
মানবজিন রির্পোটার মিজানুর রহমান, মৌলভীবাজার থেকে ফিরে
মৌলভীবাজারের মনু নদীতে রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যাওয়া মডেলকন্যা স্মৃতি ও তার ছেলেবন্ধুদের উচ্ছল-উন্মাতাল ছবির মেমোরি কার্ড নিয়ে এখন তোলপাড় চলছে। সবার কৌতূহল কি আছে মোবাইল ফোনের ওই কার্ডে? মনু নদীতে তলিয়ে যাওয়ার আগে অন্তরঙ্গ চিত্রসহ আরও ক্লু রয়েছে এতে। গোয়েন্দারা এখন মেমোরি কার্ডের ছবির সূত্র ধরেই এগোচ্ছেন। জানা যায়, কার্ডটি এখন পুলিশ ও তদন্তকারীদের হাতে রয়েছে। এছাড়া সিডি আকারে এটির বেশ কিছু কপিও নানা হাতে ছড়িয়ে পড়েছে। এদিকে স্মৃতির পরিবারে এখন কান্না। বাবা ও মা প্রিয় কন্যাকে হারিয়ে শোকে পাগলপ্রায়। মায়ের আহাজারি-আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দাও। ওরা আমার মেয়েকে কোন অতলে লুকিয়ে রেখেছে। জীবিত হোক, লাশ হোক- স্মৃতিকে কি আমি এক নজরও দেখতে পাবো না? এ কান্না স্মৃতির পিতারও।
বন্ধুদের সঙ্গে সিলেটে বেড়াতে গিয়ে রহস্যজনকভাবে মনু নদীতে হারিয়ে গেল ঢাকার মেয়ে স্মৃতি। গেল সপ্তাহে এক অভাবনীয় দুর্ঘটনায় তাকে বহনকারী প্রাইভেট কারটি মৌলভীবাজার শহরের প্রবেশ মুখ নতুন বাস টার্মিনাল সংলগ্ন বালিকান্দি ঘাটে নদীতে ডুবে যায়। রাস্তা থেকে প্রায় ১৫-১৬ ফুট উঁচু বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ টপকে গাড়িটি নদীতে পড়ার পর আরোহীদের মধ্যে ৫ জন জীবিত বেরিয়ে আসতে সমর্থ হলেও স্মৃতিকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় ডুবুরিরা প্রায় ৫ ঘণ্টা চেষ্টার পর দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি এবং গাড়িতে রক্ষিত স্মৃতির ভ্যানিটি ব্যাগ, পার্স ব্যাগ ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও তার লাশ খুঁজে পাওয়া যায়নি। আট দিন অতিবাহিত হলেও স্মৃতির লাশ না পাওয়া, পিতার অজান্তে বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া এবং মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে মোবাইলে ধারণকৃত বন্ধুদের সঙ্গে তার বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির ছবি সবাইকে অবাক করেছে। রহস্যঘেরা এই মৃত্যু নিয়ে গুঞ্জন এখন সর্বত্র। স্মৃতির মা-বাবার সামনে তার দুই বন্ধু জানিয়েছেন তাদের প্রমোদ ভ্রমণ আর ঘনিষ্ঠ হওয়ার নানা কাহিনী। কাহিনীর নায়ক তারেক ও তার সহযোগী সৈকতের জবানিতে উঠে এসেছে মডেল কন্যা স্মৃতির মডেল হওয়ার গল্প, তারেকের সঙ্গে পরিচয়, প্রেম এবং পরবর্তীতে ঘনিষ্ঠতার বিভিন্ন দিক। তারেককে সামনে রেখে সৈকত জানিয়েছে, মূলত তারেকের প্রস্তাবেই স্মৃতি দুপুর রাতে ঢাকা থেকে সিলেটে যাওয়ার জন্য রাজি হয়েছিল। তারেক জানিয়েছে, অল্পদিনেই তারা ঘনিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিল। তানভীর আর সজীব ছিল তাদের ‘গুরু’।
সজীবের ফার্মে মডেল হিসেবে কাজ করতো স্মৃতি। সেখানেই স্মৃতির সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় তারেকের। এরপর বহু জায়গায় একান্তে মিলিত হয়েছে তারা। ডিজে পার্টিতে অংশ নিয়েছে রাইফেল স্কয়ারের থাণ্ডার বোল্ট, গুলশানের ফুয়াং ক্লাব, রেডিসন বারসহ আরও অনেক ক্লাব ও হোটেলে। সর্বশেষ তারা লং ড্রাইভে হারিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় থাণ্ডার বোল্টের একটি ডিজে পার্টি থেকে। গাড়ি ভাড়া করার দায়িত্ব পড়ে তারেকের সহযোগী সৈকতের। শুক্রবার রাতে ডিজে পার্টি শেষ করে বাসায় ফেরার পথে সিদ্ধান্ত হয় লং ড্রাইভে সিলেট যাওয়ার। সারা রাত গাড়িতেই আমোদ ফুর্তির সিদ্ধান্ত হয়। স্মৃতির মাকে এড়িয়ে তার ছোট ভাই সিনহাকে সঙ্গে নেয়ার প্রস্তাব হয়। আগে থেকেই স্মৃতির মাকে ‘মা’ বলে ডাকতো তানভীর। তাকে ম্যানেজ করে স্মৃতিকে বাসা থেকে বের করে আনার দায়িত্ব নেয় তানভীর। পিতার অজান্তে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী গেল সপ্তাহে শনিবার রাত সাড়ে ১১টায় ঢাকার খিলক্ষেতস্থ লেকসিটি থেকে স্মৃতিকে নিয়ে সিলেটের উদ্দেশে রওনা হয় তারেক, সৈকত ও তানভীর।
স্মৃতি-তারেকের পরিচয়, প্রেম ও ঘনিষ্ঠতা: স্মৃতি মিতা সাইফ আফজাল। বয়স কুড়ি হয়নি। পিতা কেএম সাইফ আফজাল ঢাকায় একটি গার্মেন্টসের জেনারেল ম্যানেজার। মা মলি আক্তার আমেনা। একমাত্র ভাই সাইফ বিন সিনহা (১০)। খিলক্ষেত লেকসিটির বাসিন্দা। এ বছর এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। পরীক্ষার পর থেকে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা (ওঊখঞঝ)’র জন্য একটি ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়েছিল। এসএসসি পাস করার পর থেকে মডেলিং-এর প্রতি ঝুঁকে পড়ে স্মৃতি। একসময় মহাখালী ডিওএইচএস-এর ৩১ নং রোডের ৪৭৪ নং বাড়িতে অবস্থিত ‘ড্রিম এক্সিস’ নামের একটি ফার্মে মডেলিং-এর অফার পায়। পুরোপুরি ঢুকে পড়ে মডেলিং জগতে। স্মৃতির অভিনয় করা ফ্যাশন শো’র একটি অনুষ্ঠান একটি বেসরকারি টেলিভিশনে প্রচারিত হয় বছরের শুরুর দিকে। এতে সে আরও আগ্রহী হয়ে ওঠে। জুলাই মাসে পরিচয় হয় তারেকের সঙ্গে। পুরো নাম তারিকুল ইসলাম। সরকারি বিজ্ঞান কলেজের বি.কম (প্রাইভেট)-এর ছাত্র বলে দাবি করে সে। থাকে মিরপুরের ৬ নং সেকশনের ডি-ব্লকের ১৯ নম্বর রোডের ৭ নম্বর বাড়ির চারতলায়। পিতা শাহজাহান মিয়া সৌদি প্রবাসী ছিলেন। পেশায় প্যাথলজিস্ট।
তারেকের জন্ম সৌদি আরবে। সে জানায়, গত জুলাই মাসে পরিচয় হওয়ার পর সে অল্পদিনেই স্মৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে যায়। কখনও তারেকের বন্ধু তানভীরের বাসায়, কখনও সজীবের মহাখালীর অফিসে, আবার সুযোগমতো বিভিন্ন পার্কে তারা আড্ডা দিতো। তারেক জানায়, তাদের দু’জনের কথা ছিল পরে যা হওয়ার হবে, আগে তাদের বন্ধুত্ব। স্মৃতি তাকে খুবই পছন্দ করতো এবং তার কোন আবদার ফিরিয়ে দিতো না। তারেক জানায়, অক্টোবর মাসের ২ তারিখে স্মৃতির বাসার সামনে বাগানে তারা অনেকক্ষণ একান্তে কথা বলে। একদিন স্মৃতির মা বাসায় ছিলেন না। তাছাড়া, তার ছোট ভাই সিনহা তাকে খুব পছন্দ করতো এবং সে সিনহাকে খুব আদর করতো। তারেকের দাবি, স্মৃতির ধর্মীয় ভাই তানভীর তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। স্মৃতির সঙ্গে তার কোথায় কি হতো, কখন কি বলতো- সবই তানভীরকে সে জানাতো। সিলেটে প্রমোদ ভ্রমণের জন্য তানভীরই তাকে পরামর্শ দেয়। তার পরামর্শে আনন্দ ফুর্তির জন্য স্মৃতিকে নিয়ে সিলেটের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ে তারেক। সঙ্গে নেয় তার দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু মিরপুর মাজার রোডের লালকুঠি ১ম কলোনির বাসিন্দা তানভীর ও মিরপুর ৭ নং সেকশনের ডি-ব্লকের ২ নং রোডের আরামবাগ আবাসিক এলাকার ৪৩ নং বাড়ির বাসিন্দা সৈকত আহমদকে। তাদের সঙ্গে স্মৃতির মা যেতে চাইলে তানভীর বাদ সাধে। পরে স্মৃতির একমাত্র ভাই সিনহাসহ ৫ জন আরোহী নিয়ে ড্রাইভার শামীম সিলেটের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


