ভৃত্য : হুজুর, অভয় দিলে দু-চারি খানা কথা বলিতাম।
হুজুর : নির্ভয়ে বল্, আমার মন আজ ভীষণ আনন্দে আছে।
ভৃত্য : আজ্ঞে হুজুর, আজ আপনার গাঁধাটা ঘোড়ার মতো আচরণ করিতেছে। ব্যাপার খানা আমার কাছে সুবিধের মনে হইতেছে না।
হুজুর : (একটু হেসে) ঐ যে পাশের গ্রামের ভেটেরিনারী ডাক্তার মশাই। উনি আমাকে একটা কৌশল করায়ত্ত করাইয়া দিয়াছেন। কীভাবে গাঁধাকে ঘোড়া বানানো যায়?
ভৃত্য : আজ্ঞে হুজুর, ব্যাপার খানা এখনো বুঝিতে পারিলাম না। গাঁধা তো গাঁধাই। গাঁধা আবার ঘোড়া হইতে পারে নাকি!
হুজুর : পারে রে বোকা, পারে। প্রতি ভোরে গাঁধাকে আচ্ছা মতো পেঁদানি দিলে সকল গাঁধাই ঘোড়ার মতো আচরণ করিবে…
হুজুরের গাঁধার মতই অবস্থা আজ আমাদের দেশের স্কুল, কলেজ কিংবা ইউনিভার্সিটী পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের। নিশ্চয়ই হুজুরের ভৃত্যের মত করেই বলবেন “ব্যাপার খানা বুঝিতে পারিলাম না”। নিচের লিখাটা পড়ুন। আশা করি আমার এই লিখা আপনাকে ব্যাপার খানা বুঝাতে সক্ষম হবে।
প্রাচের অক্সফোর্ড খ্যাত দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের অন্যান্ন বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, চুয়েট, খুয়েট, রুয়েট কিংবা মেডিকেল কলেজ সমূহে ভর্তি হওয়ার বা পড়ার ইচ্ছা ঊচ্চ মাধ্যমিক ফল প্রার্থী দেশের সকল ছাত্র-ছাত্রীদের। ঊচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর থেকে কোচিং সেন্টার গুলো (কোনোটা আবার আগে থেকেই) দৈনিক পত্রিকা কিংবা লিফলেটের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে ওৎ পেতে থাকে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হওয়ার আশায়। এইচ.এস.সি পরীক্ষা দিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা ছাত্র-ছাত্রীরা কোচিং সেন্টার গুলোর এহেন অতিরঞ্জিত বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পা দিয়ে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে (গুটি কয়েক ছাড়া)।
ফলে একটা সুন্দর জীবনের সূচনাতেই মুখ থুবড়ে পড়ে তাদের উজ্জল ভবিষ্যৎ। এজন্য দায়ী আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। যে শিক্ষা ব্যবস্থায় আমরা জানিনি আমরা কি শিখছি, আমরা জানিনি আমরা যা পড়ছি তা কি কাজ দেবে আমাদের, আমরা জানিনি শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্য কি, আমরা জানিনি আমরা কেন লেখা পড়া করছি। এই শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে উপরের ক্লাসে ওঠা যায়, আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে ক্লাসে প্রথম হওয়া যায়, আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে একটা ভাল চাকরি পাওয়া যায়, আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে প্রচুর টাকা উপার্জন করা যায়। আর এজন্যইতো আজ আমরা সরকারী বা বেসরকারী অফিস আদালতে ভাল চাকরি পাই, মোটা অঙ্কের বেতন পাই, ঘুষও খাই। এই শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যই আজ আমরা বিশ্বে দুর্নীতিতে টানা পাঁচবারের অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন। দেশের এহেন নাজুক অবস্থা নিয়ে আমরাই হাসি-ঠাট্টা কারি।
আসুন দেখে নেয়া যাক আমাদের এই গর্বিত (!) শিক্ষা ব্যবস্থাটা কেমন।
আরিফ ক্লাস এইটের ছাত্র। তার পড়ার টেবিলে নাইন-টেন কিংবা ঊচ্চ মাধ্যমিকের গণিত বই ফেলে রাখা। সে প্রায়ই বই গুলো নিয়ে ঘাটাঘাটি করে। ক্লাস সেভেনের বার্ষিক পরীক্ষায় ৬৩ জন ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে সে ২২তম স্থান অধিকার করে। সুমন ক্লাস এইটের ফার্স্ট বয়। আরিফ আর সুমন দুজন একই পাড়ায় থাকে। জামান স্যার তাদের ক্লাস টিচার, গণিত পড়ান। সেভেনের বার্ষিক পরীক্ষায় আরিফ গণিতে সর্বোচ্চ (৯৯) নম্বর পেয়েছে। কিন্তু জামান স্যার কখনই তাকে মূল্য্যায়ন করেন না। স্যারের যত চিন্তা সব ঐ সুমনকে নিয়ে। আরিফ খুজে পায় না স্যার কেন সুমনকেই পছন্দ করেন? অথচ সুমন গৃহ শিক্ষকের সাহায্য ছাড়া একটাও আঙ্ক করতে পারে না। আর আরিফ ক্লাসে স্যার যা করিয়ে দেন তা দেখে বাকি গুলো সে নিজে নিজে করে।
এমন হাজার হাজার আরিফ আমাদের দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে। যারা খুজে পায়না নিজেদের দুর্বলতা। মূল্যায়নের অভাবে বিলীন হয়ে যায় যাদের প্রতিভা। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিষয় ভিত্তিক মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী খুজে বের করার কোনো ব্যবস্থা নেই। যারা সব বিষয়ে ভাল রেজাল্ট করে তারা কোনো বিষয়েই পারদর্শি নয়। যদি হত, তাহলে কোথায় বাংলাদেশের হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ ডাবল গোল্ডেন এ+ ধারী। কাউকেই তো শুনলাম না কোনো একটা বিষয়ের উপর অসাধারণ কৃতিত্তের জন্য দেশের মান বাড়াতে। আমি তাদের ছোট করে দেখছিনা। তারা হলেন পরিশ্রমী ছাত্র-ছাত্রী। আমাদের দেশের ছাত্র-ছাত্রী তিন ধরণের। মেধাবী, পরিশ্রমী, পরিশ্রমী মেধাবী। মেধাবী তারাই যারা শ্রম নয় মেধা দিয়ে ভাল রেজাল্ট করে। পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতী। লেখা-পড়া নিয়ে যারা কঠোর পরিশ্রম করে, ফলসরূপ ভাল রেজাল্ট করে তারাই পরিশ্রমী। আর যারা মেধা ও শ্রমের মাধ্যমে ভাল রেজাল্ট করে তারা পরিশ্রমী মেধাবী। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাই আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের পরিশ্রমী এবং মুখস্থবিদ্যার প্রতি নির্ভরশীল করে গড়ে তুলছে। বাসায় বসে কোন প্রশ্নের উত্তর মাথায় সংরক্ষণ করে পরীক্ষার হলে নিয়ে গেলে কোনো সমস্যা নেই, আর মাথায় সংরক্ষণ না করে পাতায় সংরক্ষণ করে পরীক্ষার হলে নিয়ে গেলে সেটাই নকল। দৈনিক ৬-৮ ঘণ্ঠা লেখা-পড়া কর, এস.এস.সি ও এইচ.এস.সি তে ভাল রেজাল্ট কর, ঊচ্চ মাধ্যমিকের সব বই আগা-গোড়া মুখস্থ কর (বুঝে পড়ে সময় নষ্ঠ করার দরকার নাই), ভাল জায়গায় চান্স পাও, ভাল বিষয় নিয়ে পড়(বিষয়টা তোমার ভাল লাগুক আর না লাগুক, পার আর না পার তাতে কি? সাবজেক্টের ডিমান্ড আছে!), ভাল বেতনের চাকরী পাও, সুন্দর একটা জীবন গড়। এই হলো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। যেখানে আমাদেরকে শুধু পরিশ্রমের দিকেই উৎসাহিত করা হচ্ছে, মেধা বিকাশের দিকে নয়। বিশ্বে আজ পর্যন্ত যত বৈজ্ঞানিকের আবির্ভাব ঘটেছে, তাদের সকলেই অলস জীবন যাপন করতেন। অলস পড়ে থাকতেন আর সারাক্ষণ চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। অথচ আমরা লেখাপড়ার প্রতি অতি মগ্নতায় ঘুমানোর সময় পাই না আর আপেল আকাশে না উড়ে মাটিতে কেন পড়ে সেটা নিয়ে চিন্তা করার সময় কোথায়?
আরিফের কাছে যাওয়া যাক, তার ভবিষ্যৎ কি? বিজ্ঞনী আইনস্টাইনের প্রতি দুর্বলতা এবং গণিত শাস্ত্র নিয়ে ঊচ্চ শিক্ষার আশায় আরিফ নবম শ্রেণীতে তার পড়ার বিভাগ হিসেবে বিজ্ঞানকেই বেচে নেয়। এস.এস.সি পরীক্ষায় সে এ (৪.০০) পেয়ে উত্তীর্ণ হয়, যেখানে গণিত এবং ঊচ্চতর গণিতে তার রেজাল্ট এ প্লাস। এইচ.এস.সি তে গ্রেড পয়েন্টের একটু উন্নতি হলেও রেজাল্ট সেই আগের মতো এ (৪.২০)-ই থাকে এবং বরাবরের মতো গণিতে এ প্লাস। মুখস্থ বিদ্যার প্রতি অনীহাই আরিফের এরকম রেজাল্টের একমাত্র কারণ। এরকম সাদামাটা রেজাল্ট নিয়ে বাংলাদেশের কোনো প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার সুযোগই নাই, মেডিকেল কলেজ তো আরিফের ধরা ছোঁয়ার বাইরে, বাকি থাকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ। আরিফ বাংলাদেশের প্রায় সবকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে। অত্যন্ত দুঃখ্য জনক হলেও এটাই সত্য যে, আরিফের কোথাও চান্স হয়নি। এমনকি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েও নয়। কারণ সে অঙ্ক ছাড়া আর কোনো বিষয় ভাল পারে না। তাই তার বর্তমান অবস্থান বি.এস.সি পাস কোর্স। এখানেও তার রেজাল্ট ভাল না, শুধু গণিত বিষয় ছাড়া। বেচারা আরিফ তার জীবনের কোনো ধাপেই মূল্যায়ণ পেল না। আমাদের দেশে প্রায়ই গণিত অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত হয়। কপাল পোড়া আরিফ মফশ্বলের ছাত্র গণিত অলিম্পিয়াডের নামই শোনেনি। গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ গ্রহণ করলে আর না হোক একটা মূল্যায়ণ তো পেতে পারত।
এটা হল একজন গণিত পাগল ছাত্রের করূণ কাহিনী। এদেশের কজনই বা এরকম আরিফদের চেনে, কজনই বা তাদের খবর রাখে। অথচ আপনি-আমি কেন, খোদ বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকারী ছাত্র কিংবা ছাত্রিও আরিফের সাথে গণিত যুদ্ধে পেরে উঠবে না। এই আরিফকে যদি গণিত শাস্ত্রের উপর অনার্স, মাস্টার্স, পি.এইচ.ডি, পোস্ট ডক্টরেট সম্পন্ন করার সুযোগ করে দেয়া যেত তাহলে হয়ত বাংলাদেশ পেত জাঁ-পিয়েরে সেরে, স্যার মাইকেল ফ্রান্সিস এতিয়্যা, ইসাডোরে এম. সিঙ্গার, পিটার ডি. ল্যাক্স, লেনার্ট কার্লেসন, শ্রীনিভাষা সিনিয়র ভারাধান, জন গ্রিগস থম্পসন, জ্যাকস টিটস, মিখাইল লিওনিডভীচ গ্রোমভ, জন টরেন্স টেইট, জন মিল্নরের মতো অ্যাবেল (কেবল গণিতশাস্ত্রে অসাধারণ কীর্তির জন্য ঘোষিত পুরষ্কার, যা ২০০৩ সাল থেকে প্রতি বছর প্রদান করা হচ্ছে) বিজয়ী জগদ্বিখ্যাত একজন গণিতজ্ঞ, আরিফ। কিন্তু হায়! আমরা যদি চাই আরিফকে সেই সুযোগ করে দিতে, তাহলে প্রথমেই বাধ সাধবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। কারণ আরিফ বর্তমানে যে পর্যায়ে আছে সেখান থেকে গণিত শাস্ত্র নিয়ে পড়ার কোনো রাস্তাই তার সামনে খোলা নেই।
এ তো কেবল গণিতের আরিফের কথা লিখলাম। বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জের আনাচে-কানাচে শুধু গণিতের নয় পদার্থবিদ্যার, রসায়নবিদ্যার, জীববিদ্যার, অর্থনীতির, যুক্তিবিদ্যার, বাংলার, ইংলিশের কত শত শত হাজার হাজার আরিফ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যারা সবকটি নয় ঐ একটি বিষয়ের উপর পারদর্শি, যারা নিজেদের প্রতিভার মূল্যায়ণ পায় না প্রাতিষ্ঠানিক সিকৃতির অভাবে, যারা প্রতিভাবান হওয়া সত্ত্বেও কেউ তাদের চিনে না, যারা জাতিকে কিছু দেওয়ার ক্ষমতা রাখলেও দেওয়ার সুযোগ পায় না।
যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো জাতি গুণের সমাদর করতে শিখবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত সে জাতি উন্নত হতে পারবে না। ১৯৫২ সালে আমরা একটা ভাষা পেয়েছি, ১৯৭১ সালে পেয়েছি একটা স্বাধীন ভূ-খন্ড। এই ভূ-খন্ডকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার দায়িত্য আমাদের। আসুন আরিফদের পাশে দাড়াই, তাদের সাহায্য করি, তাদের জন্যই শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলি। শুধু গণিতের কেন? অলিম্পিয়াড আয়োজন করি প্রত্যেক বিষয়ের। কিংবা এস.এস.সি ও এইচ.এস.সি এর রেজাল্ট নয়, শুধুমাত্র ভর্তি পরীক্ষাই হোক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির একমাত্র পন্থা। যে ভর্তি পরীক্ষায় থাকবেনা মুখস্তবিদ্যার বালাই। যে ভর্তি পরীক্ষা হবে শুধুমাত্র মেধার লড়াই। এতে করে কমে যাবে কোচিং সেন্টারের দৌরাত্ব। ছাত্র-ছাত্রিরা ছুটবেনা স্যারের বাসায় প্রাইভেট পড়ার জন্য। তারা যা করবে নিজে থেকে করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে অসাধারণ মেধাবি ছাত্র-ছাত্রি, অসাধারণ মুখস্তবিদ্যার অধিকারী কিংবা অধিকারীনি নয়।
আমি একজন মূর্খ লেখক, এটাই স্বাভাবিক যে আমার লেখার পাঠক হিসেবে আমি পাব না কোনো শিক্ষাবিদকে, শিক্ষামন্ত্রীকে কিংবা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, ড. আবু আহমেদ, ড. মাহমুদুল্লাহ কিংবা ড. রেহমান সুবহানের মতো বুদ্ধিজীবিদের, যারা আরিফদের উপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেন। কিন্তু এমন কাউকে তো পাব, যারা একদিন ঐ পর্যায়ে যাবেন। তাদের কাছে আমার আকুল আবেদন – ভুলে যাবেন না আরিফদের, সয়ং ভাগ্য দেবতাও তাদের পাশে নেই, তারা বড় অসহায়।
-দেশের ঝোপ ঝাড়ে লুকিয়ে থাকা আরিফদের প্রতিনিধি-
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে আগস্ট, ২০১১ বিকাল ৪:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



