somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দশ মনিটি (গল্প)

২৪ শে অক্টোবর, ২০০৮ দুপুর ১:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কালের খেয়া, সমকাল (২৩-১০-২০০৮) লিংক
http://www.shamokal.com/details.php?nid=98666

একটা অজানা আলো এসে পড়েছে সেয়ন্তীর মুখে। আলোটা ঠিক তীব্র নয়। আবার ক্ষীণও নয়। তবে তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।
সেয়ন্তী একটা স্টেজে বসে আছে। তার গায়ে একটা লেহেঙ্গা। আধুনিক বিয়েতে এখন সবাই এমন লেহেঙ্গা পরে। এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিত্রক্রম হয়নি। যদিও প্রচণ্ড গরমে অস্থির সে। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই।
কমিউনিটি সেন্টারের লবিতে একদল শিশু প্রচণ্ড হই চই করছে। বড়রাও নানা আলাপে মত্ত। পাশাপাশি চলছে ফুল ভলিউমে গান। শ¦েন্ধর কল্ফি^নেশনে একটা অদ্ভুত নীরবতা ঘিরে ধরল তাকে। এত কোলাহল, অথচ সে চুপ করে বসে আছে। এসব কিছুই তাকে স্পর্শ করছে না।
সেয়ন্তী বসে আছে ঘোমটা টেনে। ঠিক ঘোমটা না। লেহেঙ্গার সাথে দেয়া ওড়না মাথায় ঝুলিয়ে দিয়েছে। এখন সে তার মেহেদি রাঙা হাত ছাড়া কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। যদিও তাকে ঘিরে স্টেজে বসে আছে তার বান্ধবীরা। কিন্তু কোনো কথা হচ্ছে না। বিয়ের পাত্রীর সাথে এত কথা বলাও যায় না।
সেয়ন্তীর বিয়েটা হচ্ছে পারিবারিকভাবে। ছেলেকে সে চেনে না। এনগেজমেন্টের দিনও ভালো করে মুখ দেখা হয়নি তার। অবশ্য ছবি দেখেছে। সানগ্লাস পরে গালদোলা একটা ছেলে তাকিয়ে আছে। মুখের অর্ধেকটা ঢেকে গেছে সানগ্লাসে।
সেয়ন্তীর ভাবনাটা আরো গাঢ় হয়ে এলো। এমন একটা ছেলেকে তার বাবা কেন পছন্দ করলেন? কী এমন আছে তার মধ্যে? ভালো একটা চাকরি করে এটাই কি মহৃল কারণ? কিছুতেই হিসাব মেলাতে পারে না সেয়ন্তী।
যে ছেলেকে সেয়ন্তী কোনোদিন দেখেনি, তার আচার ব্যবহার কেমন তাও জানা নেই, তার সাথে কীভাবে থাকবে? এর চেয়ে সাজু ভাইকে তার পছন্দ ছিল। কিন্তু তাতেই বা কী আসে যায়। সে যে তাকে পছন্দ করত এটা তো কেউ জানে না। এমন কি সাজু ভাইও না।
কি সুন্দর করেই না কথা বলে সাজু ভাই। কথা বলার সময় তার চোখ দুটো হাসে। যে ছেলের চোখ হাসে তার চেয়ে সুন্দর কোনো পুরুষ কি পৃথিবীতে আছে? সেয়šøী চোখ বল্পব্দ করে দেখে। সাজু ভাইয়ের হাসি হাসি মুখ ভেসে ওঠে।
সেয়ন্তীর মনটা কেন জানি খারাপ হয়ে গেল। যে লোকটার সাথে তার বিয়ে হচ্ছে তার নাম লোকমান। পুরো নাম লোকমান হোসেন। কেমন যেন একটা ক্ষেত ক্ষেত নাম। এমন একটা মানুষকে সে স্ট^প্নেও কখনো ভাবেনি।
যেদিন আংটি পরাল সেদিন কেমন লোভীর মতো তাকিয়ে ছিল তার দিকে। যেন ক্ষুধার্থ এক বাঘ। কেবলই মাংস চাই। চাই রক্ত।
চোখের ভেতর নাকি মানুষের যাবতীয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য লেখা থাকে। সে বৈশিষ্ট্য পড়া যায় সহজেই। সেয়ন্তী কি সে বৈশিষ্ট পড়তে পেরেছে? সে তা জানে না। তবুও কেন জানি অজানা একটা ভয় তাকে ঘিরে ধরছে। অজ্ঞাত একটা কান্না এসে জমে যাচ্ছে চোখে।
সেয়ন্তী চোখ খুলে। তীব্র আলোটা আরো তীব্র হচ্ছে। কিছুতেই অজানা মানুষটাকে আপন করতে পারছে না সে। যে মানুষের মুখটাও চোখ বল্পব্দ করে দেখতে পারে না সে তার সাথে সারাজীবন কীভাবে থাকবে? বেশ কয়েকবার চোখ বল্পব্দ করে লোকমানের মুখটা ভাবার চেষ্টা করল। দেখতে পেল না। বরং ভেসে উঠল সাজু ভাইয়ের মুখ। তবে কি ভুল পথে যাচ্ছে সে?
বিয়ে মানে কী? বিয়ে মানে কি শুধু একটা আনুষ্ঠানিকতা? সামাজিক একটা বল্পব্দন, নাকি মনের গভীরের একটা উপলব্ধি। যদি মনের গভীরের উপলব্ধিই না থাকে তাহলে এমন বল্পব্দনের মানে কী?
অদ্ভুত কোলাহলটা আরো তীব্র হচ্ছে। অথচ এই কোলাহলের মাঝেই প্রচণ্ড এক নীরবতা সেয়ন্তীর মনে। যেন সুনসান নীরবতা তার হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছে। এমন সুনসান নীরবতার মাঝে কোথাও সে লোকমানকে খুঁজে পায় না।
কেন জানি অল্পব্দকার জমে যাচ্ছে মনের গভীরে । মনে হচ্ছে মা-বাবার সাথে থাকা আনন্দময় জীবন দহৃরে চলে যাচ্ছে।
জন্মের পর সেয়ন্তীদের একটা কাঠের বাড়ি ছিল। দোতলা বাড়ি। কাঠের সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠতে হতো। দোতলার বেলকনিতে বাবার কোলে বসে বৃষ্টি পড়া দেখত। ঝলমল শ¦েন্ধ অলৌকিক এক শ্বন্ধ বাবার সাথে তার আত্মার বল্পব্দন গড়ে দিত।
আর মা! সে তো আছে সংসার নিয়ে। তারপরও চা বানিয়ে আনত বাবার জন্য। বাবা এক চুমুক খেয়ে চুমুক দিতে বলত সেয়ন্তীকে। শ্বন্ধ করে চুমুক দিলে মা ধমক দিতেন। বলতেন, মেয়েদের শ্বন্ধ করে খেতে নেই।
সেই মা-বাবা, সেই আপন মানুষ। সেই কাঠের ঘর, সেই আঙিনা, সেই ছোটবেলার বৃ®িদ্ব, সেই প্রাণঢালা গ্রেট মমতা নিয়ে বড় হওয়া সেয়šøীর জীবনের কোনো অংশই লোকমান ছুঁয়ে যায়নি। যেন শত ত্রেক্রাশ দহৃরের একটা অজানা মানুষ সে।
সেয়šøী চোখ খোলে। তার ভাবনায় ছেদ পড়ে। হুড় হুড় করে একদল মানুষ এসে দাঁড়ায় ¯েদ্বজের সামনে। তাদের মাঝে বাবাও আছেন। একটু দহৃরে চাচা দাঁড়িয়ে। তার পাশেই কাজী সাহেব। তার গা থেকে ভুর ভুর করে আতরের ঘ্রাণ বের হচ্ছে। জাফরানি আতর। ঈদের দিনে বাবাও এই আতর ব্যবহার করেন।
কাজী সাহেব সামনে এসে দাঁড়াল। তার পেছনে উকিল বাবা। কাজী সাহেব মিষ্টি কণ্ঠে বলছেনÑ
‘রহিমাগঞ্জ নিবাসী আলহাজ সোলায়মান হোসেনের জ্যেষ্ঠ পুত্র মোঃ লোকমান হোসেনের সাথে বায়তুল নগর নিবাসী সালেহউদ্দিন ভূঁইয়ার একমাত্র কন্যা মোছাল্ফ§ৎ জান্নাতী বেগম সেয়ন্তীর দুই লাখ এক টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া, এ লাখ এক টাকা নগদ পরিশোধ করিয়া, এক লাখ এক টাকা বাকি রাখিয়া বিবাহ করিতে আপনি রাজি আছেন। বলুন কবুল।’
সেয়ন্তী মাথা নিচু করে বসে আছে। কাজী সাহেব বললেন, ‘বলুন মা কবুল, একটু জোরে বলুন।’
স্টেজের চারপাশে আবারো অদ্ভুত নীরবতা। সবাই কবুল শোনার জন্য অপেক্ষা করছে। সেয়ন্তী মাথা নিচু করে বসে আছে। তার ঠোঁট কাঁপছে। বুকের ভেতরের অচেনা সেয়ন্তী বারবার কেঁপে উঠছে। অজানা একটা মানুষকে বুকের একাšø আপন ঘরে আশ্রয় দিতে হবে। চোখ বন্ধ করতে করতে সেয়ন্তী বলল, কবুল।
আশ্চর্য! সেয়ন্তীর চোখের সামনে লোকমানের মুখটা ভেসে উঠল। তার মুখটা হাসি হাসি।
কাজী সাহেব আবারো মন্ত্রের মতো বিয়ে পড়ানোর নিয়ম পড়ে বললেন, বলুন মা কবুল।
সেয়ন্তীর বুকটা এবার আগের মতো কেঁপে উঠল না। যেন বুকের কোনো একটা অংশ হালকা হয়ে যাচ্ছে। অজ্ঞাত একটা সুখের বাউলা বাতাস বয়ে যাচ্ছে হƒদয়জুড়ে। সেই বাতাসে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। এলোমেলো সে বাতাসে সেয়ন্তীর চুল উড়ছে। একটু দহৃরে দাঁড়িয়ে লোকমান। হাসিমুখে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। সেয়ন্তী বলল, কবুল।
লোকমান হাত বাড়িয়ে সেয়ন্তীর হাত ছুঁয়ে ফেলল। আনন্দময় একটা কল্ফক্সন বয়ে যাচ্ছে তার হƒদয়ে। সে এখন স্বপ্ন জগতের মেঘের ভেলায় দাঁড়িয়ে। সেখানে দাঁড়িয়েই সেয়ন্তী স্পষ্ট শুনতে পেল কাজী সাহেবের কথা। তিনি তৃতীয়বারের মতো জিজ্ঞেস করলেন, বলুন মা কবুল।
সেয়šøীর চুল ছুঁয়ে একদল সাদা মেঘ উড়ে গেল। সে আস্তে আস্তে তার সব সত্তা ঢেলে দিল লোকমানের বুকে। যেন তার সব সত্তা এত বছর এমনই এক নীড় খুঁজে বেরিয়েছে। তার সত্তায় মাথা রেখেই সেয়ন্তী তৃতীয়বারের মতো বলল, কবুল।
সেয়ন্তীর মুখটা আরো উজ্জ্বল হতে লাগল। যেন আকাশ গলে জোছনা পড়ছে। সেই জোছনায় স্নাত হচ্ছে তার শরীর। আসতে আসতে চোখ খুলে সেয়ন্তী। সে এখন অন্য মানুষ।
লোকমান এখন কোথায়? ও নিশ্চয়ই অন্য স্টেজে বসে আছে। মানুষটাকে ভালো করে দেখা হয়নি। অথচ অনেক কাছের মানুষ মনে হচ্ছে সেয়ন্তীর। যেন তার অস্তিত্বের জন্মই হয়েছে শুধু তার জন্য।
আবারো চোখ বল্পব্দ করল সেয়ন্তী। লোকমানের হাসি হাসি মুখ ভেসে উঠল। এই মানুষটা কেন এত দিন এত দূরে ছিল। ভেবে পায় না সেয়ন্তী।

কালের খেয়া, সমকাল (২৩-১০-২০০৮) লিংক

http://www.shamokal.com/details.php?nid=98666
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে অক্টোবর, ২০০৮ দুপুর ২:০৪
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×