আমার প্রিয় পোস্ট

ফ্রম দ্যা হার্ট অফ ডার্কনেস

৮ই জুন,২০০২ : অতঃপর একটি খুনী বুলেট তাকে অকস্মাৎ থামিয়ে দেয়-১

১৬ ই আগস্ট, ২০০৮ রাত ১০:৪৩

শেয়ারঃ
0 0 0

বারটা ঠিক মনে নেই।কিন্ত তারিখটা স্মৃতিতে এখণো দাউদাউ করে জ্বলছে।
৮ইজুন,২০০২।আগের রাতে হলে হলে ছেলেদের কি রকম একটা জটলা দেখেছি;
ছোটখাটো মিছিলও বা হয়েছিলো কি?সামনেই ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০০২;”ছুটি চাই,খেলা দেখতে দিতে হবে”,”খেলা আর ক্লাস একসাথে চলবে না”-ইত্যাকার স্লোগান কিংবা দাবী যতটা হাস্যকরই শোনাক না কেন,হ্ল কম্পাউন্ডে,স্পোর্টস্‌ রুমে,ডাইনিংয়ে কি ক্যান্টিনে গুণগুণ,ফিসফিস কখনোবা জোরালে স্বরে ভাসছিলো।শুনেছি কোন হলে জানি খুব ছোটখাটো মিটিং হয়ে গেছে;”কালকে গেট আটকানো হবে” সেই মিটিংয়ে বরাবরই সাহসী হিসেবে খ্যাত কিছু ছেলের সিদ্ধান্ত।

ঘুম থেকে কি একটু দেরিতে উঠেছিলাম নাকি ক্লাস ধরার জন্য ঠিক সময়টাতেই!তবে ক্লাসে যে যায়নি,সেটা নিশ্চিতভাবেই জানি।আগের রাতের সিদ্বান্তমতোই মেইন ফটকে সামনে ক্রীড়াপ্রেমী ছাত্ররা অবস্থান নিয়েছে।আর যথারীতি ছাত্রকল্যান পরিচালক সহ ছাত্রপ্রেমী শিক্ষকদের সেই ছাত্রদের বোধ-বুদ্ধি জাগ্রত করার ব্যার্থ চেষ্টা।অতঃপর ছাত্র-শিক্ষক মনোমালিণ্য,এবং কলহ।উপাচার্য মহাশয় নাকি ছাতা হাতে বেয়াড়া ছাত্রদের তাড়া করছিলেন এমনটাও শুনেছিলাম।

সকাল হালকা মতো বৃষ্টি হয়েছিলো কি!না হলে উপাচার্য মহাশয়ের হাতে ছাতা আসে কোথা থেকে।নিত্যাদিনের মতোই মফিজ ভাইয়ের ক্যান্টিনে সেই একঘেঁয়ে ,বিরক্তিকর প্রায় অখাদ্য নাস্তাটা সেরে ফেললাম।ক্যাম্পাসের মেইনগেটে হালকা ঝামেলা হয়েছে;সুতরাং ওইদিকে পা বাড়ানোর কোন মানেই হয়না।এমনিতে ক্লাসে যায় চরম অনাগ্রহে ;শুধুমাত্র ক্লাস এটেন্ডেন্সের কোটা পূরণ করতে,সেইখানে কোন ছুঁতা পেলে তো কথাই নাই।ক্লাস নাই,ক্লাসটেস্ট নাই;সো নো পড়াশোনা।
হাতে এখন অখন্ড অবসর।চাইলে কমনরুমে আনন্দবাজার পত্রিকায় ভারতীয় যৌবনবতী ফিল্মি কন্যাদের দূর্দান্ত ছবি দেখা যায়,টেবিল টেনিস কিংবা ক্যারাম বোর্ডে দুইএকদান খেলাও যেতে পারে।

সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে বন্ধু’র বাড়ী ৩০৪, রশিদ হলের দিকে রওনা দিলাম।উদ্দেশ্য সত্যজিত,ঘটক মৃণাল কিংবা সাব-টাইটেল সহকারে কোন বিদেশী ভাষার ছবি দেখবো।বন্ধু মহলে তখন প্রবল বিক্রমে হলিউড কিংবা বলিউড’কে প্রতিহত করার চেষ্টা ।আর আমি সেই চেষ্টার আপাতত চোখ-কান-নাক বন্ধ করে সমর্থক।

হলগেটে ছাত্রদের বেশ আনাগোনা,বেশ একটা চাঞ্চল্য সবার মাঝে,কেউ কেউ হয়তোবা উত্তেজিত ছিলো,ততোটা খেয়াল করিনাই।ভীড়-ভাট্টা’য় বরাবরই নিরুৎ‌সাহী আমি।সবাইকে পাশ কাটিয়ে উঠে গেলাম তিনতলায়।রুমে আড্ডা চলছিলো,হঠাৎ‌ কে জানি হন্তদন্ত হয়ে খবর দিলো ক্যাম্পাসে গুলি চলেছে।সিড়ি দ্রুত বেগে নামতে নামতে জানা গেলো আরো কিছু তথ্য;আজকে কিসের জানি টেন্ডার ছিলো আর সেই টেন্ডার পেতেই বুয়েট ছাত্রদল-ঢাবি ছাত্রদলের মধ্যে রেষারেষি।তারই জের ধরে এই গোলাগুলি।বুয়েট ছাত্ররা গোলাগুলি’তেও ঢাবি ছাত্রদের সাথে টেক্কা দেয়; এইটা ভেবেও হয়তোবা অনেকের মতো আমিও খানিকটা পুলকিত হয়েছিলাম।

নীচতলার করিডর ধরে আমরা সবাই ছুটছি,উদ্দেশ্য হলগেট ;সেই ছোটখাটো জটলা বেশ বড়সড় একটা ভীড়ে পরিবর্তিত হয়েছে।নিত্যনতুন খবর আসছে।বুয়েট ছাত্রদল নাকি তীতুমীর হলে অবস্থান নিয়ে সেখান থেকে গুলি চালাচ্ছে।আর হলের সামনের রাস্তায়,শহীদ মিনারের আশেপাশে অন্যগ্রুপের অবস্থান।দুই-এক রাউন্ড গুলির শব্দও কি শুনেছিলাম?হঠাৎ‌ খবর এলো,এই গোলাগুলিতে কে জানি মারা গেছে। আমরা একটু ভীত হলাম সেই সংগে একটু বেশী উত্তেজিত,উচ্চকন্ঠ।তবে যেহেতু হতভাগ্যের নাম-পরিচয় জানিনা,তাই আরো অনেক বিচ্ছিন্ন ঘটনার মতোই তা আমাদের মনে তেমন কোন রেখাপাত করলো না;নিহতের নিয়তি ভাগ্যে ইহা লেখা ছিলো,আমরা এমনি করে সান্তনা পেতে চেয়েছিলাম।

অত;পর সেই শব্দজটের মাঝে,হরেক কথার ভীড়ে, বিভিন্ন জনের বিভিন্ন স্কেলের আওয়াজ,চিৎকার ছাপিয়ে নিহতের নাম পরিচয় জানা গেলো।নিহতজন একটি মেয়ে,এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই মেয়ে; কেমিকৌশল বিভাগের লেভেল-টু/টার্ম-২ -এর ছাত্রী সাবেকুন নাহার সনি।সে ক্লাস করতে গিয়েছিলো অন্য যে কোন স্বাভাবিক দিনের মতোই,ফিরেছে লাশ হয়ে।
দুদল খুনীর মাঝখানের শেষ্ঠতের লড়াইয়ে,হঠাৎ একটি বুলেট স্তব্ধ করে দিয়েছে তার হৃদপিন্ডের স্পন্দন,ফুটো করে দিয়েছে ফুসফুস,থেমে গেছে পৃথিবী নামক আজব গ্রহে তার স্বপ্ন যাত্রা।

 

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): জীবন থেকে নেওয়া ;
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই আগস্ট, ২০০৮ রাত ৮:২৭ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ১৬ ই আগস্ট, ২০০৮ রাত ১০:৫৭
অচেনা সৈকত বলেছেন: সনি মারা গেছে আমার সামনে। আমি তখন মেডিক্যালের ইমার্জেন্সিতে।গুলি খাওয়ার পর পর আমার এক বন্ধু ওকে আহসানউল্লাহ হলের সামনে থেকে রিক্সায় তুলে ডিএমসিতে নেয়, আমরাও সাথে যাই। সাদা সালোয়ার কামিজের কোথাও একটুকু রক্ত লেগে ছিলো না, ইন্টারনাল ব্লিডিং এ মারা গেছে ও। গুলিটা লেগেছিল কোমরে।ওকে দেখে মনে হচ্ছিল, ঘুমিয়ে আছে, ডাকলেই উঠে বসবে। তারপর, প্রতিবাদ, দুই দফা হল ভ্যাকেন্ট, আমাদের অনশন, পুলিশের লাঠির বাড়ি, টিয়ারগ্যাস.......এক ঝলকে সব মনে পড়ে গেল আপনার লেখা পড়ে।মুকির কোন বিচার হল না, আর হলেই বা কি, সনিকে তো আর কেউ ফিরিয়ে আনতে পারবে না।
১৬ ই আগস্ট, ২০০৮ রাত ১১:১৪

লেখক বলেছেন: হমম আপনি প্রত্যক্ষদর্শী।আমি অবশ্য সেই সময় রশিদ হলে অবস্থান করছিলাম,মুকির হল(হাহাহাহা)।পরবর্তী ঘটনা নিয়ে একটু লিখেছি,সেটা দ্বীতিয় পোষ্টে দিব।

দীর্ঘপোষ্ট পাঠকের বিরক্তি উদ্রেগ করে অনেক সময়।তাই একসাথে দেয়নি।

মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

২. ১৬ ই আগস্ট, ২০০৮ রাত ১১:২৫
k-79er34b বলেছেন: খুব খারাপ এবং কষ্টকর ঘটনা :(
৩. ১৬ ই আগস্ট, ২০০৮ রাত ১১:৫৬
ছন্নছাড়ার পেন্সিল বলেছেন: আমি যখন ওই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতাম, পাশে সনি আপু'র স্মরণে তৈরি স্মৃতিফলকটা দেখতাম, আমি খুব প্রবল একটা ঢেউয়ের মত শোক টের পেতাম ভেতরে। এরকম মৃত্যু কতটা ভয়ংকর তা যারা দেখেছে তারাই হয়ত জানে!

পোস্টের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ ভাইয়া!
১৭ ই আগস্ট, ২০০৮ রাত ১২:০৩

লেখক বলেছেন: সনির ফলকে একটা কবিতা লেখা আছে।ওর নিজের লেখা,স্মৃতিফলকে লেখা হবে ভেবেই যেন লেখা কবিতাটা

"এই আমি খুব আবেগপ্রবণ
এই আমি খুব জেদি
এই আমি খুব ছেলেমানুষ
এই আমি কিছুটা বাস্তব
এই আমি খুব একা"।


৪. ১৮ ই আগস্ট, ২০০৮ রাত ১২:১২
মেহরাব শাহরিয়ার বলেছেন: বস , ফুটবল বিশ্বকাপ ২০০২ হবে ।

কিছু বলার মত ভাষা নেই
১৮ ই আগস্ট, ২০০৮ রাত ১২:১৮

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ,ঠিক করে নিচ্ছি।অনেক কিছুই ভুলে গেছি।

৫. ১৮ ই আগস্ট, ২০০৮ রাত ১২:১৪
মেহরাব শাহরিয়ার বলেছেন: রশীদ হল , ৩০০৭ ছিল আমার রুম ,২০০৫/০৬/০৭ প্রতি বছর গড়ে ৪/৫ মাস করে থেকেছি ।

২০০৬ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের সংঘর্ষের সময় কি বুয়েটে ছিলেন ?
১৮ ই আগস্ট, ২০০৮ রাত ১২:২৫

লেখক বলেছেন: না,আমরা যতদূর মনে পড়ে ২০০৪-এর মাঝামাঝিতে হল ছেড়েছি(খুবই কষ্ট পেয়েছিলাম)

তবে ২০০৬-এর ফুটবল নিয়ে কীর্তি-কলাপের কথা পত্রিকায় পড়েছি।জুনিয়রদের কাছ থেকেও শুনেছি।
ট্র্যাডিশন কি এতো সহজে ব্রেক করা যায় :)

রশিদ হলের ওই ব্লকে শুধু নীচতলা আর দোতালায় খুব যাতায়াত ছিলো।
তোমার নতুন চাকরি কেমন চলে?

৬. ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ দুপুর ১২:১৯
রোবোট বলেছেন: কপাল। ট্র্যাডিশন কি এতো সহজে ব্রেক করা যায়?

 

মোট সময় লেগেছে ১.০০২৪ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
সীমিত কিছু মানুষ ব্যাতিত আমি কিংবা আমরা সবাই এক-একটা বিক্রয়যোগ্য কমোডিটি।
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই