আমার প্রিয় পোস্ট

ফ্রম দ্যা হার্ট অফ ডার্কনেস

টেল অফ্‌ থ্রি জোয়েলস্‌

০১ লা আগস্ট, ২০০৮ রাত ১২:২৯

শেয়ারঃ
0 0 0

মৃত শিশু কিংবা কিশোর কিংবা কোন তরুণী শেষ বিচারে একটা সংখ্যায় বটে।বাস-ট্রেণ-লঞ্চ-ফেরি-উড়োজাহাজ দূর্ঘটনা,কিংবা আত্মঘাতী অথবা রিমোট নিয়ন্ত্রিত সাইকেল-গাড়ীবোমা হামলা, রকেট বা মর্টার উত্‌ক্ষেপণ অথবা যুদ্ধবিমান থেকে নিক্ষিপ্ত ক্লাষ্টার বোমা,ট্যাংকের গোলায় নিক্ষিপ্ত হতাহত মানুষদের নাম-ধাম,বিশ্বাস-অবিশ্বাস,পছন্দ-অপছন্দ,সামাজিক স্ট্যাটাস,প্রভাব,প্রতিপত্তি সবকিছু’কে দূরে সরিয়ে তারা হয়ে উঠে কিছু মৃত সংখ্যা।মৃত্যের মধ্য দিয়ে তারা প্রবেশ করে এক চরম সাম্যবাদী সমাজে,যেখানে তাদের পরিচয় কিছু সংখ্যা।আর আমরা যারা বেচে থাকি তার সেই সংখ্যার উপর ভিত্তি করেই আমাদের আবেগ অনূভুতি প্রকাশ করি কিংবা বলা যায় অনুভূতিগূলো প্রকাশিত হয়ে পড়ে।বেশী সংখ্যায় মানুষ মারা গেলে আমরা বেশীমাত্রায় দুঃখিত,সমবেদনাশীল,উত্তেজিত অথবা বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ি।কম সংখ্যায় মারা গেলে,আমাদের সামষ্টিক অনুভবগুলোও সমান মাত্রায় কমে।

মানব মনের গতি-প্রকৃতি বড়ই বিচিত্র,অনিশ্চিত। এই সংখ্যামৃতদের মাঝেও এক-একটি সংখ্যা আমাদের মনে ভীষণ ভাবে দাগ কেটে যায়,স্মৃতিপ্রকোষ্টে চিরদিনের জন্য স্থির হয়ে যায়।যেমনঃ৯ বছরের প্যালেস্টাইনী শিশু হামাদের এই মৃত্য।টিভি পর্দায় দেখছি এই কিশোরের স্ট্রেচারে শোয়ানো নিথর নিস্পন্দ দেহ,মাথায় ব্যান্ডেজ্‌,রক্তমাখা স্যান্ডোগেঞ্জী, ডাক্তারদের উদবিগ্ন মুখ,সাধারণ ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভ আর মা-বোনদের চিরায়ত আহাজারি।এই দৃশ্য যেমন আমার কাছে যেন এক পরাবাস্তব দৃশ্য,যেনবা অনেক আগে দেখা কিন্তু স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করা এক প্যালেষ্টাইনীর সিনেমা’র দ্বিতীয় অধ্যায়,কিশোর ইউসেফকে ইসারাইলী সৈন্যরা যেখানে গুলি করেছিলে আজ থেকে তিন বছর আগে,সেই ইউসেফ যেনবা সেখান থেকে রুপালী পর্দা ছেড়ে ঢুকে গেছে হামাদের লাশ বহনকারি কফিনটাতে,হামদের বুকের পাশে ছোট্ট গর্ত হয়ে যাওয়া দেহটিতে।

চঞ্চলমতি,প্রাণবন্ত,জীবনিশক্তিতে ভরপুর ইউসেফ এমন এক বালক যা’কে আপনি না ভালোবেসে পারবেন না।শৈশব তো এমনি! যুদ্ধবিধস্ত ভূ-খন্ডে তারা সবকিছু’কে অস্বীকার করে জীবনের আনন্দে,পৃথিবীব রুপ-রস আহরণে।
তাদের পরিবার আর দশটি ফিলিস্তিনি পরিবারের মতোই।বাবা ইসরাঈলী জেলে বন্দি ঠিক কি অভিযোগে আমরা জানিনা,হয়তোবা কেউই জানেনা।বড় ভাই ঘরছাড়া; গেরিলা সংগঠনের যোদ্ধা। অধিকৃত গাজা ভূমিতে মা আর বোনের কষ্টোপার্জিত সংসার ।
শৈশবের স্বাভাবিক নিয়মেই ইউসেফ প্রেমে পড়ে এক জিপসী কন্যার,নাম আইদা।যেখানে এক-একদিন বেচে থাকাটাই বিরাট সৌভাগ্যের,যে সমাজে গোত্রে গোত্রে লড়াই চলে মুলত ধর্মীয়,গোষ্ঠিগত পরিচয়ে,সেখানে শিশুদের এই নিস্পাপ প্রেমও
খড়গের কাটায় পরবে তা স্বাভাবিক বটে। জিপসী পরিবারের অনুশাসন আইদা’র হৃদয় স্পন্দনের গতিরোধ করে। চঞ্চল বুদ্ধিমতি আইদা তখন এক গল্প বলে আমাদের।সূদুর দক্ষিণ আমেরিকার কোথাও আছে তার দাদীর হারের তিনটি রত্ন;তাদের মহামুল্য পারিবারিক ধন ।যে উদ্ধার করতে পারবে, তাকেই সে ভালোবাসবে।

স্বপ্নচারী ইউসেফ ঠিক করে যেখানেই হোক যাবে ,তবুও তার সপ্নকে সে সফল করবে।মা,বোনের কাছ থেকে দু-এক টাকা করে জমায় সে,তার ভবিষ্যত অভিযানের জন্য।কিন্ত এইঅতি ক্ষুদ্র সঞ্চয়ে স্বপ্নরাজ্যে যাওয়ার টিকেট মিলেনা।

ইউসেফের বন্ধু’দের বিশাল কমলাবাগান।বন্ধুপিতা বিশাল সওদাগর,বাক্সে ভরে কমলা পাঠায় তামাম দুনিয়ায়।স্বপ্নগ্রস্ত ইউসেফ পেয়ে যায় তার আলাদিনের চেরাগ,সবার অজান্তে সে চেপে বসে কমলার বাক্সে।
হায়রে মানবশিশু!
গাজাতে জারি হয় কার্ফু।মা-বোন-বন্ধু সবাই খুজছে ইউসেফ’কে,কিন্তু ইউসুফ কোথায়!
সবকিছু অবরুদ্ধ।বাণিজ্যিক ভাবনায় ভোররাতে কমলাভর্তি ট্রাকগুলো আনলোড করা হয়,সেই সাথে ইউসেফকে।ভোরের আলোয় প্রথমটায় ঠাহর করতে না পারলেও ,সে ঠিক বুঝে ফেলে কল্পরাজ্যে আপাতত সে পৌছুতে পারেনি।
বাড়ি যাবার ব্যাকুলতায়,মাকে দেখার ব্যাকুলতায় সে পা বাড়ায়।

নির্জন সকালে পুরোপুরি জনশুন্য রাস্তায় হন্তদন্ত হয়ে চলা শিশু’কে সবাই কি ভাববে জানিনা,কিন্তু ইজ্‌রাঈলী সৈন্যরা তাকে “আত্মঘাতীবোমা”ই ভাবে;টহ্লপোষ্ট থেকে ধাবমান শিশুটির দিকে ঘোষনা আসে,তাকে থামতে বলা হয়।হতভম্ব,কল্পনাতারিত ইউসেফ বুঝে উঠতে পারেনা,সে কি করবে? তার চলন বিক্ষিপ্ত হয়ে উঠে,সে দৌড়ে পালাতে চায়।অতঃপরঃ

চলচিত্রের যান্ত্রিক বিষয়াদি আমি বুঝিনা।শুধু দেখি ইজ্‌রাঈলী সৈন্যদের গুলি’র সাথে স্থির হয়ে যায় ইউসেফের ছোট্ট শরীর,স্থির হয়ে যায় অডিটোরিয়ামের সুবিশাল পর্দা,সিনেমার শেষদৃশ্য;সেই সাথে স্থির হয়ে যায় আমার মানবিক বোধ,চেতনা,শিক্ষা,হিংসা,বিদ্বেষ,ক্ষোভ,চিন্তা,দৃষ্টিভংগী,সবকিছু ছাপিয়ে উঠেছিল এক অদ্ভূত ফাঁকা অনুভূতি।

[সেদিন রাতে(২৯শে জুলাই) ইজ্‌রাঈলি সৈন্যদের গুলিতে শহীদ কিশোর হামাদ (নাকি অন্যকোন নামে)মৃতদেহ দেখে আজ থেকে তিনি বছর আগে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দেখা “Tale of three jewels” সিনেমা'টির কথা মনে পড়ে যায়।সেই সময়ে ড্রাফ্‌ট করা]

 

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): চলচ্চিত্র ও অনুভূতি ;
বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ০১ লা আগস্ট, ২০০৮ রাত ২:১৮
ফারহান দাউদ বলেছেন: স্তব্ধ হয়ে থাকি,এরপরেও কিছু পশু গনতন্ত্রের কথা বলে হত্যাতন্ত্র চালাবে।
০১ লা আগস্ট, ২০০৮ রাত ২:৩৫

লেখক বলেছেন: মৃত ব্যাক্তির পিছনের ইতিহাস আমরা যদি দেখতে পেতাম,অনুভব করতে পেতাম;তাইলে জগৎ টা মনে হয় অন্যরকম হতো।
পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

২. ০১ লা আগস্ট, ২০০৮ রাত ২:৪০
ফারহান দাউদ বলেছেন: যারা বুলেটে বুক ফুটো করে তারা ইতিহাস দেখে না তা না,বাট দে ডোন্ট রিয়েলি কেয়ার অ্যাবাউট আস(মাইকেল জ্যাকসনের ভিডিওটার কথা মনে পড়লো)
০১ লা আগস্ট, ২০০৮ রাত ৩:০১

লেখক বলেছেন: মানুষের ইতিহাস তো শুধু রীডিং পড়লে হবে না,এইটা অনুভবও করার ব্যাপার।আবার অনুভব করলেও ব্যাক্তি মানুষ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয়,ধর্মীয়,জাতিগত প্রভাবের বাইরে যেতে পারেনা।
রাষ্ট্র,জাতি,ধর্মের ধারণা একই সংগে প্রয়োজনীয় ,আবার অনেক ক্ষেত্রে তা বিপদজনকও হয়ে উঠে।

৩. ০১ লা আগস্ট, ২০০৮ রাত ৩:২৫
দরদী নজরুল বলেছেন: স্তব্ধ হয়ে থাকি নিজের অক্ষমতার জন্য।
৪. ০১ লা আগস্ট, ২০০৮ সকাল ১০:২৮
রন্টি চৌধুরী বলেছেন: কতক্ষন ঝিম মেরে বসে থাকা আর কদিন মন খারাপ করে থাকার চেয়ে বেশী কিইবা করতে পারি? এতই অসহায়ত্ব।
৫. ০১ লা আগস্ট, ২০০৮ দুপুর ১:৫১
আহসান হাবিব শিমুল বলেছেন: দরদী নজরুল, রন্টি চৌধুরী ধন্যবাদ।

অক্ষম,নপুংসক ক্রোধ; কিছুই করতে পারিনা,শুধু দেখেই যাই,কিংবা বলা যায়,দেখে যেতে বাধ্য হই ।বড্ড নির্মম এই অসহায়ত্ত্বের অনুভূতি।
৬. ০২ রা আগস্ট, ২০০৮ সকাল ১০:৩৩
বিবর্ণ বলেছেন: হায়রে.... মানুষ আমি আমার কেন পশুর মতো মন......
৭. ০২ রা আগস্ট, ২০০৮ বিকাল ৩:৫১
চিকনমিয়া বলেছেন: জেডাতো জ্ঞানী আচো
০২ রা আগস্ট, ২০০৮ বিকাল ৪:০৬

লেখক বলেছেন: লেজেন্ডারী চিকন মিয়া,যাক আমার ব্লগে আপনার পধধূলি'র জন্য ধন্যবাদ।কিন্তু জ্ঞ্যানি'র চেয়ে সংবেদনশীল কিংবা আবেগী শব্দটা মনে হয়,আমার সাথে বেশি যায়।

এইরে,,,,,নিজের ঢোল নিজেই পিটাইলাম।

আপনাকে আবারো ধইন্যাপাতা(কি ঠিক লিখলাম তো)।

৮. ০৩ রা আগস্ট, ২০০৮ বিকাল ৩:৩৩
রিফাত হাসান বলেছেন: সংখ্যা। এবং তার প্রতি আমাদের জাগতিক ভুল-ভাল সুবিধাবাদী মন, শিমুলের মানবিক হতে চাওয়া। আমরা কখন হব?
০৩ রা আগস্ট, ২০০৮ বিকাল ৪:৩১

লেখক বলেছেন: প্রতিটি মানুষ মানবিক আবার একই সাথে অমানবিকও বটে।

"আমাদের জাগতিক ভুল-ভাল সুবিধাবাদী মন" ছোট্ট পরিসরে চমৎকার আত্মবিশ্লষণ।

চমৎকার মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

৯. ০৭ ই আগস্ট, ২০০৮ দুপুর ২:০৮
মন মণষা বলেছেন: আপনার বর্ননায় সিনেমাটির শেষ দৃশ্য চখে ভাসছে। আমি যেন শেষ দৃশ্যের স্তব্ধতা আনুভব করছি। জটিল কাজটি খুব সাবলিল ভাবে এসেছে আপনার লেখায়। আফসোস...আপনার-আমার লেখনি-আনুভূতি অত্যাচারিত ও অত্যাচারীর কাছে পৌছায় না...
০৭ ই আগস্ট, ২০০৮ দুপুর ২:৩৭

লেখক বলেছেন: "আফসোস...আপনার-আমার লেখনি-আনুভূতি অত্যাচারিত ও অত্যাচারীর কাছে পৌছায় না..."

তবুও আমরা লিখে যাই,আমাদের লিখে যেতে হয়,লিখে যেতে হবে।
ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য

১০. ০৮ ই আগস্ট, ২০০৮ বিকাল ৩:৫৮
মেহরাব শাহরিয়ার বলেছেন: :(

ফিলিস্তিনি শিশুগুলোর মৃতদেহ কোলে নিয়া মায়ের গগনবিদারী চিৎকার শুনে কেঁপে উঠতাম , স্ট্রেচারে শোয়ানো বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ভাইটির কপালে বোনটির শেষবারের দেয়া চুমু দেখে কান্না লুকানোর কত ব্যর্থ চেষ্টা করতাম ।

কত পাষাণ হয়ে গেলে এখন এসব খবর এড়িয়ে চলি , ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুটাকেই এখন স্বাভাবিক কেন লাগে ? :( :(
১২. ১২ ই আগস্ট, ২০০৮ রাত ১১:৪০
তৌফিক বিষাদ বলেছেন:
চলচিত্রের যান্ত্রিক বিষয়াদি আমি বুঝিনা।শুধু দেখি ইজ্‌রাঈলী সৈন্যদের গুলি’র সাথে স্থির হয়ে যায় ইউসেফের ছোট্ট শরীর,স্থির হয়ে যায় অডিটোরিয়ামের সুবিশাল পর্দা,সিনেমার শেষদৃশ্য;সেই সাথে স্থির হয়ে যায় আমার মানবিক বোধ,চেতনা,শিক্ষা,হিংসা,বিদ্বেষ,ক্ষোভ,চিন্তা,দৃষ্টিভংগী,সবকিছু ছাপিয়ে উঠেছিল এক অদ্ভূত ফাঁকা অনুভূতি।

অামাদের মনবিক অনুভূতিগুলো কেমন যেন বোঁতা হয়ে গেছে। মানবিকতার এমন দুর্দিনে কেবল আক্ষেপ ছাড়া কিইবি করার অছে।

আপনার প্রকাশ অনেক সাবলিল।

ধন্যবাদ।
১৫ ই আগস্ট, ২০০৮ রাত ২:১৩

লেখক বলেছেন: লেখার মান যেমনই হোক,লিখতে সময় লাগে।ওইভাবে সময় পাইতেছিনা।

১৪. ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ দুপুর ১:৫০
জুবুথুবু বলেছেন: অনেক দিন ব্লগে আসা হয় না, তাই এই অসাধারন লেখাটা পড়া হয়ে উঠেনি। স্যালুট কমরেড।
১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৫:৫৪

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ স্বপনদা।

 

মোট সময় লেগেছে ১.০৭২৪ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
সীমিত কিছু মানুষ ব্যাতিত আমি কিংবা আমরা সবাই এক-একটা বিক্রয়যোগ্য কমোডিটি।
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই