somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ নতুন কোন শব্দ

২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ৯:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ইদানীং কেন যেন ধৈর্য্য থাকে না। ভাল লাগে না কিছু। ধৈর্য্য নিয়ে কিছু করব, আর হয়েই উঠে না। বাসে এতক্ষণ ধরে বসে আছি। সাথে কেউ একজন থাকলে বোধহয় ভাল হত। গুটুর গুটুর করে গল্প করতাম। তাও কতক্ষণ ধৈর্য্য থাকত , কে জানে! কয়দিন আগে অনেকদিন পরে একটা এলবাম কিনলাম, ভাবলাম গান শুনি। নাহ, তাও তো হল না। কিনার পর সব গান শুনে পছন্দের গুলা নিয়ে প্লেলিস্ট বানানোর ধৈর্য্যটুকু পর্যন্ত পেলাম না। খালি অসহ্য লাগছিল, যা শুনি তাই। যা ভাবি তাই। যা করি তাই।

মাঝে মাঝে মনে হয় আমি আসলে খুব একা।
তুমি যার সাথেই ঘুমাও, যখন তুমি ঘুমিয়ে পড় তখন তুমি একাই। একা।

একটা স্বপ্ন দেখি আমি। গভীর রাতে একটা পরীর। ডানাওয়ালা। তারা বসানো জাদুর কাঠিওয়ালা। নদীর উপর নৌকা, আর সেখানে নামে সেই পরী। কিছুক্ষণ পরে চলে যায়। এই একটা স্বপ্ন যে কত দেখেছি। সেই কবে থেকে ! বাংলাদেশে আর কতদিন থাকব জানি না। চলে যাবার সময় হয়ে এসেছে। এই ত আর কয়েকদিন। যেখানে যাব সেখানে নদীর পাশেই একটা বাসা নেব। কানাডার নদীতে কি আমাদের দেশের নৌকা পাব ! নাহয়, বানিয়েই নিলাম। কানাডার পরীরা কি আমার স্বপ্নের মতই হবে !

চার দিন আগে গিয়েছিলাম গ্রামে। আবার কবে না কবে যাই। তাছাড়া আর যেতে পারি কী না, তাও ত কথা। আমাকে এতদিন পরে দেখে দাদু ত পুরা জড়িয়ে ধরে কান্না। উফফ, তাকে শান্ত করতে যে কী ঝামেলা। মানুষের মনে এত মায়া কেন !

আমাদের গ্রামের বাড়ির পাশে একদম ছোট একটা বিলের মত আছে। আসলে দুই পাশে অনেক উঁচু মাটি ত, মাঝখান দিয়ে তাই সরু নদীর মত বয়ে গেছে অনেকদূর। খুব বেশি প্রশস্ত না। ত্রিশ কদম। শুধু নৌকা চলে। সারাটা রাত নৌকার উপর শুয়েছিলাম। ছোট্ট একটা নৌকা। গভীর রাতে বাসা থেকে পালিয়ে বের হই। নৌকায় উঠি। এই নৌকায় মানুষ কী করে শোয় জানি না, আমার ত কিছুক্ষণ বসে থাকতেই হাত পা ঝিম ঝিম করছিল। বিলের উপরের দিকে তাকালে দুপাশের বড় বড় গাছ আকাশ ঢেকে রাখে। যেখানে যেখানে এক টুকরো আকাশ দেখা যায়, সেখান দিয়ে চঁদের রূপালি আলো নেমে বিলের পানির উপর পড়ে। টুকরো টুকরো আলো নামে, সেটুকু পানি চকচক করে রূপালি আলোয়।

আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম। এই সৌন্দর্য্যকে প্রকাশের জন্য কি একটাই শব্দ ‘ সৌন্দর্য্য ’ ! আমার যে আরও শব্দ লাগবে, নতুন কোন শব্দ। মশা ছিল ওখানে। বিরক্তিকর। প্রকৃতি বোধহয় কবি চায় না, চাইলে মশা বানাত না। মশার কামড় খেয়েও আমি আসতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল একটা পরীও কি নামবে না এখন ! একজনও না? আমি কী দেখতে এতই খারাপ যে, আমি থাকলে ওরা আসতে পারবে না!
অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছিলাম, কারও জন্য না, এমনিই। কীভাবে যেন ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম, জানি না। আযানের শব্দে ঘুম ভাঙ্গে। একদম সকালে। হাত পা নেড়ে, একটু আড়মোড়া ভেঙ্গে সোজা হয়ে বসতেই মনে হল কী যেন নেই। ভাল করে খুঁজে দেখি, হাতের চেইন ঘড়িটা নেই। বুঝলাম না, পরী আসল নাকি ! আর আসলেই ঘড়ি নিয়ে যাবে কেন ! ভালমত খোখুঁজির পর আবিষ্কার করলাম কখন হাত থেকে খুলে পড়ে পানির নিচে এখন ঘড়িটা। ভাল। সময় শৃংখল থেকে মুক্তির হালকা চেষ্টা ঘুমের মাঝেও। আযান হচ্ছে এখনও। এরকম ভোরে আযানের শব্দ কখনও এত ভাল লাগে নি। মনে হল, ঘণ্টা দেয়ার সিস্টেম না করে, আযানের সিস্টেম হওয়ায় বোধহয় ভালই হয়েছে। এই সময় ঘণ্টার আওয়াজ শুনতে কেমন লাগত ভাবছিলাম ! আরেকবার তাকালাম চারপাশে। আদিম মানুষ প্রকৃতিকে কেন যে পূজা করত হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। হঠাৎ করে ভাবলাম, মসজিদে যাব নাকি একবার ! মসজিদটা কোথায় জানি না। আমি গ্রামে আসি না তো তেমন। জানলেও কিই বা হত, আমার ত অযুহাতের শেষ নেই।

আজকে সন্ধ্যায় ঢাকার পথে রওনা দিলাম, বাসে বসে কিছু করার নেই। সাথে কেউ একজন থাকলে বোধহয় ভাল হত। গুটুর গুটুর করে গল্প করতাম। সাথে কাকে রাখব, ভেবে পেলাম না। পরিচিত কাউকে ভাল লাগছে না। আচ্ছা, রাতে যদি কোন পরী নেমে আসত, সে কি আমার সাথে আসতে রাজি হত? বাসায় নিব না তো ! শুধু আমার সাথে বাসে করে বাসায় যাওয়ার পথটায় থাকত। আচ্ছা, না হয় বাসাতেই নিতাম, কিন্তু পরীরা কী খায় জানি না ত। ভাবছি, সেই পরীর সাথে কী নিয়ে কথা বলতাম ! পরীর জন্যেও কি বাসের টিকেট কাটা লাগত ! এত শখ করে বেচারিকে এখানে উঠতাম, পরে ওর সাথে কী নিয়ে কথা বলতাম !

কোন সুন্দরী মেয়ে হলেই সে বোধহয় পরী হয় না। যত সুন্দরই হোক, তাকে আমি দেখেই পরী ভাবতে পারি না। কেমন যেন লাগে! মনে হয়, এ কেমন না কেমন কে জানে! হয়ত, খালি গিফটের লোভ তার। অথবা, ছেলে ঘুরাতে হয়ত ভাল লাগে, অথবা হয়ত আমার টাইপ ছেলেকে তার কাছে ক্ষ্যাত লাগে। তাই আমি কোন মেয়েকে না, পরীকেই খুঁজি ।যে পরী রূপালি জোৎস্নায় আকাশ থেকে নামতে পারে, যার ডানা থাকবে, হাতে রুপালি তারা বসানো জাদুর কাঠি থাকবে।

খুব যখন ছোট ছিলাম, রাতে অকারণে ঘুম ভেঙ্গে গেলে একটা পরীকে দেখতাম। আমার সামনের বাসার বারান্দায় বই নিয়ে এক মাথা থেকে আরেক মাথায় হাটত। চশমা পরা পরী, যতক্ষণ দেখতাম, অতক্ষণই পড়ত। দিনে দেখিনি কখনও। প্রথম প্রথম ভয় পেতাম খুব, আম্মু বলত, আমিও যদি ভাল মত লেখাপড়া করি, তাহলে নাকি আর ভয় পাব না। তাও আগে ভয় লাগত। পরে ভয় কেটে গেছে। একদিন পরীটা এসেছিল আমাদের বাসায়। পহেলা বৈশাখে। আমার জন্য একগাদা চকোলেট এনেছিল। আমাকে নাকি সেও রাতে মাঝে মাঝে দেখত জানালার কাচে নাক লাগিয়ে ওকে দেখতে। আমি ত সেদিন পরীকে বাসায় দেখে ভয়েই শেষ।
তার দুই দিন পরে এক দুপুরে ঘুমিয়ে ছিলাম। সেদিনই প্রথম এরকম একটা স্বপ্ন দেখি। গভীর রাতে একটা পরীর। ডানাওয়ালা। তারা বসানো জাদুর কাঠিওয়ালা। বিলের উপর নৌকা, আর সেখানে নামে সেই পরী। কিছুক্ষণ পরে চলে যায়।
তখন বুঝি নি, পরে বড় হয়ে শুনেছিলাম, মেয়েটা নাকি হারিয়ে গিয়েছিল। পহেলা বৈশাখের পরের দিনই। আমি অবাক হয়েছিলাম খুব। কেমন যেন লাগছিল। এই অনুভূতির নাম কি শুধু একটাই শব্দ ‘ মায়া ’ ! আমার যে আরও শব্দ লাগবে, নতুন কোন শব্দ।

ঐ বাসা ছেড়ে এসেছি আমরা অনেকদিন। আমরা চলে আসার আগ পর্যন্তও নাকি তাকে আর কখনও দেখেনি আম্মা। তখন এসব ত আমি জানতামও না। শুনেছি আরও পরে। আমি যেদিন স্বপ্নটা দেখলাম প্রথমবার সেদিন দুপুরে কী কিছু হয়েছিল সেই পরীটার ? কোন এক ছেলের সাথে নাকি একগাদা স্বপ্ন নিয়ে বাসা থেকে পালাতে চেয়েছিল একদিন আগেই। পহেলা বৈশাখের পরের দিনই। ছেলেটা আর আসে নি। সেই ছেলের কাছে এসব নাটক লাগে! ইদানীং আমার কাছেও এসব শুধু গল্পই লাগে। পরীরা ত শুধু গল্পতেই থাকে। বাস্তবে থাকে শুধু কিছু আশাভঙ্গ মানুষ।

হারিয়ে যাবে তবু রবে সে ওই নীল জোছনায়
থাকবে তবু বসে ওই রাতের তারায়।
বৃষ্টি ভেজা রাতে এই মন ভেবে যায়
নির্ঘুম এ রাত, শুধু যেন একা থাকায়।

© আকাশ_পাগলা
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ১০:১২
৩২টি মন্তব্য ৩২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×