আজ থেকে দশ বছর আগের কথা। সবে মাত্র অষ্টম শ্রেনী থেকে নবম শ্রেণী উঠেছি। ক্লাসও তখন শুরু হয়নি। বরাবরই সেই তৃতীয় শ্রেণী থেকেই আমি সব পরিক্ষায় তৃতীয় স্থান অধিকার করে আসছি। কিন্তু অষ্টম শ্রেণীতে এসে প্রথম ও দ্বিতীয় সাময়িক পরিক্ষায় আমি দ্বিতীয় স্থান অধিকার করি। প্রথম হয় শিমুল আর তৃতীয় হয় আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম বন্ধু প্রসূন। জানের-প্রাণের বন্ধু ও আমার। আমি যে স্কুলে পড়তাম অষ্টম শ্রেণীতে প্রসূন সে স্কুলে ভর্তি হয়। প্রসুনে ভর্তি রোল ছিল ৭২। সবাই ধারণা করলো নবম শ্রেণীতে শিমুল হবে প্রথম, আমি দ্বিতীয় আর প্রসূন হবে তৃতীয়।
কিন্তু ফলাফল উল্টা হলো শিমুল প্রথম হলেও দ্বিতীয় হলো প্রসুন আর চিরস্থায়ী তৃতীয় স্থানটি রইলো আমার। আমরা সবাই ফলাফলে খুশি কিন্তু প্রসুন খুশি হতে পারলো না। প্রসুন মানতে পারলো না যে আমি তৃতীয় হবো আর প্রসুন দ্বিতীয়।আমি কেন দ্বিতীয় হলাম না এটায় প্রসুনের কষ্ট। অনেক চেষ্টা করে প্রসুন আমার রোল দুই করার চেষ্টা করলো যা আমি জানতাম না। অবশেষে প্রসুন নতুন ক্লাস অর্থ্যাৎ নবম শ্রেণীতে নতুন করে ভর্তি হলো না। যাতে আমার রোল ২ হয়ে যায়। কিন্তু প্রসুন এর বাবা মা প্রসুন কে অন্য স্কুলে ভর্তি করতে চাইলেন। কিন্তু প্রসুন বললো যে স্কুলে আমি আর রানা একসাথে পড়তে পারবো না সে স্কুলে আমি কেন একা পড়বো।
অবশেষে প্রসুন সিদ্ধান্ত নিল যে ও ভারতে চলে যাবে এবং ঐখানে পড়ালেখা করবে। ব্লগার ভাইয়েরা জানেন ঐ বলদ ভেবেছিল আমার রোল ২ হলে আমি হয়তো অনেক খুশি হবো কিন্তু আমাকে খুশি করতে বদলটা বড় কষ্টটায় আমাকে দিয়েছিল। প্রসুন ভারতে চলে গেলে যে আমি কত কষ্ট পেয়ে ছিলাম তা কাউকে বোঝাতে পারিনি। এমন কোন দিন ছিল না যে দিনটাতে প্রসুনকে মনে পড়েনি প্রসুনের সাথে আমার পরানো স্মৃতি গুলো মনে পড়েনি। এই দীর্ঘ দশ বছরে প্রসুন মাত্র একবার বাংলাদেশে এসেছে কিন্তু দূর্ভাগ্য আমার সাথেই দেখা হয়নি। আমি তখন ইন্টারমিডিয়েট পড়ছি ক্যান্টনমেন্ট কলেজে।
প্রসুন ভারতে ফিরে যাবার পর দিন আমি গ্রামে যাই আর জানতে পারি প্রসুন এসেছিল আমাকে অনেক খুজেছে। এর পর আরো এই দশ বছরে প্রসুনকে আর দেখা হয়নি ওর সাথে কথা হয়নি। মাঝে মাঝে ভাবতাম আমি প্রসুনকে যতটা মিস করি ও কি আমাকে এতোটা মিস করে???? ওকি আমার অভাব অনুভব করে? আবার ভাবতাম অবশ্যই করে আমি করলে ও কেন করবেনা???? আবার ভাবতাম না মনে হয় করে না করলে আর একবার দেশে আসতো আমার সাথে দেখা করতো।
কিন্তু আমার সব প্রশ্নের উত্তর এই দশ বছর পর পেয়েছি গত কাল রাতে। অফিস থেকে বাসাই যেয়ে গোসল করতে ঢুকেছি এমন সময় দুইটা কল এসেছে আমার সেল ফোনে। গোসল শেষে বের হওয়ার সাথে সাথে আবারও ঐ নম্বর থেকে কল। দেখি নম্বরটি ভারতের। রিসিভ করার আগে বুঝতে পারিনি কে। কল রিসিভ করার সাথে সাথে ঐ প্রান্ত থেকে একটি কন্ঠ বলছে, অনুমান করতো সাংবাদিক আমি কে? নম্বরটা দেখে বুঝতে পেরেছিস এটা বাংলাদেশের নম্বর না। তাহলে বল আমিকে? বলতে পারলে বুঝবো তুই কেমন সাংবাদিক। উত্তরে আমি একটা সেকেন্ড দেরি করিনি, আমার মুখ নয় মন বলেদিল এটা প্রসুন। সাথে সাথে বললাম তুই প্রসুন, কান্না কান্না কন্ঠে বললো তুই ১০ বছর পরেও আমার কন্ঠ চিনতে পারলি। আমি বললাম তুই কি আমার কন্ঠের কোন পরিবর্তন পেয়েছিস। প্রসুন বললো না। তোর কন্ঠ যে সব সময় আমার কানে বাজে। এটা ভুলে যাবার না।
আর্চায্য রকম মিল আমাদের। আমরা দুজনেই সাংবাদিকতা করছি। সারা রাত কথা বললো আমার সাথে প্রসুন। সব মনে আছে ওর সব স্মৃতি প্রসুনের মনে আছে। অনেক কষ্ট করে প্রসুন আমার নম্বর সংগ্রহ করেছে।
আমার মতো প্রসুন বিশ্বাস করতো পৃথিবীতে সব কিছু আমি ভুলতে পারবো কিন্তু প্রসুনকে নয়।
ব্লগার ভাইয়েরা আমাদের এই বন্ধুত্ব কি কোন নির্দিষ্ট দিনের জন্য। আমাদের বন্ধুত্বের জন্য কি বন্ধু দিবসের দরকার পড়ে। আমাদের বন্ধুত্ব আত্মার মনের।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



