আজকে ১০ জুলাই আমার জন্মদিন। আবার আজকে ১০ জুলাই আমার বাবার মৃত্যুদিন। একইদিন। একদিকে বেদনার রং অন্যদিকে আনন্দ। অথচ আজ কেন জানি জন্মদিন নিয়ে ভাবতেই ইচ্ছে করছে না। ভাবছি শুধু প্রিয় বাবাটার কথা..! আজ তার ১০ম মৃত্যু বার্ষিকী। আমার বাবাকে নিয়ে কত কথাই না মনে পরছে.....................
গ্রামের বাড়িতে পয়লা বৈশাখের মেলায় বাবার কাছে আমার প্রথম আব্দার ছিল আকাশের সবচেয়ে উপরে উড়ছে সুন্দর ঘুড়িটা আমাকে কিনে দেয়ার...তারপর সেই ঘুড়ি নিয়ে বাড়িতে এসে কতই না আনন্দ..! সেই আনন্দের পুরোটা অংশে ভাগ বসাতেন আমার বাবা। মা শুধু দুরে বসে থেকে আমাদের পিতা-পুত্রের কান্ড দেখতেন আর হাসতেন..! আগেই বলে রাখি আমি খুব সাধারন মধ্যবিত্ত পরিবারের এক সন্তান। আমাদের বিত্ত ছিল না কিন্তু সুখ ছিল। বাবা একটা কলেজে ইংরেজি সাহিত্য পড়াতেন। আর পাশাপাশি ডেইলি অবজারভার পত্রিকায় লেখালেখি করতেন। তাঁর সখ ছিল গানে আর নাটকে। বিশষ করে শেক্সপিয়র এর ম্যকব্যথ এর ম্যকডাফ এর চরিত্রে বাবা অভিনয় করতেন। মাঝে মাঝে আমাদের বাসায় খাটকে মঞ্চ বানিয়ে সেখানেই চলতো তার রিহার্সাল। আমি, আমার বোন, আর আমার মা এই আমরা ছিলাম সতর্ক অডিয়েন্স। বাবার অভিনয় শেষ হলে আমরা হাত তালি দিয়ে ঘর কাপিয়ে তুলতাম। আর আমার মা ভালোবেসে বাবাকে বানিয়ে দিতেন এক খিলি পান। আমাদের জন্মদিন হত খুব সাদা মাটা করে। আমার প্রিয় বাবা আমাদের কে জন্মদিন উপলক্ষে কিছু একটা দিতেনই। তা যত সামন্যই হোক। আর সেই কিছুটাই ছিল বই। জন্মদিন মানেই তার কাছ থেকে বই উপহার । তাো আবার এক অভিনব উপায়ে। ঘুমিয়ে আছি। হঠাৎ বালিসের নীচে আবিস্কার করা গেল একটা চেপ্টা শক্ত মলাট বদ্ধ জিনিস। হেচকা টানে মলাটটা খুললেই আবিস্কৃত হত জ্বলজ্যান্ত একটা বই....আঙ্কল টমস কেবিন....ট্রেজার আইল্যন্ড...সুকান্তের কবিতা......পঁথের পাচালি...কতকি....তখন বাবাটাকে জড়িয়ে ধরে কত যে আদর দিতাম....একদিন হল কি পাড়ার একটা ছেলের কাছ থেকে কুড়িয়ে একটা নেড়ি কুকুরের বাচ্চা নিয়ে এলাম। বাসায়তো লংকা কান্ড! মা ভয়ানোক চটে আছেন..এটা ফিরিয়ে দেয়ার জন্যে। কিন্তু আমি কাঁদতে শুরু করে দিলাম। এমন সময় বাবা হাজির । সব শুনে টুনে তিনি মাকে বুঝিয়ে বললেন যে কুকুরের ছানাটা দেখতে কিন্তু বেশ। চল আমরা সবাই এটাকে ভালো খাইয়ে টাইয়ে মানুষ করি....বাবা সেটার নাম দিলেন " লাইকা"। চাঁদে প্রথম যে কুকুরটা পাঠানো হয়েছিল তার নাম ছিল লাইকা। সেই লাইকা আমার চোখের সামনেই বুড়ো হল। আর মানুষের মত মানুষ হল। কারন লাইকার চোখ ফাকি দিয়ে আমাদের বাড়িতে চোরতো দুরের কথা অপরিচিত আত্বিয়রা পর্যন্ত আসতে পারতেন না।
যুক্তরাষ্ট্র পড়াশুনা করতে চলে আসছি। সবার চোখেই জল। শুধু বাবাটা চুপচাপ বসে আছেন আমার একটা হাত ধরে। অনেক ক্ষন চুপ থেকে হঠাৎ করে বললেন.." আয়তো আমার বুকে ..তোকে একটু আদর করে দেই"।
................................................................................................
তারপর অনেকটা বছর কেটে গেল। এল ১০ জুলাই। আমার জন্মদিন পালনে বন্ধুরা সবাই ব্যাস্ত। হঠাৎ একটা ইন্টারন্যাশনাল ফোন কল। বড় মামার কন্ঠস্বর। অনেক কথার পর বললেন আসল কথাটা .....আমার বাবাটা আর নেই.......হার্টএটাকে চলে গেছেন.....না ...তার সাথে আর কোনদিনই আমার দেখা হবে না....কখনো হবে না.....প্রতিবছর যখন আমার এই জন্ম তারিখটা আসে .....তাঁর কথা খুব মনে পড়ে.......অথচ আমিতো জানি আমার বাবা সবসময়ই আছেন আমার সারাটা অন্তর জুড়েই। আমার ভালোবাসা হয়ে..............না..সেই দিনের পর থেকে আমি আর আমার জন্মদিন পালন করি না........করতে পারি না......বাবাকে খুব মনে পড়ছে................................
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুলাই, ২০১০ বিকাল ৫:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



