somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাবার গল্প

১৯ শে এপ্রিল, ২০০৮ রাত ৯:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাবার গল্প!
আমার বাবা অতি সাধারণ একজন মানুষ। সাধারণত মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক খুব ভালো। কিছু লোক, যারা মদগাঁজা খায়, নামাজ পড়ে না, গুণ্ডামি করে বেড়ায় তারাও বাবাকে একটু সমিহকরে চলে। কারও মাঝেবি বাবা যেন কোনও খারাপ কিছু দেখতে পান না। বাবার ভাষ্যমতে সবাই এদেশের সন্তান। সবাই মানুষ। যারা আজ সন্ত্রসী করছে, যারা তোতদর সামনে মেয়েদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে, যারা পোড়াবাড়িতে,ঘাটেবাধা নৌকায় গাঁজা আর মদ খায় তারাও মানুষ, তারাও এদেশের সন্তান। হতে পারতো এরাই এদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান। শুধু পরিচর্যা, গাইড আর সহযোগিতার অভাবে এরা দিনদিন খারাপ হচ্ছে আর মানুষ মারছে। এদের ঘরে যদি এমন বাবা থাকত যাদের বাবারা যেকোনও কিছুর বিনিময়ে হলেও সন্তানকে সুন্দর ভাবে বাঁচতে শেখান, স্কুলে ভর্তি করান, নিজে না খেয়ে ছেলেমেয়েকে পড়ান, যারা ছেলেমেয়েদের লক্ষলক্ষটাকা খরচকরে ডাক্তার-ইন্জিনিয়ার বানান! এমন পিতা-মাতা অভিভাবক পেলে এরাও নিশ্চই খারাপ হতো না। কেউ জন্ম নিয়েই খারাপ হয় না, খারাপ করে তার পরিবেশ-পরিস্থিতি।

বাবার বক্তব্যের সঙ্গে আমরা দ্বিমত পোষণ করি না, কিন্তু এওতো আছে যারা সবকিছু পেয়েও খারাপ হয়েছে? তবে তারও নিশ্চই কোনও কারণ আছে। কারণ কেউ খারাপ হয়ে জন্মায় না। আদর্শ মা, আদর্শ বা, আদর্শ পরিবার আদর্শ পরিবেশ চাই আদর্শ মানুষ হিশেবে গড়তে।
কিন্তু আমার এই বাবাও কিছু মানুষকে ঘৃণা করেন।
আমাদের এলাকার ... অমুক সাহেবকে। বাবা জানেন এইলোকটি রাজাকার ছিল। লোকটি এখন অনেক ভালো। পারলে মানুষের উপকার করেন, এর বাড়ি করে দেয়া, কল বসিয়ে দেয়া, যাকাতের টাকা, নিজেদের দান ইত্যাদি দিয়ে গ্রামের সহজসরল দরিদ্র মানুষের উপকার করে বেড়ান। মানুষ তাকে এখন ভালোওবাসে। তবে আড়ালে হয়ত আমার বাবার মতো বলে রাজাকার!

আমাদের সবার নিষেধ ছিল ওনাদের বাড়িতে যাওয়ার। বাবা মানুষের বাড়িতে মানুষ যাবে না এটা কেমন কথা?
সবার বাড়িতে গেলে দোষ নাই শুধু...
উনিতো মানুষ না। এরা অন্যজাত। দেখছিস সবাই কেমন ওর কথায় ওঠবস করে! লোকটি পারেও বটে! যে কোনও মূল্যে চায় এরা ভুলে যাক তার কুকীর্তি। কত কৌশলে...

আমরা যাইনি। সে আসত। খুবই কম। সর্বশেষ এলো আমার অসুস্থতার সংবাদ শুনে। কারও অসুখ হলে আর কারও কাছে সাহায্য পাক বা না পাক ওনার কাছে গেলে সে খালিহাতে ফিরত না। তছলির মা(আমাদের বাসার কাজের মহিলা) একবার মেয়ের অসুখের জন্য গিয়েছিল দুলাল ডাক্তারের কাছে, সে নাকি চিকিৎসা করেইনি উল্টো ধমক দিয়ে বেরকরে দিছে। দুলালদা মুক্তিযোদ্ধার ছেলে, এলাকায় তারও খুব নাম ডাক। একটা হোন্ডা নিয়ে আসেন প্রতি বৃহস্পতিবার। তছলির মা শেষে ওই রাজাকারের কাছে গিয়ে সাহায্য নেন।
আমাকে দেখতে তিনি হাতেকরে আঙুর নিয়ে এসেছেন। আর তার মুখের মিষ্টি সান্ত্বনাবাণী। আমার জবাফুলের এমন হলো ক্যামনে? শুভ্রপোশাকের সুগন্ধিময় মানুষটাকে ঘৃণা করার শক্তি আমি পেলাম না। আমার বাবা সামনা সামনি তারসঙ্গে কখনও খারাপ ব্যবহার করেননি। মা নাস্তা এনে দিয়েছেন। আঙ্কেল কীকী পড়ে যেন আমার সারা শরীরে ফুঁক দিলেন। আর বললেন ডাক্তারের ওষুধ যেন ঠিকমত খাই। ফুঁটু কিছু না, মানুষের একটা বিশ্বাস। আর আল্লাহর কালামতো কিছু বরকত আছে। ভালো হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। একটুপর বারান্দায় বনস আব্বুর সঙ্গে গল্প করতে করতে দেখলেন আমাদের জবাগাছে ফুল ফুটে আছে, তিনি একটা ফুল ছিঁড়ে এনে আমার হাতে দিলেন বললেন কে সুন্দর! জবা নাকি তুমি, মামনি?
আমি খুবই লজ্জা পেলাম। কেউ প্রশংসা করলে আমি খুশি হই ঠিক তাই বলে জবা এনে একেবারে হাতে নাতে ধরিয়ে দিতে হবে? যদি চাঁদের মতো সুন্দর হতাম, তাহলে কী করতেন।

উনি চলে যাবার পর বাবা বললেন কী সুন্দর ব্যবহার! কেউ বলবে এই লোকটাই আমার দেশের...
মা প্রতিবাদ করেন, রাখোতো তোমার সেই পঁচাগল্প। দেশকে একেবারে উদ্ধার করেছেন ওনারা। নিজেরা সব ভুড়িমোটা করছে আর গরিব মেরে বিদেশে টাকা জমাচ্ছে, তাতে কোনও দোষ নাই, এই লোক কবে কী করছে সেটাই দোষ! তোমার আদর্শবাদী ছেলে দুলাল যে ওউষধের নামে তছলির মার মেয়েকে নষ্ট করতে গেছিল তাতে কোনও দোষ নাই? আর এইলোকটা জানদিয়া সব মানুষের উপকার করে, শুধু ওইসময় কী ছিল না ছিল সেই কাসুন্দি।...
বাবা সাধারণত কারও সঙ্গে তর্কে জড়ান না। রাতে ঠাণ্ডা মাথায় মাকে নিশ্চই বুঝিয়ে বলবেন। দুপুরের দিকে আমি বেশ সুস্থ হয়ে গেলাম। আমার কেন যেন মনে হলো ওনার ফুঁতে। আল্লাহর কালাম!

কলেজে যেতে আসতে দেখা হতো রাস্তায়, তার বাড়ির আঙিনায়। সালাম দিতাম। সেও বেশ আদুরে গলায় বলত মা একটু বসে যাও!
বসা হতো না। শুধু একদিন তারমেয়ে (পরিত্যাক্তা! সম্ভবত রাজাকারের মেয়ে বলে) জোরকরে টেনে নিয়ে গেলেন রাস্তা থেকে। একগাদা বড়ই দিয়ে দিলেন।

হঠাৎই একদিন শুনি সে খুব অসুস্থ! হাসপাতালে নিয়ে এসেছে কাল রাতে। হাসপাতাল ছিল আমার কলেজের পাশে। আমি ছুটে গেলাম তাকে দেখতে। আমার বিশ্বাস ছিল বাবা কিছু মনে করবেন না। দুপুরে বাসায় না ফিরে হাসপাতালে গেলাম। মহি ভাই (তার ছেলে)বলল স্ট্রোক করেছে। কথা বলতে পারছে কিন্তু তেমন সেন্স নাই। কাকে কী বলে কোনও ঠিক নাই।
আমি গিয়ে তাকে সালাম দিলাম। সে উঠে বসল, আমার আব্বুর নামধরে বলল দ্যাখ অমুকের মেয়ে আসছে, মনে হয় কিছু খায় নাই অরে কিছু খাইতে দে।.. তারপর আমার সারাদিনে এলোমেলো হওয়া চুলগুলো আঁচড়ানোর জন্য তার মেয়েকে ধরলেন। চিরুনী খুঁজে পেলেন না। কেমন যেন করছিলেন, মহিভাই তার পকেট থেকে চিরুনী বের করে দিলেন হাসতে হাসতে। সে তাই দিয়ে আমার চুল আঁচড়াবার চেষ্টা করলেন, ঠিক সেভাবে , যেভাবে বাবা ছোটবেলায় আমার থুতনিতে হাত দিয়ে আঁচড়াতেন। আমার চোখে পানি চলে আসছিল..
কেন এই লোকটিকে বাবা এতো ঘৃণা করে?

বাবাকে বললাম বাসায় গিয়ে। বাবা বোধয় কিছু ভাবলেন তারপর বললেন, লোকটাতো এমনিতে খারাপ ছিল না, কিন্তু দলতো করে সেই যুদ্ধাপরাধীদেরই।..
আমার মুখ থেকে কিছু যেন বেরুতে চাইলো। কিন্তু পেটে প্রচণ্ড ক্ষুদা। খেতে খেতে মাকে বললাম- রাজনীতি না করলে কী হয়? ভালোমানুষরা কেন রাজনীতি করবে? তারা রাজনীতি না করলে সবার কাছেই প্রিয়ভাজন হতে পারত! কেন করে রাজনীতি?
আজও আমি ভাবি। আর কষ্ট পাই যখন মনে পড়ে ওনার জানাজায় আমার যে বাবা যাননি, তার আদর্শ আর যাই হোক অহিংস নয়। আমার সারাজীবনে আমি বাবার আর কোনও দিক পাইনি যাতে আমাদের কোনও প্রশ্ন উঠেছে।...
বাবা, শুধু মানুষকে ভালোবাসো। কিছু মানুষ তোমার কাছে কিছুই চায় না, শুধু চায় নিরপেক্ষতা।
১০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×