প্রথম পর্বের জন্য এইখানে ক্লিক করুন
প্রথম পর্ব
নতুন অফিসে জয়েন করার দিন-কতক পরই সপ্তাহখানেকের ট্যুরে আমাকে প্রাদেশিক একটা শহরে যেতে হয়েছিল।অফিসে ফিরে দেখি পাশের ডেস্কে এক নয়া কালা-আদমি।পরিচয় পর্বে জানলাম সে কংগো থেকে আসা, স্থানীয়দের ভাষায় “কংগো মান্”।কংগো সহ উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার অনেকদেশের ভাষাই ফরাশি।আমিও ফরাশিতে হালকা বাচ-চিৎ করতে পারি।ফলে অল্পসময়েই মধ্যেই আমি তার “আপনা” লোক হয়ে গেলাম,ভাষাগত ভাতৃত্ত্ববোধ বলে কথা।শুরু থেকেই দেখতেছি সে কম্প্যুটারে কি নিয়ে যেন গুতোগুতি করতেছে। আমাকে জিজ্ঞেস করল ভিরুস্ সফতওয়্যার আছে কিনা।সফত্ওয়্যার ত বুঝলাম “ভিরুস্” জিনিসটা কি!অতকিছু না ভেবে বললাম “নাই”।সে এমন একটা ভংগিতে তাকাইয়া রইল, যেন একটু আগে পরিচিত হওয়া একটা লোক এই রকম জ্বলজ্যন্ত মিথ্যা কেমনে বলে কোন প্রয়োজন ছাড়াই।কিছুক্ষন পর বুঝলাম,আসলে তার সন্দেহ্-ই ঠিক। আপনারও তাই বলবেন।ভিরুস সফতওয়্যার অর্থাৎ anti- virus কার কম্প্যুটারে না থাকে?
আমি ত এ যাত্রায় ত উৎরে গেলাম কিন্তু আমার এক বন্ধু’র কিন্তু এর চেয়ে বড় চিপায় পড়ছিলো।প্রসংক্রমে বলে রাখি,আমার এই বন্ধুটি কিন্তু ইংরেজীতে “তুফান”।“দেশে-বিদেশে” সৈয়দ মুজতবা আলি যেমনটা বলেছেন প্রথম আলফাবেট খানিকটা অতিরিক্ত জোর দিয়ে উচ্চারণ করলে সাহেবি কায়দা আয়ত্ত্ব করা যায়, সে মোটামুটি এইটার কাট-কপি-পেষ্ট ফর্মূলা আপ্লাই করে কথা বলে।এইটা’র অনেক রিওয়ার্ড সে কিন্তু পেয়েছে।তার মালয়েশিয়ান বস তাকে কুয়ালালামপুরে নিতে চেয়েছিলো সে দেশের প্রকৌশলিদের কিছু ইংরেজি জ্ঞান বিতরণ করতে। এরপর সে যখন নাইজারে কাজ করতে যায়, তখন সেখানকার অধিবাসীরা তাকে কখণো ব্রিটিশ কিংবা অস্ট্রেলিয়ান বলে মনে করতো, তার উচ্চারণ গুণে। নাইজারে তার সহকর্মী ছিলো এক তিউনিশিয়ান গাই।তিউনিশিয়ানটা,একদিন কি জানি একটা বিষয় নিয়ে আলাপ করতে গিয়ে বলে, “আই স লটস্ অফ ব্লু দ”।“টুথ” কিংবা “ব্লু-টুথ” নামে শব্দ আছে কিন্তু ব্লু দ? গেল তার নিজের কাছে নিজের মান-সম্মান টা গেলো।শেষপর্যন্ত তিউনিশিয়ানের কাছে ধরা(আমেরিকান, ব্রিটিশ কিংবা অসি হলেও না হয় মানা যায়), যাদের তৃতীয় ভাষা হলো ইংলিশ;জনসংখ্যার ০,৫% বড়জোড় ১% ইংরেজি জানে কিনা সন্দেহ। সে এইখান থেকে মুখরক্ষা করছিলো কিভাবে জানিনা।তবে জানি, “ব্লু দ” আসলে ছিলো ব্লাড্ (blood)।
আমি মানুষটা খানিকটা ধুরন্দর অথবা বলা যায় ধান্দবাজ টাইপের নইলে ,সব প্রজাতির লোকের সাথে বন্ধুত্ত্ব হয় কেমনে! যাইহোক এইখানে এসে আমার একটা বড় প্রাপ্তি বিভিন্ন দেশের মানুষের বন্ধুত্ত্ব ।আন্থনী আমার তাঞ্জানিয়ান বন্ধু।প্রতিটি মানুষ কোন না কোন ভাবে জাতিয়তাবাদি।আমি কিংবা আন্থনিও তার ব্যাতিক্রম নই।তাঞ্জানিয়া নিয়ে তার অনেক গর্ব; আফ্রিকার সর্বোচচ পর্বত “মাউণ্ট কিলিমাঞ্জারো”,সর্ব্ববৃহৎ জল্পপ্রতাত “ভিক্টোরিয়া ফলস্” এবং সেই ভিক্টোরিয়া ফলস্ থেকে নীলনদের উৎপত্তি কিংবা পূর্ব-আফ্রিকা’র দেশগুলোর মধ্যে যে তার দেশ তাঞ্জানিয়া পলিটিক্যালী সবচেয়ে স্ট্যাবল ইত্যাদি এইগুলো সে আমাকে প্রায়ই বলে। একদিন সে আমাকে নিয়ে বের হয়ছে তাদের শহর দেখাবে বলে।দার-এস্-সালাম ভারত মহাসাগরের ঠিক তীরে অবস্থিত বেশ ছিম-ছাম গোছানো শহর। শহরের এসিয়ান (মূলত ইন্ডিয়ান) অধ্যুষিত এলাকা,সমুদ্রের ঠিক পাশ দিয়ে আড়াআড়ি ভাবে বানানো রাস্তা,দার-এস-সালাম বিশ্ববিদ্যালয় দেখানোর পর সে আমাকে নিয়ে গেলো সমুদ্রের ঠিক খাঁড়িতেই অবস্থিত এক জায়গায়।সেদিন আবার ক্যামেরুন-তাঞ্জানিয়া বিশ্বকাপ ২০১০ কোয়ালিফাইং ম্যাচ।চারিদিকে বেশ উত্তেজনা।সে কি যেন বলতে ছিলো, পুরোটা শুনিনি খালি শুনলাম “সিক্লিফ”।আমি মনে মনে ভাবি এই তো চান্দু লাইনে আসছো ।আমরা যেমন দজ্জাল বসকে সিক্লিফের নামে ডজ্ দেই, তুমিও দেখা যাচ্ছে তাই করো।আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম, তুমি দিব্যি সুস্থ-মানুষ গাড়ী ড্রাইভ করতেছে আবার সিক্লিফ চাও কেন?
সে বলল,নো মাই ফ্রেন্ড উই কাম টু সিক্লিফ্? এতোসুন্দর একটা জায়গার নাম সিক্লিফ,এইটা কি ধরনের নাম।আমি তো এই চান্সে অত্র সমাজের কালচারাল স্যান্ডার্ড,পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ইত্যাদি হাই-থট ব্যাপার নিয়ে ব্যাপকভাবে চিন্তিত ও প্রতিবাদি হয়ে উঠলাম। এরমধ্যে চারিদিকে ব্যাপক শোরগোল,মানে তাঞ্জানিয়া ক্যামেরুনকে একটা গোল দিয়েছে।সে গাড়ি থেকে নেমে দৌড়, পিছে পিছে আমি। ভবনটির সামনে গিয়ে সিক্লিফ রহস্য উদ্ঘাঠিত হলো। ঢাকা’র দেয়ালে অনেক সময় যেমন লেখা থাকে, “এইখানে প্রসাব করিবেন না করিলে ৫০ টাকা জরিমানা”।যে যেভাবে পারে পড়ে যায়।সেও আসলেই এক কায়দায় “SEA-CLIFF”-এর উচ্চারণ করেছে “সিক্লিফ”।
শুধু ব্যার্থতা নয়,আমার সাফল্যের গল্পও কিন্তু আছে।আমার ঠিক মুখোমুখি বসে “আবেল”(নামের প্রথম অংশ উচ্চারণ করতে চাপা ব্যাথা হয়ে যায়); নাইজেরিয়ান গাই।কয়েকদিনের ব্যবধানেই আমরা হরিহর আত্মা; কাছাকাছি গাত্র বর্ণ এর অবদান আর কি।আমরা একসাথে লাঞ্চ-এ যাই, উইক-এন্ডে যাই সিনেমা দেখতে অথবা বেড়াইতে (গতসপ্তাহে আমাকে সাকুল্যে ২০$ ব্যয় করে আমাকে “স্পীড-রেসার” নামের একটা মুভি দেখতে হয়েছে,যেটা নরমালী আমাকে কেউ ডিভিডি কিনে দিলেও দেখতাম না!) তার ভাষ্যে আফ্রিকার সবচেয়ে বড় অর্থনীতি নাইজেরিয়া(এটা জেনে আমি বরং খুশিই,পরিচিত ১০-১২ বংগসন্তান নাইজেরিয়া গেছে খেপ্ মারতে;আমারও ভবিষ্যতে ওইখানে খেপ্ জুটতে পারে!) একটা কথা সে প্রায়ই বলে তার ফ্যামিলি,বংশ -আভিজাত্য তাকে “হোয়াইট কিংবা এসিয়ান” মেয়ে বিয়ে করতে দিবেনা, তার নিজেরও কোন ইচ্ছা নাই। সে এতো বেশি বার কথাটা বলতেছে, আমার মনে এখন ঘোর সন্দেহ তার হোয়াইট/এশিয়ান মেয়ে বিয়ে করার ইচ্ছা ষোল-আনা।
সে হিল্লি-দিল্লী করে এশিয়া, ইউরোপ,আমেরিকা,আফ্রিকা’র প্রচুর দেশ ঘুরেছে, বিশাল তার অভিজ্ঞতা।প্রায়ই সে বিভিন্ন শহরের, বিভিন্ন দেশের কথা বলে।সে বক্তা, আমি শ্রোতা;সে বলতে থাকে,আর আমি একপাশ দিয়ে শুনে, আরেকপাশ দিয়ে বের করে দিই(আমি জেলাস্)।এখানে একটু বলে রাখি আরো অনেক হতভাগ্য দেশের মত নাইজেরিয়াতেই ইংরেজি কথ্য ভাষা হিসেবে স্থানীয় ভাষা গুলোকে রিপ্লেস করে দিয়েছে। সেদিনও সেই কোন এক শহরের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ে কি জানি বলতেছিলো, তার বক্তব্য শেষে বল্লাম(ভদ্রতা বলে একটা ব্যাপার আছে ত) এইটা কোন শহর?
“মুস্কাত”
আপনারা এতোক্ষনে অনেক ভাষা জ্ঞান লাভ করছেন, বলেন দেখি এইটা কোন শহর?
বারে বারে তিনবার, এইবার পারছি। "মুস্কাত" আসলে মাসকাট(Muscat), ওমানের রাজধানী।
(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

