আবদুর রব
।। এক ।।
কবিতা কী তার উত্তরের শেষ নেই। শিশুর কাছে কবিতা একটা গাছ যাতে সে চড়ে বসতে চায়, একটা টলটলে জলের হ্রদ যাতে সে সাঁতার কাটতে চায়, একটা পাহাড়ি গিরগিটি যার হেঁটে বেড়াবার দৃশ্য তাকে রোমাঞ্চিত করে কিংবা দাদির মুখের রূপকথা যা সে বারবার শুনতে চায়। রাতে বিছানায় শুয়ে এগুলোরই স্বপ্ন দেখে সে।
যখন সে বড় হয় তখন কবিতা তার কাছে এক ধরনের শব্দবস্তু যা শব্দে তৈরি অন্য শব্দবস্তু যেমন প্রবন্ধ থেকে আলাদা। সে জেনে যায় কবিতার শরীরী কাঠামো তার খেলার সাথী মেয়েটির মতো আলাদা। সে ভালো করেই জানে উচ্চারিত কবিতা পারিপর্শ্বিক অন্যান্য সাধারণ বক্তব্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
সে বুঝতে পারে কবিতা সাধারণ শব্দাবলিই ব্যবহার করছে কিন্তু তার ভেতরেও রয়েছে মিতব্যয়িতা ও অন্য এক গুরুত্ব। প্রতিটি শব্দ তার কাছে একটা নিজস্ব অবস্থান ঠিক করে নেয়, কাঠামো ও অর্থের ভিতর দিয়ে যা সে অন্য কিছুতে দেখে না। কবিতার ভাষাকে সে আবিষ্কার করে সঙ্গীতলহরে, ছন্দে ও সুরের মূর্ছনায়। সে দেখে কবিতা রচিত হয়, যার ভেতরে থাকে সৌন্দর্য ও গভীরতা, সাউন্ড ও সেন্স, শরীরী-অশরীরী অর্থময়তা। দেহমন তার ভরে যায় অপার আনন্দে। সে দেখেছে কবিতা উচ্চারিত হলে সে তথ্য পায়, পায় অনির্বচনীয় অনুভূতি। সে দেখে কবিতার শব্দে থাকে কল্পনার স্বর, শরীর। তার কাছে মনে হয় কবিতা সবসময় কিছু একটা করতে চায়। এর সুক্ষ্মতা ও সঙ্গীত, স্পন্দমাণ আত্মা ও রক্তমাংস একসাথে জড়ো হয়ে তার দৃষ্টিকে নিয়ে যেতে চায় কিছু নির্দিষ্ট-অনির্দিষ্ট ইমেজের দিকে। তার কাছে মনে হয় মন যেন ইমেজের আড়ৎ। ইমেজে উদ্ভাসিত হয় নতুন ভিশন যার ভেতরে সে নিজেকে আবিষ্কার করে, বিস্ময়ভূত হয়। তখন কত কী যে মনে পড়ে তার। এসবের ভিতর নিজের একটা সম্পৃক্ততাই খুঁজে পায় সে।
সে আরও বড় হয়। জীবনের পূর্ণতার দিকে অগ্রসর হয়। সে ভাবে, কবি যেন নিজের অভিজ্ঞতা শ্রোতার মনে পুনঃসৃজন করে বিস্তার করে অর্থ ও ভাবাবেগের আন্তর্জাল। কবি তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে অন্যের বিবেচনার জন্য। হতে পারে সে অভিজ্ঞতা প্রকৃত ঘটনার অথবা ফ্যান্টাসির অবয়ব কিংবা পটভূমিহীন ইমেজের। শব্দের পৃথিবীতে কবিতার উপস্থিতি তাকে মনে করিয়ে দেয় যে এর (কবিতার) কোন নিহিত অর্থ আছে, নিদেন পক্ষে, কবির নিজের কাছে। এতদিনে সে জেনে গেছে কবিতা প্রতিদিনকার কথোপকথন অতিক্রম করে পৌঁছে যায় বিশ্বচরাচরে।
কবিতার স্বপক্ষে যুক্তিতর্ক দাঁড় করতে গিয়ে সে ভাবে বিজ্ঞান বাস্তব, কারণ তা প্রযুক্তিকে সম্ভবপর করে তোলে। কবিতা কি এরকম করতে পারে? না, এরকম কিছু করতে না পারলেও তার বিশ্বাস কবিতা কিছু একটা ঘটিয়ে দিতে পারে। কবিতা পড়ে পড়ে সে বুঝেছে কিসে সে ভয় পায়, কোথায় মানবজীবনের দায়বদ্ধতা। এই দায়বদ্ধতা প্রকাশ করার দায়বদ্ধতা। প্রকাশ করলেই তার মনের জানালা খুলে যায় অন্যদের সামনে।
সে জানে কবিতা কখনও আদেশ-নির্দেশ দেয় না। কাজ করিয়ে নিতে বাধ্য করে না, শুধু অনুভব করতে বলে। কবিতা এমন অভিমত তুলে ধরে যা ব্যক্তিগত অনুভূতি ছাড়িয়ে অন্যের অনুভূতিতে রূপান্তরিত হয়। এভাবেই কবিতা তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, আনন্দ, দুর্ভোগ থেকে বের হয়ে অন্যের দিকে তাকাতে সাহায্য করে। কখনও কখনও তার কাছে কবিতার অর্থ সাথে সাথেই উদ্ধার হয় না, অপেক্ষা করতে হয়- ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য, অর্থকে নিজের মতো করে আবিষ্কারের জন্য। সে স্বীকার করে নেয় যে, সে যখন কোন শব্দ শোনে প্রথমবারের মতো, তার অর্থ আবিষ্কারের জন্যে তার কান সব সময় তৈরি থাকে না। তবু সে বুঝে ফেলে তার নিজের ভেতরে যে পৃথিবী বাস করে তার কোথায় সে অবস্থান করে।
।। দুই ।।
এতক্ষণ কবিতার সাথে বেড়ে ওঠা যে পাঠককে দেখলাম তার পরিচয় কী? সে কী আধুনিক না উত্তর আধুনিক? উত্তর দেওয়ার দায় নেই কারণ সে কবিতার অর্থ ও কাঠামো পছন্দ করে, ভাষার সঙ্গীতময়তা, ছন্দ-সৌন্দর্য ও গভীরতায় মুগ্ধ হয়। তথ্য ও অনুভূতি তাকে প্রাণিত করে। সে চায় কবিতা যেন দৈনন্দিন জীবনের বিচিত্র ছবিগুলো তুলে ধরে, তাকে একটা জীবদর্শন এনে দেয়, বাকি পৃথিবীর সাথে তার একটা সম্পর্ক স্থাপনে সাহায্য করে এবং তার জীবনটাকে প্রকাশিত-বিকশিত করার একটা দায়বদ্ধতা এনে দেয়।
উত্তরাধুনিকরা তার পরিচয় নিতে গিয়ে জানতে চাইবে সে প্রতীকে প্রীত হয় কিনা, সময়ের জাতক কিনা, যুক্তির পৃথিবীতে বাস করে যুক্তিকে অগ্রাহ্য করে কিনা, কিংবা দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে যেতে পারে কিনা। প্রতীকে প্রীত হলে অবশ্য রক্ষা নেই, তৎক্ষণাৎ এই পাঠকের গায়ে তারা আধুনিক পাঠকের লেভেল লাগিয়ে দেবেন। এঁরা এমন এক ধরনের আন্দোলনে লিপ্ত যা একতা, লক্ষ্য (Purpose) ও শৃঙ্খলাকে (Order) তুমুলভাবে চ্যালেঞ্জ করে। এটা তাঁরা শুরু করেন স্থাপত্যবিদ্যার ক্লাসিক নীতিকে প্রত্যাখান করার মধ্য দিয়ে। ইন্ডাস্ট্রিয়ালিজমের পর গোটা আমেরিকায় যে সেবামূলক অর্থনীতির বিকাশ ঘটে তাতে তারা যে ভালোভাবেই প্রভাবিত হয়েছেন সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। পোস্টমর্ডান যুগের এই রঙিন পৃথিবী ও রঙিলা মানুষ গড়ে তুলতে ডিজাইনারদের অবদান অনস্বীকার্য।
স্থাপত্যবিদ্যা, ডিজাইনার আর এ্যাড্ভ্যার্টাইজিং ফার্মগুলোর বদৌলতে গড়ে উঠা পোস্টমর্ডান পৃথিবীতে কবিরা পিছিয়ে থাকবেন কেন? তারা কবিতায় কলোকোয়ালিজম, স্ল্যাং, দৈনন্দিন জীবনের প্রকাশভঙ্গি ও এক ধরনের আগ্রাসী ভাষার ডিজাইনে কবিতা রচনা শুরু করলেন। যে ভাষায় থাকে কমিক ও আপাত বোধহীনতামূলক বাক্য । তাঁরা স্যুররিয়েলিজম ও সিচুয়েশনলিজমের অনেক কৌশল গ্রহণ করেছেন।
বাংলাদেশ ও ভারতে পোস্টমর্ডানিস্টদের মধ্যে রয়েছে দল-উপদল। একদল লাকা, জ্যাক দেরিদা পন্থী, অন্যদল মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি পন্থী । প্রমাণ, প্রভাত রায় চৌধুরীরা। তারা লাকা, দেরিদার নাম শুনতে পারেন না অথচ মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর বিজ্ঞাপনের মাহাত্ম্য প্রচারে গদগদ (প্রভাত রায় চৌধুরীর পোস্টমর্ডান মানচিত্র বইটি পড়লে একথা পরিষ্কার হবে। তিনি মার্ক্সবাদীদের মৌলবাদী বলেন, আধুনিকদের প্রতীক প্রীতির সমালোচনা করেন অথচ মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিকে সততার পরাকাষ্ঠা মনে করেন। তিনি তাঁর ‘‘একালের বিজ্ঞাপন একটি সমীক্ষা” নামক আলোচনা শুরু করলেন NIIT বিজ্ঞাপন দিয়ে। বিজ্ঞাপনটি এরকম: If you’re not studying with NIIT, you’re missing something”. এবার তিনি বিজ্ঞাপনের গুণকীর্তন শুরু করলেন:
“বিজ্ঞাপনটি এই সময়ের।...এই বিজ্ঞাপনের ক্রিয়াপদের রূপ present continuous tense বা ঘটমান বর্তমান। যারা NIIT-এ পড়াশুনা করছে না তারা কিছু একটা পাচ্ছে না। Miss এই শব্দটি অবশ্য বহুবিধ অর্থে ব্যবহূত হয়।... কিন্তু বিজ্ঞাপনের ক্রিয়াপদটি ভবিষ্যত কালে না করে ঘটমান বর্তমান করা হলো । বলা হল না- এসো ভাই আমাদের কাছে এসো আমরা তোমাকে কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ করে দেব।
সস্তা প্রলোভনের যুগ শেষ হয়ে গেছে। এখন যে ভাষা বললে বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকটা বেড়ে যায় সেই ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। এই ভাষা কিছুটা জটিল, মনে রাখতে হবে জটিলতা এই যুগের একটি প্রধান লক্ষণ। এই বিজ্ঞাপনে বলা হল, যারা অন্য প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তাদের মুর্খমির পরিচয় দিচ্ছে, তুমি সেই মেষপালে নেই। তোমার বুদ্ধি ও বিচেনার প্রতি আমরা (NIIT) খুবই আস্থাশীল।”
এই যে বিজ্ঞাপনের ভাষাকে কবিতার ভাষা করে তুলতে তারা মরিয়া সেটাও আমার কাছে এক ধরনের মৌলবাদী চিন-া বলে মনে হয়। কারণ তাঁরা ভাষাকে অনভিজাত (De-elitisize) করার জন্য মাঝে মাঝে এমন নৈরাজ্যে চলে যান যা রক্ষণশীলদের আরো উস্কে দেয়। অনেকই মনে করেন সাধারণভাবে পোস্টমর্ডান দৃষ্টিভঙ্গি কুল (cool), পরিহাসমূলক ও বর্তমান কালের জীবনাসি-ত্বের খণ্ডিত অবয়বকে গ্রহণ করলেও এর একটা ভোগবাদী দিক রয়েছে। পোস্টমর্ডানিস্টরা তাদের শিল্পকে (কবিতা, গান, স্থাপত্যবিদ্যা, ইত্যাদি) কালারফুল করে তোলার জন্য নিজের মুক্ত ও অবদমিত সমস- ইচ্ছাকে চরিতার্থ করেন যা আরেক ধরনের আত্মপ্রেম। আমেরিকার প্রাক্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট আল-গোর পোস্টমর্ডানিজমকে তাই বলেন: Its the combination of Narcissism and nihilism that really defines postmodernism. এখানে লক্ষ্য করা যায় যে তিনি a combination না বলে the combination বলেছেন যা তাঁর মতের দৃঢ়তাকে প্রকাশ করে। যা হোক, পোস্টমর্ডানিজম কী, এর পরিণতি কী সে বিতর্কে না গিয়ে বলতে পারি কবিতার ভাষা আমার স্মৃতিতে দ্রবীভূত হয়ে গাঢ় সুবাস, স্বাদ, বহুমাত্রিকতার দৃষ্টিভঙ্গি, বৈশিষ্ট্যমূলক প্রকাশভঙ্গি ও একটা ডিজাইন নিয়ে আভির্ভূত হয়। এই আসার ব্যপারটা ভাষার কারণে ব্যর্থ না হয় সে দিকটা ভেবে দেখা উচিৎ।
জানি, পশ্চিমবঙ্গের অঞ্জন সেনের দেওয়া অঞ্জন ও আয়না হাতে নিয়ে আমাদের দেশের কিছু কবি তাদের উত্তর আধুনিক মুখ দেখছেন। মুখ দেখা ভালো যদি সে মুখে উদ্ভাসিত হয় ঐতিহ্যলগ্নতার বোধ, সংস্কৃতির আন্তর্বয়ন, বৃহত্তর বাংলার লোকভাষা, উপভাষা ও সংস্কৃতি। কিন্তু মুখ দেখতে দেখতে তাঁরা যেন প্রসাধনী ব্যবসায়ীর খপ্পরে না পড়েন, হয়ে না উঠেন নব্য নার্সিসাস। এরকম মন্তব্য করার কারণ দ্বিবিধ। এক. ঐতিহ্যলগ্নতার বোধ, সংস্কৃতির আন্তর্বয়ন, বৃহৎ বাংলার লোকভাষা, উপভাষা ও সংস্কৃতির সেবকরা উত্তর আধুনিক না নবজাগরণবাদী তা আগে তাদের ঠিক করতে হবে। নবজাগরণও কিন্তু এক ধরনের আধুনিকতার সমপ্রসারণ। বিষয়টিকে খোলাসা করা যায় নিতাই জানার কথায়। তিনি বলেন, “রবীন্দ্রনাথ যে ঔপনিবেশিক আধুনিকতাকে আক্রমণ করেছিলেন একদা অমিতাভ, অঞ্জন প্রমুখ সেই আক্রমণকে আরো প্রখর এবং বিজ্ঞান ভিত্তির উপর নির্মাণ করেন। সেই সঙ্গে শিক্ষকের মতো পরবর্তী প্রজনমকে গণ্ডিবদ্ধ করার চেষ্টা করেন একটা লক্ষণরেখা টেনে। দায়িত্ব, সামাজিক মঙ্গলবোধ এদের নিকট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ”। এরপর তিনি পার্থপ্রতিম বন্দোপাধ্যায়ের পোস্টমর্ডান ভাবনা ও অন্যান্য গ্রন্থের উত্তর আধুনিক একটি ব্যক্তিগত উক্তি অধ্যায়ের উল্লেখ করলেন যেখানে পার্থপ্রতিম বলেন, “আমার কাছে এটি উত্তর আধুনিকতা নয়, যথার্য এই দেশীয় আধুনিকতার জাগরণ। এ আধুনিকতায় কিছু মেলে, আমাদের বাস্তব ও পরস্পরার, সময় ও ইতিহাসের সংশ্লেষণে। আর এই জাগরণ রাজনৈতিক বটে-পশ্চিমী রাষ্ট্র, রাষ্ট্রতত্ত্ব, ঔপনিবেশিক ছাঁকনির মধ্য দিয়ে যে পঙ্গুত্ব নিয়ে আসে, আঠারো শতকের আমাদের স্বাধীন বিকাশকে বিকৃত করে, এই মুক্ত আধুনিকতার বিরুদ্ধেই দাঁড়ায়-এ আধুনিকতাকে তাই অঙ্কিত লোকজীবন সংস্কৃতি, প্রাক-ঔপনিবেশিক প্রাণজ ধারা-আবার পশ্চিমী আধুনিক প্রগতি আসে স্বাবলম্বী ভিত্তির ভূমিতে। পশ্চিমী ধারণা, নতুন রূপ নিতে চায় এ আধুনিকের নতুন জন্মে”। দুই. এই সব উত্তর আধুনিকরা যে ভাবে Lakme, NIIT দের গুণকীর্ত্তনে ব্যস্ত তাতে এপার বাংলার উত্তর আধুনিকদের একটু ভেবে দেখার দরকার আছে যে, কর্পোরেট দুনিয়ার কাছে তাঁরা কতটা আত্মসমর্পণ করবেন। এ-দেশের লোক ঐতিহ্যের কতোটা তাঁদের ব্যবসা বিস্তারের জন্য উপঢৌকন হিসেবে তুলে দেবেন। আমি চাই আমাদের দেশে পোস্টমর্ডানিজমের চর্চা হোক কিন্তু তা যেন ভোগসর্বস্ব জীবন থেকে কবিতাকে নিয়ে যায় মানবিকতা ও ভারসাম্যপূর্ণ মনোভূমির দিকে। যেখানে সবারই সুযোগ থাকে অবদান রাখার। এটা বলতে হচ্ছে এই কারণে যে, ইহাব হাসান আধুনিক ও উত্তর আধুনিক কবিতার পার্থক্য টানতে গিয়ে দেখিয়েছেন উত্তর আধুনিক কবিতা পাঠককেন্দ্রিক নয় লেখককেন্দ্রিক।
।।তিন।।
আধুনিক উত্তর আধুনিক যাই হোক, কবিতার অবলম্বন ভাষা। কবিতার ভাষাকে তাই নানা চড়াই-উৎরাই পার হয়ে এগুতে হয়। ভাষার পরিণতি তাই কবিতার পরিণতি। শব্দ-নৈঃশব্দ কবিতার চিহ্নায়ক। শব্দ ছন্দের ভেতর কিংবা বাইরে থেকে নিজেদের বুনে চলে আমাদের হৃদয়ের চারপাশে। শব্দ আমাদের ভাবতে শেখায়, মূল্যায়নে সাহায্য করে। কখনও কখনও ছুঁড়ে দেয় চ্যালেঞ্জ। তখন ভাষা থেকে আমরা পালাতে চাই। কবিরা প্রায়ই Unnarrable Moment কে মোকাবেলা করেন। কবি অ্যাডোনিস (সিরিয়ার কবি আলি আহমদ সাইদ-এর ছদ্মনাম, জন্ম ১৯৩০) তাঁর Lugha (ভাষা) কবিতায় এই বিষয়টাকে প্রকাশ করতে গিয়ে বললেন:
“যতবার একজন মানুষ প্রেমে পড়ে
ততবারই কি সে ওই একই শব্দ ব্যবহার করবে!
যতবার একজন নারী তার প্রেমিকের আলিঙ্গন চায়
ততবারই কি তাকে ব্যাকরণবিদ কি দার্শনিকের সাথে শুতে হবে !
এই কারণে
আমি যাকে ভালোবাসি তাকে কিছুই বলিনি
ভালোবাসার সব জিনিসপত্র স্যুটকেসে তুলে রেখে
আমি সমস- ভাষা থেকে গেলাম পালিয়ে”।
[ইংরেজিথেকে অনুবাদ বর্তমান লেখকের]
ভাষা থেকে পালিয়ে গেলাম বললেই তো আর সমস্যার সমাধান হয় না। অ্যাডুনিস তাই নৈঃশব্দকে বেছে নিলেন অনুভূতির তীব্র প্রকাশের মাধ্যম হিসাবে। রুমি তার মসনবিতে একে হামোশ (Sublime Silence) বলেন। কিন্তু ভাষার নীরবতা কি ভাবে রচিত হয়? রুমির কবিতার নীরবতার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ফিরোজ পাপান মতিন যুক্তি দেখালেন, “ভাষার নৈঃশব্দকে নিশ্চিত করতে গিয়ে কবিতা মেটাল্যাংগুয়েজে রূপ লাভ করে। যা নিজেকে অসংলগ্নতার ধারণায় পরিণত করে। এই অবস্থায় ভাষা নিজেই নিজের বিরুদ্ধাচারণ করে, আত্মহত্যা করে, নীরবতার ভিতর পুনর্জন্ম লাভের জন্য। পল ভ্যালেরির মতে কবিতা কখনো সম্পূর্ণ লেখা যায় না এটা অসমাপ্ত অবস্থাায় পরিত্যক্ত হয়। এই পরিত্যক্ত অবস্থাটা যে একটা সাসপেন্স তৈরি করে তারও একটা বাস্তবতা আছে”।
কবিতার নিজস্ব ভাষা সম্পর্কে আজকাল তিনটি যুক্তিকে বিবেচনা করা হয়। ১. অসম্পূর্ণতার যুক্তি ২. একাত্মতা বা এমপ্যাথির যুক্তি ও ৩. কাব্যিকতার যুক্তি। কাব্যিকতার যুক্তির রয়েছে দুটি শাখা: ক. একমাত্র কবিতার মধ্য দিয়ে অসম্পূর্ণতার সমস্যা সমাধান করা সম্ভব, খ. কবিতার ভাষা সংক্রান্ত জটিলতার উত্তর নিহিত রয়েছে Empathy'র ভেতরে।
প্রতিটি যুক্তির অন্তর্নিহিত কিছু সত্য থাকা সত্বেও কেউই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। মালার্মের Swan নামক একটা সনেট আছে। যাতে দেখা যায় একটা রাজহাঁস বরফ ঢাকা হ্রদে আটকা পড়ে। রাজহাঁসের কাছে হ্রদটা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেই হ্রদই তাকে শেষ পর্যন্ত শীতে জমিয়ে দিয়ে তার চূড়ান্ত সর্বনাশ ঘটিয়ে দেয়। এই কবিতার মতো মানুষ ও ভাষার মধ্যে একটা সম্পর্ক বিদ্যমান। মানুষ ভাষা চায় কিন্তু আবার সেই ভাষার কারাগারে বন্দি হয়। এ বন্দিদশা থেকে মানবমুক্তির জন্য কবিতা নতুন অর্থ তৈরি করে। নতুন সংবেদশীলতা তৈরি করে দেয় কবির মনে যা কবি অর্জন করেন তার নিজের মানসিক অভিজ্ঞতা থেকে। পাঠক যখন কবির এ ভাষাবস্তু বা বিষয়ের দিকে তাকান তখন তার চোখ কান সজাগ হয়ে উঠে। কবি ও পাঠক তখন এক সাথে ঝাঁপ দেয় ভাষার সলিলে।
তথ্যসূত্র:
১. পোস্টমর্ডান মানচিত্র, প্রভাত রায় চৌধুরী
২. উত্তর আধুনিকতা: সহজপাঠ,অমিতাভ চক্রবর্তী, একবিংশ-২৩, পৃ-১৮০, ফেব্রুয়ারি ২০০৮
৩. Wikiquote related Postmodernism
৪. পোস্টমর্ডান বাংলাকবিতা, সমপাদনা ও ভূমিকা প্রভাত রায় চৌধুরী
৫. উত্তর আধুনিক চাতালে, খোন্দকার আশরাফ হোসেন, একবিংশ-২৩,পৃ-১৯৪, ফেব্রুয়ারি ২০০৮
৬. পোস্টমর্ডান ও উত্তর আধুনিক কবিতা পরিচয়, নিতাই জানা
৭. “To flee from all language”: the gap between language and experience in the works of modern Arab poets, Huri, Yair.
(লেখাটি সাপ্তাহিক কাগজে কবিতার মানচিত্র-২ হিসেবে প্রকাশিত হয়)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

