আগের পর্বগুলো দেখুন:
১. আমার কোরিয়া সফর।। পর্ব ১: কুয়ালালামপুরে যাত্রা বিরতি
২. আমার কোরিয়া সফর।। পর্ব ২: সিউল ইমিগ্রেশনে তিক্ত অভিজ্ঞতা
পর্ব: ৩
=====
এয়ারপোর্ট থেকে আসা বাস দুপুর ২ টার দিকে Ellui হোটেলের সামনের রাস্তার উল্টোদিকে কিছুটা দূরে নামিয়ে দিল। সামনে একটি বড় মোড়। আমি রাস্তা পের হয়ে বাস ড্রাইভারের দেওয়া পরামর্শ মোতাবেক Ellui হোটেলে গিয়ে উঠলাম। বহুতল ভবনের নীচতলার রিসেপশনের লোকজন বললেন, কনফারেন্স হচ্ছে দু'তলায়। আমার পেট চোঁ চোঁ করছে ক্ষিধেয়। গত রাতের শেষের দিকে এয়ার বাসে অল্প খেয়েছিলাম। এরপর একফোঁটাও পানিও খাওয়া হয়নি। ভাবলাম, যদি ভাগ্য ক্রমে কনফারেন্সের লাঞ্চটি পেয়ে যায়। এখানে লাঞ্চের ব্যবস্হা থাকার কথা। আমি দেশ ছাড়ার আগে কনফারেন্স রেজিস্ট্রেশনের সময় মুসলিম ফুড বা ভেজিটেবল লাঞ্চের কথা বলেছি।
গিয়ে কনফারেন্স ম্যানেজার ভদ্রমহিলার সাথে দেখা হলো। উনার সাথে পরিচয়ের পরে রেজিস্ট্রেশনের কাগজ পত্র দেখিয়ে কনফারেন্স প্রসিডিংটা নিলাম। এরপরে বললাম, লাঞ্চের টাইম এখনো আছে কিনা। তিনি বললেন ঘ্ন্টা দুয়েক আগে শেষ। এর পরে ৩ টা নাগাত চা বিরতি আছে। আমি সকালে incheon এয়ারপোর্টে বিড়ম্বনার কথা সংক্ষেপে বলে নিজের ত্রাহিমধূসুদন অবস্হা ব্যাখ্যা করলাম। ভদ্রমহিলা শান্তনার বাণী শোনালেন। তবে আমার কান দিয়ে তা তেমন প্রবেশ করল না। আমি কনফারেনস হলে প্রবেশ না করে ভদ্রমহিলাকে পরেন দিন দেখা হবে বলে বেরিয়ে গেলাম। বললাম, আমার এখনি খেতে হবে।
হোটেল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামলাম। এখানকার হোটেলে কুকুরের মাংস পাওয়া যায় - একথা মনে পড়তেই কোন হোটেলের খোঁজ না করে আগে থেকে ঠিক করা bag & breakfast হোটেলে গিয়ে পরে খাবার যেমন, ফল, খোঁজার জন্য প্ল্যান করলাম। একটি ট্যাক্সি দেখে উঠলাম। ড্রাইবার কে ইংরেজীতে বললাম কোথায় যেতে চায়। তিনি বুঝলেন না। তারপর হাতের প্রিন্ট করা কাগজটি দেখালে তিনি বুঝতে পারলেন। সিটে বসে প্রচন্ড ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লাম অল্প সময়েই। কতক্ষণ সময় গেছে বুঝতে পারিনি। হঠাৎ ঘুম ভাঙলে দেখি, ড্রাইভার ভদ্রলোক মোবাইলে কার সাথে যেন কোরিয়ান ভাষায় কথা বলছেন। কিছুক্ষণ পরে দেখি, অন্য একটি ট্যাক্সি এসে হাজির। আমার ড্রাইভার আমাকে তাতে উঠার জন্য বলেন। আমি ঢাকা শহরের সিএনজি-ট্যাক্সি ড্রাইভারদের 'হাইজাক' কর্মের কথা অনেকবার পত্রিকায় পড়েছি। কিন্তু এখন আমার সে কথা চিন্তা করারও শক্তি নেই। আল্লাহর উপর ভরসা করে যা হবার তা হবে এই ভেবে নতুন ট্যাক্সিতে উঠে পড়লাম। আবারও ঘুমিয়ে পড়লাম। সিউল শহরের কিছুই আর দেখা হল না।
বিকেল বেলা নাগাদ আমার সেই bag & breakfast হোটেল এলাকায় পৌঁছলাম। আবারো ড্রাইভারের টেলিফোন সংলাপ শুনছি কোরিয়ান ভাষায়। ঘুম থেকে জেগে এখনও অক্ষত আছি ভেবে মনে হল, আমি শুধু শুধুই তাদের সন্দেহ করেছি। ড্রাইভার বললেন, উনি হোটেলটি খোঁজে পাচ্ছেন না, তাই মালিককে ফোন করেছেন।
অল্প সময়ের মধ্যে দেখলাম এক কোরিয়ান মহিলা ট্যাক্সির সামনে। ইনি হোটেলের ম্যানেজার ও মালিক। আমি ট্যাক্সি থেকে ভাড়া মিটিয়ে নেমে উনার সাথে হোটেলে উঠলাম। ভদ্র মহিলা আমাকে আমার রুমে পৌঁছিয়ে দিয়ে বিশ্রাম নিতে বলে চলে গেলেন।
বলে রাখা ভাল, পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম, এটা আদৌ কোন হোটেল নয়। ভদ্র মহিলার নিজেদের দোতলা একটা বাড়ি। সম্ভবত: দু'রুমে নিজেরা থেকে বাকি গুলো ভাড়া দিয়েছেন। এরকম শত শত হোটেল কাম বাড়ি এই সিউল শহরে। যাদের বাড়ি আছে, তারা এর মাধ্যমে এক্সট্রা ইনকাম করছেন কিছু রুম ভাড়া দিয়ে। সাধারণত টুরিস্টরা এসব হোটেলে কমদামে থাকেন। আগে থেকে বুকিং না দিলে, অনেক সময় সিট পাওয়ায় কষ্টকর হয়। আমি মাসখানেক আগে বুকিং দিয়েছিলাম। আমার হোটেলের বাসিন্দাদের নিয়ে পরে লিখব, আশা করি।
আমি গোসল করে নামাজ পড়ে ক্লান্তিতে দু'তলা বেডের নিচ তলায় গুম দিলাম। ছোট্ট রুমে দুটি দুতলা বেড। ঢাকা শহরে কোচিং করতে এসে অনেক ছাত্রদের ফার্মগেট এলাকায় এরকম বেডে থাকতে দেখেছি। আমার এক চাচাত ভাইকে এরকম বেডে থাকতে দেখে মজা লেগেছিল, কিছুটা খারাপও লেগেছিল। এখন নিজের হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা!
ঘুম থেকে উঠে দেখি, সন্ধ্যা হয়ে গেছে। রাত ৮-৯টার মতো। শরীর কিছুটা ভাল লাগছে। এখন খেতে হবে। হিসেব করে দেখলাম, আমি গত রাতে কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টে শেষ বার ভাল ভাবে খেয়েছিলাম। রুম থেকে বেরিয়ে ম্যানেজার মহিলার কাছে গিয়ে খাবার কোথায় পাওয়া যায় জিজ্ঞেস করলাম। আমি বললাম, আমি ভাত খেতে চাই। তিনি আমাকে কাছে আরেকটি বাড়ি সদৃশ হোটেলে নিয়ে গেলেন। মেঝেতে পাটি বিছানো। আমাকে বসার জন্য বলে নতুন হোটেলের এক মহিলাকে খাবার দিতে বলে আমার হোটেলের ম্যানেজার চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে সামনে কাঠের পিড়েতে কিছু খাবার দিলেন বাটিতে। কিছু সাদা ভাত, কেমন করে যেন রান্না করা একটা ডিম, ও কিছু সবজি। আমার অরুচি আসল, কষ্ট করে সাদা ভাতটুকু খেয়ে বিল দিয়ে রাস্তায় নামলাম। এর পরে হোটেলে আসার সময় রাস্তার ধারের দোকান থেকে কিছু কমলা, বিস্কিট, নুডুলস এসব কিনে ফিরলাম।
হোটেলে ফিরে ম্যানেজারকে বললাম, আমি নুডুলস রাঁধতে চাই। ইতিমধ্যে ভদ্রমহিলা আমি মুসলমান জেনে বললেন, হোটেলের দুতলায় দুজন মুসলিম মহিলা আছেন। আমাকে নিয়ে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ইনারা দু'বোন ইউরোপ (সম্ভবত: আলবেনিয়া থেকে) ব্যবসায়িক কাজে এসেছেন। হোটেলে আরেকজন মুসলমান ভদ্রলোক আছেন। তিনি ফিলিস্তিনি হলেও জর্ডানের পাসপোর্ট নিয়ে ব্যবসায়িক কাজে এসেছেন। দু'বোনের বড় বোনটি আমাকে নুডুলস রান্না করে খেতে সাহায্য করলেন। পুরো ২৪ ঘন্টা পরে পেটে কিছুটা শান্তি অনুভব করলাম।
কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে পরের দিন সকালে কনফারেন্সে হাজির হওয়ার কথা ভেবে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরের পর্ব: আশ্চর্য রকমের সহায়তাকারী সিউলের মানুষ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

