ছাদের টবে পানি দেয় সামিয়া। সপ্তাহের এই একটি দিন তার ছুটি। ছুটির দিনটাতেও তার অনেক ব্যস্ততা। কাজের মেয়েটাকে প্রতি শুক্রবারেই ছুটি দিতে হয়। এটা তার কন্ডিশন(শর্ত)। ঘরের সব কাজ সেদিন ওরা নিজেরাই করে। ছাদ থেকে সামিয়া দেখতে পায় বাবার বাজারে যাওয়ার দৃশ্য। নিজের রুমটাকে গোছায়। শুধু ফোন সেটটার যায়গা বদল করতে গিয়ে মনে পড়ে গতরাতের কথা।একচিলতে বাঁকা হাসিতে বলে_ বেশি ভদ্রলোক!
আর ঠিক সেই মুহূর্তে ফোনটা বেজে ওঠে। চমকে গিয়ে বুকে ফুঁক দেয় সামিয়া। কোনও একটা চিন্তায় ডুবে থাকলে এমনি চমকে যায় মানুষ! চমকের ভাবটুকু গলা থেকে সরিয়ে ফোন ধরে।-বরাবরের মতো-
-আসসালামু আলাইকুম!
-স্লামালেকুম ম্যাডাম!
-ওয়ালাইকুমুস সালাম। কপালে ভাঁজ ওর।
-ঘুমের ডিস্টার্ব করলাম বুঝি!
-না, আমি সকালেই উঠি, কে বলছিলেন যেন?
-ওহ চিনতে পারছেন না? না পরারই কথা! গতরাতে কথা হয়েছে। আপনি -বলেছেন আমি ভুল নাম্বারে ফোন করেছি, আসলে সেটা নয়, আমি আপনাকেই ফোন করেছিলাম! কিন্তু কোনও সূত্র না পেয়ে শেষে ভুল বলেই স্বীকার করলাম।
-কিন্তু আমিতো ডাক্তার নই?
-ডাক্তার নন, ডক্টরতো?
-আরে না, তাও না। ড এর সঙ্গে একটা ফোটা যোগকরা এতই সহজ? এই বয়সে?
-চেষ্টাতো করছেন, থিসিস পেপারওতো প্রায় রেডি? নাকি?
-নারে ভাই অতো কিছু না। কিন্তু আমিতো ঠিক আপনাকে...
আপনার কৌতূহলও দেখছি আর দশটা মেয়েরে মতো! আমি যতদূর জানি আপনি আর দশটা মেয়ের মতো ভাবেন না! কেবল একটা পরিচয় দিলেই আমি ভদ্রলোক হয়ে যাবো, একটু পরিচয়ের সূত্র থাকলেই আপনি আমার সাথে কথা বলবেন, এটাইকি হওয়া উচিৎ সবসময়? একটুকি ভিন্নভাবে হতে পারে না, মানুষের চিন্তা, মানুষের অনুভব, উপলব্ধি?
-হয়ত পারে! আসলে আমরা নিজেরাই নিজেদের বৃত্তের মধ্যে বন্দি রাখি! নয়ত মনে হয় যেন পদে পদে শুধু বিপদ আর বিপদ।
-মানুষের একটা বয়স থাকে নিয়ম ভাঙার! আপনারতো এখন সে বয়স!
-কে বলেছে? সে বয়সতো পেরিয়েছি সেই কবে? বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম জীবনে। এখনতো সবকিছু স্থির। তারুণ্য নেই, কোলাহল নেই, আড্ডা নেই। শুধু ধ্রুব গন্তব্য সামনে।
-একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি?
-করতে পারেন তবে তার আগে এইটুকু বলুন যে আপনি আমার অপরিচিত নন।
-না, আমি আপনার সত্যিই অপরিচিত। এবং শুধু আপনার কাছেই হয়ত আমি চিরকাল অপরিচিত থেকে যাব। যেভাবে মেঘ আলাদাই হয়ে থাকে আকাশের সাথে চিরকাল।
-ওকে বলুন, প্রশ্নটা বলুন। আমার প্রশ্ন শুনতে ভালো লাগে। আমার ভীষণ নেশা আছে ইন্টারভিউ দেয়ার।
-এটা ইন্টারভিউ নয় ম্যাডাম! জাস্ট কৌতূহল! আপনি কি পরিণীতা?
-বাহ! আর দশটা ছেলের মতোই যে আপনার কৌতূহল?
-হ্যাঁ, পরিণীতা।
-স্যরি ম্যাডাম!
-কেন?
-আমার তাহলে আপনাকে রাতে ফোন দেওয়াটা উচিৎ হয়নি।
-থ্যাংকস! নিজেকে এভাবে পরিশুদ্ধ করার জন্য।
তবে আপনাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি আমার দ্বারা আপনার কোনও ক্ষতি হবে না। আমার পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন? বলবো? নাকি নিজেই খুঁজে বের করবেন?
-দেখি পারি কি না। এই বয়সেও একটু অ্যাডভেঞ্চার করা যাক!
-আপনার বয়সকি কুড়ি একুশের বেশি? আপনি কিন্তু সেরকমই অভিনয় করছেন।
-সার্টিফিকেটএ সেরকমই। তবে বাস্তবে..
-আমি আসলে আপনাকে একটা কবিতা শোনাতে চেয়েছিলাম।
-আমাকে? কবিতা?
-আপনি কবিতা খুব ভালোবাসেন, বাসেন না?
-বাসিতো!
-আপনি যেই দোকান থেকে প্রায়ই আবৃত্তির ক্যাসেট কেনেন আমি সেখানকার কর্মচারী। আমার ধৃষ্টতায় অন্যায় নেবেন না। আমি কিন্তু আপনাকে ম্যাডাম বলেই সম্বোধন করেছি, আর তাছাড়া..
-তাছাড়া?
-তাছাড়া আমি কিছুদূর লিখাপড়াও করেছি। অন্তত ভদ্রতা সৌজন্য রক্ষার বিদ্যাটুকু।
-সে নজিরতো দেখিয়েছো । ঠিক আছে। ওকে। শোনাও! কবিতা শোনাও!
নামকি তোমার?
-....একবার বসন্তকালে একটা পাখি বসতে দেখেছিলাম আমার আঙিনায়, হলুদ রঙের পাখি! অনেক ছুটি বেড়িয়েছি তার পেছনে, আজও হয়ত...
দেখা হলো না আর, দিবতীয়বার। আমি কোকিলের গান শোনার ভক্ত ছিলাম না কখনও, একবার ...
একবার জোসনারাতে পুকুরপাড়ে কার যেন সুর শুনেছি, বাঁশির মতো, কত খুঁজেছি তারে! আর শুনতে পাইনি কখনও..
আমাদের ডালিম গাছ ছিল, ফুল ফুটলেই ছিঁড়ে খেলা করত দুষ্টদের দল। বর্গীর হানা থেকে মা যদিও বাঁচিয়ে রাখত কতেক, তাও পঁচে যেত একদিন..বিলাসী সুখের অভাবে! যেদিন বাবা আসবে, সেদিন পারিস! আজ থাক!
থেকে যেত, থেকে থেকে পোকার দংশন সহ্যকরত কোমল দেহী ওরা।...
দেখুন! আপনার আবৃত্তি খুব সুন্দর! একদিন সাক্ষাতে শুনবো! ফোনটা আসলে এভাবে বিজি রাখা ঠিক না। রাখি?
-রাখুন, তবে আরেকবার আমায় আমার যায়গাটি ফিরিয়ে দিন, সেই তুমিতে!
ও, আচ্ছা! আমি জানি না, তোমাকে তুমি বলাটা কতটুকু সমীচীন। তবে ছাত্রছাত্রী পড়াইতো, অভ্যেস হয়ে গেছে।.. রাখি..(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে অক্টোবর, ২০০৮ রাত ৯:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


