আমি কবিতার একজন সাধারণ পাঠক মাত্র। কবিতা যে খুব ভাল বুঝি এমন দাবী করার মতো যোগ্যতাও আমার নেই। কবিতা বা কবিতার বই পেলে বুঝে না বুঝেই পড়ি। অনেক সময় শক্ত ভাষার কবিতা হলে অথবা বুঝতে না পাড়লে আর আগ বাড়ি না। আলফ্রেড খোকন নামের সাথে দশ বছর আগে থেকে পরিচয়। পত্রিকায় বা লিটল ম্যাগাজিনে তাঁর কবিতা দেখলে আগে ভাগে পড়ে নিয়েছি। এযাবৎ তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা আট। ২০০৯-এর একুশে বই মেলায় প্রকাশিত বইয়ের তালিকায় আলফ্রেড খোকন: সাধারণ কবিতা বইয়ের নাম দেখে বইটি সংগ্রহে রাখার মনোবাসনা জাগে। আমার খুব কাছের মানুষ আহমেদ শিপন কে দিয়ে বইটি সংগ্রহ করি। বইমেলা থেকে শিপন ভাই ফোনে জানালো বইটি পাচ্ছেনা। আমি তখন আলফ্রেড খোকন দাদাকে ফোন দিলাম বইটি কোথায় পাওয়া যাবে জানার জন্য। বইটি এ যাবৎ কয়েকবার পড়েছি। কবিতাগুলো পড়ে সাধারণ পাঠক হিসেবে আমার ভালোলাগা পংক্তিগলো একত্রিত করলাম...
সাধারণ কবিতা কবিতাটির-
`আমি খুব সাধারণ কবিতা লিখি
এ ধরনের কবিতায়
শব্দের ওপর শব্দ উঠে খেলা করতে পারে না
যেমন মানুষের ওপর মানুষ উঠছে।'
আবশ্যক কবিতায়-
`নাম পরিবর্তনের নামে আমি কতিপয় বেদনা মুছে ফেলব;'
একই কবিতার শেষের দিকে-
`নতুন নামের হাসপাতালগুলিতে বেদনার সুচিকিৎসা হোক-
চিকিৎসকেরা ভালো সমালোচক;
এই বসন্তে আবার বিজ্ঞাপন দেব-একটি নাম আবশ্যক।'
গত রাতের ঘটনা কবিতার-
`ভালো ঘটনায় থাকে কিছু মেঘ, পুলিশ করছে লিঙ্গ চেক। পকেটে ঘুমাও, চোখও।
ছোটবেলার পুলিশরা সব কবি।'
গত শুক্রবারের ঘটনা কবিতার-
`এমনকি তোমার জন্য
বুকের বাইরে বসেনি রঙের নীল দোকান'
আবার-
`চুলটি বাদ দিলেন দৈনিকের গাঢ় সম্পাদক।'
আয়না কবিতায়-
`হাতের তালুতে ত পুষে রেখে জ্যোতিষীর কাছে যাও
বুকের ভিতর ষড়যন্ত্রের দাগ নিয়ে রঙিন কবিতা ছাপাও'
আতশ কাচের আয়না কবিতায়-
`যদিও একটি হত্যার জন্য এত গুলো পাথরের
একটি মৃত্যুর জন্য এতগুলি মানুষের এবং
একটি কথার জন্য এতগুলি বর্ণমালার প্রয়োজন নেই;
এরপর অবশ্যই তোমাকে একটি সরল অংক বলা যায়
কারণ ওই আতশ কাচের আয়না নিজে দেখে না,
অন্যকে দেখায়
আতশ কাচের আয়না, আয় না- কাছে আয়?'
পৃষ্ঠা ছেঁড়ার আওয়াজ কবিতার-
`সেই টেবিলে একজন নারী ইতিহাস বুঝাচ্ছে আঙুলে
সেই টেবিলে একজন পুরুষ ইতিহাসের পৃষ্ঠায়
কাঁঠালচাপা গুঁজে দিচ্ছে মনে মনে
বাতাস বন্ধুপ্রতিম ছিল বলে
একটি অসহায় পাপড়ি উড়ে এল আমার টেবিলে
ইতিহাসবোদ্ধা নারীর চোখ তখন সবজির পিরিচে
ফুলের নামে যে পুরুষ রুচিশীল রেস্তরায়
তার নজর টেবিলের নিচে।'
বেরঙের হাস কবিতার-
`একদিন সে আমাকে স্তন খুলে দিয়ে বলল: `খাও'
আবার-
`অথবা কল্পনার সেই এক কালো-লাল বেরঙের হাঁস
এখন মৃত আমি, জীবিত তোমরা তাই করো হাসপাস!'
প্রথম পত্র, বাঙালি নারীকে কবিতার-
`পাথর জন্মাতে পার কিনা দেখ;
মিলিত হও, একটি ধর্মগ্রন্থ লেখ।'
জানালা কবিতার-
`জানালা দিয়ে আকাশ দেখা যায়
আকাশ একটি ধারণা'
আবার-
`জানালা দিয়ে কিছুই দেখা যায় না
বাইরে যখন থাক না!'
বামের সড়ক কবিতার-
`একটি দুঃখের নাম সোনার গাঁ মোড়
একটি দুঃখের স্মৃতি মোড় থেকে ডানের সড়ক'
নির্দেশকের প্রতি কবিতার-
`অন্ধকারে কিভাবে ঝাঁপ দেয় গোপন শরীর
দেহ ব্যবহারের আগে দেহ দেখা যায় না
শব্দ ব্যবহারের আগে
কোন শব্দই চোখে পড়ে না`
মনে মনে কবিতার-
এই কবিতায় পাঁচটি লাইন আছে যার সব গুলোই ভালোলাগে।
লাইনগুলো-
`অন্ধকারে গভীর রাতে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে মনে মনে
অন্ধকারে প্রিয় গাছের ডালে পাতা ঝরে মনে মনে
অন্ধকারে হাতের আঙুল গোপনে ছোঁয় মনে মনে
অন্ধকারে রাত হয়ে যায় অনেক গভীর মনে মনে
অন্ধকারে তোমার আমার সব দেখা যায় মনে মনে'
স্পর্শকাতর কবিতার-
`পৃথিবী জাগিয়ে দিল
হঠাৎ একটি ঘুম,
ঘুম ঘুম মুখ;'
জ্বর ও ঝড় কবিতার-
`ঘুমের মুখের ওপর একটা ফড়িং
উড়ে উড়ে আমাকে জানাল:
`ঝড়'
মুখের উপরে হাত কেঁপে উঠল
গায়ে তার অদ্ভুত জ্বর।'
সম্পর্ক কবিতার-
`নেমেছি হৃদয় তেকে আরও একটু দূরে
একটা ফড়িং নামল ওই ঢেউ ছুঁয়ে ছুঁয়ে
একটা নীলতিমির বেদনা পড়েচে নুইয়ে
এতটা নামলে তুমি যাবেই তো পুড়ে!'
ক্রমশ কবিতার-
`ফুটপাথের করুণ দোকানির চোখে
যে সব অপো থাকে,'
পাড়াগামী ট্রেন কবিতার-
`আমাদের পাড়ার ভিতর দিয়ে চলে যাচ্ছে ট্রেন
পার কবিতা যদি তিনশো টাকা হয় তবে আরও
একটা বিকেল ঝুলবে লনে- একটি মেয়ে গ্রামে,
মেয়ের ভিতর ট্রেনের ভিতর কবিতা ও-ম্যান;'
সতর্কতা কবিতার-
`যা লিখেছি প্রতিশব্দে, তারও নিচে চাপা পড়ে পৃথিবীর মন।'
চাষাড়া ব্যাংকের নীল অফিসার কবিতার-
`জেনারেল ম্যানেজারের চোখ হরিণাভ,
ধরা পড়ে যায় নির্বাচিত কবিতার বুল-অরের মোহ;'
আবার-
`তোমার একটা মুহূর্ত বুঝতে এসে
অন্ধকারের ঝুল বারান্দায়,
দাঁড়িয়ে রয়েছি সেই ভোররাত্রি থেকে।'
টোল কবিতার-
`অঙ্গের ভিতর অঙ্গ ঠেকাইয়া টোল খাচ্ছে কে?'
রাষ্ট্রপতি ও মাতাল কবিতার-
`ধরো তুমি একজন পুরুষ ও রমণীর মন- মুঠ করে ধরো'
জরুরি অবস্থায় কবিতার-
``ছেলে হোক, মেয়ে হোক দুটি সন্তানই যথেষ্ট'। কিন্তু জরায়ুর
গভীরে পা রাখতেই আমি অজস্র সন্তানের শুভেচ্ছা পেতে থাকি'
আবার-
`সঙ্গমকালীন জরুরি নিরাপত্তার জন্য এবার রাষ্ট্রের কাছে আমি
একদল দাঙ্গা-পুলিশ চাইব।'
আমার পাড়াতে থাকেন দামোদর হরি চাফেকর কবিতার-
`বক্তৃতা দিয়েই যারা স্বাধীনতা আনতে যায়, তারা
সবাই কি রে!'
প্রণয়েষু মাঘের কবিতা'য়-
`একটা কাক ঠোঁটে আদর করছে ঘন অন্ধকার
ফুটপাথ থেকে উচ্ছেদ হচ্ছে রৌদ্র ও ছায়া
পাখির পালক, আইসক্রিমের লাল প্যাকেট আর
ঠোঁটে লেগে থাকা বাচ্চারঙের বরফ;'
শহরে সফরসঙ্গী একটি করুণ মুখ কবিতার-
`খুব সরু, সোজা উপরে ওঠে- যেন সত্যের কাছাকাছি'
ইশতেহার কবিতার-
`আমার পক্ষে তোমাদের অনন্ত-অনন্তকাল ভালোবাসা কোনোমতে সম্ভব নয়। একটি
সাধারণ মুহূর্তে আমি টুপ করে ঝরে যেতে পারি।'
মনুমেন্ট থেকে এ-শহর কবিতার-
`আঁধার ছুঁয়ে দিলে ভোর নেমে আসে। আকাশের নিচে আর কোনো মহত্ত্ব ওঠে না
আমার আঙুলে কোনো দাগ নেই তোমাকে ছোঁয়ার ব্যর্থতা ছাড়া।
কয়েকজন বন্ধু আমার ঠিকানা লিখে রাখছে নোটবুকে। যে আমাকে একবারও
লেখে না- আমি তার অতিথি ভীষণ। পাতাদের গায়ে কোনো শীতজামা নেই,'
দারুণ কবি কবিতার-
`দারুণ বৃষ্টিপাত হতে পারে আজ মেঘে
দারুণ কিছু, অজানা তোমার আবেগে;'
শেষমুহূর্ত কবিতার-
`শেষমুহূর্ত ছাড়ার আশ্বাসে ক্রমশ চুপচাপ
মুহূর্তের খসড়া বুকপকেটে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি অস্পষ্ট এই অরের লোভে'
আবার-
`মানুষের অনেক মুহূর্ত এসে পাশ ফিরে চুপচাপ শোয়,
টিনের চালে আকাশের ব্যথা ঝরে,
শেষমুহূর্ত লোভনীয় হয়ে উঠছে খুব-
সকালের ক্ষণস্থায়ী হাট, সন্ধ্যা নদীর তীর, তীরে তীরে।'
ডাস্টার কবিতার-
`যেমন রাত্রির পিঠে জেগেছিল ভোর,
আবার ভোর মুছতে জাগল দুপুর
দুপুরকে মুছে দিতে এসছে বিকেল
আবার বিকেল মুছতে তুমি গোধূলি,
যেমন আমাকেও মুছে দিতে এসেছ
সময় তুমি বালকের হাতে ডাস্টার!'
যৌথ একাকিত্ব কবিতার-
'তোমার পাশে প্রিয়তম ছায়া,যৌথনির্মাণ;
যে কোনো নির্মাণে পাশে যদি লেখ নাম
নাম বানানের ভুল এসে পড়ে দেবে কেউ'
মৃত্যু কবিতার-
`ধরো, আজ তুমি বন্ধ করেছো তোমাকে
ঘরে নেই, বাইরে নেই, এমন কি ওই
দূরের সাইনবোর্ডেও পাওয়া যাচ্ছে না'
একটি নির্মম কবিতা কবিতার-
`তোমাকে কিছুই বলিনি
যত পৃষ্টা মনে রেখে চলে গেছে রাত
যত স্পর্শ নিয়ে
তোমার এই ছুঁই ছুঁই হাত;'
একটি জিহ্বাসম্ভব কবিতা কবিতার-
`সকাল দেখেছি মৌমাছির চাকের কাছে
চক্ চক্ করছে তোমাদের চোখ
তোমরা তাই আমার প্রিয় গাছটির কথা বলছো'
তার উদ্দেশ্যে কবিতার-
`যখন কবিতা শেষ, তখন তুমিও
যখন তোমার কলম অরহীন;
তোমার শব্দের দারুণ জেল্লা-
যখন বুকশেলফ থেকে শোকেস
একটা একটা করে খসে পড়ে নিস্তেজ;'
কুয়াশার আড্ডায় কবিতার-
`একটা লাল পিঁপড়ে কামড়ে দিল ঠোঁট
হঠাৎ বৃষ্টির ফোঁটা গ্রীবার কাছে বলল: `ওঠ'
উঠে যেতে যেতে মনে পড়ল ঢেউ,
উঠে যেতে যেতে হাজার বছর আগে
ফেলে আসা বাঁক
বাতাসের কাঁধ ছুঁয়ে সমাগত সন্ধ্যারা বলল:
`চলে যাবি, রাত্রিতে থাক্?''
স্বপ্নপাঠ কবিতার-
`স্বপ্নের ভিতর আমি উপর হয়ে শুই
স্বপ্নকে বুকের ওপর বসাই, তালবিদ্যা খেলি
একটা স্বপ্ন সাদা খাতায় মুখ গুঁজে থাকে
একটা স্বপ্ন আকাশপ্রার্থী পাড়াগাঁয়ের লোক,
এই রাতে হাত ধরে বলল:`আরও দূরে তাকাও,
ভাবছো কোন নায়ক?''
কবির বাগানে কবিতার-
`সমস্ত আলোড়ন শেষ হবে। নির্জনতা পেয়ে যাব হাতের মুঠায়'
আবার-
`প্রবল নৈঃশব্দ্যের বাগানজুড়ে রৌদ্রছায়া ধ্যান- যা কিছু অজানা
তোমার সম্ভাবনা নিয়ে নুইয়ে পড়া আকাশের গায়;
তোর নামটি এত বেশি চেনা!'
জ্যোৎস্নার পোস্টমর্টেম কবিতার-
`......................। আমাদের একদিন
সবকিছু মনে আনতে বহুদূর চলে যেতে হয়'
আবার-
`একটি শিশুর চোখ আমাকে উপো শেখায়;
কখনো পাবে না তাকে- পদ্মার চরে, ইলিশের পেটে
তোমাদের আয়োজিত জ্যোৎস্নায়।'
বোবাশব্দ কবিতার-
`গরুর শিংয়ে কত শব্দ তেড়ে আসে, গোড়ার খুড়ে কত শব্দ উড়ে যায়। শব্দের
বিবাহ উৎসবে আমিও
অতিথি হই। খাওয়া-দাওয়া শেষে পান করি দুইপেগ শুভেচ্ছার জল- এই জলে
এত আশ্চর্য কোলাহল
আর কোথাও দেখি না। ভুলে যাই যখন-তখন, আর যারা বোবাশব্দ, আলজিভে
তাহাদের কথারা সব
টঙ্কার মারে। ওই সাদা প্রান্তরে আমি তার প্রতিশব্দ হই- নৈঃশব্দ্যের এত স্পর্ধা
আর কোতাও দেখি না!'
গায়ে পড়ে লেখা কবিতার-
`আঙুলগুলি আর নতুন বেদনা ছোঁবে না'
আবার-
`প্রতীক্ষার প্রতিশব্দ নেই এ মধ্যরাতে,
ভোরগুলি মনে রাখবে না পাহারাদার
সময়ের অপো থাকল না এই হাতে;'
কলকাতায় বসে কবিতার-
`মানুষের ওপরে মানুষ উঠছে,
নামছে মানুষ
বৃষ্টি ভিজছে নিজেই, মানুষ ভিজছে কই?'
টোস্ট বিস্কুট কবিতার-
`কিছু চিঠির থাকে না প্রকৃত প্রাপক
গাছগুলি ফল বিক্রি করে
মাছগুলি বিক্রি হতে আসে আমাদের উঠোনে'
না-এর কবিতা কবিতার-
`রাস্ট্রপতিগণ যখন বেয়াদবি করেন তখন কি
তোমরা তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বলো- `যাও?"
নতুন কবি কবিতার-
`কী যেন নাম আপনার?
`-কালনেত্রে আছি,
আপাতত এটুকুই পরিচয়।''
সাধারণ কবিতা কাব্যগ্রন্থে মোট কবিতার সংখ্যা সাতচল্লিশ। সব কবিতাতে সন তারিখ এবং কিছু কবিতায় বিশেষ মুহূর্তের কথা কবি জানিয়েছেন। কিছু কবিতা কোথায় লেখা হয়েছে তা উল্ল্যেখ করেছেন। যেমন- শহরে সফরসঙ্গী একটি করুণ মুখ কবিতাটি ময়মনসিংহের কে. সি রোড়ের দোতা লা রেস্তরায় লেখা, কলকাতায় বসে কবিতাটি কলকাতার মীর্জা স্ট্রীটের আফরীন হোটেলে বসে।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জুন, ২০০৯ সকাল ১১:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


