somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আদালত অবমাননা, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং অন্যান্য

২৬ শে আগস্ট, ২০১০ দুপুর ২:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমরা আইন শ্রদ্ধা করি । করতে চাই আজীবন । কিন্তু এই চাওয়াটাকে বাস্তব করার দায় কি একা আমাদের ? আইনের নিজের কোন দায় নেই ? বলছিলাম আদালত অবমাননার কথা। এর বিধানগুলো এখনো সুনির্দিষ্ট নয়।

২০০৮ সালে জরুরি অবস্থার মধ্যে ১৯২৬ সালের আদালত অবমাননা আইনটিকে বাতিল করে একটি নতুন অধ্যাদেশ দেওয়া হয়। আমরা কিছু দিকনির্দেশনা পেয়েছিলাম তাতে। কিন্তু পরবর্তিতে সেই অধ্যাদেশ বাতিল করে হাইকোর্ট রায় দেয় । তাতে বলা হয় আদালত অবমাননা হয়েছে কি হয়নি তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব একমাত্র আদালতের। কোন অধ্যাদেশের মাধ্যমে তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

ফলে আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব হচ্ছেনা কিসে আদালত অবমাননা হয় আর কিসে হয়না। আমাদের প্রথাগত জ্ঞান আর বিচার বুদ্ধি দিয়ে তা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। কারণ আদালতের সম্ভ্রম আর আমাদের সম্ভ্রমের মধ্যে দুস্তর ব্যবধান। সুতরাং সিমারেখাটা আদালতের নিজে টেনে দেয়াটাই সবার জন্য মঙ্গলজনক।

সংবিধান আমাদের বাক স্বাধীনতা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছে । আমরা তাতে সংবিধানের প্রতি কৃতজ্ঞ । এই পোড়া দেশে যেখানে দু-বেলা পেটপুরে অন্ন সংস্থানের জন্য মাথা কুটতে হয় সেখানে বাক স্বাধীনতাকে বাহুল্য মনে হলেও সংবিধান এই অধিকার দিয়ে যে গোটা জাতির অনেক বড় উপকার করেছে তা বোধ করি কেউই অস্বীকার করবে না ।

সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বলা আছে- (২) রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে ।
(ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের, এবং (খ) সংবাদ ক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল ।

পাশাপাশি সংবিধানে এও বলা আছে (১০৮ অনুচ্ছেদে) - সুপ্রীম কোর্ট একটি “কোর্ট অব রেকর্ড” হইবেন এবং ইহার অবমাননার জন্য তদন্তের আদেশদান বা দন্ডাদেশদানের ক্ষমতাসহ আইন সাপেক্ষে অনুরূপ আদালতের সকল ক্ষমতার অধিকারী থাকিবেন ।

সুতরাং আমাদের জানা দরকার “সদা সত্য কথা বলিবে ” এই টাইপের কথা গুলো কখন মানা যাবেনা । কোন কোন ক্ষেত্রে বাক এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রয়োগ করলে তা আদালত অবমাননা বলে গণ্য হবে । আমরা তো বিনম্র, সংযত এবং মার্জিত হয়েই থাকতে চাই। শুধু আদালতের একটু দিক নির্দেশনা প্রয়োজন।

আমরা এটা সুনির্দিষ্ট করে জানতে চাই কোন কোন প্রেক্ষিতে কোন কোন কথা বললে বা কাজ করলে তাতে আদালত অবমাননা হবে ! আমাদের সত্য বলার পরিধিটুকুও তাতে স্পষ্ট হয়ে যাবে আশা করি । তাছাড়া আমাদের এ ব্যাপারেও যথেষ্ঠ আগ্রহ আছে ঠিক কোন কোন বিষয়গুলোতে আদালত বিব্রত বোধ করতে পারবেন । আমি আগ্রহের কথা বললাম কারণ এটা আমার অধিকার কিনা সেটাও আমরা জানিনা । আমাদের বয়স হয়েছে ঢের । আমাদের অনেক কিছুই জানা থাকার কথা ছিল । অথচ আমরা অনেক কিছুই জানিনা । এর দায় কে নিবে ?

এই যে না জানানো, এতে কি আদালত কোন সংকটে পড়ছে? আদালত কেন নিজেকে এই বিপদের দিকে ঠেলে দিবে ? আদালত যেহেতু মানুষ দ্বারা চালিত তাই মানুষের ব্যক্তিক আবেগ, অনুভূতি, রাজনৈতিক মতাদর্শ, ধর্মীয় বিশ্বাস আদালতকে প্রভাবিত করতে পারে। আদালত কেন নিজের জন্য এই কন্টকময় রাস্তাকে আরো কন্টকাকীর্ণ করে রাখবে ? আদালত কি নিজের সীমানা নিজেই নির্ধারণ করতে পারে না ? পারে না আমাদের বাক স্বাধীনতার সীমা নির্ধারণ করতে ?

একটা জাতির মধ্যে কিছু দুর্ভাষী, অপ্রিয় কথক থাকতেই পারে । তারা জনসমুদ্রের মাঝে দাঁড়িয়ে শত তিরস্কার, লজ্জা আর ভয়কে তুচ্ছ করে বলতেই পারে “রাজা তোর কাপড় কোথায় ?” কিন্তু আগেই যদি তাদের জানিয়ে দেয়া যায় রাজার দিকে ওভাবে অঙ্গুলি তোলা যাবেনা । কিংবা রাজা সম্পর্কে সত্য হোক মিথ্যা হোক এ জাতীয় কথা বলা যাবেনা । বললে তোমার কপালে এ ধরনের জিল্লতি আছে। তাহলে সেই দুর্বাক তার অপবাক থেকে আমাদের রেহাই দিতে পারে । পারে নিজের জিহ্বাকে সংযত রাখতে । আদালতও পরিত্রান পায় জানানোর দায় থেকে । সংবিধানের ব্যাখ্যাকার হিসেবে এ দায় কি আদালতের উপর বর্তায় না ?

আমরা মাঝে মাঝে বিভিন্ন জাতীয় দিবসে একটা গান শুনি “বিচারপতি তোমার বিচার করবে কারা ? আজ জেগেছে এই জনতা।” এই গানে আদালত অবমাননা যখন হয়না তখন মনে বড় সাহস পাই । মনে হয় আমাদের আদালত নিশ্চয়ই এত ঠুনকো নয় যাতে সামান্য একটু কথার এদিক ওদিকেই তার অবমাননা হবে ! এছাড়া আমাদের একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে যখন বিচারপতিদের বিরুদ্ধে লাঠি মিছিল হয়েছিল তখনো কোন আদালত অবমাননার মামলা হয়নি । আমরা অবাক হইনি ।

আমরা সবাই জানি বিচারপতি নিয়োগের প্রক্রিয়াটা রাজনীতি প্রভাবিত। সংবিধানই এ অধিকার দিয়েছে। ৯৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারকগণ রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হইবেন।” আবার ২২ অনুচ্ছেদে বলা আছে “রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন।” রাষ্ট্র তা নিশ্চিত করেছে আমরা দেখেছি । কিন্তু বিচার বিভাগ স্বাধীনতার সুফল পাচ্ছেনা। কারণ ঐ নিয়োগ প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রপতি নিজেই রাজনীতি প্রভাবিত হওয়ার কারণেই এই বিপত্তি ঘটছে।

আরো সিমাবদ্ধতা আছে বিচার বিভাগের। বিচার বিভাগ যে তথ্যের ভিত্তিতে রায় প্রদান করে তা যাচাইয়ের নিজস্ব কোন ব্যবস্থা বিচার বিভাগের নেই। ফলে তাকে নির্ভর করতে হয় মামলার আইও, আইনজীবী এবং সাক্ষীদের উপর (যাদের বিরুদ্ধে প্রভাবিত হওয়ার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে)। ফলে ঘটনা বা বিষয়ের সত্যাসত্যের চেয়ে আদালতের কাছে বড় হয়ে উঠে যুক্তি প্রদর্শনে পারঙ্গমতা ।

আমরা নিকট অতীতে আইনজীবীগণ কর্তৃক আদালত কক্ষ ভাঙচুরের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি। যেই আইনজীবীগণ পরবর্তিকালে বিচারপতি হতে পারবেন, যারা আইনের নামে দন্ড দিতে পারবেন তারাই সেই ঘটনা ঘটানোয় আমরা শিউরে উঠেছিলাম। আমরা অবশ্য আশ্বস্ত হয়েছিলাম এই ভেবে যে, তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা হয়েছে। রায় যদিও তাদের পক্ষে গেছে। তবু মামলা তো হয়েছে। এতেই আমরা সুখী থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের মন-মনন আর চিন্তার সুখকে জাহান্নামে পাঠিয়ে সেই মামলার আসামীদের মধ্য হতেই বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হল। আমরা হয়ে পড়লাম ভাষাহীন। কোন অরণ্যে গিয়ে রোনাজারি করব এখন? আমরা আরো দিশেহারা হলাম যখন জানলাম একজন খুনের মামলার আসামীও আছেন এই তালিকায়। হা আমাদের রাজনীতি! কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে আমাদের ?

এই যে আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং খুনের মামলার আসামী আইনের মহামহিম নামে আমাদের সত্য ও ন্যায়ের কথা শুনাবে। এটা কি একটু অদ্ভুতুরে মনে হচ্ছেনা আদালতের কাছে ? স্বাধীন বিচার বিভাগ কেন সহ্য করবে এই সৃষ্টিহীন তান্ডব ? স্বাধীনতার পরেও কেন এই পরাধীনতা ? আমরা আশা করবো এখনো যে সিমাবদ্ধতাটুকু আছে- তা দ্রুত কাটিয়ে উঠে পূর্ণ স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদন করবে বিচার বিভাগ! আমাদের মুক্তি দিবে রাজনীতির পাতা ফাঁদে পড়ে আদালতকে অসম্মান করার হাত থেকে । এবং কলঙ্ক মুক্ত রাখবে বিচারকদের সুউচ্চ আসন ।
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×