আমার কোন অভিযোগ নেই ।ছোটবেলায় মা যেমন শিখিয়েছেন - প্রতিবাদ আমার ধাতে সয়না ।মাকে দেখেছি চারপাশের বিস্তর অভিযোগের মুখে অবলিলায় হাসি ধরে রাখতেন । বাবাকে দেখিনি কোনদিন । শুনেছি আমি গর্ভে আসার সাতমাস পর সাপের কামড়ে মৃত্যু হয়েছিল বাবার । আমার এ জীবনে বাবা শব্দটি একেবারেই অপরিচিত-ভীনদেশী । মা-ই আমার জগৎ ।
স্বামীহীন সংসারে প্রতি পদে পদে কাঁটা, বিদ্রুপ আর প্রতারণার ফাঁদ গলে মা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিলেন আমাকে নিয়ে ।দাদা বাড়ির লোকজন যখন তখন বিদ্রুপ করত আমাকে, মাকে, আমার জন্মকে । মাঝে মাঝে মন বিদ্রোহী হয়ে উঠত । মাকে বলতাম, চল নানা বাড়ি চলে যাই । ওখানে কেউ আমাদের বিদ্রুপ করবেনা ।
নানা বাড়ি ! কখনো যাইনি আমি সেখানে । মায়ের কাছে শুনেছি, আমার নানার বেশ নাম ডাক ছিল পাঁচ গ্রামে ।কিন্তু নানা বাড়ি যাবার বায়না ধরলেই মা চুপসে যেতেন । অনেক পরে জেনেছি, নানার অমতে বিয়ে করেছিলেন মা । লুকিয়ে, বংশের মুখে চুনকালি মেখে । বাবার মৃত্যুতে মায়ের একূল ওকূল সবই গেছে । একমাত্র আমিই ছিলাম তার আশার প্রদীপ ।
কলেজের পথে প্রতিদিনই ওরা আমাকে বিরক্ত করত ।প্রথম প্রথম বেশ কান্না পেত ।বাড়িতে ফিরে মাকে লুকিয়ে কেঁদেছি অনেক ।বখাটেদের উল্লাস আর নপুংশকদের সহানুভূতি - একটা সময় নিত্যদিনের রুটিন হয়ে দাঁড়ায় । আমি ধীরে ধীরে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলাম । কিন্তু ওদের অসভ্যতা দিন দিন মাত্রা ছাড়িয়ে গেল । সেদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে ওরা আমার পথ রোধ করে দাঁড়ায় । আমি সাহসে ভর করে এগিয়ে যাই ।অশ্রাব্য খিস্তি খেউড় উড়ে আসতে থাকে আমার দিকে । আমি মাথা নত করে পার হচ্ছি প্রতিদিনকার পুলসিরাত । হঠাৎ আমার সমস্ত শরীরে অচেনা অনুভব ছুঁয়ে গেল । তীব্র জ্বালা শক ওয়েভের ক্ষিপ্রতায় ছড়িয়ে পড়ল সমগ্র দেহে ।আমি থমকে গেলাম ।জীবনে প্রথম উচ্চারণ করলাম 'বাবা তুমি কোথায় ?' আমার জগৎ অন্ধকার হয়ে গেল ।বোধশূণ্য আমি যেন হারিয়ে গেলাম দূরে কোথাও ।
আজ আমি সূর্য দেখিনা ।সবুজ দেখিনা । কেবল অন্ধকার দেখি ।আমার চারপাশে কেবলই আঁধারের উৎসব ।নিজের জন্য আর ভাবিনা কিছুই ।মায়ের দেখানো স্বপ্ন-বড় হয়ে ডাক্তার হবো- আর টানেনা আমাকে ।বোধহীন, চেতনহীন, অস্তিত্বহীন জড়ে পরিণত হয়েছি আমি ।মাঝে মাঝে শুধু মায়ের জন্য বুকের কোণে কষ্টরা ডানা ঝাপটায় ।মায়ের জীবনের একমাত্র বাতিঘরটাও দিকভ্রষ্ট হয়ে গেল !
(একটি ইমপ্যাথি প্রচেষ্টা )

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


