somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

২ য় টার সাথে ৩ য় সাবমেরীন কেবলের কাজও শূরু করি উচিত ।

১৯ শে ডিসেম্বর, ২০০৭ সকাল ১১:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

স্যাটেলাইট, ওয়াইফাই বা অন্য কোন প্রযুক্তি অদূর ভবিষ্যতে সহজ লভ্য না হলে আমাদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে ২ টো ক্যাবল যথেষ্ট নয় ;

একই সাথে ৩ য় আরেকটি নদী পথে সরাসরি ঢাকায় আনা উচিত ।




সাবমেরিন কেবল ও আত্মঘাতী বাঙালি



ইন্টারনেটের তথ্য ভাণ্ডারকে সহজে ও সাশ্রয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে ২০০৬ সালের ২১ মে আনুষ্ঠানিকভাবে সাবমেরিন কেবলের সঙ্গে সংযুক্ত হয় বাংলাদেশ। এই সংযোগকে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে মাইল-ফলক হিসেবে আখ্যায়িত করেন প্রযুক্তিবিদরা। দেখা মেলে নতুন এক সম্ভাবনার।



সাধারণ মানুষও খুশি হয়েছিল এই ভেবে যে, এবার দুর হবে 'ডিজিটাল ডিভাইড'। প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে যাবে তথ্যপ্রযুক্তি সেবা। নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজে পাবে এদেশের মানুষ। মুনাফার আশায় ইন্টারনেট সেবা বিকেন্দ্রীকরণের দায়িত্ব নিয়ে ব্যবসায়ীরা (ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো) মোটা অংকের টাকা দিয়ে বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন বোর্ডের (বিটিটিবির) মাধ্যমে সংযুক্ত হয় এই সুপার হাইওয়েতে।

কিন্তু, সবার মুখ হতাশায় ঢেকে যায় একের পর এক কেবল (তার) বিপর্যয়ে। গত ১৮ মাসে সাবমেরিন কেবলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে মোট ২৯ বার। এ সময়ের প্রায় প্রতিবারই বিচ্ছিন্ন হয়েছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার প্রান্তে অথবা ঢাকা-চট্টগ্রাম প্রান্তে। দেশের অভ্যন্তরে বার বার কেবল কেটে যাওয়ার ঘটনা পৃথিবীর অন্য কোনও দেশে বিরল।

সাবমেরিন কেবল বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ভোগান্তির শিকার সামগ্রিক অর্থে দেশবাসী। তবে কিছু ব্যবসা ও পরিষেবা সরাসরি ইন্টারনেট সংযোগের উপর নির্ভরশীল। ইন্টারনেট পরিষেবা প্রতিষ্ঠান (আইএসপি), পোশাক শিল্প, সফটঅয়্যার নির্মিতা প্রতিষ্ঠান, বায়িং হাউজ, সাইবার ক্যাফে, অনলাইন পত্রিকা এবং অনলাইন নিলাম প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে এই তালিকায়। কেবল বিচ্ছিন্ন হওয়ার সবচে' নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ব্যবসার এই অঙ্গনে।

সুনাম নষ্ট হচ্ছে আইএসপিগুলোর
দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ ছড়িয়ে দিচ্ছে আইএসপিগুলোই। এক্ষেত্রে যখনই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে তখন প্রাথমিক পর্যায়ে গ্রাহকরা দায়ী করছে সংশ্লিষ্ট আইএসপিকেই। ফলে সুনাম নষ্ট হচ্ছে এদের, হুমকির মুখে পড়ছে এই ব্যবসা। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় প্রত্যক্ষভাবে ইন্টারনেট পরিষেবা প্রতিষ্ঠানগুলো (আইএসপি) খুব বেশি আর্থিক ক্ষতির শিকার না হলেও পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে এই ব্যবসায়।

অন্যদিকে ভোক্তাকে নিরবিচ্ছিন্ন সংযোগ দিয়ে সুনাম রক্ষার্থে সাবমেরিন সংযোগের বিকল্প হিসেবে ভি-স্যাট (ভ্যারি স্মল এ্যাপারচার টার্মিনাল) সংযোগও যোগান দিচ্ছে আইএসপিগুলো। ফলে সংযোগপিছু খরচ বেড়ে যাচ্ছে অনেক।

আইএসপি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সভাপতি আব্দুস সালাম বলেন, "বার বার সাবমেরিন কেবল কেটে যাওয়াটা দুঃখজনক। এতে আইএসপিগুলোর এতদিনের অর্জিত ব্যবসায়িক সুনাম নষ্ট হচ্ছে। তবে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন গ্রাহকরা (ইউজাররা)। সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে বিকল্প ব্যবস্থা (ব্যাকআপ) হিসেবে আমরা ভি-স্যাট রাখছি। ফলে ইন্টারনেট সংযোগের সার্বিক মূল্যও বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে গ্রাহকের উপর। সবার পক্ষে এই বাড়তি খরচ বহন করা সম্ভব নয়।"

আইএসপিএবি'র সাধারণ সম্পাদক রাসেল টি আহম্মেদ বলেন, "এতবার সাবমেরিন কেবল বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা ইন্টারনেট বিশ্বে অস্বাভাবিক। আরও অস্বাভাবিক হচ্ছে দেশের ভিতরে স্থলভাগে বার বার কেবল কেটে যাওয়ার ঘটনা। প্রতিবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো পৃথিবী থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বাংলাদেশের। ফলে সবচে' বেশি ক্ষতি হয় ইন্টারনেট নির্ভর ব্যবসাগুলোর।"

তিনি বলেন, "বাংলাদেশে গুরুত্ব সহকারে কোন জরিপ করা হয় না, তাই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় নির্দিষ্ট করে আর্থিক ক্ষতির পরিমান বলা না গেলেও এর পরিমান শত কোটি ডলারের কম নয়। বিকল্প হিসেবে ভি-স্যাট ব্যবহারের যে ব্যবস্থা চালু রেখেছে আইএসপিগুলো, সে ব্যবস্থা বন্ধেও বিটিটিবি তৎপরতা চালাচ্ছে। সাবমেরিন কেবল নিরবিচ্ছিন্ন না করে এরকম সিদ্ধান্ত নেয়াটা হবে পুরোপুরি আত্মঘাতী।"

দেশের প্রথম ইন্টারনেট পরিষেবা প্রতিষ্ঠান আইএসএন এর সিনিয়র সিষ্টেম এডমিন এইচএম ফারুক আহমেদ বলেন, "আইএসপিগুলোর ক্ষেত্রে গ্রাহক সন্তুষ্টি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। একবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে গ্রাহকদের অভিযোগ মোকাবেলা করা যে কতটা ভোগান্তির, তা আইএসপির গ্রাহকসেবা বিভাগের সদস্য মাত্রই জানেন। ২৪ ঘন্টা গ্রাহক সেবা নিশ্চিত করার জন্য বিটিটিবির দক্ষ কোনও মনিটরিং সেলও নেই। ফলে কেবল বিচ্ছিন্ন হয়েছে কি-না, গণমাধ্যমে প্রচারের মাধ্যমেই কেবল আমরা তা জানতে পারি।"



প্রভাব পড়েছে সফটঅয়্যার ব্যবসায়
বাংলাদেশে সফটঅয়্যার ব্যবসা উত্তরোত্তর উন্নতি করছে। ব্যবসার এই ক্ষেত্র থেকে প্রতিবছর কয়েক শ' কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে দেশ। সফটঅয়্যার ব্যবসার অন্যতম প্রধান অনুসর্গ হচ্ছে ইন্টারনেট সংযোগ। বিদেশের ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ এবং তথ্যের আদান - প্রদান প্রক্রিয়া চলে অনলাইনে। সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলে কার্যত অচল হয়ে পড়ে এই প্রক্রিয়া।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটঅয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, "সাবমেরিন কেবল স্থাপনের পর দেশে ইন্টারনেট সেবার মান উন্নত হবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে -এটাই আশা করেছিলাম। অথচ চালু হওয়ার পর থেকে ২৯ বার এই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। ফলে দেশের সফটঅয়্যার শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে দেশের সার্বিক অর্থনীতির ওপর।"

তিনি বলেন, "আন্তর্জাতিক ক্রেতারা আমাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ভারতের বাজারে চলে যাচ্ছে। এমনিতে আমাদের এখানে ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচ ভারতের চেয়ে ২০ গুণ বেশি। তারপরও সংযোগ যদি এভাবে বারবার বিচ্ছিন্ন হয় তাহলে আমরা ব্যবসা করবো কীভাবে?"

রফিকুল ইসলাম জানান, সাবমেরিন কেবল বিচ্ছিন্ন থাকলে একদিনেই তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আড়াই লাখ ডলার ক্ষতি হয়। শুধু তাই নয়, সাবমেরিন কেবল এক ঘন্টা কাটা বা বিচ্ছিন্ন থাকলে শুধু টেলিফোন সংযোগ থেকেই বিটিটিবি ৭০ হাজার ডলার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়।"

হুমকির মূখে পড়েছে পোশাক শিল্প
গার্মেন্টস ও পোশাক শিল্পের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ এর সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ সাবমেরিন কেবল বারবার বিচ্ছিন্ন হওয়া প্রসঙ্গে বিডিনিউজটুয়েন্টিফোরডটকমকে বলেন, "এখন বিদেশের সঙ্গে প্রায় সব ধরনের যোগাযোগ ইন্টারনেটের মাধ্যমে হয়। সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ক্রেতাদের সঙ্গে সময়মতো যোগাযোগ রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ ধরনের বিঘ্ন আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করছে। ফলে অনেক কাজের অর্ডার বাতিল হয়ে সেগুলো অন্য দেশে চলে যাচ্ছে।"

তিনি জানান, "অনেক কাজের জন্য আমাদের ইন্টারনেটের মাধ্যমে দরপত্রে অংশ নিতে হয়। এসব ক্ষেত্রে মাত্র কয়েক ঘণ্টা সময় পাওয়া যায়। অপটিক্যাল ফাইবার কেবল বারবার কাটা পড়ায় অনেক দরপত্রে অংশ নেওয়া যাচ্ছে না। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে পোশাক শিল্প।"

আইএসপিএবি সভাপতি আব্দুস সালাম এই প্রসঙ্গে জানান, "অধিকাংশ বায়িং হাউজ-ই অনলাইনে গার্মেন্টস পণ্য নিলামে তোলে। এক্ষেত্রে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলে প্রতিষ্ঠানটি আর নিলামে অংশ নিতে পারে না। ফলে প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।"



ভোগান্তি প্রান্তিক গ্রাহকদেরও
সাবমেরিন কেবল বারবার বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন ব্যাক্তিগতভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা (হোম ইউজার)। আর হোম ইউজারদের একটা বড় অংশকে ইন্টারনেট সংযোগ দিয়ে থাকে স্থানীয় সাইবার ক্যাফেগুলো।

ফার্মগেটের ব্যাস্ত সাইবার ক্যাফে টেকপার্কের সত্ত্বাধিকারী আশফাকুদ্দিন মামুন বলেন, "সাবমেরিন কেবল বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ক্ষতির শিকার হচ্ছে সাইবার ক্যাফেগুলো। জাতীয় ক্ষতির হিসেবে এই ক্ষতির অংকটা যদিও খুব বেশি নয়, তবে যে কোনও সাইবার ক্যাফে মালিকের জন্য এই ক্ষতি অপূরণীয়।"

আশফাকুদ্দিন মামুন জানান, "দেশজুড়ে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ৭ শ’ সাইবার ক্যাফে রয়েছে। একদিন ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলে ক্যাফেগুলো গড়ে প্রায় দেড় হাজার টাকা করে লোকসান গুনে। এর প্রধান কারন ক্যাফেতে ব্রাউজ করতে আসা ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা ব্যবহারের পরে টাকা প্রদান করে। কিছু সাইবার ক্যাফে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন হোম ইউজারদের ইন্টারনেট সংযোগ দিয়ে থাকে। এদের একটা বড় অংশ মাসের শেষে ক্যাফেগুলোকে ফি প্রদান করে। কিন' মাসের শুরুতেই আইএসপিগুলোকে মাশুল দিয়ে ইন্টারনেট সংযোগ পায় ক্যাফেগুলো।"

ঢাকার মোহাম্মদীয়া হাউজিং লিমিটেডের বাসিন্দা তৌহিন হাসান অভিযোগ করে বলেন, "সুপার হাইওয়েতে যুক্ত হওয়ায় বেশ খুশি হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম ইন্টারনেটের ধীরগতির যন্ত্রণা থেকে হয়তো এবার মুক্তি মিলল। আগের তুলনায় খরচ কিছুটা বাড়লেও ইন্টারনেট সংযোগ নিলাম। গতি কিন' খুব একটা বাড়েনি। তবে বাড়তি বিরক্তি হিসেবে যোগ হয়েছে বিনা নোটিশে সংযোগ বার বার বিচ্ছিন্ন হওয়া।"



অভিযোগের তর্জনী বিটিটিবি'র দিকে
বার বার সাবমেরিন কেবল কেটে যাওয়ার সব দায় বর্তে বিটিটিবির উপর। এ ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষ বিটিটিবি-ই। সাবমেরিন কেবল দেখভাল এবং পরিচালনার দায়িত্ব এই প্রতিষ্ঠানটিরই।

তথ্যপ্রযুক্তি ব্যক্তিত্ব মোস্তাফা জব্বার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "বিটিটিবিতে এমন কিছু লোক বসে আছে যাদের দেশপ্রেম নেই, যাদের মধ্যে জাতীয় সম্পদ রক্ষার তাগিদ নেই। হাজার কোটি টাকার সম্পদ কয়েকজন আমলার হাতে জিম্মি হয়ে আছে। এ কারণে রাস্তার পাশ দিয়ে নিয়ে যাওয়া সাবমেরিন কেবলটি অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে।"

তিনি বলেন, "চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থেকে দোহাজারী এলাকায় বারবার কেবল কাটা হচ্ছে। অথচ কোনও ব্যাবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। কক্সবাজারের কলাতলীতে মাঝে মাঝে বালি সরে গিয়ে সাবমেরিন কেবল উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। যেটা অন্তত ৭ থেকে ১০ ফিট মাটির গভীরে থাকার কথা ছিল, সেটা বেরিয়ে পড়ছে।"

আইএসপিএবি'র প্রাক্তন সভাপতি আখতারুজ্জামান মঞ্জু বলেন, "সাবমেরিন কেবলের ল্যান্ডিং পয়েন্টটি যদি কক্সবাজারে না হয়ে চট্টগ্রামে হতো তাহলে এটি তদারকি করা অনেক সহজ হতো। এখন পর্যন- যতবার কেবল কাটা পড়েছে তার অধিকাংশই হয়েছে কক্সবাজারে। এর নিয়ন্ত্রণ যেহেতু বিটিটিবির হাতে তাই এ ব্যর্থতার দায়ভার তাদেরকেই বহন করতে হবে।"

তিনি বলেন, "কেবল বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর বিটিটিবি কখনোই দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে কেবল পরিচালনায় যারা আছেন তাদের সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষের দূরত্ব যোজন যোজন। এই প্রশাসনিক জটিলতায় সময় লাগছে অনেক বেশি।"

আইএসপিএবি'র সাধারণ সম্পাদক রাসেল টি আহম্মেদ বলেন, "সমুদ্রের নিচে কোনও কারণে কেবল বিচ্ছিন্ন হলে সেটা স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই বিবেচিত হতো। যেহেতু দেশের ল্যান্ডিং স্টেশনের পর এই দূর্ঘটনাগুলো ঘটছে, সেক্ষেত্রে দায়ভার অবশ্যই বিটিটিবি'র।"

তিনি আরও বলেন, "পৃথিবীর কোনও দেশে রাস্তার পাশ দিয়ে সাবমেরিন কেবল স্থাপনের নজির নেই। রাস্তার মাঝ দিয়ে কেবল স্থাপনই স্বাভাবিক নিয়ম। যদি রাস্তার মাঝ দিয়ে কেবল নেয়া হতো তাহলে কেউ চাইলেও নাশকতামূলকভাবে কেবল কাটতে পারতো না। এটুকু দূরদৃষ্টি বিটিটিবির কাছে সবাই আশা করেছিল।"

বেসিস এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, "বিটিটিবির অযোগ্যতা ও উদাসীনতার কারণেই বার বার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা ঘটছে। বিকল্প আরেকটি অপটিক্যাল ফাইবার লাইন সরকারি বা বেসরকারি কোনও সংস্থার কাছে ভাড়া নিয়ে ব্যবহার করলে এ সমস্যার অনেকটাই লাঘব হবে। এক্ষেত্রে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) এবং একটি বেসরকারি ল্যান্ডফোন কোম্পানির কেবল ব্যাবহারের কথাও ভাবা যেতে পারে।"

আইএসপিএবি সভাপতি আব্দুস সালাম বলেন, "অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বিটিটিবিকে অনেকবার লিখিত এবং মৌখিকভাবে সমস্যা সমাধানের সুপারিশ করেও তেমন সুফল মেলেনি। বিটিটিবি এটিকে নাশকতামুলক কাজ বলে বার বার পাশ কাটাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে, পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) সঙ্গে চুক্তির চিন্তা ভাবনা করছে বিটিটিবি। এ চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে বলে আশা করছি আমরা।"

আইএসএন এর সিনিয়র সিষ্টেম এডমিন এইচএম ফারুক আহমেদ বলেন, "কেবল স্থাপনের ক্ষেত্রে মাটির নীচে এর সুরক্ষা অত্যন্ত জরুরী। এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ যথাযথ দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেনি। এ ধরনের প্রাযুক্তিক সেবা স্থাপনের ক্ষেত্রে অবশ্যই পরিপূরক ব্যবস্থা রাখা উচিত। সেটাও আমাদের দেশে নেই। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর যথাযথ তদারকি নেই। অভিযোগ করে সমাধান না পাওয়া গেলে সেবা দিয়ে ক্রেতাকে সন'ষ্ট করা যায় না। গত ক'মাসে আইএসপিগুলো অনেক ভোক্তা হারিয়েছে।"



কেবল কাটা নিয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
বিটিটিবি'র জিএম সিকিউরিটি অ্যান্ড সার্ভিল্যান্স কর্ণেল জিয়াউর রশীদ সরদার বারবার কেবল কাটা প্রসঙ্গে বিডিনিউজটুয়েন্টিফোরডটকমকে বলেন, "কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে লাইনটি কেটে দেয়ায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কে বা কারা কী উদ্দেশ্যে কাজটি করছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা তদন্ত করে দেখছে।"

কর্ণেল রশীদ বলেন, "গত এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আট মাসে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার প্রান্তে মোট পাঁচবার সাবমেরিন ফাইবার অপটিক কেবল কাটা পড়েছে। এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম প্রান্তে বেশ কয়েক বার কেবল কাটা পড়েছে।"

কর্ণেল রশীদ বলেন, "ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উন্নয়ন কাজের সময় শ্রমিকদের অসাবধানতার কারণে বেশ কয়েকবার লাইন কাটা পড়ে। রাঙ্গামাটির দিকে পাহাড় ধস এর ঘটনায় বা মাটি কাটতে গিয়েও শ্রমিকরা লাইন কেটে ফেলেছে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম কক্সবাজার প্রান্তে লাইন কাটা পড়লে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে মাইক্রোওয়েভে পরিবর্তন আনা হয়। ফলে বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার যে ঢালাও অভিযোগ করা হয় তা সব সময় ঠিক নয়।"

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক সাজ্জাদুল হাসান ৩০ নভেম্বর বিডিনিউজটুয়েন্টিফোরডটকমকে বলেন, "কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বার বার ফাইবার অপটিক কেবল কাটা পড়ার ঘটনাকে নাশকতামূলক বলার সুযোগ নেই। তবে তদন্তকারী সংস্থাই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে পারে।"
তিনি বলেন, "হাইওয়ের পাশের সাধারণ জনগণকে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করে ফাইবার কেবল সম্পর্কে জানানো যেতে পারে। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসন বেশ ক'বার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বৈঠকও করেছে।"

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইমাম হোসেন বলেন, "কক্সবাজার এলাকায় অপটিক্যাল ফাইবার কাটা পড়ার পর কয়েক বার নিজেই ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। কিন্তু কখনোই ওই ঘটনাকে নাশকতামূলক বলে মনে হয়নি।"

তিনি বলেন, "পুলিশ হাইওয়ে এলাকায় পাহাড়ার ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে পুলিশ ইচ্ছা করলেই ফাইবার কাটার সমাধান করতে পারবে না।" এ ব্যাপারে পুলিশের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একাধিক চিঠি দিয়ে গ্রামের লোকজনকে ফাইবার পাহারায় নিয়োজিত করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রশাসনের কয়েক পদস্থ কর্মকর্তা জানান, "টিএন্ডটির লোকজনই ফাইবার কাটার সঙ্গে জড়িত।" তাদের মতে, কক্সবাজার থেকে ঢাকা পর্যন্ত বিকল্প একটি ফাইবার বসানোর পরিকল্পনা ছিল সরকারের। প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন করার জন্য একটি মহল সরকারকে চাপ দেয়ার জন্য পরিকল্পিত ভাবে ফাইবার কাটার মতো নাশকতা করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিটিটিবির এক কর্মকর্তা বলেন, "আমরা পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সাক্ষর করেছি। যারা কেবলের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। এর ফলে আশা করা যায়, খুব শিঘ্রই এই সমস্যার একটা সমাধান হয়ে যাবে।"

পরিপূরক সংযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন, "এটি একটি সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। সবাইকে একটু ধৈর্য্য ধরতে হবে। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করি একটি ভাল ফলাফল পাওয়া যাবে।"

প্রত্যাশা অনেক
নানা ক্ষেত্রে 'পাইওনিয়ার' বাংলাদেশ। বিশ্বের অন্য কোন দেশ সাবমেরিন কেবল নিতে গড়িমসি করেনি। '৯০ এর দশকের শুরুতে আমরা তা করেছি। বিশ্বের অন্য কোথাও সাবমেরিন কেবল কাটার কোন রেকর্ড নেই। আমাদের শুধু আছে না, ভয়াবহভাবে আছে।

বাঙালি আত্মবিস্মৃত জাতি শুধু নয়, সে যে আত্মঘাতীও - সে কথা বলেছিলেন খ্যাতনামা প্রাবন্ধিক নিরদ সি চৌধুরী। কতটা অবিমৃষ্যকারী হলে কোন দেশের মানুষ 'ব্যাকবোন' বলে পরিচিত তথ্য প্রযুক্তির সুপার হাইওয়ের এই কেবল কাটতে পারে, তা উপলদ্ধি করা আসলি কঠিন।

তত্ত্ববধায়ক সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক ছিল। অনেক বঞ্চনার এই দেশে সে প্রত্যাশার মাত্রা হয়তো একটু অস্বাভাবিকই। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই প্রত্যাশা পূরণ না হলে এই দেশ এই জাতির 'ব্যাকবোন' (মেরুদন্ড) বাস-বিকই নুয়ে পড়বে। হতাশার গভীর খাদে তলিয়ে যাবে সে। হাজার আহাজারি করেও সেখান থেকে তোলা যাবে না তাকে। সরকার যত দ্রুত এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবেন ততই মঙ্গল।



নাজনীন কবির/মুহম্মদ খান/আনসার হোসেন/এমআইআর/১৮৩০ ঘ./০৩.১২.০৭

২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×