
অন্যান্য পর্বের জন্য Click This Link
পর্ব – ২
[একটি গিনিপিগ আর একটা মানুষের বাচ্চাকে পরীক্ষার বিষয়বস্তু হিসেবে নেয়া হয়। এদের বয়স সমান। এদেরকে একই সাথে বড় করা হয়েছে। আর একই ধরণের বাকি সকল ট্রিটমেন্ট। ঘটনা এখানেই শেষ না। মানুষের ঐ বাচ্চাটার একটা জমজ ভাইও ছিল। যাকে আলাদা রাখা হয়। আলাদা পরিবেশে।
আগের পর্বেই আমি এটা পরিষ্কার করেছি যে, আমাদের মানসিকতা দুটো বিষয়ের উপর নির্ভর করে। প্রথমটা হল পরিবেশ আর দ্বিতীয়টা হল বংশানুক্রম।আর আমাদের মানসিকতাই ঠিক করে যে, আমরা কেমন আচরণ করব। সুতরাং, আচরণ এনালাইসিস করে আমরা মানুষের মানসিকতা সম্পরকে ধারণা পাব।
যাই হোক, এদেরকে পাঁচ বছর পর্যন্ত একসাথে বড় করা হয়। পরবর্তীতে ফলাফল হিসেবে দেখা যায় যে, বাচ্চাটা আর গিনিপিগটা একই আচরণ করছে। একই রঙের প্রতি তাদের আগ্রহ। এমন কি আলাদা ভাবে বেশ কিছু বল দিলে তারা একই বল তুলে নিচ্ছে। একই ছবি দেখলে রেগে যায়, একই মুখোশ ভয় পায়। সেই দিক থেকে মানুষের বাচ্চাটার অপর জমজ ভাই বেশ আলাদা। আর তার সাথে তার ভাইয়ের আচরণ মেলে ২০% এরও কম।
এটা মনোবিজ্ঞানীদের কাছে ছিল একটা ব্রেকথ্রু। পরিবেশের কারণে একটা মানুষের সাথে একটা গিনিপিগের আচরণ পর্যন্ত মিলে যায়। অথচ, বংশগতির কারণে তার জমজ ভাইয়ের সাথে তার আচরণ মিলছে না। ]
গত পর্বে মোটামুটি ভাবে আন্দাজ দিয়েছি যে, মানুষের মনের সাথে আচরণের সম্পর্ক আসলে কতটুকু। এখন কেউ সারাজীবন একটা পরিবেশে বড় হল, আমি চাইলেই এখন তার সেই পরিবেশ পরিবর্তন করতে পারব না। তাহলে তার আচরণের মাধ্যমে মন নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা আসলে কতটূকু ! এই সম্পর্কটা একটু কৌণিক দিক থেকে ভাবতে হবে। সেটা হল, আমরা যদি জানি কোন পরিবেশের মানুষরা কোন ধরণের আচরণ করে তাহলে সেই আচরণকে নিয়ন্ত্রণের জন্য আমরা অগ্রীম পদক্ষেপ অর্থাৎ অগ্রীম কোন পরিবেশের ব্যবস্থা করতে পারি। ব্যাপারটা ইকুয়েশনের মত। আপনি তার আচরণ জানলে তার আশেপাশের পরিবেশ বের করতে পারবেন। তার পরিবেশ জানলে তার আচরণ বের করতে পারবেন। কিছু একটা আপনাকে জানতে হবে। তাহলে বাকি ব্যাপারটার উপর আপনি কন্ট্রোল পাবেন। যখনই আচরণের উপর কন্ট্রোল পাবেন, তখনই তার মনের উপরও আপনার কিছুটা কন্ট্রোল চলে আসবে।
এর প্রায়োগিক ব্যাপারটা জটিল না। উদাহরণ হিসেবে খুব স্থূলভাবে বলা যায়, মেয়েটার সাথে দেখা করার জন্য আপনি ফুল নেবেন নাকি চকোলেট, কোনটায় সে খুশি হবে বেশি, এই ধরণের একটা সমীকরণ দিয়ে আপনি কিছুটা আন্দাজ করতে পারবেন। ব্যাপারটা নিশ্চয়ই এত ছোট না, আমি একটা স্থূল উদাহরণ দিলাম। বলতে চাচ্ছি, আপনার যে কোন ডিসিশান (এমন কোন ক্ষেত্রে, যেখানে কোন পক্ষেরই লাভ বা ক্ষতির কোন সম্ভাবনা নেই। লাভ ক্ষতি থাকলে কার আচরণ কী হবে সেটা বের করতে মনস্তত্ত্ব লাগে না। কমনসেন্স লাগে) কার কার উপর কী ধরণের প্রভাব ফেলবে, তার কিছুটা আন্দাজ আপনি করতে পারবেন।
কিছু প্রেডিক্টেবল ক্যাটাগরির ভেতরে মানুষ থাকে। একেক ক্ষেত্রে হয়ত একেক ক্যাটাগরীতে সে থাকবে। মোটামুটি তার একটা কী দুটো ক্যাটাগরি সম্পর্কে জানলেই বাকি ক্ষেত্রে সে কোন পক্ষে থাকবে, তা বলে দেয়া সম্ভব। এর হেরফের মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের কম হয়। অর্থাৎ, ছেলেরা তুলনামূলকভাবে বেশি ক্যাটাগরাইজড। আর, অবশ্যই এটার পিছে বায়োলজিকাল কারণ ২০%, বাকিটুকু পরিবেশ। কারণ, ইউরোপে আমাদের সমীকরণ খাটবে না হয়ত। অথবা, অন্যভাবে খাটবে। কারণ পরিবেশ আলাদা।
একটা ছেলেকে এমন একটা অবস্থার মাঝে আসতে হয় যেখানে সে বড়ও না, আবার ছোটও না। রবীন্দ্রনাথের “ছুটি”র ফটিকের মত অবস্থায় আমাদের সবাইকেই পড়তে হয়। সদ্য গোঁফ গজানো ছেলের মুখে আদো আদো কথা শুনলেও ছ্যাবলামি লাগে আবার বড় বড় কথা শুনলেও পাকামো লাগে। এই স্টেজটা আপনি কীভাবে কাটাবেন, কত দ্রুততায় কাটাবেন সেটা আপনার পরিবেশ নির্ধারণ করবে। একই সাথে এই স্টেজটা ছেলেদের আচরণ তৈরি করে দেয়।
একেকজন একেক ক্ষেত্রে এই স্টেজ কাটাতে একেক সময় নেয়। সর্বোচ্চ সময়কাল হচ্ছে, ক্লাস নাইন থেকে এইচ এস সি পাশ পর্যন্ত। এরপর থেকে আপনি বড়োদের মাঝে জুনিয়র। এই নতুন কৈশরেই একটা ছেলে একোটা ক্যাটাগরীতে ঢুকে পড়ে।
যে কোন ছেলে অর্থাৎ পুরুষকে বুঝার জন্য এই সময়ে একটা ছেলে কী পরিস্থিতে থাকে সেটা বুঝা জরুরি। আমি কোন ইনডিভিজুয়াল ব্যক্তির কথা বলছিনা বরং সার্বিকভাবে এই সময় ছেলেদের মনে কী ধরণের পরিবর্তন আসে, সেটা আপনাকে বুঝতে হবে।
আশেপাশের মানুষদের মাঝে যখন ছেলেটা বিরক্তির উদ্রেক করে, যখন সে কার্টুন নেটওয়ার্ক দেখলেও সমস্যা আবার এইবিও দেখলেও ইতস্তত করে, তখন সে স্বাভাবিক ভাবেই কনফিউজড হয়ে যায়। একই সময় প্রকৃতি একটা নিষ্ঠুর খেলা খেলে, তার চেহারা আর তার গলার স্বর নষ্ট হতে থাকে। মানে, ব্রণ হয় আর গলা ভেঙে মোটা হয়। ফলে তার ছোটদের উপরও সে অধিকার বজায় রাখতে পারে না। ছোটরাও তাকে অবহেলা বা এড়িয়ে চলা শুরু করলে সে পুরোপুরি অসহায় হয়ে যায়।
এটা মানুষের আদিম দুর্বলতা যে, মানুষ সবসময় একটা ব্যালেন্স অবস্থায় চলে আসতে চায়। অমুক ভাল(স্কেল ১০০), তমুক খারাপ(স্কেল ০)। এই যদি হয় আপনার ধারণা, তাহলে আমি আপনাকে এর উলটা কথাটা ২০ বলার পরে, আপনি নিজে থেকে এর পরে বলবেন, অমুক মোটামুটি ভাল (স্কেল ৬০), তমুক মোটামুটি খারাপ (স্কেল ৪০)। দেখা যাবে, আমি আর আপনি দুজনেই এই কথায় একমত হলাম। আমরা একোটা ব্যালেন্সের দিকে আসলাম। কিন্তু সত্যটা কী আসলে পরিবর্তন হয়েছে? সত্যিকারের বাস্তবে কেউ খারাপ (স্কেল ০) থাকলে সে তাই আছে। শুধু আমাদের তর্কের কারণেই সে মোটামুটি খারাপ(স্কেল ৪০) পর্যায়ে উপরে উঠেছে।
(একটা কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, দুইজন বিপরীতবাদীর মধ্যে মতের মিল হওয়াটা সবসময়েই কিন্তু ব্যালেন্সে আসা বুঝায় না। আমার কথা শুনে আপনার ভাল লাগল, আপনি আমার কথা শুনে নিজের ভুল বুঝলেন বা আমার কথার কিছু একটা আপনার কাছে যৌক্তিক লেগেছে। এই কারণেও আমাদের মতের মিল হতে পারে। তাই, আমি আপনাকে বলব না যে, আপনি কারও কথায় মত পরিবর্তন করবেন না, বা একরোখা হয়ে যান। সেটা আরও বড় ভুল। বরং আপনাকেই বুঝতে হবে যে, আপনি কী ব্যলেন্সে আসার জন্য নাকি সত্যিই আমার কথা বুঝে আপনার কথা পরিবর্তন করছেন !! সিদ্ধান্ত আপনার। আমি শুধু রাস্তা দেখালাম। ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করি, কে কি বলল, সেটা খুব মনোযোগ দিয়ে শোনাই ভাল। এরপর নিজের থেকেই সিদ্ধান্ত পাবেন আপনি। শুধু সাবধান থাকেন, ব্যালান্সে আসার দুর্বলতা দিয়ে কেউ যেন আপনাকে দলে টানতে না পারে, আপনাকে দলে টানার জন্য যেন তাকে যথেষ্ট যুক্তি দাঁড় করাতে হয়। যুক্তির সামনে আবার গোঁ ধরে থাকবেন না।)
এই ব্যাপারটা বুঝলে, এটা কেন বুঝিয়েছি সেটা বলার পর পুরো জিনসটা আপনার কাছে খুব দ্রুত পরিষ্কার হয়ে যাবে। অতক্ষণ যেই কনফিউজড ছেলের কথা বলেছি, সেও আপ্রাণ চেষ্টা করে একটা ব্যালান্স অবস্থায় আসার জন্য। এমন কিছু যা সে খারাপ জানত, এখন চোখের সামনে সেটা হতে দেখলে, সেটাকে ভাল ভাবতে শিখবে সে। অন্য কারও কাছে না, বরং নিজেকে সে নিজেই বোঝাবে।
ব্যাপারটা স্থূল উদাহরণ দিয়ে পরিষ্কার করি। একটা ছেলে জানে তার ঘুষ খাওয়া খারাপ। এই স্টেজে উঠে সে বুঝতে পারল যে, তার বাবাই ঘুষ খায়। এখন সে কী করবে! তখন, সে নিজেকেই নিজে বোঝাবে। নিজেকেই নিজে বোঝাবে যে, “এই দেশে আসলে ঘুষ না খেলে কিছুই হয় না, ঘুষ খাওয়াটা খারাপ না, সরকারী বেতন এত কম দেয় যে, পেটই চলে না, সবাই ত ঘুষ খায়, ব্লা ব্লা ব্লা।” সে তখন নিজেকেই বোঝাবে যে তার বাবা লোকটা খারাপ না মোটেও। তখন সে তার বন্ধুদের কাছে যাবে, আর হঠাৎ করেই এই টপিক নিয়ে আলোচনা শুরু করবে। বাকিদেরকে নিজের এই নতুন মতবাদ বোঝানোর চেষ্টা করবে। কেউ কেউ একমত হবে না। বেশিরভাগই ব্যালেন্সে আসার থিওরী অনুযায়ী মোটামুটি ভাবে কোন একটা পর্যায়ে এসে এরা একমত হবে। ধরা যাক, সেই ব্যালেন্স পর্যায়টা হল, যারা ঘুষ খায়, সবাই খারাপ না। যাদের সরকার বেতন দেয় কম, তাদের এসবের অধিকার আছে। এখন কম বেতন বলতে কতটুকু তা ছেলেটার কাছে নির্ভর করবে তার বাবার মূল বেতনের উপর। ধরা যাক, কোন কারণে সেই ছেলেটা তাও একমত হতে পারল না, ততক্ষণ সে নতুন নতুন ছেলেদের সাথে এই বিষয়ে কথা বলবে যতক্ষণ না তার মন ঠান্ডা হচ্ছে, অর্থাৎ কেউ না কেউ তার সাথে একমত হচ্ছে।
এখানে খেয়াল করেন, ছেলেটা নতুন কিছু ছেলের সাথে কথা বলতে গেল। তাদের মতের মিল হলে তাদের সখ্যতা বাড়বে। এভাবে, একেক বিষয়ে ছেলেটার সাথে যাদের যাদের মিলে যায়, তাদের সাথে তার সখ্যতা আরও বাড়তে থাকবে। এভাবে, তার একটা নির্দিষ্ট ক্যাটাগরির ফ্রেন্ড জুটে যাবে। সে নিজেও সেই ক্যাটাগরিতে ঢুকবে।
ক্যাটাগরি ছাড়াও আপপকনার অবশ্যই অনেক বন্ধু আছে। সেটা হল, পরিস্থিতি। একটা ছেলে অনেক জায়গায় যায়, অনেকের সাথে মেশে, অনেকের সাথে খাতির। ধরা যাক, প্রতিদিন একসাথে যাওয়া আসা করে, ফলে মতামত আলাদা হলেও খাতির হবেই। বিপদে বাঁচালাম, মতামত আলাদা হলেও খাতির হবেই। অথবা, কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে অনেক মিলে গেল, তাহলে নিজেদের মাঝে অন্য টপিক এড়িয়ে এরা এই খুব ভাল বন্ধু হয়ে পড়বে। কিন্তু, মূলত আপনার গ্রুপ ফ্রেন্ড বা আপনার মূল আচরণ আসলে টের ক্যাটাগরির ফ্রেন্ডদের দেখে।
যাহোক, আচ্ছা যদি দেখ গেল, ওই ছেলে যে তার বাবার কাজকে মোটামুটি স্বীকৃতি দিল, কয়দিন পরে দেখল তার বাবাকে পুলিশ ধরে নিল। আর পরিবার ও আত্মীয়স্বজন বলাবলি করল, ব্যাপারটা ঠিকই আছে। তাহলে ওর মাথায় কী ঘুরবে? বা, ও কী ভাবে চিন্তা করবে?
(এই বিষয় নিইয়ে সামনের পর্বেও আরও আলোচনা করব। পোস্ট আরও বড় করছিনা, শেষের প্রশ্নটা আপনাদের জন্য। দেখা যাক, আপনারা কতটুকু আত্মস্থ করলেন! আমি সামনের পর্বে এই ব্যাপারটাও আলোচনা করব।)
© আকাশ_পাগলা
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই অক্টোবর, ২০০৯ রাত ১১:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


