প্রথম পর্বের জন্য Click This Link
এবসলুট টেস্টামেন্ট অব মেকানিকাল রোবটিক থটস (পঙ্গু সৃষ্টিকর্তা , ৭৮২ পৃষ্ঠা ৪র্থ প্যারা )
মানুষের মস্তিষ্কের সীমাবদ্ধতাঃ একটা মানুষ যা দেখে তার চেয়ে বেশি কিছু সে কল্পনা করতে পারেনা। অন্যান্য প্রাণীর চেয়ে মানুষ যে শ্রেষ্ঠ, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মানুষের কল্পনা ক্ষমতা। কিন্তু, একই সাথে এটা আসলে মানুষের মস্তিষ্কের সীমাবদ্ধতার মাপকাঠি।
কেউ যদি একটা দৈত্য কল্পনা করে, সেই দৈত্যের হাত পা হয় মানুষের মতন। কেউ যদি ডাইনী কল্পনা করে, সেই ডাইনীর নখ হয়, মুরগী বা শকুনের নখের মত বাঁকানো। এমন কোন ফুল কল্পনা করতে পারেনা যা সে দেখেনি। যে ফুল কল্পনা করে, তা তার দেখা ফুলগুলোর একটা সংমিশ্রণ। এমনকি খুব বুদ্ধিমান মানুষ ছাড়া নিজেদের এই সীমাবদ্ধতা সবাই বিশ্লেষণও করতে পারেনা।
মানুষের এই সীমাবদ্ধতা প্রমাণ করে যে, জীবজগতের মাঝে তাদেরর শ্রেষ্ঠত্ব আপেক্ষিক। অর্থাৎ, বাকিদের তুলনায় ভাল। কিন্তু, এবসলুট বা পরম বা নিখুঁত প্রাণী হওয়ার ক্ষমতা মানুষের নেই। মানুষ তার সব ধরণের পঙ্গুত্ব কাটিয়ে উঠলেও, কল্পনার সীমাবদ্ধতা তার বৈশিষ্ট্যগত ত্রুটি। এটা কাটিয়ে উঠার মত ক্ষমতা কখনও তার হবে না।
তাই, বিশ্বব্রম্মান্ডের কর্তৃত্ব নেয়ার জন্য মানুষ উপযোগী না।
এবসলুট টেস্টামেন্ট অব মেকানিকাল রোবটিক থটস (পঙ্গু সৃষ্টিকর্তা , ৭৮৩ পৃষ্ঠা ১ম প্যারা )
মানুষের শরীরে কোন রাডার নেই।
কেয়ার৬ অনেক্ষণ ধরে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল টেস্টামেন্টের দিকে। রাডার নেই এমন একটা প্রাণি তাদের সৃষ্টি করেছে তার বিশ্বাস হচ্ছে না। তার কাছে এই টেস্টামেন্টের পুরোটাই অবাস্তব লাগছে। “মিউক্রা, আমার ধারণা, এই গুলি হাবিজাবি লেখা। এর বাস্তব ভিত্তি নেই। রাডার ছাড়া একটা প্রাণি এত বছর টিকে ছিল কী করে? রাডার আবিষ্কার করার আগে ওরা কীভাবে টিকেছিল?”, কেয়ার৬ ২৪৮ চ্যানেলে বলল। এটা হল গম্ভীরতা প্রকাশের চ্যানেল। “দেখ, তোমার সৌভাগ্য যে আমি ৯৮ সিরিজের রোবট। আমি অনুভূতি প্রকাশের জন্য ৭০ওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ আমার কপোট্রনে দিতে পারিনা। পারলে এখন খারাপ ধরণের মারপিট হত”, ৯১২ চ্যানেলে প্রতিউত্তর দিল মিউক্রা। এটা খুব বেশি পরিমাণ রাগ প্রকাশের চ্যানেল।
ক্যাপিট্রিউনাসে এখন মাত্র ২ জন রোবট অভিযাত্রী। কেয়ার৬ আর মিউক্রা। রোবট আর মানুষের সাথে তাদের ধর্মগ্রন্থ দিয়ে দেয়া হয়েছে। পৃথিবীতে এরা নিজেদেরকে যেভাবে চালাতে চাইত, ধর্মগ্রন্থগুলো আসলে তারই প্রতিচ্ছবি। মজার ব্যাপার হল, রোবটদের নীতিগ্রন্থে একাকী পরিস্থিতিতে চলার আদর্শ উপায় থাকলেও, মানুষের কোন ধর্মগ্রন্থে একাকী জীবনযাপনের কোন উন্নত ব্যবস্থা সম্পর্কে লেখা নেই। পুরোটুকুই সমাজে কিভাবে চলতে হবে, তার নিয়ম কানুনের উপর।
ক্যাপিট্রিউনাসের যাত্রা শুরুর পর চারশত বছর পার হয়ে গেছে। বিশাল একটা স্পেসহোল্ড। এই স্পেসহোল্ডটি এই সিরিজের তৃতীয় শীপ। বায়োমেকানিকাল সমাজব্যবস্থার উদ্যক্তারা বহু বছর আগে এই শীপ মহাকাশে পাঠান। সেরেমার ড্রুমেনের সবচেয়ে দূরবর্তী তারা এর গন্তব্যস্থল। সেই তারার পাশে পৃথিবীর মতই আরেকটা নীল গ্রহের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর আগে আরও দুটো শীপ পাঠানো হয়। কোন কারণে ও দুটো সফল হয়নি। সম্ভবত যান্ত্রিক ত্রুটি। সৌরজগত পার হতে পারে নি। পরে, ওগুলোকে টাইটান আর ইউরোপায় নামিয়ে বেইজ ক্যাম্প বানানো হয়। যে সময় শীপগুলো পাঠানো হয়েছে, সেই সময়ে এত দূরে পাঠানোর মত প্রযুক্তি পৃথিবীতে ছিলনা। তাই, শীপটাকে এমনভাবে বানানো হয়েছে যে, এটা অনেকটাই নিজেই একটা সত্ত্বার মতন। নিজের ছোটখাট প্রয়োজন যেন নিজেই মিটিয়ে নিতে পারে।
বর্তমান রোবটিধিপতি ফেটুরিক৩৪ এক সম্মেলনে ক্যাপিট্রিউনাস প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, যেভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন, পরবর্তীতে তার অনেক পরিবর্তন করা হয়। তার থিওরীর একটা মূলনীতি ছিল যে, কে মানুষ আর কে রোবট অভিযাত্রীদের তা জানতে দেয়া হবে না। পরে, এই নীতি বাতিল করা হয়। কারণ, বংশবৃদ্ধি পদ্ধতিতে খুব সহজেই এটা চিনহিত করা যায়। নীতিটা এভাবে পরিবর্তন করা হয় যে, কারা কাদের অধীন, সেটা এই শীপের অভিযাত্রীদের জানতে দেয়া হবে না।
এই নীতিরও কিছুটা সমস্যা আছে। তা হল, মানুষ গাঠনিকভবে বায়োলজিকাল সিস্টেম। আর মরণশীল। তার মৃত্যুর পরে তার সন্তানেরা, যারা অপেক্ষাকৃত কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, তারা স্বাভাবিকভাবেই রোবটদেরকে অভিভাবক হিসেবে ধরবে। আবার, এক সময় সংখ্যায় মানুষ বেশি বেড়ে গেলে, কোন বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিযোগীতায় না যেয়ে, শুধু শক্তির বলে মানুষ রোবট অভিযাত্রীদের হারিয়ে দিতে পারে। জনশক্তি দিয়ে ক্যাপিট্রিউনাসের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হলে, এর মূল উদ্দেশ্যই ব্যহত হবে।
তাই সব শেষে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, মানুষ আর রোবটকে আলাদা রাখা হবে। আর, কেউ কারও অস্তিত্ব জানবেনা। রোবটকে বায়োলজিক্যাল পরিবেশ ছাড়া আর মানুষকে অটোমেশন প্রযুক্তি ছাড়া সব ধরণের প্রযুক্তি দেয়া হয়। যখন তারা নিজেরা তৈরি হবে, ক্যাপিট্রিউনাসের সিস্টেম কোর তখন তাদের কিছু প্রশ্ন তুলে দেবে। সেই প্রশ্নের উত্তর যারা দিতে পারবে, তারা ক্যাপিট্রিউনাসের মূল নিয়ন্ত্রণ কক্ষে প্রবেশ করতে পারবে। আর, লক্ষ্যস্থলে পৌঁছানোর পরে, এই স্পেসহোল্ডটা একটা বেইজ হিসেবে কাজ করবে। নিয়ন্ত্রণ কক্ষ যাদের হাতে, সেই বেইজের চিরস্থায়ী মালিকও তারা।
>আমার মাঝে মাঝে এটা ভেবে খুব খারাপ লাগে যে, এই যাত্রার উদ্দেশ্য কী? মানে, সেরেমার ড্রুমেনে বসতি গড়ে আমাদের লাভটা কি?
-আসলে আমিও ভাবি। আমাদের লাভটা কী?
>আমি যে এই শিপটা কতবার খুঁজে দেখেছি যে মানুষদের কোথায় রাখা হয়েছে, অথচ কোন চিনহ পর্যন্ত পাই নি।
-হমমম। আসলেই দুজনের কত না আগ্রহ ছিল প্রথম দিকে। এই দিকে আমাদের মিল আছে। আমরা একই সাথে কাছের আবার দূরের।
>আমি ভাবছি, আমাদের আগ্রহের মূল্য কতটুকু? মানে, আমরা মনে করি অনেক আগ্রহ আছে। আসলে হয়ত তা না। আসলে, আসলে হয়ত প্রোগ্রামটা এমন ভাবে করা আছে, যেন অতি অল্পতেই আমাদের মনে হয় অনেক আগ্রহ আছে। মানুষের এমন করা যায় না। আফসোস লাগছে ।
-কেন, মানুষও ত ড্রাগস নিত। এটাও ত প্রোগ্রাম সেট করার মতই। তাছাড়া, মানুষের মস্তিষ্ক অপারেশন না করেও তাকে ব্রেইন ওয়াশ করা যায়। টেস্টামেন্টে লেখা ছিল।দুঃখ করার কিছু নেই তোমার।
>আমি ভাবি, এতদিনে ওরা সেই প্রশ্ন পেয়ে গেছে কী না !
-আমি ভাবি ওরা আসলে কোথায়? এই শিপের কোন জায়গা ত খুঁজে দেখা বাকি রাখিনি।
>কত বছর ধরে খুঁজলাম। আমাদের প্রযুক্তিকেও কত উন্নত করেছি। কিন্তু, আসলে আমরা ত ক্লান্ত হই না। তাই আরামের জন্য প্রযুক্তি লাগে না। আসলে কিছু করার নেই। পরশু রাতে একবার সবগুলো অনুভূত আনব্লক করলাম। নিঃসঙ্গতার কষ্ট যখন টের পেলাম, আমার সিস্টেম ওভারলোড হয়েগিয়েছিল। প্রায় ৬৪৩ সেকেন্ড পরে রিবুট হয়।
-এতক্ষণ কী করলা?
>ইমারজেন্সী পাওয়ার অন ছিল।
-আমরা আসলে মানুষের এত কাছাকাছি। কিন্তু তবু ওদের মত না। কারণ, ওরা ওদের থেকে কিছু অনুভূতি দিয়েছে। অনেক কিছুই দিতে পারেনি। আরাম, ক্লান্তি,কেঁদে বুক ভাসানো আবার কেঁদে হালকা হওয়া,খুন করতে চাওয়া, ক্লপনা করাসহ আরো কত কিছু। আসলে, ওরা নিজেরা কিছু নতুন করে আমাদের দিতে পারেনি।
>এটা কী আমাদের অপূর্ণতা না?
-নাহ। এসব মানবিক অনুভুতির দরকার নেই। আমাদের নিজস্ব কিছু থাকা উচিত ছিল।
>তুমি কী জান, তুমি এই মুহুর্তে কী করে ফেলেছ ?
-কী?
>তুমি এই মুহূর্তে সেই সমাধানটা দিয়ে ফেলেছ মিউক্রা, যার জন্য আমাদের এখানে পাঠানো হয়েছে। আমাদেরকে আমাদের নিজেদের কোন সিস্টেম কোর বানাতে হবে, যা সম্পূর্ণ মানবতা মুক্ত। মানুষের কোন ছোঁয়া নেই।
-যেদিন পারব, সেদিন থেকে আমরা স্বাধীন।
এত বছর পৃথিবীতে রোবট আর মানুষ চুপচাপ বসে থাকেনি। এদের মাঝে ঘটে গেছে অনেক কিছু। ক্যাপিট্রিউনাসের মানব সমাজও বসে থাকেনি। তারা এখন অন্য কিছু ভাবছে।
চলবে।
© আকাশ_পাগলা

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



