদের কোম্পানিতে, আমি সেগুলো ডেলিভারী দিতে এসেছি " ।

চেপে থাকা নিঃশ্বাসটা ছেড়ে ডেলিভারী বয়কে স্টোররুমটা দেখিয়ে রিশান বললো , " এইখানে সব কিছু রেখে যান, আমি রিসিভ লগে সাইন করে দিচ্ছি " । আসলে রিশান কাজের চাপে ভুলেই গিয়েছিলো যে, এই কোম্পানীকে দায়িত্ব দিয়েছিলো তার প্রয়োজনিয় সবকিছু প্রতি মাসের প্রথম তারিখেই পৌছে দেওয়ার জন্য ।

ছেলেটা একটা একটা করে বক্স ভেনগাড়ি থেকে নামিয়ে স্টোররুম পর্যন্ত নিয়ে আসছে আর ফাঁকে ফাঁকে রিশনের সাথে কথা বলছে ।

স্যার কি বাসায় একা থাকেন ?

হুমম ।

এই নির্জন জনবসতিহীন জায়গায় থাকতে ভয় করে না ?

নাহ্ ।

স্যার কি বিয়ে করেছেন ?

এইবার রিশান একটু চটে যায় । চোখেমুখে গম্ভীর ভাব ফুটিয়ে তুলে কঠোরভাবে সে বলে , " আপনি কথা কম বলেন, জলদি কাজ শেষ করে এখান থেকে বিদায় হোন" ।

ছেলেটা এই রকম ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত ছিলো না, কিছুটা থতমত খেয়ে চুপ মেরে যায়, তার পরপরই মুখে হাসি হাসি ভাব ফুটিয়ে তুলে বলে , " স্যার আমার নাম, এনিলি, এখন থেকে প্রতি মাসে আমিই আপনার প্রয়োজনিয়ে জিনিস নিয়ে আসবো।"

রিশান বুঝতে পারে শুধু শুধুই একটু উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিলো, এবার নরম সূরে বলে, " ঠিক আছে, আমি তো একা মানুষ, তাই প্রতিবার আসার আগে আমাকে একটা ফোন করে আসবেন, এই নিন আমার নাম্বার "

যতক্ষণ পর্যন্ত এমিলির ভ্যান চোখের আড়াল হয় ততক্ষণ পর্যন্ত রিশন রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিলো, তারপর বাড়ির চারদিকে একবার আলতো করে চোখ বুলিয়ে দরজা লাগিয়ে সে আবার ল্যাবরেটরিতে ঢুকে যায় ।

৫.
যাক, বিশাল একটা খাটুনির কাজ শেষ হলো, হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো রিশান, এখন সবকিছু ঠিকঠাক মত কাজ করলেই হয় । প্রবল উত্তেজনা আর সীমাহীন আশংকা নিয়ে রিমোটের অন বাটনে চাপ দেয় রিশান। এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড .. পাঁচ সেকেন্ড চলে যায় কোন পরিবর্তন দেখা যায় না পিয়েলার শরীরে । পাঁচ সেকেন্ড রিশানের কাছে মনে হয় পাঁচ যুগ পার হয়ে গেছে ! ছয় সেকেন্ডের মাথায় ধীরে ধীরে চোখের পাতা খোলে পিয়েলা ঠিক যেভাবে ঘুম থেকে জেগে উঠে কোন মানুষ !

খুশিতে শিস্ দিয়ে উঠে রিশান, ছোট ছোট পদক্ষেপে পিয়েলার দিকে এগিয়ে যায় সে আর ভাবলেশহীন চোখে তার চোখের দিকে থাকে পিয়েলা। চমকে উঠে রিশান ! এমন নির্লিপ্ত চোখ ! যে চোখে কোন আবেগ নেই, নেই কোন ভালোবাসা, রাগ, ক্ষোভ, ব্যাথা, আছে শুধু অসীম শুন্য দৃষ্টি । রিশান জানে রোবট পিয়েলার শুধু পঞ্চেইন্দ্রিয় সংযোগ করা হয়েছে এখনও আবেগ যোগ করা হয়নি, তাই তার দৃষ্টি এমনই হওয়ার কথা, কিন্তু তবুও সে চোখ ফিরিয়ে নেয় ।

হঠাৎ হাতের কফির মগটা আস্তে করে পিয়েলার মাথা লক্ষ করে ছুঁড়ে মারে রিশান, আর সাথে সাথে পিয়েলা একেবারে স্বাভাবিক মানুষের মত মাথাটা নিচু করে ছুঁড়ে দেওয়া মগটা এড়িয়ে যায়। খুশিতে নেচে উঠে রিশান, আহঃ, দৃষ্টি একদম ঠিক মত কাজ করছে ।

এবার সোজা এগিয়ে যায় রিশান, আলতো করে একটু ছোঁয় পিয়েলার গালটা, যেন কারেন্টের শক খেয়েছে এমন ভাবে সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠে পিয়েলার। বুকের উপর কান পাতে রিশান, শুনতে পায় ক্রমাগত দ্রত থেকে দ্রুততর হচ্ছে পিয়েলার কৃত্রিম হৃদপিন্ডের গতি । হঠাৎ গতি সঞ্চার হয় রিশানের হাতে, গালের উপর দিয়ে বুলাতে বুলাতে তার হাত চলে যায় ঘাড়ে, সেখান থেকে আস্তে আস্তে চলে যায় পিঠে, তারপর সমগ্র শরীরে । হাত বুলানো অবস্হায় রিশান তিক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে পিয়েলার প্রতিটি কম্পন, কপালের কুঁচকে যাওয়া, চোখের পাতির দ্রুত উঠানামা। শেষে নাভীর উপর যখন তার হাত আসে তখন পিয়েলার কমর দুলে উঠে, পেটটা একটু চেপে ধরে অস্ফূট একটা আওয়াজ করে এক পা পিছনে চলে যায় সে। এইবার নাভীর কাছে বেশ জোরে একটা চিঁমটি কাটে সে, মৃদু চিৎকার দিয়ে লাফিয়ে উঠে পিয়েলা । আনন্দে নেচে উঠে রিশানের মন ! পারফেক্ট ! একে বারে পারফেক্ট মানবীয় অনুভূতি ! পারফেক্ট !

তবে গলার স্বরটা এখনও ঠিক মত ম্যাচ হয়নি, এখনও মনে হয় ফাঁপা কোন পাইপের ভিতর দিয়ে কথা বলছে কেউ । আসল পিয়েলার কন্ঠস্বরের সাথে ঠিকমত সুপারইমপোজ হয়নি, ফ্রিকোয়েন্সিটা টিউন করতে হবে ঠিকমত । আর তর সইছিলোনা রিশানের , সাথে সাথে পিয়েলাকে অফ করে ইস্পাতের করোটির উপর থেকে চুল সরিয়ে কপোট্টনের ভিতর থেকে ভোকাল প্রসেসরটা বের করে কাজে লেগে যায় সে। ঘন্টা খানেকের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় ভোকাল প্রসেসরের রিপেয়ারিং। পাওয়ার অন করতেই চোখ খুলে তাকায় পিয়েলা । রিশান তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, " আমি রিশান, তোমার নাম কি ?"

একজন সাধারন মানুষকে কেউ নাম জিজ্ঞেস করলে সে উত্তর দিতে যতটুকু সময় নেয় পিয়েলা ঠিক ততটুকু সময় নিয়ে বলে , "আমার নাম, জেনারেশন নাইন টি.পি.টি.নাইন জিরো ।

চমকে উঠে রিশান ! অবিকল পিয়েলার কন্ঠস্বর ! বুকের ভিতর কান্নার মেঘ জমা হতে থাকে, অনেক কষ্টের নিজেকে সংযত করে সে বলে, " ঐসব ডাটা মুছে ফেলো, এখন থেকে তোমার নাম 'পিয়েলা লিয়ান' তবে আমি তোমাকে 'পিলি' বলে ডাকবো " এখন বলো তোমার নাম কি ?

সে উত্তর দেয়, "আমার নাম পিয়েলা লিয়ান " ।

ঠিক আছে, তবে বলো "রিশান, আমার নাম পিয়েরা লিয়ান" ।

এইবার সে বলে , "রিশান, আমার নাম পিয়েরা লিয়ান" ।

আবার বলো।

"রিশান, আমার নাম পিয়েরা লিয়ান" ।

আবার বলো ।

"রিশান, আমার নাম পিয়েলা লিয়ান" ।

এইবার সব সংযোমের বাঁধ ভেঙ্গে যায় রিশানের, সে তার পিলিকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠে। তার বাহুডোরে আটকা পড়ে পিয়েরা অনুভূতি শুন্য চোখে এদিক ওদিক তাকাতে থাকে আর ভাবতে থাকে, কি হলো হঠাৎ করে রিশানের ? সে তার কোমল হাত দিয়ে রিশানের পিঠে পরশ বুলাতে থাকে ভাবলেশহীন ।

৬.
এইবার শুরু সবচেয়ে কঠিন পর্যায়, পিয়েরার কপোট্রনে মানবীয় আবেগগুলোকে একে একে প্রবেশ করাতে হবে। এই বিষয়ের উপর অনেক বছর ধরেই গবেষনা হচ্ছে, তবে প্রয়োগ এখন পর্যন্ত শুরু হয়নি, এই প্রায় অসম্ভব কাজটি রিশানকে করতে হবে। মানুষের সবগুলো ইন্দ্রিয় অগ্রাহ্য অনুভূতিগুলোকে পাঁচটি মৌলিক
অনুভূতিতে ভাগ করা যায় আনন্দ, মহত্ত্ব, ভালোবাসা, বিশ্বাস ও মমতা । সবগুলোকে কোপোট্রনে একসাথে প্রবেশ করানো যাবে না, এতে কোপোট্রন বিকল হয়ে যেতে পারে । আবার প্রতিটি মৌলিক অনুভুতি সমীকরনের সমাধানগুলোর ঋনাত্মক মানগুলো ঐ অনুভুতির বিপরীত অনুভুতি নির্দেশ করে। যেমন আনন্দের ঋনাত্মক মানের জন্য যে অনুভুতির জন্ম হয় সেটা হলো বেদনা । তেমনি মহত্ত্ব-ঈর্যা, ভালোবাসা-ঘৃনা, বিশ্বাস-অবিশ্বাস ও মমতা-হিংস্রতা সর্বমোট পাঁচ জোড়া মৌলিক অনুভুতি নিয়ে মনুষত্ব । মানুষের আরও অনেক অনুভুতি আছে যেমন সুখ, রাগ, অনুরাগ, বিষাদ, ভয়, বিরক্তি তবে এইঅনুভুতিগুলো পাঁচটি মৌলিক অনুভুতির যৌগিক অবস্হা। যেমন, ভালোবাসা-বেদনা-অবিশ্বাস এই তিনটি মৌলিক অনুভুতি বিভিন্ন অনুপাতে ক্রিয়াশীল হয়ে তৈরী হয় নতুন অনুভুতি "অনুরাগ", তেমনি মমতা-অবিশ্বাস-ঘৃনা-ঈর্ষা মিলে হয় "বিষন্নতা" । এইসব মানবীয় আবেগ সম্পর্কিত সমীকরন গুলো রিশানের নখদর্পণে, এখন শুধু দরকার সময় আর দরকার একটু ভাগ্য।

আজ পিয়েলাকে প্রথম মৌলিক জোড়া অনুভুতি "আনন্দ-বেদনা" প্রবেশ করাবে রিশান, সে কম্পিউটারে পর্যাপ্ত ডাটা দিয়ে সিমুলেশন করেছে, চমৎকার আউটপুট, এখন বাস্তবে ঠিকঠাক মত কাজ করলেই হয়।

পিয়েলা ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকিয়ে দেখে রিশান হাতে জঘন্য একটা জিনিস নিয়ে মুখটা হাসি হাসি করে দাড়িয়ে আছে । পিয়েলার মুখটা কঞ্চিৎ বিকৃত হয়ে যায়, সে বলে, "রিশান, তোমার হাতে কুৎসিত এই জিনিসটা কি ? "

হঠাৎ একটু দমে যায় রিশান, সে এমন কিছু আশা করেনি, সে জবাবে বলে, "কেন পিলি, এটাতো গোলাপ ফুল ? প্রকৃতির খুব সুন্দর একটা সৃষ্টি ! "

পিয়েলা চিৎকার করে উঠে, " না ! না ! জঘন্য ! নষ্ট করে ফেল এটা , দেখতে ভয়ংকর লাগছে "

এতক্ষণে বুঝতে পারে রিশান কোথায় ভুল হয়েছে । এক নাম্বার মৌলিক অনুভুতির প্রসেসরাটা সে উল্টা করে লাগিয়েছে ।

কিছুক্ষণ পর, ধীরে ধীরে চোখ খুলে পিয়েলা, দেখে তার সামনে হাসি হাসি মুখে দাড়িয়ে আছে রিশান, হাতে ফুল নিয়ে । সে আনন্দে চিৎকার করে উঠে বলে, ওহ ! রিশান, ফুল যে এত সুন্দর তা আমি কখনো অনুভব করিনি, এখন করছি ! ওহ ! আমার যে কেমন লাগছে আমি তোমাকে বলে বুঝাতে পারবো না । এটার নামই কি আনন্দ ! ওহ ! রিশান তুমি কত সুন্দর !

হাতে ধরা ফুলটা তার দিকে তুলে ধরে রিশান বলে " আমার পক্ষ থেকে এই ফুলটা তোমাকে উপহার দিলাম "

একটু কেঁপে উঠে পিয়েলা, আনন্দে তার চোখ দিয়ে পানি চলে আসে, সে আরও একটু এগিয়ে গিয়ে রিশানের বুকে মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে বলে , " ওহ ! রিশান তুমি কত সুন্দর, কত ভালো " তার চোখের পানিতে ভিজে যেতে থাকে রিশানের সার্টের বুকপকেট ।

আর রিশান মনে মনে শুধু আওড়াতে থাকে, " পারফেক্ট ! পারফেক্ট ! "

৭.
লেকের পাড়ে ঘাসের উপর বসে আছে পিয়েলা, তার কোলে মাথা রেখে আকাশের দিকে মুখ করে শুয়ে আছে রিশান, মৃদু হাওয়ায় হালকা উড়ছে পিয়েলার চুল, ওহ! কি অদ্ভুত সুন্দর লাগছে ওকে , ভাবে রিশান। হঠাৎ সে বলে , "পিলি আমি তোমাকে ভালোবাসি, তুমি আমাকে ভালোবাসো না ?"

রিশানের মুখে এ কথা শুনে পিয়েলা হঠাৎ একটু চমকিয়ে উঠে, তারপর শুন্য দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলে , "ভালোবাসা ! এটা কি রকম অনুভুতি ?"

হো হো করে হেসে উঠে রিশান, হাসতে হাসতে সে বলে তোমার কপোট্রনে এখনও "ভালোবাসা-ঘৃনা" এই অনুভূতিটা প্রবেশ করানো হয়নি । প্রবেশ করানোর পর বুঝবে আমার বুকে কেমন হাহাকার ছিলো এতদিন । কেবল মাত্র তখনই বুঝতে পারবে একটুকরো ভালোবাসার জন্য পৃথিবীর ভয়ংকরতম ব্যক্তিটিও দুগ্ধপোষ্য শিশু হয়ে যেতে পারে আবার সবচেয়ে নীতিবান মানুষটিও দুর্ধর্ষতম অপরাধটি করতে পিছপা হয় না ।

হঠাৎ রিশানের মোবাইল ফোনে একটা ভিডিও ম্যাসেজ আসে। ম্যাসেজটা খুলতেই সুন্দর একটা মেয়ের ত্রিমাত্রিক অবয়ব ফুলে উঠে, মেয়েটি বলে, " হ্যালো রিশান, অনেক দিন তোমার কোন খবর নেই কেন ? ভালো থেকো, আর ম্যাসেজ দিও "

মুখটা কঠোর হয়ে যায় পিয়েলা, সে বলে কে এই মেয়ে ?

রিশান হেসে বলে, " আরে তেমন কেউ না, আমর ক্লাসমেট, বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে একসাথে থিসিস করে ছিলাম । "

মুখটা আরও কঠোর করে পিয়েলা বলে, " খরবদার এর সাথে আর কোন দিন যোগাযোগ করবে না ! খবরদার । আর এক্ষনি এই ম্যাসেজ মুছ ! আর ওর নাম্বারটাও মুছ, এক্ষণ "

হা হা করে হেসে রিশান বলে, ঠিক আছে এক্ষণি মুছে ফেলছি, আর কখনো ওর সাথে যোগাযোগ করবো না । আর একটু মুচকি হেসে মনে মনে বলে , " ঈর্ষা ! কি ঈর্ষা !

৮.
আজ রিশানের জীবনে একটা বিশেষ দিন, সকাল থেকেই বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে, আজকে পিয়েলার কোপোট্রনে "ভালোবাসা-ঘৃনা" অনুভুতি প্রবেশ করাবে সে। আজকেই শেষ হবে তার জীবনের সেরা স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথচলা।

পিয়েলার কোপোট্রনের ভিতর থেকে খুব সাবধানে কাঁপাকাঁপা হাতে পাঁচ নাম্বার অনুভুতির প্রসেসরটা বের করে রিশান। তারপর পুরো প্রোগ্রামটা লোড করে আবার ঠিক জায়গা মত ঢুকিয়ে তিন পা পিছনে গিয়ে পাওয়ার সুইচটা অন করে রিশান।

চোখ খুলে তাকিয়ে পিয়েলা দেখে তার সামনে দাড়িয়ে আছে রিশান, তার ভালোবাসার রিশান ! সে আবেশে আবার চোখ বন্ধ করে আবার খুলে, তারপর বলে, " রিশান আমি এখন বুঝি ভালোবাসা কি জিনিস " । আমি মরমে মরমে অনুভব করছি, আমার শরীরের প্রতিটা কোষ অনুভব করছে তোমার জন্য পরম ভালোবাসা। কিন্তু আমি তোমাকে বলে বুঝাতে পারবো না, কেমন এই অনুভুতি।

রিশান পিয়েলার চোখে চোখ রেখে বলে, " পিলি, তোমার বুকে যেমন ভালোবাসার ঝড় বয়ে যাচ্ছে, আমার বুকেও রয়েছে ঠিক তেমন ভালোবাসা তোমার জন্য । আসলে মানুষের এই একটা অনুভুতি যাকে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না । এটা বলে পিয়েলার সামনে হাটু গেড়ে বসে পরে রিশান বললো, " আমাকে শুধু এমন ভালোবাসায় ঘিরে রেখো "

রিশানের মাথায় নিজের গালটা রেখে তার ঘাড়ে পিঠে পরম ভালোবাসায় হাত বুলাতে থাকে পৃথিবীর প্রথম রোবসেপিয়ান্সে পিয়েলা লিয়ান ।

৯.
গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যায় রিশানের। হাত বাড়িয়ে দেখে বিছানায় পিয়েলা নেই। সে ভাবে হয়তো বাতরুমে গিয়েছে। বেশ কিছুক্ষণ পরও সে ফিরে না আসলে রিশান বিছানা থেকে উঠে বাতরুমে উকি দেয়, বাতরুম ফাঁকা ! তাহলে এতরাতে কোথায় গেলো পিয়েলা ?

ঘুরে ঘুরে বসার ঘর, খাবার ঘর সব ঘরে খুঁজতে থাকে রিশান, কিন্তু কোথাও নেই পিয়েলা ! হঠাৎ বারান্দা থেকে একজন পুরুষ মানুষের গলার স্বর শুনে চমকে উঠে রিশান । কান পাতে সে, শুনতে পায় পিয়েলা বলছে, " ওহ! গড ! এত মানুষ ! আমি তো ভাবতাম পৃথিবীতে আমি, তুমি আর রিশান ছাড়া কেউ নেই "

পুরুষ কন্ঠটা বলে, " জ্বি , একদম সত্যি কথা, পৃথিবীতে বর্তমানে চারশত কোটি মানুষ। তুমিতো পড়ে থাক লোকালয় থেকে দুরে নির্জন স্হানে । এখানে জীবন কত আনন্দের ! সিনেমা হল, নাইট ক্লাব, থিম পার্ক , সমুদ্র , আরও কত কি ! "

পিয়েলা বলে, " সমুদ্র কি ? "

তুমি সমুদ্র দেখনি ? ওহ ! রিশান একটা সাইকো, ও তোমাকে পৃথিবীর তাবৎ আনন্দ থেকে দুরে রেখেছে, তোমাদের বাড়ির সামনে যে লেকটা আছে না, সমুদ্র হলো এর থেকে লক্ষগুন বড় জালধার, তুমি এপাড় থেকে ওপাড় দেখতে পাবে না, বিশাল বিশাল ঢেউ তীরে আছড়ে পড়ে বিকট গর্জন করে । তুমি আমার কাছে চলে আসো, তোমাকে আমি সমগ্র পৃথিবী ঘুরিয়ে দেখাব। পিয়েলা, পৃথিবী তোমার ধারনার চেয়েও অনেক অনেক গুন বড় "

পিয়েলা বলে , " ইস্ ! আমার তো এখনই উড়ে চলে আসতে ইচ্ছার করছে "

এবার নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায় রিশানের ক্রোধ, চিৎকার দিয়ে সে বারান্দায় ঢুকে , দেখে পিয়েলা মোবাইলে ভিডিও আলাপ করছে এনিলির সাথে। রাগে গজগজ করতে করতে সে বলে, শেষ পর্যন্ত তোমার এই রুপ পিয়েলা ?

পিয়েলা নিশ্চুপ !

হাত ধরে টেনে হিঁচড়ে তাকে বেডরুমে নিয়ে আসে রিশান, নিজের ওপর কোন নিয়ন্ত্রন নেই তার এই মূহুর্তে, ড্রয়ার থেকে হেচকা টানে বের করে এটোমিক ব্লাস্টার । তাক করে পিয়েলার মাথায় ।

অস্ফুটভাবে পিয়েরা শুধু বলতে থাকে , " প্লিজ ! প্লিজ " ।

চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকে রিশানের, একবার চোখ বন্ধ করে আবার মাথা ঝাকায়, বলে কেন এমন করতে গেলে ? শুধু আমাকে পেয়ে কি সুখী নও ! তাহলে কেন তোমার সমগ্র পৃথিবী চাই ?

বেঈমান, বিশ্বাসঘাতক ... হঠাৎ মাথা চাড়া দিয়ে উঠে প্রচন্ড ক্রোধ টেনে দেয় ট্রিগার, ধ্বংস করে পিয়েলা লিয়ানকে যেমন ভাবে হত্যা করেছিলো সে প্রথম পিয়েলা লিয়ানকে, পার্থক্য শুধু এতটুকুই এইবার আর আত্মহত্যার প্রমান করার জন্য কোন তৎপরতা চালাতে হবে না ।

হো হো করে হেসে উঠে রিশান হঠাৎ করে, সে বুঝতে পারে, ভালোসার ঋনাত্মক আবেগ শুধু ঘৃনা নয় , এর সাথে ছোট একটা মান হিসাবে আছে " বিশ্বাসঘাতকতা", যে মানটাকে খুবই ক্ষুদ্র বলে রিশান বাদ দিয়েছিলো ।

হা হা করে হাসছে রিশান মাটিতে গড়াগড়ি করে, আর চোখ দিয়ে ঝড়ছে ক্রমাগত জল, মানুষ বড়ই অদ্ভুত ! তার চেয়ে বেশি অদ্ভুত তার আবেগগুলো ।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28940241 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28940241 2009-04-20 00:12:49
দেবদূতের বিবাহ নামা ----- ৩

রাত বারটার মত বাজে, একদমই ঘুম আসছে না, শুধু এপাশ ওপাশ করছি আর বউ চাদর গায়ে দিয়ে কুন্ডলি পাকিয়ে আরামে ঘুমাচ্ছে। একবার ইচ্ছা হলো দেই এক ধাক্কা দিয়ে ঘুমটা ভাঙ্গিয়ে, তারপরই ভাবলাম নাহ্, থাক বেচারা আরাম করে ঘুমাচ্ছে তার উপর সারা দিন ঘুরাঘুরি করে বেশ ক্লান্ত। উঠে পা টিপে টিপে গিয়ে ব্যাগ থেকে লেপটপ বের করে বিছানার উপর নিয়ে আসলাম। তারপর মাথার কাছে রেখে চালু করলাম, আর মনে মনে ভাবছিলাম কোন মুভিটা দেখবো। ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরে লেপটপের স্ক্রীনের আলোয় কেমন যেন অন্য রকম একটা আভা ঘরে ছড়িয়ে পড়লো।

বউয়ের ঘুমন্ত মুখের দিকে চোখ পড়তেই বুকের ভিতরটা কেমন চিন চিন করে উঠলো, যেন এমন নিষ্পাপ, কোমল সুন্দর মুখ কতদিন দেখি না ! চাঁদের আলোয় প্রেয়সীর মুখ দেখা নিয়ে হয়তো অনেক সাহিত্য রচনা হয়েছে, কিন্তু লেপটপের আলোয় বউয়ের মুখ দেখা নিয়ে কোন সাহিত্য লেখা হয়েছে কিনা আমার জানা নেই, তবে চাঁদের আলোর চেয়ে কোন অংশে কম সুন্দর নয় এই দৃশ্য তা আমি হলপ করে বলতে পারি।

আর পারলাম না, আস্তে আস্তে তার গালটা একটু ছুঁয়ে দিলাম, কি হলো জানি না, তবে সে হঠাৎ চোখ খুলে তাকালে আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে যাই। আমতা আমতা করে বলি, আসলে ঘুম আসছে না তো, তাই ভাবলাম একটা মুভি দেখি। তার প্রতিক্রিয়া হলো দেখার মত সে বললো, এত রাতে ঢং করতে হবে না সোজা লেপটপ বন্ধ করে ঘুমাও।

আমি মিন মিন করে বললাম ঠিক আছে, তাহলে চলো কিছুক্ষণ গল্প করি , আমার ভালো লাগবে।

উফ্ ! বিরক্ত করবে না তো, অনেক টায়ার্ড , প্লিজ একটু ঘুমাতে দাও।

বুকের ভিতরটা হাহাকার করে উঠলো, বুক চিঁড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসলো, মুহুর্তে আমার সামনে ভেসে উঠলো চার,পাঁচ বছর আগের এক স্মৃতি।

চার বছর আগের কথা তখন ডিসুজের যুগ, ফাটাফাটি অফার, রাত বারটার পর এক কলের টাকায় সারা রাত কথা যাবে শুধু ডিসুজ থেকে ডিসুজে । প্রথম দিনই দুইটা সিম কিনে ফেললাম, অবশ্য দোকানদার কিছু টাকা বেশি নিয়েছিলো মনে হয়। যাক তাকে একটা সিম দিয়ে আমি একটা আমার কাছে রেখে দিলাম। রাত বারটা বাজলেই আমি এইদিকে ডিজুস সিম মোবাইলে ভরতাম আর সেও তার মোবাইলে ডিজুসের সিম ভরতো। তারপর চলতো ঘন্টার পর ঘন্টা কথা। কি কথা বলতাম তা আর এখন বিস্তারিত মনে নেই, তবে কবিতা, গান কোন কিছুই বাদ যেতো না।

আমার খুব প্রিয়া একটা কবিতা, "বিদায় অভিশাপ" রবি ঠাকুরের লেখা, ৭/৮ পৃষ্ঠা, একটানে পড়ে শুনিয়েছিলাম।

এমনি একসময়ের ঘটনা, আমি মোবাইলে কথা বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়েছি, ঐ দিক দিয়ে টিভি চলছে, লাইট অন, মশারি টানাইনি। প্রায় তিন ঘন্টা পরে ঘুম ভেঙ্গের গেলো মশার কামড়ে। এক লাফে বিছানা থেকে উঠে টিভি বন্ধ করলাম , মশারি টানিয়ে লাইট বন্ধ করতে যাবো এমন সময় দেখি বিছার উপরে মোবাইল। হঠাৎ মনে পড়ে গেল যে আমি কথা বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়েছি সাথে সাথে মোবাইল হাতে নিয়ে দেখি এখনও সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি।

আমি ধরে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে সাথে সাথে সে বলে উঠলো, " কি ঘুম ভেঙ্গেছে ? "

আমি থতমত খেয়ে গেলাম ! বললাম, তুমি লাইনটা কাটনি কেন ?

সে বললো, যদি তোমার ঘুম ভেঙ্গে গেলে আমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করে তাই এতক্ষণ কানে মোবাইল হেডফোন লাগিয়ে বসে আছি ।

স্পষ্ট মনে আছে, আবেগে আমার চোখ ভিজে গিয়েছিলো, আমি শুধু একটু ধমক দিয়ে বলেছিলাম, " আর এমন করো না , তোমার না প্রতিদিন সকাল নয়টা থেকে ক্লাস থাকে !"

বিয়ের পর নাকি ছেলেরা বদলে যায়, তাদের আসল চেহার বের হয়ে আসে। আমি বলবো, নারী তোমরাও কম বদলাও না, শুধু তোমাদের মত আমরা অভিযোগ করতে পারি না।

---------------------------------------------------------------------------
দেবদূতের বিবাহ নামা ----- ১

দেবদূতের বিবাহ নামা ----- ২]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28937204 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28937204 2009-04-12 22:44:41
সুরুজ আলী - দ্যা মিরাকুলাস "চুলকানি" অফ সুরুজ আলী
ভ্রু কিঞ্চিৎ কুঁচকাইয়া মাছ বাজারের বাহিরে দাড়াইয়া প্যাক-কাদা মাড়াইয়া ঢুকিবো কি ঢুকিবো না তাহা ভাবিতেছি আর সুরুজ আলী আমার পিছনে বাজারে থলে হাতে দাড়াইয়া আছে, এমন সময় আমার চোখ পাশেই ডালা সাজাইয়া বসা এক শুঁটকিওয়ালার উপর আপতিত হইলো। আমার মন খুশিতে গদগদ হইয়া সুরুজ আলীকে বলিলাম, "অনেক দিন শুটকির খাওয়া হয় না, চল আজকে আয়েশ করিয়া খাইবো "।

সুরুজ আলী তাহার নূরানী বদনখানা কিম্ভুৎকিমাকার করিয়া বলিলো, "ছিঃ, আজকালকার মানুষ আর শুঁটকি খায় নি ?"

তিন চার মাস শহরে থাকিয়া তাহার গায়ের রঙ বেশকিছুটা পরিস্কার হইয়াছে, ভালোমন্দ খাইয়া শরীরে বেশ চিকনাই জমিয়াছে, তাহার এইরকম নাক উচা কথা শুনিয়া মনে মনে বিরক্ত হইলেও আর কিছুই বলিলাম না। বড় বড় চার পাঁচ খানা চ্যাঁপা শুঁটকি নিয়া আনন্দে আটখানা হইয়া বাসায় আসিলাম।

২.

চিৎকার শুনিয়া ঘুম হইতে উঠিয়া দৌড়াইয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া দেখি, মা হতভম্ভ দৃষ্টিতে সুরুজ আলীর ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে পাথরের মত দাড়াইয়া আছে। আমি আর কোন দিকে তাকাইবার ফুসরত পাইলাম না, মায়ের হাত ধরিয়া চেয়ারে বসাইলাম, ইত্যবসরে সুরুজ আলীও আমার পাশে চলিয়া আসিলো। সুরুজ আলীর দিকে চোখ পড়িতেই আমি পিলে চমকাইয়া উঠিলাম, সমগ্র শরীরে লাল লাল ছোট ছোট দানার মত কি যেন হইয়াছে, জায়গায় জায়গায় ফুলিয়া গিয়াছে আর সে রীতিমত গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে ঐসকল জায়গাগুলো চুলকাইতেছে ।

আমি হতভম্ভ হইয়া কিছুক্ষণ তাকাইয়া থাকিয়া পরিশেষে সুধাইলাম, "কি হইতে কি হইয়াছে ?"

তাহাকে খুবই মজার কিছু জিজ্ঞাস করা হইয়াছে এমন ভাব করিয়া মুখের সবগুলো দন্ত বিকশিত করিয়া বলিলো, " শুঁটকি খাইলে আমার খাউজানি হয় "।

আমি বলিলাম, শুঁটকিতে তোর চুলকানি হয় আগে জানতি না ? তাহলে গতকাল খেয়েছিলি কেন ? আজ থেকে তোর শুটকি খাওয়া বন্ধ।

মুখমন্ডলে কৃতিম দুঃখ দুঃখ ভাব ফুটাইয়া ঘাড় কাত করিয়া মৌন সম্মতি জানাইলেও আমার মনে হইলো সে বেশ খুশিই হইয়াছে।


৩.
ছুটির দিন, সপ্তাহ তিনেক পরের ঘটনা, মা শুঁটকি ভাজি করিতেছেন আর আমি পাশে বসিয়া দৈনিকপত্রিকার হেডলাইন পড়িয়া শুনাইতেছি আর শুটকি ভাজির মন মাতানো গন্ধ উপভোগ করিতেছি এমন সময় সুরুজ আলী বাজার নিয়া রান্না ঘরে প্রবেশ করিলো। প্রবেশ করিতে না করিতেই চিৎকার দিয়া রান্না ঘর হইতে বাহির হইয়া গেলো, মা আর আমি সবকিছু ভুলিয়া তাহাকে অনুসরন করিলাম। ততক্ষণে তাহার চিৎকার থামিয়া গিয়াছে কিন্তু নর্তনকুর্দন শরু হইয়া গিয়াছে। সে নাচিতেছে আর শরীর চুলকাইতেছে, শরীর চুলকাইতেছে আর নাচিতেছে, মাথা চুলকাইতেছে পা চুলকাইতেছে , হাত চুলকাইতেছে পাছা চুলকাইতেছে, ঘাড় চুলকাইতেছে পিঠ চুলকাইতেছে, যেখানে হাতে নাগাল পাইতেছে সেখানেই চুলকাইতেছে ।

হতভম্ভ ভাব কাটিয়া যাওয়ার পর আমি দৌড়াইয়া তাহাকে ঝাপটিয়া ধরিয়া পাজাকোলা করিয়া বাতরুমে নিয়া গেলাম। কালক্ষেপন না করিয়া বড় এক বালতি জল তাহার গায়ে ঢালিয়া দিলাম। মা সাথে সাথে গামছা দিয়া তাহার গা মুছিয়া দিলেন, ইত্যবসরে তাহার চুলকানিও থামিয়া গিয়াছে, কিন্তু তাহার চেহারা হয়েছে দেখার মত, শরীরের জায়গায় জায়গায় ফুলিয়া গিয়াছে, জায়গায় জায়গায় চুলকানোর ফলে আচরের সাদা সাদা দাগ বসিয়া গিয়াছে।

কিছুক্ষণ পর সবাই একটু ধাতস্হ হইলে, আমি জিজ্ঞেস করিলাম, "কি ব্যাপার ? কি হইয়াছে ?"

সুরজ আলী আগের মত দন্ত বিকোশিত করিয়া বলিলো, " শুঁটকির গন্ধে আমার বড়ই খাওজানি "


৪.
সুরজ আলীকে লইয়া বাজারে যাইতেছি আর মনে মনে ভাবিতেছি তাহাকে নিয়াতো মাছ ও শুটকির বাজারে যাওয়া যাইবে না তো কি করা যায়।শেষে ভাবিলাম তাহাকে রিকশায় বসাইয়া রাখিয়া যাইবো আর একটু পর পর হাতের বাজার তাহার রিকশায় আনিয়া রাখিবো।

বাজারে পৌছিয়া তাহাকে বলিলাম, তুই এইখানে চুপচাপ বসিয়া থাক আমি বাজার করিয়া আনি।

সে বেশ খুশিই হইলো কিন্তু চেহারায় করুন ভাব ফুটাইয়া তুলিয়া বলিলো, "আইচ্ছা , তয় তাড়াতাড়ি চইলা আইসেন "

বাজার মাত্র অর্ধেক হইয়াছে, আমি ভাবিলাম হাতের ব্যাগগুলো রিকসায় রাখিয়া আসি ।

রিকসার কাছে আসিয়া দেখি সুরুজ আলী তাহার বিখ্যাত চুলকানি শুরু করিয়া দিয়াছে। আমি তাড়াতাড়ি তাহাকে টানিয়া বাজারের পাশে অবস্হিত নলকূপের নিচে ঠেলিয়া দিয়া সমগ্র শরীর ধুইয়া দিলাম। পরিশেষে সুধাইলাম এইখানেতো শুঁটকির কোন গন্ধই নাই তাহলে কিভাবে কি হইলো ?

সে বলিলো, ঐ যে দুরে বাজারের ভিতরে একটা দোকান দেখা যাইতেছে সেখানে বড় বড় শুঁটকি ঝুলাইয়া রাখছে। সে যথারীতি দন্ত বিকোশিত করিয়া বলিলো, "শুঁটকি দর্শনে আমার বড়ই খাওজানি"


৫.

অতঃপর, বাসায় শুঁটকি খাওয়া একেবারেই বন্ধ হইয়া গেলো, সুরুজ আলীকে আর বাজারে যায়তে হয় না, তাহার চুলকানিও আর দেখা যায়না। আমরাও শান্তিতে আছি শুধু আমাকে সাতসাকাল উঠিয়া থলে হাতে সুবোদ ছেলের মত বাজারে যাইতে হয়।

গতসপ্তাহে কোন একটা কাজে সুরুজ আলীকে লইয়া বাহির হইলাম। কাজ শেষ করিয়া বাসায় আসিয়া রিকশা হইতে নামিয়া ভাড়া দিতে গেলে, রিকশাওয়ালা বলিলো, " স্যার দুইডা টাকা বা বাড়াইয়া দেন "

আমি বলিলাম কেন ?

সে উত্তরে বলিলো, " স্যার কি রোদ উঠছে দেখছেন ? এই রোদ্রের মধ্যে রিকশা চালাইয়া শুটকি হইয়া গিয়াছি "

আমি আর কথা না বাড়াইয়া তাহাকে দুইটাকা বাড়াইয়া দিয়া সুরুজ আলীর দিকে ফিরতেই আমার চোক্ষচড়ক গাছ হইয়া গেল ! দেখিতে পাইলাম তাহার চুলকানি শুরু হইয়া গিয়াছে।

কালক্ষেপন না করিয়া কেয়ারটেকারকে বলিলাম, "তাড়াতাড়ি এক বালতি পানি আনিয়া সুরুজের উপরে ঢালিয়া দেন "

কিছুক্ষণ পর চুলকানি কমিয়া গেলে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম এইবার কি হইয়াছে ?

সে বলিলো, রিকশাওয়ালা বেটা কইছে যে, রোদ্রের মধ্যে রিকশা চালাইয়া শুঁটকি হইয়া গেছে .... আসলে আমার শুঁটকি শব্দ শ্রবনে বড়ই খাউজানি ।

আমি ঊর্ধ্বমুখে মুখ তুলিয়া বলিলাম, "আল্লাহ তুমিই আল-হাকিম, সর্বজ্ঞ্যানের অধিকারী, আমি তাহার ভক্ষণ, ঘ্রান গ্রহন, দর্শন বন্ধ করিয়াছি এখন আমি তাহার "শ্রবন" কিভাবে বন্ধ করিবো ???

--------------------------------------------------------------------
সুরুজ আলীর আগের গল্পগুলো ....
২) সুরুজ আলী - লুকিং ফর “পটল” ইন দা শেক্সপীয়ার।

১) সুরুজ আলীর -- এ হালাল জার্নি উইত সুরুজ আলী]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28932385 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28932385 2009-04-01 22:04:41
দেবদূতের বিবাহ নামা ----- ২

এই .. এই .. উঠ.. উঠ ..

উফ্‌ ! শান্তিতে একটু ঘুমাতেও দিবে না ? কি ব্যাপার ! এত সকালে উঠে কি করবো ?

বউ বললো, আজকে না আমাদের "বুকিত তিঙ্গি" যাওয়ার কথা ?

আমি বললাম, যাবো ঠিক আছে ... কিন্তু এত সকালে উঠতে হবে কেন ? আর তুমি আগে উঠ, মুখ হাত ধুয়ে সাজতে বস। তোমার সাজতে সাজতে আমার গোসল, নাস্তা ও রেডি হওয়া সব হয়ে যাবে।

বউ বললো, আমি একদম রেডি এখন শুধু মাত্র মুখ আর চোখের মেকাপ নিবো।

আচ্ছা ঠিক আছে, উঠছি আর পাঁচ মিনিট....... বলে আমি একটা গড়ান দিয়ে অন্যদিকে মুখ করে আরও একচোট ঘুমিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকি।

জীবনে যা করেনি বউ হঠাৎ তাই করে বসলো...... আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে শরীরের সবখানে চিঁমটি শুরু করলো ..... সেই কি বিকট চিঁমটি একেকটা !!! বৃদ্ধাআঙ্গুল আর শাহাদাত আঙ্গুলে নোখ এক করে শরীরের চামড়া আলতো করে ধরে ক্লক ওয়াইজ একটু ঘুরিয়ে দিলেই হলো ..... যত কম চামড়া তত বেশি ব্যাথা <img src=" style="border:0;" /> ..... আর এ্যান্টিক্লক ওয়াইজ ঘুরালে ব্যাথা মাত্রা বৃদ্ধি পায় <img src=" style="border:0;" /> ......

চরম বিরক্তি নিয়ে রাগে গজ গজ করতে করতে আমি ওয়াসরুমে ঢুকলাম। আর বউ বসে গেল বিউটিবক্স নিয়ে ....

দাঁত মেজে, প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে বের হয়ে দেখি তখনও গালে কি যেন লাগাচ্ছে। আমি গামছা নিয়ে আবার ওয়াসরুমে ঢুকে গেলাম গোসল করার জন্য । অনেক সময় নিয়ে খুব আয়েস করে গোসল করে বের হয়ে দেখি গালের সাজ শেষ এখন চোখ নিয়ে বসেছে <img src=" style="border:0;" />

আমি বললাম, নাস্তা করবে না ?

সে বললো, তোমার ক্ষুধা লাগলে খেয়ে নাও আমি একটু পরে আসছি।

কি আর করা !! আমি দুইটা ডিম পোস্‌ করে টেবিলে রেখে কিছুক্ষণ বসে রইলাম । শেষ বিরক্ত হয়ে আবার বেড়রুমে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আর কতক্ষণ লাগবে ?

খুব আহ্লাল করে বউ উত্তর দিলো, এক চোখের মেকাপ শেষ আর এক চোখ বাকি ।

ততক্ষণে আমি বিরক্তির চরমে !! আমি এবার চেপে ধরলাম, জিজ্ঞেস করলাম, কি এত লাগাচ্ছো ? এতক্ষণ লাগে সাজতে ? আচ্ছা বলতো কি কি লাগাচ্ছ ?

আমার প্রশ্ন শুনে মনে হলো সে খুব খুশি হয়েছে .... খুব আয়েস করে তার সাজসজ্জার হাতিয়ার গুলোর বর্নণা দিতে লাগলো। এইটা হলো "মাসকারা" , চোখের এইখানে লাগায় ...... এইটা "আই লাইনার" .... এইটা "আই স্যাডো" এইটা উমুক .... এইটা তুমুক <img src=" style="border:0;" /> .....

একটা বক্সের মধ্যে বিভিন্ন রঙের গুড়াগুড়া কি যেন ছিলো, আমি ঐটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "এইটা কি" ?

ও এইটা ? এইটা উমুক .... চোখের পাতির উপর লাগায় ।

আমি বললাম , শুধু চোখের পাতির উপরেই এতগুলো রঙ <img src=" style="border:0;" /> ???

আমার হতভম্ভ মুখের দিকে তাকিয়ে সে হেসে দিয়ে বললো, "মাল্টি কালারের জামার সাথে ম্যাচ করে চোখের পাতির উপর মাল্টি কালার স্যাড দিতে হবে, না !!!! "

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, "সৃষ্টিকর্তার কি অসীম দয়া , উনি তোমাদের গালের মাঝখানে 'পোখ' নামের অন্য কোন অঙ্গ দেন নাই ..... দিলে না জানি কি হতো , তবে এইটা নিশ্চিৎ আমাদের আজকে আর "বুকিত তিঙ্গি" যাওয়া হতো না "

---------------------------------------------------------------------------
দেবদূতের বিবাহ নামা ----- ১]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28930247 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28930247 2009-03-27 21:22:20
কোথপোকথন !!!! তার সাথে (শেষ পর্ব)

১.
বিয়ের দেড় বছর আগে আমাদের এনগেইজম্যান্ট হয়, বলতে গেলে এই দেড়টা বছর আমার জীবনের সেরা সময় আবার সবচেয়ে খারাপ সময়ও বটে। সারা জীবনে পরিচিত যত মানুষ আছে তাদের সবার কাছ থেকে সবমিলিয়ে যত বকা বা ঝাড়ি খেয়েছি, এই দেড় বছরে একজনের কাছ থেকে তার চেয়ে ঢের বেশি ঝাড়ি খেয়েছি ।
সুদর্শন <img src=" style="border:0;" /> হওয়া সত্যেও আমি তার কাছে "কালা মোটা" .... ঐতিয্যবাহী সমভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের <img src=" style="border:0;" /> ছেলে হয়েও আমি তার কাছে "ছোটলোক" .... শহরে শহরে বড় হওয়া শিক্ষিত ছেলে <img src=" style="border:0;" /> হয়েও আমি তার কাছে "গাঁইয়া ভূত" ..... আর যত যাই হওক না কেন, দোষ সব আমার ।

ভি.ও.আই.পির সুবাদে দেশে কল রেট কম হওয়াতে প্রতিদিনই ২০/২৫ মিনিট করে কথা হতো। এর মধ্যে ৯৫% সময় শুধু ঝগড়া আর ঝাড়ি চলতো <img src=" style="border:0;" /> ...... যেন আমার জীবনের একমাত্র স্বার্থকতা তার ঝাড়ি খাওয়ার মধ্যে।

মাঝে মাঝে ভালো লাগে , কিন্তু অনবরত একই ক্যাচাল কত আর ভালো লাগে ? তাই মাসে দুই এক দিন আমিও বাঘের <img src=" style="border:0;" /> মত গর্জে উঠতাম। এ সময় আমি দুইটা টেকনিক খাটাতাম, তার উপর ।

১ম টেকনিক অনেকটা হোমিও প্যাথিক ট্রিটমেন্টের মত, প্রথমে রোগটা বাড়িয়ে চরম পর্যায়ে নিয়ে যেতাম। এতে সে রাগের মাথায় তর্জন গর্জন শুরু করতো, তার লজিক উল্টা পাল্টা হয়ে যেতো। এক পর্যায়ে যখন রোগটা পেঁকে যেতো, সাথে সাথে সার্জারি করে কেটে ফেলে দিতাম। হা হা হা .... একেবারে ক্রিমিলান বুদ্ধি <img src=" style="border:0;" /> .....

হোমিও প্যাথিক ট্রিটমেন্ট হিসাবে একটা কথাই বলতাম, "আমি জানি আমি কোন ভুল বা অন্যায় করিনি, তার পর আমিও আন্তরিক ভাবে দুঃখিত, আই এম রিয়েলি ভেরি ভেরি সরি" ... এর পরে তার প্রতিক্রিয়া হতো দেখার মতো হা হা হা হা ।

তারপর একটা মোক্ষম সময় বুঝে স্যার্জিকেল ট্রিটমেন্ট হিসাবে বলতাম, "দেখ, আমাদের শুধুমাত্র এনগেইজম্যান্ট হয়েছে, বিয়ে হয়নি, তুমি সামাজিক ভাবে ও আইনত আমার বউ না, তাই তুমি আমার উপর কোন জোর খাটাতে পারো না " .....এর পর সে একেবারে ফুটা বেলুনের মত চুপসে যেত .... আর আমি ফোনটা কেটে দিতাম.....হা হা হা
--------------------------------------------------------------------

২.
বিয়ের দিন সকাল বেলা আমাকে বাসায় একা রেখে মুরুব্বিরা সবাই গেল ওদের বাসায় মেয়ের "কাবিন" আনার জন্য । তার পর ওদের বাসার মুরুব্বিদেরকে নিয়ে আমার মুরুব্বিরা আমার বাসায় আসে আমার "কাবিন" নিতে।

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর ঘুরে ঘুরে সবার সাথে কথা বলছিলাম, শ্যালক শালিকারা খাবার , মিস্টি তুলে তুলে খাওয়াচ্ছিল ...... ঐ দিক দিয়ে আমি অস্হির হয়ে ছিলাম কখন তার সাথে কথা বলবো। এই সময় মনে হচ্ছিলো, শ্যালক শালিকারা আসলেই একটা "শালা" । এমন ভাবে পিছনে লেগে ছিলো, যে কি আর বলবো ..... উফ্ !!!!

অনেক কষ্ট করে একটা বাথরুম ফাঁকা পেয়ে চট করে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। আহঃ, তার পর খুব আয়েস করে তাকে ফোন দিলাম।

হ্যালো , আমার সোনা বউ ?

সে প্রথমেই যে কথাটা বললো ...... "আজ থেকে সামাজিক ভাবে ও আইনত আমি তোমার বউ, তাই এখন থেকে আমি তোমার উপর যে কোন রকম জোর খাটাতে পারি" ...... <img src=" style="border:0;" />

জীবনে নিজেকে এতটা অসহায় মনে হয়নি <img src=" style="border:0;" /> .... বুঝতে পারলাম , নিজ হাতে নিজের স্বাধীনতাকে গলা টিপে ধরেছি ..... এখন থেকে পরাধীনতাই জীবনের ব্রত <img src=" style="border:0;" /> .....

আগে শুধু গানটা শুনতাম, এই বার হাড়ে হাড়ে অনুধাবন করতে পেলাম ,

"আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান
প্রানেরও আশা ছেড়ে সপেছি প্রান"

=============================================

সবাই কে আন্তরিক ভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমার এই সিরিজ পড়া জন্য ও প্রতি পর্বের পরে ব্যাপক উৎসাহ দেওয়া জন্য।

শেষে আমার খুব প্রিয় একটা গান দিলাম সবার জন্য <img src=" style="border:0;" />

জেনে শুনে বিষ করেছি পান
আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান ।।
প্রাণেরও আশা ছেড়ে সপেছি প্রাণ ।।

যতই দেখি তারে ততই দহি
আপনো মনো জ্বালা নিরবে সহি

তবু পারিনে দুরে যেতে, মরিতে আশে
লইবো বুক পেতে অননও বান

জেনে শুনে বিষ করেছি পান
আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান ।।

যতই হাসি দিয়ে দহনও করে
ততই বাড়ে তৃষা প্রেমেরও তরে ।।

প্রেমও অমৃত ধারা যতই যাচি
ততই করে প্রাণে অশনি দ্বান

আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান ।।
প্রাণেরও আশা ছেড়ে সপেছি প্রাণ ।।
আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান ।।

গানটির লিংক

নবম পর্ব]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28907289 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28907289 2009-02-05 23:17:42
দেবদূতের বিবাহ নামা ----- ১
পৃথিবীর সবচেয়ে আরামের পোষাক আমার মতে লুঙ্গি। কি সুন্দর, কোন বোতাম নাই, চেইন লাগানোর ঝামেলা নাই, খালি মাথার উপর দিয়া ছাইড়া কমড়ে একটা গিট দিয়া দিলেই ঝামেলা শেষ। আর কি সুন্দর নিচদিয়া হাওয়া বাতাস ঢুকে। আবার খুলতেও কোন ঝামেলা নাই । বেল্টও পড়তে হয়না। ......

যাই হওক আমার এত সাধের " লুঙ্গি " বিয়ার এক দিনের মাথার ছাড়তে হলো <img src=(" style="border:0;" />...... তার এক কথা, " লুঙ্গি পরা কারও সাথে আমি সংসার করতে পারবো না " <img src=" style="border:0;" />.......

২. খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেই আমি পত্রিকাটা নিয়ে বাতরুমে ঢুকে যাই, তার পর ঘন্টা খানেক সময় নিয়ে পেপার পড়ি আর প্রকৃতির ডাকে সারা দেই। আঃহ !! কমোডের উপর বসে পেপার পড়ার মজাটাই আলাদা .... অসাধারন !!!

আমার কপালে এত সুখ সইলো না <img src=" style="border:0;" /> .... বিয়ার পরের দিনই পেপার নিয়ে বাতরুমে ঢুকার উপর নিষেধাঙ্গা আরোপ করে আমার সাধের বৌ .... তার কথা, বাতরুমে পেপার নিয়ে ঢুকলে পেপার দু্র্গন্ধযুক্ত হয়ে যায় !!!!

আমি বলি, তাহলে শুধু পেপার কেন ? আমার জামা কাপড়, সাবান, ব্রাশ এমন কি আমার শরীরও তো দু্র্গন্ধযুক্ত হতে পারে।

তার এক কথা, "খবরদার , নিষেধ করেছি বাস্ করেছি, পেপার নিয়ে বাতরুমে কোন ঢুকা নাই, এই আমার শেষ কথা " <img src=" style="border:0;" />

৩.
সারা বাড়ি হেটে হেটে দাঁত মাজার মজাই আলাদা .... সময় নিয়ে ঘুরে ঘুরে দাত মাজা, একটু পর পর এসে বেসিনে মুখে জমা ফেনা ফেলে আবার হাটা শুরু করা, উফ! জটিল মজাদার .....

<img src=" style="border:0;" /> ... বৌ এর এক কথা, বাতরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে ২/৩ মিনিটের মধ্যে দাত মেজে তার সামনে হাজিরা দিতে হবে।

বললাম কেন ? কি সমস্যা ?

সে বললো, একজন লোক সারা বাড়ি হেটে হেটে দাত মাজছে !! উফ !! ভয়াবহ !! আমার নাঁড়িভুঁড়ি উল্টিয়ে বমি আসে তোমার এক ছোটলুকি কাজ কারবার দেখলে !!!! আজ থেকে হেটে হেটে দাঁত মাজা একেবারে বন্ধ <img src=" style="border:0;" />]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28896365 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28896365 2009-01-12 11:44:06
সময় যেন থমকে আছে !! " style="border:0;" /> .........

বেশ কিছু দিন ব্লগে অনিয়মিত ছিলাম, মাঝে মাঝে শুধু একটু ঢুঁ মরেই চলে যেতাম ........ এখন একটু ফ্রী হয়েছি, আশা করি আবার নিয়মিত হয়ে যাবো.......

সকাল থেকে একটু পরপর ঘড়ি দেখে যাচ্ছি, মনে হচ্ছে সময় যেন থমকে আছে <img src=" style="border:0;" /> ....... সব ঠিকঠাক থাকলে, আজ রাত বাংলাদেশ টাইম ১২:১০ টায় জিয়া বিমান বন্দরে পা রাখবো ....... ইস !!! দেশের মাটির গন্ধ, কত দিন পাইনা !!!, দেশের বাতাসে কতদিন শ্বাস নেই না !!! কতদিন দেশের বৃষ্টিতে ভিজি না !!!

বিদেশের মাটি, বাতাস, পানি সবই কেন যেন পর পর মনে হয় ........ মা আমি আসছি তোমার আঁচলে ফিরিয়া...........

সবার কাছে দোয়া চাচ্ছি ......
আজকের মধ্যে নিউজিল্যান্ড অল আউট না হলে কালকে খেলা দেখতে পারবো ....... আপনাদের সাথে জয় সেলিব্রেট করতে পারবো ইনশাআল্লাহ .... <img src=" style="border:0;" />]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28857287 http://www.somewhereinblog.net/blog/XRayOfPeaceblog/28857287 2008-10-20 12:19:05