আমার একটা খুব সুন্দর গল্প দরকার।একটা নাটক বানাবো।স্যার প্রতিদিন তাড়া দেয়! কী হলো, নাটক লেখা কতদূর?
আমি প্রতিদিনই কাইকুই করে বলি- এইতো স্যার! একটু বসতে হবে।
কখন লিখবো? বাসায় ফিরতে রাত এগারটা। কোনওরকম কিছু একটা খেয়ে টিভি দেখতে দেখতে ঘুম। ঘুম থেকে উঠে আবার অফিস। আগে যা লিখেছি তার প্রাগমেটিক্স এখন নেই। সেগুলো আর দর্শক খাবে না। সো নতুন করে লিখতেই হবে।
রিশানকে ফোন দিলাম; আমার বন্ধু খুব ভালো বন্ধু। বন্থুতা ভালো সেটাই বলছি না, বলছি ছেলেটাও খুব ভালো। পরোপকারে সুযোগ পেলে একদম বর্তে যায়। আর সবচে বড় গুন হলো একদম নির্লোভা একটা মানুষ। রাজধানীর সব মানুষগুলো যখন ধান্দা ছাড়া পাই ফেলে না, রিশান তখন সবচে বেশি প্রতিবাদী এসব ব্যাপারে। ওকে তাই ওর ক্যাম্পাসের বন্ধুদের থেকে আলাদাই থাকতে হয়েচে বেশি। এমনকি আমাদের সবচে ভালো (ধার্মিক)বন্ধু কামরুজ্জামান মাসুম সেও (অর্থনীতিতে পড়ত) ঢাবির আবহে সম্পূর্ণ পাল্টে গেলো। ও আমাদের সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া লাগাত আমরা কেন ওর সঙ্গে নামাজ পড়তে যাই না! কেন এতো আড্ডা দেই! তারচে নামাজবাদ মসজিদে বসলে কী হয়! আমরা মাঝে মাঝে ওর চাপাচাপিতে বসতাম। কিন্তু ও ছিল নিয়মিত। এটা আমাদের কলেজ লাইফের কথা। ঢাবিতে ভর্তি হওয়ার পর একবছরের মাথায় ওর সবচে বড় পরিবর্তন হলো- দাঁড়ি গায়েব। একদিন রিশানের কাছে গিয়ে ওকে না পেয়ে ওর পাশের রুমে একটু বসলাম জাস্ট ওয়েট। দুটো ছেলে কথা বলছে ওদের বিষয় বস্তু মেয়েলি। এসব রসাল বিষয়ে সবারই আগ্রহ থাকে। আমি না শোনার ভান করেও শুনছিলাম। কিন্তু একটুপর আর বসে থাকা সম্ভব হচ্ছিল না। একজন আরেকজনকে বলছে
-দোস! কী করি বলতো? মেয়েটা আর ছাড়ছে না। নোট নোট করে একদম পাগল বানিয়ে ফেলল।
-কী করবি মানে খেয়ে দে!
ফ্রি কোনও কামে নামবি না, দেখবি মেষে তোরেই হিজড়া কইবো। তারচে আগে খাবি তারপর নোট দিবি।
তারপর মালটা কেমন কী বলেটলে এসব নিয়ে জমজমাট আড্ডা। একটা জুনিয়র ছেলে যে শুনছে এসব, সেদিকে কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। এসব যেন সবার সামনে বলার মতোই কথা।
রিশানকে কথাগুলো বলিনি, লজ্জায়।
এমন পরিবেশে কামরুজ্জামান নষ্ট হলো ঠিকই কিন্তু রিশান রয়ে গেলো একদম ঠিক। আর দিনদিন যেন ওর স্পিরিচুয়াল ক্ষমতা আরও বাড়তেই লাগল। শেষ দিকে ও খুব নামাজী হয়ে গেলো, মুখে দাড়ি রাখল। খুব বেছেবেছে চলে। সবচে মজার ব্যাপার হলো ও কোনওভাবেই যৌতুক এলাউ করতে পারে না। এমনকি শ্বশুর বাড়ির কোনও গিফটিই ও মানতে নারাজ।
সম্প্রতি ওর বড়ভাই বিয়ে করেছে। তার শ্বশুরবাড়ি থেকে সংসারের সব মালামাল পাঠিয়ে দিয়েছে। কিন্তু রিশান এটা কোনওভাবেই মানতে চায় না। শেষমেশ ও ভাইর বাসা ছেড়ে এক বন্ধুর সঙ্গে মেসে ওঠে।
ভাইয়া ওকে অনেক বোঝাতে চেষ্টা করে যে সেতো কিছু চায়নি, আর তাছাড়া তারতো নতুন চাকরি, কোনও জমাটমা নেই, একটা সংসারে যা লাগে সেসব সে করবে কীভাবে? চাকরির বেতন থেকে মাসিক খরচ ছাড়া বাঁচানো সম্ভব না। মা-বাবার জন্যও কিছু পাঠানো সম্ভব হয় না। আর মেয়ের বাপের বাড়ি থেকে যদি না দিত একটা খাট কিনতে তার কতদিন লাগত? থাকত কোথায়? সংসারে সবার সহযোগিতা লাগে। রিশানকে আমি, এসব বোঝাতে চাই, ওর যুক্তি
-যদি ভাবীর বাপের সে সামর্থ্য না থাকত তাহলে ভাইয়া কী করত? ভাবীকে চাপ দিত? মারত নিশ্চই তা ই করত?
-সেরকম ফ্যামিলিতে বিয়েই করত না।
-তার মানে গরিবের মেয়েদের বিয়ে হবে না?
আমি ওর সাথে তর্কে না পেরে বললাম তাদের তুই বিয়ে করবি!
হ্যাঁ আমি গরিবের মেয়েই বিয়ে করবো...
-আর সারাজীবন ফ্লোরে ঘুমাবি!
-দরকার লাগে তাই করবো।
এই হলো আমাদের রিশান। ও কিন্তু মেয়েদের সঙ্গে একদমই মেশে না। আমরা যেমন সবারসঙ্গে হ্যান্ডশেক করি ও তা কখনই করে না, তবে তেমন কোনও প্রতিক্রিয়াও করে না; কামরুজ্জামানের মতো। কামরুজ্জামান হলে বলতো আস্তাগফিরুল্লাহ...
রিশানের কথাও ঠিক কিন্তু এর উল্টোটাও আছে। আমাদের এক সিনিয়র ভাই বিয়ে করেছে। মেয়েটা ইন্টারমিডিয়েট পাশ। ভাইটা রিশানের মতো কোনও ব্যাপারেই খুব বেশি এক্সাইটেড নয়। কিন্তু তার শ্বশুর বাড়ির লোকজন যে কী পিশাচ তা আমি নিজে দেখেছি। ভাবী চায় পড়াশুনা করতে। ভর্তির সময় একসঙ্গে বেশকিছু টাকা দরকার, ভাই সবার কাছে টাকা ধার করল এমনকি আমাদের কাছে পর্যন্ত টাকা ধার চাইলেন। ভর্তিটা ঋণের টাকায় হলো। কিন্তু মাসের খরচ? হিমশিম খাওয়া অবস্থাতার। অনেকদিন থেকেই আমরা তার বাসায় যাবো বাসায় যাবো বলি কিন্তু সে নেয় না, একদিন কোনও খবর না দিয়ে আমরাই গেলাম; গিয়ে বুঝলাম কেন সে তার বাসায় আমাদের দনতে চায়নি। ঘরের অবস্থা খুবই খারাপ। কাপড় রাখার আলনা নাই, খাট নাই, আমরা ফ্লোরে বসা ছাড়া কোনও গত্যান্তর পেলাম না। ফ্লোরে একটা তোষক তাও আবার সিঙ্গেল; তার হলজীবন থেকে পাওয়া।
দশ হাজার টাকা বেতনের চাকরি করে কীইবা তিনি করতে পারেন?
আমার খুব কৌতূহল হলো যে ভাবীর বাপের বাড়ির অবস্থা কেমন দেখার জন্য। ভাইর যা শুনলাম তাতে আমার খুব খারাপ লাগল। ভাবীর দুই ভাই পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। একজন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে আর আরেকজন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। শ্বশুর তার দুই ছেলেকে মানুষ করেছেন সব মাটি করে। রিটায়ার মেন্টের টাকাগুলো ব্যায় করেছেন দুই ছেলের পিছনে। এখন যা আছে, তা আগলে রাখছেন ছোট মেয়েটার জন্য। তার বিয়েতেতো খরচ করতে হবে।
বড়ভাইটা এখন কী করে?
ব্যাংকএ চাকরি করে।
বেতন?
সবমিলে ২৫/৩০ হাজার টাকা। ক্রেডিট শাখার তো, কমিশন আছে। কিন্তু সে নাকি ফ্যামিলির খোঁজ খবর নেয় না।
সিনিয়র ভাইটির সঙ্গে আলাপ করে আরও যা জানলাম তা হলো, মেয়েকে বিয়ে দেবার পর বাপের আর কোনও দায় দায়িত্ব থাকে না, এ কথাটা নাকি তার শ্বশুর তাকে বহুবার বুঝিয়ে দিয়েছে। ভাবীকে দেখলাম এতে তার কোনও লজ্জা বা অভিব্যক্তি নেই। সেও তার বাপের কাছে কিছু চাইলে বাপ মা দুজনেই বরে এমন অসভ্য ছেলের কাছে না থেকে চলে আয়। শিক্ষিত ছেলে দেখে বিয়ে দিলাম , সেই ছেলেও যৌতুক চায়?
আমি জানি না, ওই ভাইটার কপালে শেষপর্যন্ত কী ঘটল! তবে রিশানের কাছে আমি জানতে চাইলাম বাবা মার দায়িত্বকি কেবল ছেলেদের মানুষ করা? মেয়েদের লেখাপড়া করানোর কোনও দরকার নাই?
আর হিন্দুদের মতো মেয়েরা বিয়ের পর বাপের কিছুই পাবে না?
রিশান কিছু বলে না।
হয়ত ভাবে যৌতুক যেমন একটি অত্যাচার তেমনি, যৌতুক হয়ে যাবে বলে মেয়েকে ঠকানোরও একটি পাঁতারা কেউ কেউ করেন।
সেই রিশানের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হলো আজ আবার। ওকে বললাম একটা প্রচ্ছদ করে দিবি বই মেলায় একটা বই বের হবে। লিটল ম্যাগাজিন?
ও দুমকরে বলল- পয়সা দেবেতো?
আমিতো আকাশ থেকে পড়লাম! কার বাতাসে রিশানের এইদশা হলো?
কিছু ছাত্র তাদের কিছু লেখা নিয়ে একটা পত্রিকা বের করে নিয়মিত অনিয়মিত। এবার তারা ফেব্রুয়ারি উপলক্ষ্যে একটু বড় সাইজের এবং একটু উন্নতমানের একটা সংখ্যা করতে চায়, রিশান তাদের কাছেও টাকার আশা করে?
না, এ হতেই পারে না, তাহলেতো দুনিয়াতে আর উদাহরণ হবার মানুষই থাকবে না!
না, এই তথ্য আমাকে উদ্ধার করতেই হবে। আর যে লেখাটা ও দেকব বলেছে তারও টাকা দিতে হবে নাকি? ও আজকাল জনপ্রিয় লেখকদের একজন। চাইতেওতো পারে!
রিশান তু্ই আমার নাটকটা লিখে দে যদি স্যারের পছন্দ হয় তোকে ঠকাবো না। দিবিতো?
রিশান এই ব্লগের একজন পাঠক। আমি আশা করবো এই লেখা পড়ে ও ওর স্বস্থানে ফিরে যাবে অথবা কামরুজ্জামানের মতো সম্পূর্ণ খারাপ হবে।
কামরুজ্জামানের অনেক কথাই বলিনি আর রিশানের অনেক বাহাদুরির গল্পও আপনাদের বলিনি- আজ শুধু একটি বলি। কলেজ লাইফের। সেদিন রিশান রাতে আমাদের বাসায় ছিল। সঙ্গের বাইকটার জন্য রাতে একা বাসায় ফিরতে সাহস হচ্ছিল না।
তো সারারাত গল্পেগল্পে কাটিয়ে অনেকরাতে ঘুমালাম। কিন্তু ভোরে ঘুম ভাঙল একটা মেয়ের চিৎকারে! চোখে প্রচণ্ড ঘুম। বাইরে বেরুতে মন সায় দেয় না। আমি বলি অনেকেই আছে তারাই দেখুক, নে ঘুমা!
কিন্তু রিশানের ঘুম আর এলো না, আরেকটা চিৎকার শোনামাত্র ও বের হয়ে গেলো।
তারপরের দৃশ্যটা দেখে আমারও ঘুম শেষ। ও ফিরে এলা রক্তাক্ত শরীরে। সঙ্গে একটা মেয়ে, বাচ্চা মেয়ে, ভয়ে আর ঠাণ্ডায় কাঁপছে।
আমি রিশানকে ফার্স্ট এইড দিচ্ছি আর আন্টি মেয়েটাকে ভিতরে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
মেয়েটাকে ওর মা খালার কাছে রেখে যায় পড়ালেখা করার নামে। আসলে ও সে বাসার কাজের মেয়ে। কিন্তু এর কিছুদিন পর দেখা গেলো, মেয়েটির প্রতি বিভিন্ন লোকের কু দৃষ্টি, আর এর অন্যতম হোতা খালার ছেলে। খালা নাকি এতে কোনও বাধা দেন না। গতকাল মেয়ের মা এসে মেয়ের বিনিময়ে টাকা নিয়ে যায়। মেয়ে এটা টের পেয়ে মায়ের সঙ্গে পালাতে চেষ্টা করে। খুব সকালে উঠে তাই মায়ের যেখানে থাকার কথা সেখানে রও না দেয়। কিন্তু রাস্তায় থরা পড়ে কিছু আজেবাজে লোকের খপ্পরে।
মেয়েটি ক্লাস সেভেনে পড়ে।
সবচে মজার বিষয়- যেই রিক্সা থেকে মেয়েটিকে কেড়ে নেওয়া হচ্ছিল গুণ্ডাদের তাড়িয়ে দেওয়ার পর সেই রিক্সাঅলা নাকি পথ আটকার তার ভাড়ার জন্য! হায়রে রিক্সাঅলা? একেই বলে?
রিশানের সঙ্গে ছিল বস্তির এক মহিলা যাকে আমি বহুদিন দেখেছি গলা উঁচিয়ে ঝগড়া করতে। সে ও রিশান মিলে মেয়েটাকে উদ্ধার করে আমাদের বাসায় নিয়ে আসে। বস্তির মহিলাও বোছে একটি মেয়ের মানসম্ভ্রমের সম্মান! বুঝল না মেয়েটির মা, আর মেয়েটির খালা। এতো অসঙ্গতি কেন বলতে পারেন কেউ?
রিশান খুব দ্রুতই সুস্থ হয়ে গেলো। কলেজে আমরা ঘটাকরে এটার একটা প্রচার করতে চেয়েছিলাম, রিশানের জন্য পারলাম না।...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

