somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফিরিয়ে দিন আমার পরিচয় (ব্যাংক হিসাবধারীদের জন্য অবশ্যপাঠ্য)

০৬ ই এপ্রিল, ২০১১ বিকাল ৪:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রায় কুড়ি বছর আগের ঘটনা। ভারতের একটি ব্যাংকের একজন মেসেঞ্জার কয়েক কোটি রুপি ফ্রড করেছিল। ঘটনাটা সেবা প্রকাশনীর রহস্য পত্রিকার পাঠকদের নজরে এসে থাকতে পারে। ঘটনাটা এরকম-

সেই মেসেঞ্জার কয়েকটি ব্যাংকে একাউন্ট খোলে। তার নিজের ব্যাংকেও একটি একাউন্ট খোলে। (সবগুলোই ভুয়া পরিচয়ে) সে নিজ ব্যাংকের ওই একাউন্টের চেক বিভিন্ন ব্যাংকে খোলা হিসাবে জমা দিতে থাকে। চেকগুলো যখন ক্লিয়ারিং হাউজে আসত সেখান থেকে চেকগুলো ওই মেসেঞ্জারই নিয়ে আসত তার ব্যাংকে। পথে সে চেকগুলো ছিঁড়ে ফেলে দিত। তখন ইন্টারব্যাংক রিকনসিলেশন অতটা উন্নত না থাকায় ফ্রড ধরতে অনেক সময় লেগেছিল। পরে সেই কেস গোয়েন্দাদের হাতে দেয়া হলে তারা মেসেঞ্জারের লাইফ স্টাইল দেখে তাকে সনাক্ত করতে সক্ষম হয়। তবে সে একজন সামান্য ম্যসেঞ্জার হয়ে এত বড় ফ্রড করতে পারায় তাকে আদালত শুধু জরিমানা করেই ছেড়ে দেয়। সে জরিমানার টাকা দিয়ে মুক্তি পেয়েছিল।

----------------------------

কারো কারো দরকার হতে পারে বিবেচনা করে ক্লিয়ারিং হাউজের কার্যাবলী একটু আলোচনা করছি- ক্লিয়ারিং হাউজের আওতায় থাকা সবগুলো ব্যাংকই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা তার প্রতিনিধির কাছে একটা হিসাব মেইনটেইন করে। যখন কোন ব্যাংকের কাছে অন্য ব্যাংকের চেক উপস্থাপিত হয় তারা তা ক্লিয়ারিং হাউজে জমা দেয়। ক্লিয়ারিং হাউজ কর্তৃপক্ষ তখন যেই ব্যাংকের চেক তাদেরকে সেই চেক দিয়ে দেয় এবং সমপরিমান টাকা তাদের একাউন্ট থেকে পাওনাদার ব্যাংকের একাউন্টে ট্রান্সফার করে দেয়। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক আবার সেই চেক তাদের সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঠায়। যদি সেই একাউন্টে ব্যালান্স থাকে তাহলে চেক পাশ হয়। আর যদি একাউন্টে টাকা না থাকে তাহলে চেক ফেরত আসে। চেক ফেরত আসলে ক্লিয়ারিং হাউজ কর্তৃপক্ষ যেই ব্যাংকে ওই চেক জমা পড়েছিল তাদেরকে চেক ফেরত দেয় এবং সমপরিমান টাকা আবার আগের মতই আগের ব্যাংকে ফেরত দিয়ে দেয়। চেক যথানিয়মে যেই শাখায় জমা পড়েছে সেই শাখায় ফেরত চলে আসে।

এখানে সমস্যা হলো কোন চেক পাশ হলো কি ফেল হল তার জন্য কোন কনফারমেশনের ব্যবস্থা নেই। কেবল চেক ফেরত আসলেই ধরে নেয়া হয় যে চেকটা পাশ হয়নি আর ফেরত না আসলে ধরে নেয়া হয় যে চেকটা পাশ হয়েছে। এই ফোকড়টুকুরই সুবিধা নিয়েছিল ভারতের সেই ম্যাসেন্জার। এবং অবাক করা ব্যাপার হলো একই রকম একটা ফ্রডের ঘটনা গতবছর আমাদের দেশেও ঘটেছে। (আমি বলছিনা তারা রহস্য পত্রিকার গল্পটা পড়েই প্রেরণা পেয়েছে)

----------
আমাদের দেশের ঘটনাটা এরকম-

কয়েকটি প্রাইভেট ব্যাংকের ঢাকার বিভিন্ন শাখায় বিভিন্ন পরিচয়ে একাউন্ট খোলে একটি জালিয়াত চক্র। একাউন্ট খোলার সময় তারা স্থানীয় প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পরিচয় নিয়ে একাউন্ট খোলে। এই ব্যবসায়ীরা আবার সহজ সরল ভাল মানুষ। তারা কোন সন্দেহ না করে পরিচয় দিয়ে দেয়। এই একাউন্টগুলোতে সোনালী ব্যাংকের ঢাকার একটি শাখার বেশ কয়েকটি চেক বিভিন্ন সময়ে জমা হয়। চেকগুলো ফেরত না আসায় স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেয়া হয় যে চেকগুলো পাশ হয়েছে। ফলে যথানিয়মে তাদের একাউন্টে সমপরিমান টাকা জমা হয়ে যায়। এভাবে প্রায় কোটির উপরে টাকা ফ্রড হবার পর সোনালী ব্যাংক জানতে পারে যে, বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত তাদের হিসাবে এই পরিমান টাকা গরমিল হচ্ছে। তখন তারা বিষয়টি নিয়ে তদন্তে নামলে বেরিয়ে আসে ফ্রডের ঘটনা।

---------------------------

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে চেক নিয়ে যাওয়ার পর সংশ্লিস্ট শাখায় সেই চেক পৌঁছায়নি। পথেই কোথাও ফেলে দেয়া হয় চেক। যার কারণে চেক ফেরত যায়নি বাংলাদেশ ব্যাংকে। এই ঘটনার সাথে যতদুর জানা গেছে, সাত আটটি ব্যাংক জড়িত হয়ে গেছে। প্রায় অর্ধশত নিরপরাধ ব্যাংক কর্মকর্তা এবং গ্রাহকও এই ঘটনায় জড়িয়ে গেছেন।

-----------------

যেভাবে এড়ানো যেত এই ফ্রড:
০১. সোনালী ব্যাংক যদি প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে তার স্থিতির পরিমান যাচাই করত। তাহলে সর্বোচ্চ একটি বা দুটো চেক ফ্রড হবার পরপরই ফান্ডের অমিলের বিষয়টি নজরে আসত। এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হত।

০২. চেক পাশ নাহলে যেমন চেক ফেরত আসে তেমনি যদি এমন নিয়ম থাকত যে, চেক পাশ হলে একটি কনফারমেশন লেটার (সংশ্লিষ্ট শাখা প্রধানের স্বাক্ষরিত) বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাতে হবে, বাংলাদেশ ব্যাংক সেই লেটার পাওয়ার পরই কেবল ফান্ড ট্রান্সফার করবে। তাহলে পথে চেক হারিয়ে গেলে বা চুরি হলেও কোন সমস্যা ছিলনা। সংশ্লিষ্ট একাউন্ট ডেবিট হবার পরই কেবল তা সংশ্লিষ্ট একাউন্টে ক্রেডিট হতো।

-------------------
ব্যাংকিং যে নিয়মগুলো পরিবর্তন করা জরুরী-
০১. প্রতিটি শাখায় ইন্ট্রোডিউসারদের তালিকা মেইনটেইন করা। যদি কেউ জানতে চায় এ পর্যন্ত সে কাকে কাকে পরিচয় দিয়েছে তাহলে যেন সহজেই সে তা জানতে পারে।
০২. ইন্ট্রোডিউসার যদি চায় যখন তখন তার দেয়া পরিচয় সে বাতিল করতে পারবে। তখন সংশ্লিষ্ট হিসাবধারী নতুন ইন্ট্রোডিউসার না আনা পর্যন্ত তার হিসাবে সকল লেনদেন বন্ধ থাকবে।
০৩. ক্লিয়ারিং চেক পাশ হোক বা পাশ না হোক সব ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট শাখা প্রধানের স্বাক্ষর সম্বলিত একটি কনফার্মেশন লেটার বাংলাদেশ ব্যাংক বা প্রতিনিধি ব্যাংকে পাঠাতে হবে।

--------------
আমাদের করণীয়-
যদি কাউকে না জেনে পরিচয় দিয়ে থাকি, এক্ষুণি তা বাতিলের জন্য সংশ্লিষ্ট শাখায় আবেদন জানানো। আরেকজনের পাপের ভাগী আমি হতে যাব কেন ? সুতরাং যার যেখানে একাউন্ট আছে সেখানে গিয়ে হিসাব চান যে আপনি এ পর্যন্ত কাকে কাকে পরিচয় দিয়েছেন। যদি তারা সে হিসাব না দিতে পারে (জানি পারবেনা) তাহলে একটা এপ্লিকেশন দিয়ে আসেন, সেখানে উল্লেখ করুন- আমি ইতোপূর্বে যত একাউন্ট ইন্ট্রোডিউস করেছি সব বাতিল করলাম। ওই সব একাউন্টে ভবিষ্যত কোন ফ্রডের জন্য আমি কোনভাবে দায়ী থাকবনা।

যেহেতু এখনো পরিচয় বাতিলের নিয়ম করেনাই বাংলাদেশ ব্যাংক, তাই সবচেয়ে ভাল হয় যদি বিষয়টা বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্টদের কানে তোলা যায়। আর যদি কেউ জনস্বার্থে হাইকোর্টে একটা মামলা কিংবা একটা সাংবাদিক সম্মেলন করে সাধারণ গ্রাহকদের ভোগান্তির এই বিষয়টা কর্তৃপক্ষের নজরে আনতে পারেন তাহলে আরো ভাল হয়।

সবশেষে আমি বলব, আমরা নিরুদ্বেগ ব্যাংকিং চাই। জেল-জরিমানার জুজু ঝুলতে থাকা ব্যাংকিং থেকে পরিত্রান চাই।
১০টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×