
আগের পর্বগুলোর জন্য Click This Link
পর্ব – ৪
[১৯৮০ সালে একটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটা ভাল সাবজেক্টে এক ব্যাচে ৪০ জন পাশ করল। সবার রেজাল্ট মোটামুটি ভাল। আমাদের দেশের পরিস্থিতিতে চট করে চাকরী পাওয়া যায় না। এরা কিছুদিন ঘোরাঘুরি করল। অনেক জায়গায় সিভি দিল। বিসিএস পরীক্ষা দিল। দেখা গেল, এদের মাঝে অধিকতর যোগ্য ২০ জন বিসিএস পরীক্ষায় টিকে গেল। অফিসার হিসেবে জয়েন করার জন্য এপয়েন্টমেন্ট লেটার পেল। সে সময় সোনালী ব্যংকে লোক নিল। সেবার প্রচুর লোক নিল। ৩৫ জনেরই সুযোগ হল। কিন্তু যারা অলরেডি চাকরী পেয়ে গেছে, তাদেরকে চলে যেতে বলা হল, কারণ দুটো চাকরী দিয়ে কারও লাভ নেই। ২০ জন ফেরত আসল। ফলে বাকি ৫ জনেরও সুযোগ হল।
এখন, ২০০৯ সালে সেই বিসিএস ক্যাডার ২০ জন বেতন পায় ৩০ হাজার। আর, সোনালী ব্যাংকে ঢুকা ২০ জন বেতন পায় ৫০ হাজার।
বিসিএস ক্যাডার এই “এক সময়ের অধিকতর যোগ্য” ২০ জন , বাকি ২০ জনকে এখন কী চোখে দেখে ? এদের কারও কী কোন “দোষ” আছে?
প্রশ্নটা আপনার জন্য, উত্তরটা আপনার হাতে রাখেন।]
মানুষ যেভাবে চিন্তা করে, যেসব চিন্তা করে, সেটাই তার মানসিকতা। আমরা আমাদের চিন্তা থেকে আচরণ করি, একই সাথে আমাদের চিন্তা থেকে আমরা যুক্তি বের করি, একে অপরকে যুক্তি দেই। এই পর্বের বিষয়বস্তু এটাই। আমাদের মানসিক ব্যাপারগুলাতে যুক্তি আসলে খুব কম গুরুত্বপূর্ণ। বলতে গেলে একেবারেই কম। গাণিতিক কিংবা বস্তুগত ব্যাপার ছাড়া আমরা যেসব যুক্তি দেই, তাতে আমাদের মানসিকতার যথেষ্ট ছাপ পড়ে। ফলে, পুরো যুক্তির ব্যাপারটাই ভিত্তিহীন।
এই সময়ের হট টপিকগুলো নিয়ে পক্ষবিপক্ষের মানুষগুলোর মনস্তত্ব ভাবলে ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হবে। মানসিকতায় পরিবেশের প্রভাব স্পষ্ট , তাই মানসিক ছাপ সম্বলিত যুক্তিগুলোতেও পরিবেশের কিছু প্রভাব আছে। ধরেন, আস্তিক নাস্তিক বিতর্ক। এখানে যারা বিতর্ক করছেন, তাদের খেয়াল করেন। নাস্তিকের যুক্তি শুধু অন্যান্য নাস্তিকদেরই মনে ধরছে। একই কথা, আস্তিকদের বেলাতেও। একটা যুক্তি যদি, ১+১=২ হয়, সেটা মানসিকতা নিরপেক্ষ যুক্তি। আর এই যুক্তি আমার কিংবা আপনার মাথাতেও আসবে। কিন্তু, যখনই যুক্তিটাতে মানসিকতার ছাপ পড়বে, আপনার মাথায় সেটা আসলে আমার মাথায় তা আসবে না। আর, আমাদের কথার ৯৮% এরও বেশি যুক্তি মানসিকতার ছাপ যুক্ত। কারণ বাস্তবের কোন কথায় গাণিতিক যুক্তি লাগে না। দেখেন, আস্তিকের যুক্তিগুলো কখনও নাস্তিকের মাথাতেই আসে না যে সে কী বলতে চায়, একই ভাবে নাস্তিকের পয়েন্ট গুলো নাস্তিক সবার সামনে তুলে না ধরলে আস্তিকও সেটা আগে ভাবে নাই। অথবা, কারও মাথায় আসলেও তার নিজেকে বুঝানোর জন্য বিপরীত যুক্তি নিজের কাছেই ছিল।
তাহলে, এই সব যুক্তি দেয়ার ভূমিকা কী? এই প্রশ্নের উত্তর বুঝতে পারলে, আপনি বুঝতে পারবেন যে, যুক্তির ভূমিকা না থাকলে মানুষ অপরের যুক্তির কথা শুনে দল পরিবর্তন করে কেন !! আমি ব্যাখ্যা করছি।
আমরা যুক্তি দেই কেন ! নিজেকেই সন্তুষ্ট করতে। নিজেরটাই ঠিক, এটা মানুষকে পারতপক্ষে নিজেকেই বুঝাতে। এমনকি বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে গাণিতিক যুক্তির বেলাতেও একজন বিজ্ঞানী নিজের থিওরীর পক্ষ টানেন। মানুষ আদিম কাল থেকেই নিজেকে অনেকের সাথে সেইফ মনে করে। তাই সে মানুষকে দলে টানে। তাই, অন্য মানুষ যখন তার পক্ষে মতামত দেয়, তখন সে আশ্বস্ত হয়। আমরা যুক্তি দেই সে কারণেই, পারতপক্ষে নিজের অথবা নিজের পক্ষের লোকদের মনকে সন্তুষ্ট করতে, আশ্বস্ত করতে। এই লেখার আগের পর্বগুলো সহ এই পর্যন্ত যদি আপনি ঠিকভাবে আত্মস্থ করেন, তাহলে নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝে গেছেন যে, মানুষ দল কেন পরিবর্তন করে! মানুষ দল পরিবর্তন করে আশ্বস্ত হওয়ার জন্য।
নাস্তিক তার পক্ষের যুক্তি দেয়, নিজেকেই অবচেতন ভাবে বোঝায় যে, আমি যা করছি ঠিক করছি, আমার কোন ভয় নেই। একই ভাবে আস্তিকও তাই করে। সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহে আশ্বস্ত হবার জন্য। এখানে যারা ব্যতিক্রম তাদের ব্যাপারটা কী! এখানে ব্যতিক্রম মানে, কেউ ঝগড়া করে, কেউ করে না। আসলে মনে মনে সবাই নিজের দলের যুক্তি বিশ্বাস করে।এর আরেকটা কারণ হল ক্যাটাগরীর মিশেল। দুই ক্যাটাগরীর লোকজন ভাল বন্ধু হলে এদের সাথে ঝগড়া করবেন না। এটাই স্বাভাবিক।
মজার ব্যাপার হল, এই আশ্বস্ত হবার থিওরীটা আপনি সব হট টপিকেই দেখবেন। যেখানে সরাসরি দেখবেন না, সেখানে একটু পিছন থেকে শুরু করলেই সূত্র পেয়ে যাবেন। যেমন, প্রাইভেট-পাবলিক ভার্সিটি বিতর্ক। এই বিতর্কে যুক্ত মানুষের মনস্তত্ব বুঝতে হলে আপনি একটু পিছন থেকে দেখতে পারেন।
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় আর মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের মাঝে কেমন সম্পর্ক তা বলতে পারছি না। তবে, এটুকু দেখা যায় যে, কলেজে থাকার সময় দুটা গ্রুপ থাকে, যাদের একদম ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়তে চায়, আরেকদম মনে করে ডাক্তারীর উপর কিছু নেই। দুই জায়গার যে কোন খানেই টেকা অনেক কঠিন, কিন্তু এর মাঝেও গবেষণা হবে, তুলনামূলক ভাবে কোনখানে টেকা সহজ। অথবা প্রফেশনালি কারা উপরে। এই বিতর্কের অর্থ কী! উপর থেকে খালি চোখে দেখলে বুঝবেন, এই বিতর্ক পুরাটাই নিরর্থক। নিজেই সন্তুষ্ট হওয়া যে, যেখানে চান্স পাওয়ার জন্য পড়াশুনা করছি, সেটাই ঠিক।
ঠিক একই মানসিকতা কাজ করে সাইন্স কমার্সে পড়া ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রেও। বিতর্ক হয়, বুদ্ধিমানরা সাইন্সে পড়ে, অথবা এখনকার যুগে কমার্সই বেশি দরকার। এই টাইপ। এই দুটা মানদণ্ড এক না, সুতরাং তুলনাটাও চলে না। আমি যদি বলি, আমার গরু কাল, আপনি বললেন আপনার ঘোড়া লাল। এখানে যেমন তুলনার কিছু নেই, উপরের বিতর্কগুলাও তাই। যদি না দুই দলেই আপনার খুব ক্লোজ বন্ধু থাকে, তাহলে আপনি নিজেও এই বিতর্কে জড়িয়ে যাবেন।
একই কথা কাজ করে প্রাইভেট পাবলিক ভার্সিটির বিতর্কেও। আমাদের দেশে ভাল জায়গায় সিট খুব কম। ভাল বাস, ভাল এলাকা(পানি জমে না) এমনকি ভাল ভার্সিটিও। এখানে সবই সীমিত। একেবারে উপরের উদাহরণটা দেখলেই এখানে মানুষের মনস্তত্ব আপনি ধরতে পারবেন। যে অবজ্ঞা করছে, সে সত্যিই অধিকতর যোগ্য, কিন্তু এরপরেও অবজ্ঞা করার অধিকার তার নেই, কারণ, সামনে সে যে ভাল করবেই তার কোন নিশ্চয়তা নেই। সুযোগ আর চেষ্টা পিছনের জনকেও সামনে আনতে পারে। সিরাজগঞ্জের সব ভার্সিটিকে আপনি ভাল বললে সেটা হাস্যকর শোনাবে। একই ভাবে সব পাবলিক বা সব প্রাইভেটকে ভাল বললে সেটাও হাস্যকর শোনাবে। এরপরও বিতর্ক হয়, কারণ আপনি যে যেখানে পড়ছেন, সেটা যথেষ্ট ভাল, এই ব্যাপারে আপনি অন্যদের কাছ থেকে আশ্বস্ত হতে চান।
(এই টপিকে আরও দুটো ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে। কলেজে পড়ার সময় পড়াশোনায় আগ্রহী সাইন্সের কোন ছাত্র প্রাইভেটে পড়ার কথা চিন্তা করে না। তাছাড়া বাসা থেকে টাকা নিতেও কেউ চায় না। আরেক টা ব্যাপার হল, কোন কিছু না বুঝে মানুষ তার জীবনের চারটা বছর আর এতগুলো টাকা কোন প্রতিষ্ঠানের হাতে দেয় না। এত মানুষ এক সাথে বোকা হয় না।)
এত কষ্ট করে সেই সময় এই সব যুক্তি বের করেছি, আর এখন শুনলাম এসব নিরর্থক, এটা ভেবে এই থিওরী মানতেও কষ্ট হতে পারে। কিছু করার নেই। মানুষের মনকে কন্ট্রোল করতে হলে, আপনাকে সবার উপরে উঠতেই হবে। সেক্ষেত্রে এসব কমন থিওরীর আওতায় নিজেকে জড়ানো বাদ দিতে হবে।
কাউকে আশ্বস্ত করার জন্য যুক্তি একটা পন্থা মাত্র। এর বেশি কিছু না। এর চেয়ে আশাবাদ অপনেক ভাল কাজ করে। অর্থাৎ, কাউকে আপনার পক্ষে বা আপনার দলে টানতে যুক্তি না, যুক্তির উদ্দেশ্য অর্থাৎ তাকে আশ্বস্ত করার দিকে মনযোগ দেন।
(পর্বগুলো আত্মস্থ করলে আপনার একটা উচু স্তরের চিন্তাধারা তৈরি হবে, যেটাতে আপনি উপরকে থেকে সবাইকে দেখতে পারবেন। সামনের পর্বে আমি মেয়েদের মনস্তত্ব নিয়ে আলোচনা কররার ইচ্ছা রাখি।)
© আকাশ_পাগলা
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই অক্টোবর, ২০০৯ রাত ১১:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



